page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব
লাইফস্টাইল

মালয়েশিয়ান অর্থ কেলেঙ্কারি ও লিয়োনারদো ডিক্যাপরিয়ো

লিয়োনারদো ডিক্যাপরিয়ো নামের হলিউড অভিনেতাকে চেনে না এমন মানুষ আজকের পৃথিবীতে মনে হয় কেউ নাই। আগেও ছবিতে অভিনয় করলেও ‘টাইটানিক’ মুভি লিয়োনারদোর জীবনের সবচাইতে বড় সাফল্য এবং পরিচিতি এনে দেয়।

সেই ছবিতে বালকসুলভ চেহারার সেই নায়ক এখন হলিউডের সবচাইতে শক্তিশালী, জনপ্রিয় অভিনেতা হিসাবে পরিচিত। মাত্র একচল্লিশ বছর বয়সে তার এত কিছু প্রাপ্তি। এই মুহূর্তে তার সম্পত্তির আর্থিক মূল্য আড়াইশো মিলিয়ন ডলারের উপর।

সুখে থাকলে ভূতে কিলায়—এই কথা তো আর মুরুব্বিরা এমনে এমনে বলে নাই। সব শ্লোকের পিছনে ভাল যুক্তি রয়ে গেছে দেখা যায়। খুব কম বয়সে খ্যাতির চূড়ায় চড়লে মানুষ চোখে সর্ষে ফুল দেখা শুরু করে। সবার নিশ্চয়ই মনে আছে বিশ্ব মুষ্টিযুদ্ধ চ্যাম্পিয়ন মাইক টাইসনের কথা। দুর্দান্ত দ্রুত গতির বক্সার ছিলেন। কিন্তু বদ স্বভাবের দোষে যেমন দ্রুত খ্যাতির চূড়ায় উঠেছিলেন, একই গতিতে ঝরে পড়ে লোক চক্ষুর অন্তরালে চলে গেছেন কপর্দকশূন্য হয়ে। আইনি ঝামেলা, জেল জরিমানা তো আছেই।

সব বিখ্যাত এবং ধনী ব্যাক্তিরা নিজেদের নামে ফাউন্ডেশন গড়ে তোলে। উদ্দেশ্য হল আর্থিক অনুদান গ্রহণ করে পিছিয়ে থাকা মানুষদের কল্যাণে, জলবায়ু উন্নয়নে, জলজ ও বন্য পশু রক্ষায় গবেষণা এবং শিক্ষামূলক ক্যাম্পেইনের জন্য খরচ করা।murad hai 3 logo

বড় বড় মানুষেরা যে কোনো উদ্যোগ নিলে সেখানে বৃষ্টির মত টাকা আসে। টাকার পাহাড় গড়ে ওঠে। সমসা হল, তারপর সেই টাকার আয়-ব্যয় এবং উৎস নিয়ে তারা স্বচ্ছ থাকে না। ঊনিশ বিশ করে একদিন আইনি ঝামেলায় জড়ায়। দেখা গেছে হলিউডের সব নামি দামি ব্যক্তিদের ওঠাবসা থাকে আমেরিকাসহ বিশ্বের সব শক্তিশালী প্রেসিডেন্ট, আইনপ্রণেতা, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং আন্ডার ওয়ার্ল্ড ক্রিমিনালদের সাথে।

লিওনারদোও সেটার ব্যতিক্রম নন। ক্লিনটন ফ্যামিলির ঘনিষ্ঠ বন্ধু তিনি। হিলারি ক্লিনটনের ক্যাম্পেইনে মোটা চাঁদা দেন। ফান্ড রেইজিং এ যান। কিন্তু বাড়াবাড়ি হয়ে গেলে আইন তার নিজের বাপকেও ছাড়ে না আমেরিকায়। এই ব্যাপারটা আমার খুব পছন্দের। রাজনীতিতে অনেক নোংরামি থাকলেও আইনি স্বচ্ছতায় এই দেশে কেউ ফাঁক গলে যেতে পারে না। সেটা আমরা প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের ক্ষমতা থেকে প্রায় ইমপিচ হয়ে যাওয়ার দশা দিয়েই টের পেয়ে গিয়েছি।

bono-leo

বনো ও ডিক্যাপরিয়ো, লিয়োনারদো ফাউনডেশনের ফান্ড রেইজিং অনুষ্ঠানে।

লিওনারদোর ফাউন্ডেশনের নাম লিয়োনারদো ডিক্যাপরিয়ো ফাউন্ডশেন। সংক্ষেপে বলা হয় LDF। প্রচুর টাকার ফান্ড রেইজ করে প্রতি বছর। এসব ফান্ড রেইজিং অনুষ্ঠান হয় কোনো সংরক্ষিত এলাকায় শুধু আমন্ত্রিত অতিথিদের নিয়ে।

