ডিজিনেস আপনাকে কিছু সময়ের জন্যে ব্যালেন্স থেকে সরিয়ে আনতে পারে।

ডিজিনেস, অর্থাৎ মাথা ঘোরানোর বা ঝিম ঝিম করার কারণ কি সেটা আমরা প্রায়ই জানতে চাই। মাথা ঝিমিঝিম করা খুব অস্বস্তিকর হলেও প্রাপ্ত বয়স্কদের ক্ষেত্রে এটি আসলে খুব সাধারণ একটি ব্যাপার।

ডিজিনেস এর মতই আরো একটি সমস্যার আমরা সম্মুখীন হই, যেটাকে বলা হয় ‘ভার্টিগো’। আমরা বাংলায় বলতে পারি ঘূর্ণি-রোগ। এই সমস্যা যার আছে তাঁর কাছে মনে হয় তিনি স্থির আছেন কিন্তু আশেপাশের সবকিছু ঘুরছে।

কিন্তু ঘুর্ণি-রোগও বেশ সাধারণ ব্যাপার। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া সান ফ্রানসিস্কো মেডিক্যাল সেন্টার-এর মতে, চল্লিশোর্দ্ধ ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৪০%-ই জীবনে একবার হলেও এই সমস্যায় আক্রান্ত হন।

তো, আপনি কি করে বুঝবেন আপনার ডিজিনেস আছে, না কি আপনি ভার্টিগোয় আক্রান্ত? এই দুটো’র মধ্যে প্রধান পার্থক্য হলো, ভার্টিগো হলে আপনার অনেক বমি বমি ভাব হবে এবং বমি করেও ফেলতে পারেন। আপনার দৈনন্দিন ব্যালেন্সেও ব্যাপক অনিয়ম দেখা দিতে পারে।

অন্যদিকে, ডিজিনেস আপনাকে কিছু সময়ের জন্যে ব্যালেন্স থেকে সরিয়ে আনতে পারে। এর পরিসর তীব্রও হতে পারে, আবার খুব সামান্যও হতে পারে।

এবার জেনে নেয়া যাক ভার্টিগো এবং ডিজিনেস কেন হয় এবং এতে আক্রান্ত হলে আমাদের কি করা উচিৎ।

১. অন্তকর্ণের সমস্যার কারণে ডিজি স্পেল বা মাথায় ঝিমঝিম ভাব হতে পারে

কান ও মস্তিষ্ক বিশেষজ্ঞ গ্রেগরি হুইটম্যান-এর মতে, “ডিজিনেস বা মাথা ঘোরার অন্যতম কারণ হল বিনিন প্যারোক্সিসমাল পজিশনাল ভার্টিগো, সংক্ষেপে বিপিপিভি।” তিনি জানান, “আমাদের অন্তকর্ণে রয়েছে ক্যালসিয়াম ও প্রোটিন দ্বারা গঠিত সেনসিং বা সংবেদী ক্রিস্টাল যাকে বলা হয় অটোকনিয়া। যদি এই ক্রিস্টালগুলো স্থানচ্যুত হয় এবং আমাদের অন্তকর্ণের মধ্যকার ক্যানেলে ভাসতে থাকে তাহলে অল্প সময়ের জন্যে মাথা ঘুরতে পারে বা ঝিমঝিম করতে পারে।”

হুইটম্যানের মতে, “এটি একটি সাধারণ শারীরবৃত্তীয় সমস্যা। এর সমাধান করতে হবে ফিজিক্যাল থেরাপির মাধ্যমে, মেডিকেশন বা সার্জারির মাধ্যমে নয়।”

বিপিপিভি অন্তকর্ণের খুব সাধারণ একটি সমস্যা। ভাস্টিবুলার ডিজর্ডারস অ্যাসোসিয়েশন-এর মতে, প্রতি বছর হাজারে একজন ব্যক্তি এতে আক্রান্ত হন। এটি প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে যে কারোরই হতে পারে। তবে সাধারণত এই ধরণের ভার্টিগোয় বেশি আক্রান্ত হন বয়স্করা।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এতে আক্রান্ত হওয়ার নির্দিষ্ট কারণ জানা যায় না। তবে বিপিপিভি এর সাথে ট্রমা, মাইগ্রেন, অন্তকর্ণের ইনফেকশন, ডায়বেটিস এবং অস্টিওপোরোসিস এর যোগসূত্র রয়েছে। চিকিৎসা নেয়ার পাঁচ বছরের মধ্যেই ৫০ভাগ রোগী আবার এতে আক্রান্ত হতে পারেন, বিশেষত এটা যদি ট্রমা’র কারণে হয়ে থাকে।

২. কানের ব্যালেন্স সিস্টেম রক্ত প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করে

হুইটম্যান বলেন, “আমরা জানতে পেরেছি যে, অন্তকর্ণের ব্যালেন্স সিস্টেম আমাদের রক্ত প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করে। এবং অন্তকর্ণের উপর-নিচ জ্ঞান আছে।”

