মা
“আমারে যে হুজুর বাসায় কুরআন শরিফ পড়াইতেন, উনি একদিন জিজ্ঞাসা করলেন, আমি কেন আমার মা’রে মাঝেমধ্যে ‘তুই’ কইরা বলি। আমি তখন বেশ ছোট…।”

আমারে যে হুজুর বাসায় কুরআন শরিফ পড়াইতেন, উনি একদিন জিজ্ঞাসা করলেন, আমি কেন আমার মা’রে মাঝেমধ্যে ‘তুই’ কইরা বলি। আমি তখন বেশ ছোট; আমি জানতাম কেন আমি আমার মা’রে মাঝেমধ্যে ‘তুই’ বলি, কিন্তু ঠিকঠাক গুছাইয়া বলতে পারলাম না। অগত্যা হুজুরের কিছু নীতিকথা শুনছিলাম ওইদিন।

আমার মা তার জন্মদিন জানে না; যেমন বাবাও তারটা জানে না। তবে যুদ্ধের দুই বছর আগে আমার মা’র জন্ম এই ব্যাপারে আমার নানি নিশ্চিত ছিলেন। বাকি ছেলেমেয়েদের ব্যাপারে এই নিশ্চয়তাও তিনি দিতে পারেন নাই। আমার মা সবার ছোট ছিল আর যুদ্ধের কিছু আগে জন্ম হইছে বইলাই হয়ত নানি মা’র জন্মের বছর মনে রাখতে পারছিলেন।

মা’র বড় হইয়া ওঠা বা ছোটবেলা সম্পর্কে আমার তেমন ধারণা নাই। যা শুনছি তা খালা/মামাদের কাছে, ততটুকুই জানি। আমার খালার বিশ্বাস, আমার মা পড়াশোনায় খুবই ভালো ছিল। কিন্তু আমি যখন খালারে বলতাম, “ভালো হইলে ম্যাট্রিক আর ইন্টারমিডিয়েটে সেকেন্ড ডিভিশন পাইছে ক্যান? মা’র তো তাইলে ফার্স্ট ডিভিশন পাওয়ার কথা!” খালা তখন মুখ অন্ধকার কইরা ফেলতেন। কোনো এক কাজের ছুতায় বিড় বিড় কইরা বলতে থাকতেন, “বাপ ছিল না, মা’র টাকা-পয়সা নাই, শক্তি নাই, জমিজমার বিরোধ; তারপরও কত যুদ্ধ কইরা পড়ছে! তুমি সেগুলি কীভাবে বুঝবা!”

আমি শুইনা যাইতাম। বাবা না থাকলে কষ্ট হয় জানতাম, কিন্তু পড়াশোনায় কী সমস্যা তা ঠিক বুঝতাম না। মা’রে কোনোদিন এইসব নিয়া বলতে শুনি নাই। আমার নানাবাড়ি থিকা মা’র কলেজ বেশ দূরে ছিল। এইজন্য মা বড় খালার বাসায় থাকত। তাদের বাড়ির দোতলায়। বড় খালার বড় দুই মেয়ে আমার মা’র চেয়ে বড়, ছোট দুই মেয়ে মা’র চেয়ে ছোট। আমি ছোটবেলায় কয়েকবার সেইখানে গেছি। আমার খালাত বোনের মেয়ে, মৌ, আমার চেয়ে প্রায় সাত-আট বছরের বড়। মৌ আমারে পছন্দ করত না। কারণ সে জানত তার ঝর্ণা আপু এখন তার চেয়ে আমারে বেশি ভালোবাসে।

একদিন সে সিরিয়াস ভঙ্গিতে মা’রে আইসা বলল, “এই বাবুটা তোমার নিজের, না?”

মা হ্যাঁ-সূচক উত্তর দেওয়াতে সে মুখ ম্লান কইরা জিজ্ঞেস করল, “ওরে অনেক আদর করো?”

মা মৌ’রে কোলে নিয়া আদর করতেছিল এই কথা শুইনা। তখন মৌ বলল, “ঝর্ণা আপু, তোমার বাবুটা আমার মত ফর্সা না। কেমন জানি বাদামি ওর রঙ। তুমি ওরে ভালোবাসবা না। আমি সুন্দর, তুমি আমারে ভালোবাসবা।”

আমি তখন অত বাদামি-ফর্সার ব্যাপার বুঝি না। তাই কিছু হয়ত মনেও করি নাই। বড় হইয়া যখন আবার এই কথা শুনতেছিলাম, তখন বুঝলাম মৌ মা’রে ভালোবাসে; তাই এমন বলছে।

যখন মা বড় খালার বাসায় থাকত, তখন মৌ বেশ ছোট। সারাদিন মা’র সাথে থাকত। দোতলায় যে সোফায় বইসা মা সেলাই করত, সেইখানে সে না-খাইয়া, না-দাইয়া মা’র পাশে বইসা থাকত। আমার রুমে পাঁচটা ওয়্যালম্যাট আছে মা’র সেলাই করা। লাগেজে চারটা চাদর, দুইটা শাড়ি আছে—মা’র করা। ঘুমজেগে যখন মাঝেমধ্যে এগুলিতে চোখ যায়, তখন মনে হয়, এত সুক্ষ্ম আর সুন্দর সেলাই করা আমার পক্ষে হয়ত সম্ভব না। ছোটবেলার কত জামা, সোয়েটার, কানটুপি, মাফলার যে মা’র বানানো তার হিসাব নাই। যেইদিন সেলাই করতে করতে ঘাড়ব্যথা হইত, সেইদিন বেশ খুশি খুশি মুখ কইরা বলত, “আজকে ঘাড়ব্যথা হইতেছে।” মানে সে তৃপ্তি পাইছে আজকের সেলাইয়ে।