ফ্রান্সে সেইন্ট ট্রপেজ নামে খুব ব্যয়বহুল, মোহনীয় সৌন্দর্যের একটা ছোট্ট দ্বীপ আছে। পৃথিবীর সব ধনী ব্যক্তিদের অবকাশ যাপনের পছন্দনীয় দ্বীপ এটি। গত ২০ জুলাই সেইন্ট ট্রপেজে তেমনই এক ফান্ড রেইজিং অনুষ্ঠানের আয়োজন চলছিল লিয়োনারদো ফাউন্ডেশনের।

ধনী মানুষদের আপ্যায়নের জন্য দামি পানীয়, সুন্দরী ললনা, মজাদার খাবারের কোনো কমতি ছিল না সেই আয়োজনে। লিয়োনারদো হোস্ট হিসাবে মাইকে কথা বলছিল হাসি ঠাট্টা করে। ঠিক সেই একই দিনে খুব অনাড়ম্বরভাবে আমেরিকার লস অ্যানজেলেসে ঘটছিল অন্য ঘটনা। আমেরিকার বিচার বিভাগ ইউ,এস ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে লিয়োনারদোর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের মামলা সাজাচ্ছিল।

leonardo-65

লিয়োনারদো ফাউনডেশনে আগত সেলেব্রিটিরা।

অভিযোগের ভিতর ছিল মালয়েশিয়ার 1MDB-এর (1malaysia Development Berhad) তিন বিলিয়ন ডলার অর্থ কেলেঙ্কারির সাথে যোগসাজস। অভিযোগে সরাসরি তাকে অভিযুক্ত না করা হলেও একশ’ ছত্রিশ পাতার ডকুমেন্টে মালয়েশিয়ার অর্থ কেলেঙ্কারির সাথে জড়িত ব্যক্তিদের লিয়োনারদোর সাথে সম্পর্ক এবং তার ফাউন্ডেশনে মোটা অংকের টাকা দান করার কথা উল্লেখ করা হয় বার বার।

চোখ ঝলসানো সুন্দরীদের তত্ত্বাবধানে ধনী ব্যক্তিদের হেলিকপ্টারে করে অনুষ্ঠানে এনে ফ্রেশ বেইকড গোটা সী ব্যাস ফিশ দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। যদিও অনুষ্ঠানে চাঁদা চাওয়ার বিষয় ছিল পৃথিবীতে অতিরিক্ত মাছ ধরে, ভক্ষণ করে সামুদ্রিক মাছের বিলুপ্তি বন্ধ করা। ফাউন্ডেশনের উদ্দেশ্য আদর্শের সাথে যেমন বাস্তবে কোনো মিল নাই—ঠিক একইভাবে টাকা সংগ্রহের উৎস এবং খরচের স্বচ্ছতা নিয়েও তারা কোনো হিসাব দেখাতে রাজি নয় কাউকে।

লিয়োনারদোর ফাউনডেশন নন প্রফিট হিসাবে রেজিস্ট্রার্ড না হলেও ক্যালিফোরনিয়া কমিউনিটি ফাউনডেশন (CCF) নামের একটা নন প্রফিট সংগঠনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই এই সংগঠনের মত লিয়োনারদো ফাউডেশনেরও কোনো আয়-ব্যয় হিসাব দেয়ার বাধ্যবাধকতা নাই। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অন্য দেশের এক শোষক গোষ্ঠীর রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে লুটপাট করা টাকা শোষক ঘোষ্ঠীর চেলা চামুণ্ডারা এনে এই ধরনের ফাউন্ডেশনে রাখে নানারকমের অবৈধ সুবিধা পাওয়ার জন্য।

এখানে মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান 1MDB সম্পর্কে কিছু ধারণা দেই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাথে যৌথ উদ্যোগে রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের জন্য স্বদেশ এবং বিদেশ থেকে নেয়া ফান্ড দিয়ে ২০০৯ সালে এই সংগঠনের উৎপত্তি হয়। প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক নিজে চেয়ারম্যান পদে থাকেন এই প্রতিষ্ঠানের। রিয়েল এসটেট, পাওয়ার স্টেশন, ট্যুরিজম, কনসট্রাকশন, অস্ত্র কেনাবেচা’র মত বিশাল সব কাজ এবং ব্যবসায়গুলি দেখে এই প্রতিষ্ঠান। এখানে অর্থ বিনিয়োগ করে মধ্যপ্রাচ্যের সব ধনী দেশগুলি।