অর্থাৎ, আপনি যখন শোয়া অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়ান তখন অন্তকর্ণের দুটি কাঠামো, ইউট্রিকল ও স্যাকুল, মাধ্যাকর্ষণ টের পায়। এরা আপনার কার্ডিওভাস্কুলার সিস্টেমকে সংকেত পাঠায় আপনার অবস্থান পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে রক্ত প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের জন্যে।

এই প্রক্রিয়ায় যখন কোনো সমস্যা দেখা দেয় তখন ডিজিনেস বা মাথা ঘোরানো দেখা দিতে পারে।

৩. ভিটামিন বি-১২ বা কোব্যালামিনের অভাব হলে মাথা ঘোরাতে পারে

এই জরুরি ভিটামিনের ঘাটতি থাকলে অনেকগুলো নিউরোলজিক্যাল সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন, অফ-ব্যালেন্স অনুভূত হওয়া, ব্লাড প্রেশার নেমে যাওয়া, মস্তিষ্কে রক্ত প্রবাহ হ্রাস পাওয়া।

বি-১২ ভিটামিনের ঘাটতি থাকলে সেটা সহজেই বোঝা যায় এবং পূরণ করা যায়। কিন্তু মাথা ঘোরানোর ক্ষেত্রে বি-১২ এর অভাবকে অনেকে প্রায়ই উপেক্ষা করেন।

আপনার যদি মাথা ঝিমঝিম করে তাহলে আপনার ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করুন আপনার বি-১২ লেভেল ঠিক আছে কিনা, ব্লাড টেস্টের মাধ্যমে তা নিশ্চিত করুন।

বি-১২ এর প্রধান উৎস হলো মাংস, দুগ্ধজাত খাবার ও ব্রেকফাস্ট সিরিয়ালস।

৪. মাথা ঘোরানো হৃদরোগের লক্ষণ হতে পারে

মাথা ঘোরানোর একটি সহজ কারণ হতে পারে হঠাৎ নড়াচড়া করা। যেমন শোয়া অথবা বসা অবস্থা থেকে হঠাৎ উঠে দাঁড়ানো। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে মাথা ঘোরানো হৃদরোগের লক্ষণ হতে পারে।

ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস সাউথওয়েস্টার্ন মেডিকেল সেন্টার-এর ফিজিক্যাল থেরাপির অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর পেট্রিসিয়া ব্লাউ বলেন, মাথা ঘোরানোর কার্ডিওভাস্কুলার-সংক্রান্ত কারণগুলোর মধ্যে কয়েকটি হল হার্টের ভাল্বে ফুটো কিংবা ভাল্ব সরু হয়ে যাওয়া, এরিথমিয়াস, যেমন অ্যাট্রিয়াল ফ্রিব্রিলেশান এবং এথেরোসক্লেরোসিস।

এগুলোর কারণে মাথা ঘোরাতে পারে কারণ এদের ফলে মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন বাধাগ্রস্ত হয়।

৫. মাইগ্রেনের কারণে ভার্টিগো হতে পারে

নিউরোলজিস্ট ডেবারা এল টুসি বলেন, “অনেকেই শুনে অবাক হয় যে মাথা ঘোরানোর সাথে মাইগ্রেনের যোগসূত্র আছে।” মাইগ্রেন-সংক্রান্ত ভার্টিগো’র আরো কিছু লক্ষণ হল নড়াচড়া করা, আলো ও শব্দের ক্ষেত্রে অতি সংবেদনশীলতা। মাইগ্রেনে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রায় ৪০ শতাংশেরই ডিজিনেস অথবা ভার্টিগো হতে পারে।

৬. দুশ্চিন্তার সাথে যোগসূত্র

হুইটম্যানের মতে, যেসব ব্যক্তি, বিশেষ করে বিশ থেকে ত্রিশ বছর বয়সীরা, ডিজিনেস অনুভব করেন তাঁদের অনেকেই দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগগ্রস্ত। এসব মানুষেরা সাধারণত স্বীকার করতে চান না যে দুশ্চিন্তার সাথে মাথা ঘোরানোর সংযোগ থাকতে পারে। কারণ এর ফলে বোঝায় যে এই সমস্যার মূলে হচ্ছে তাদের মাথা।

অথচ মাথার ভিতরে যা থাকে তা হলো মস্তিষ্ক। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা মস্তিষ্কের কাজে বাধা পাওয়ার ফলেও হতে পারে। এমনকি এটি জেনেটিক হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে।

দুশ্চিন্তাগ্রস্ত এবং দুশ্চিন্তামুক্ত লোকেদের মধ্যে তুলনা করে দেখা গেছে, যারা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত তারা চলমান দৃশ্য দেখে বেশি প্রভাবিত হয়। হুইটম্যানের মতে, এই লোকগুলো ভিজ্যুয়াল স্টিমুলেশন-এর ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক রকমের সংবেদনশীল। চলমান বস্তু দেখলে বা উজ্জ্বল ও বিশাল ঘরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় তাঁদের মাথা ঘোরার বা ঝিমঝিম করার প্রকোপ বৃদ্ধি পায়।