২০১৫ সালে মালয়েশিয়ার অনেক পত্রিকা এবং নিউইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর মত পত্রিকা রিপোর্ট করেছে যে বিভিন্ন অনিয়ম করে প্রধানমন্ত্রী বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার সেই সংগঠন থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের খুব কাছের মানুষ ছিলেন জো লো (Jho Low) নামের মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর বয়সের এক ঝানু শয়তান ব্যবসায়ী।

leonardo-698

সৌদি প্রডিউসার মোহাম্মদ আল তুরকির সঙ্গে হলিউড সেলেব্রিটিরা; লিয়োনারদো ফাউনডেশনের ফান্ড রাইজিং অনুষ্ঠানে।

আমেরিকায় পড়াশুনা করা জো ২০১০ সাল থেকে লিয়োনারদোর সাথে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন। বলা হয় তারা দু’জন একসাথে মদ্যপানের সঙ্গী ছিলেন।

আমেরিকার বিচার বিভাগের অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, জো লো খুব অল্প দিনের ভিতর এক বিলিয়ন ডলারের উপর খরচ করেছেন আমেরিকায় বিভিন্ন দামি সম্পদ কিনে। তার ভিতর একত্রিশ মিলিয়ন ডলার দিয়ে ম্যানহাটানে পেন্ট হাউজ অ্যাপার্টমেন্ট এবং বেভারলি হিলে লিয়োনারদোর বাসার পাশে ৩৯ মিলিয়ন ডলার দামের একটা ম্যানসন কেনেন। সে লিন্ডসে লোহান নামের হলিউড অভিনেত্রীর তেইশতম জন্মদিনে প্রতি বোতল ছয়শ ডলার দামের তেইশ বোতল বিখ্যাত ‘ক্রিস্টাল’ শ্যাম্পেন উপহার হিসাবে পাঠিয়েছেন।

জো এবং নাজিব রাজাকের ছেলে রিজা আজিজ এবং হলিউড প্রযোজক জোয়ি ম্যাকফারল্যান্ড (Joey McFarland) প্রতিষ্ঠা করেন হলিউড ফিল্ম কোম্পানি রেড গ্র্যানাউট পিকচারস। এই প্রযোজনা সংস্থা লিয়োনারদোর সুপারহিট ছবি দি উলফ অব ওয়াল স্ট্রিট-এর সব স্বত্ব কিনে নেয়। বলা হয় এই ছবিতে বিনিয়োগকৃত ২৩৮ মিলিয়ন ডলার আসলে মালয়েশিয়ার সেই সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান 1MDB থেকে চুরি করা টাকা।

সব কিছু মিলিয়ে লিয়োনারদো ফেঁসে যাচ্ছেন এক মহা অর্থ জালিয়াতি কেলেঙ্কারিতে। অতীত রেকর্ডে দেখা গেছে, যে কেউ একবার আইনের এমন বেড়াজালে আটকা পড়েছে, সে কোনোভাবেই আর কোনো ফাঁক গলে বের হতে পারে নাই। বরং হঠাৎ পাওয়া সব ঐশ্বর্য হঠাৎ করে হারিয়ে বাকি জীবন জেলের ঘানি টেনে যায়।

leonardo-578

‘দি উলফ অব ওয়াল স্ট্রিট’ ছবিতে লিয়োনারদো ডিক্যাপরিয়ো।

লুকিয়ে বেড়াচ্ছেন লোকচক্ষুর আড়ালে লিয়োনারদো। হিলারি ক্লিনটনের ফান্ড রেইজিং অনুষ্ঠানের হোস্ট হওয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু তার উপস্থিতি হিলারির নির্বাচনী প্রচারণায় বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে ধারণা করে তাকে অনুষ্ঠানে না আসতে বলা হয়েছে।

আমেরিকার মানুষ লিয়োনারদোকে তার ফাউনডেশনে জমা হওয়া মালয়শিয়ার জনগণের চুরি করা টাকা ফেরত দিতে চাপ দিচ্ছে। মালয়শিয়ার মানুষও একই কথা বলছে।

রাষ্ট্রের অর্থ চুরি করে আসলে কেউ কোনো দিন পার পায় নাই। ধরাও যেমন পড়েছে, শাস্তিও হয়েছে। যাদের যোগসাজসে অর্থ সরিয়ে রেখেছে, তারাও শাস্তি পেয়েছে। এটাই আইনের শাসন।

(তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট) নিউইয়র্ক, ২ সেপ্টেম্বর ২০১৬

About Author

মুরাদ হাই
মুরাদ হাই

জন্ম হাতিয়ায়। ১৯৬০ সালের ৯ অক্টোবর। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। পড়তেন মার্কেটিং বিভাগে। থাকতেন সূর্যসেন হলে। ১৯৮৯ সালে পাড়ি জমান নিউইয়র্কে। সে অবধি সেখানেই আছেন। দুই ছেলে রেশাদ ও রায়ান ছাত্র, স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা স্কুলের শিক্ষিকা।