হুইটম্যান আরো জানান, এটিকে বলা হয় ভিজ্যুয়াল ডিপেন্ডেন্স। এটিকে নিয়ে আরো উন্নতমানের পরীক্ষা নিরীক্ষা হওয়া প্রয়োজন। সেই সাথে অ্যাংক্সাইটি ডিসঅর্ডার নিয়েও ল্যাবরেটরি টেস্ট হওয়া দরকার। সম্ভাবনা আছে ভবিষ্যতে এইসব ডিসঅর্ডারগুলো নিয়ে অংশত হলেও জেনেটিক্স এর অধীনে গবেষণা করা হবে।

৭. নৌকা ভ্রমণ কিংবা ওয়াটারবেড ব্যবহারের কারণে মাথা ঘুরতে পারে

ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডো’র ব্যালেন্স ল্যাবরেটরির ডিরেক্টর ক্যারোল ফস্টার বলেন, সমুদ্র ভ্রমণ থেকে ফিরে আসার পর মাথা ঘোরানোর অনুভূতি হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। এই অনুভূতিকে বলা হয় ‘মাল দে দেবারকেমেন’।

কারো ক্ষেত্রে এই অনুভূতি হয় কয়েক মাস, কারো ক্ষেত্রে তা কয়েক বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। নাবিকদের ৭৫%-ই এটি অনুভব করে থাকেন। বিমান, গাড়ি কিংবা ট্রেনে ভ্রমণ করার পরেও এরকমটি হতে পারে। ওয়াটারবেডে শুয়ে থাকলেও এমন হয়।

৮. ডিজিনেস ও ভার্টিগো কোনো ওষুধের প্রতিক্রিয়ায়ও হতে পারে

অনেক ওষুধ আছে যেগুলো ঝিমঝিম ভাব তৈরি করতে পারে। রক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণের জন্যে ব্যবহৃত বেশি ডোজের ওষুধগুলো মাথা ঘোরার কারণ হতে পারে। এই সমস্যা সাধারণত হয় বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে।

হুইটম্যান অারো বলেন, “আমার রোগীদের চিকিৎসা আমি অল্প ডোজের ওষুধ দিয়ে শুরু করি। অনেক সময় এই অল্প পরিমাণই বেশি হয়ে দাঁড়ায়।”

ওষুধ গ্রহণের আগে ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হতে পারেন এতে ডিজিনেস বা ভার্টিগো হওয়ার সম্ভাবনা আছে কিনা। তবে মাথা ঘুরতে পারে অাবার ভেবে ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেয়ার দরকার নেই। বেশিরভাগ মানুষই ওষুধের পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া টের পায় না।

৯. ডিহাইড্রেশন বা ডায়েটের কারণেও ঝিমঝিম লাগতে পারে

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন (এএইচএ)-এর মতে, সামান্য পানি শূন্যতার কারণেও মাথা ঝিমঝিম করতে পারে। তাদের মতে, পানি শূন্যতার কারণে রক্ত চাপ কমে যায়। ফলে মাথা ঘোরার অনুভূতি হয়।

ড. ব্লাউ এর মতে, খাদ্যাভ্যাসের কারণেও দেহে পানি শূন্যতা তৈরি হতে পারে, সেখান থেকেও এই মাথা ঘোরা হতে পারে। এএইচএ’র তথ্য অনুযায়ী, দেহের ওজন যদি ১ থেকে ২ শতাংশ কমে যায় তাহলে অল্প পরিমাণে পানি শূন্যতাও মাথা ঘোরার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

১০. মাথা ঘোরা ও ঘূর্ণি-রোগের আরো কিছু কারণ

মাথা ঘোরার পর্যায়গুলোর প্রতি লক্ষ রাখতে হবে। কারণ এটি হয়ত অন্য কোনো সিরিয়াস অসুখের লক্ষণ। বিষয়টা যদি এমন হয়ে দাঁড়ায় যে একদম নিয়মিত ঘটছে তাহলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

হুইটম্যান জানান, তার রোগীদের মধ্যে মাত্র ১ শতাংশের ক্ষেত্রে স্ট্রোক বা ব্রেইন টিউমারের মত প্রাণঘাতক অসুখের ফলে ডিজিনেস তৈরি হয়। যদি কারো ব্রেইন টিউমার থাকে তাহলে মাথা ঘোরানোটাই একমাত্র লক্ষণ না। অন্যান্য লক্ষণগুলোও যাচাই করতে হবে।

হুইটম্যান আরো জানান, ভার্টিগো’র সঙ্গে সম্পৃক্ত আরো একটি বিরল সমস্যা হল ‘মেনিয়ের’স ডিজিজ’। ঘূর্ণি-রোগের সাথে যদি শুধু এক কানে শোনার সমস্যাও থাকে তাহলে এটি মেনিয়ের’স হতে পারে।

তিনি অনুমান করেন, মাত্র ০.২ শতাংশ মানুষের অাছে। বিশেষত যাদের বয়স ৪০ থেকে ৬০। যদিও এটি পুরোপুরিভাবে নির্মূল করা যায় না, তবে চিকিৎসার মাধ্যমে কমিয়ে আনা যায়।