আমার মা’র ধারণা ছিল আমার একলার চুল শুধু সুন্দর দুনিয়ায়, বাদবাকিদের চুল পাটের আঁশ বা ঘোড়ার লেজের মত। এমনকি তার নিজের চুলও। ছোটবেলায় রাত্তির দশটায় ঘুমায়া যাইতাম। মা চুলে তেল দিয়া দিত, এত তেল যে চুলে চাপ দিলেই তেল পড়ে। সকালে উইঠা আধঘুমে আমি আবিষ্কার করতাম, আমার চুলে তেলেরা ডুইবা আছে, হাবুডুবু খাইতেছে। মা বালিশের ওপর টাওয়েল দিয়া রাখছে, যেন তেল বালিশের কাভারে না লাগে। আমি রান্নাঘরে গিয়া মা’র ফিনফিনা বেণি ধইরা ঝুইলা পড়তে চাইতাম। শ্যাম্পু না করায়া দেওয়া পর্যন্ত নিজে খাইতাম, কিন্তু মা’রে খাইতে দিতাম না।

মাসে একদিন চুলে ডিম-থেরাপি চলত । ডিম, অলিভ অয়েল আর টক দই—এই মিশ্রণ মাথায় দিয়া আমারে দাঁড়ায় থাকতে হইত পাক্কা আধঘণ্টা। আমার বয়স তখন ছয় বা সাত। মা’রে ভয় পাইতাম খুব, এইজন্য টু-টা শব্দ করতাম না। একবার একটা মাইজেলা ঠোঁটের ওপর কামড় দিছিল, তাও চুপচাপ দাঁড়ায় ছিলাম। দাঁড়ায় দাঁড়ায় বিলের পাড়ের বাচ্চাগুলিরে দেখতাম। রুক্ষ, নিষ্প্রাণ চুল তাদের। মুখটা খুশি খুশি। বকের ঘাড় লক্ষ কইরা ইটের কুচি মারতেছে। আর হাসতেছে। দেখতে দেখতে নিজের দাঁড়ায়ে থাকার দুঃখের কথা ভুইলা যাইতাম। তখন মা’র গলা কানে আসত, “আধঘণ্টা হইছে, শ্যাম্পু করতে আয়!”

ভাত মুখে রাখার জন্য খুব মাইর খাইতাম। গাল-টানা, চুল-টানা, শলার বারি—এইগুলি সপ্তাহে একবার অন্তত খাইতাম। তখন পড়াশোনায় ভালো ছিলাম, তাই ওরজন্য মাইর-টাইর খাই নাই। নার্সারি থিকা টু পর্যন্ত কিন্ডারগার্টেনে একবার সেকেন্ড হইছিলাম শুধু। আমারে বকাঝকা দেয় নাই অবশ্য এইজন্য। কারণ বাংলা পরীক্ষা দিয়া তার পরদিন আমি মা’রে বলে দিছিলাম, “মা, আমি না ভুলে ন্ত-তে ‘দন্ত, বসন্ত’ না লিখা ‘আনন্দ, ছন্দ’ লিখা আসছি।”

আমি সবচেয়ে বেশি হিংসা করছি মা’রে, নিঃসন্দেহে। মা ক্যান এইটা কিনল, মা ক্যান সাজল—এইসবে আমার খুব মাথাব্যথা ছিল। আমার মনে পড়ে, আমার মামাত বোনের বিয়েতে মা পার্লারে সাজছিল। আমারেও নিয়া গেছিল। আমারে একটা আন্টি চুল বাইন্ধা দিছিলেন, আর বলতেছিলেন আমার চুল কত সুন্দর! আমি তখন আড়চোখে মা’র সাজগোজ দেখতেছি। মেকআপ নেওয়া শেষ হওয়ার পর আমি চিল্লাপাল্লা শুরু করলাম—“ক্যানো মা’রে আমার চেয়ে বেশি সুন্দর দেখাইতেছে!”

তখন পার্লারের চাকমা-চাকমা দেখতে কিছু আন্টি আমারে বললেন, আমারেই বেশি ভাল্লাগতেছে। আমি তাদের বললাম, “আমি তো মেকআপ নিই নাই। লিপস্টিক দিই নাই। শুধু চুল বাঁধছি।”

একজন বললেন, “মেকআপ করতে চাও?”

“না। আমার এইগুলি ভাল্লাগে না।”

“তাইলে?”

“মা’কে আমার থিকা সুন্দর লাগতেছে ক্যান!”

আমার কথা শুইনা মা’র চোখ রাঙানি আর পার্লারের সবার হাসাহাসি দেইখা আমার চোখে পানি চইলা আসতেছিল তখন।

এগুলি সব ২০০৮ সাল পর্যন্ত সময়ের কথা। হুজুররে পরে বলছিলাম, “মা যখন ইনিসী হইত আর আমি যখন মা হইতাম, তখন আমি মা’রে ‘তুই’ কইরা বলতাম। আপনি গত মাসে যখন আমাদের কথাবার্তা শুনছেন দরজার ওপাশ থিকা, তখনও আমি মা-হইয়া মা’রে ইনিসী সাজায়ে কথা বলতেছিলাম।”

হুজুর কানছিলেন সেইদিন এই কথায়। একটা কথাও বলেন নাই। যেন ‘ইনিসী’ মা, আর ‘মা’ ইনিসী হইয়া তখনও কথা বলতেছিল দরজার ওপাশে। এতসব কথা কেবল অতীত হিসাবে স্বীকার কইরা নিতে ওনারও হয়ত কষ্ট হইছিল।

১২/৫/২০১৮

কভার. সানজিদা আমীর ইনিসী, নভেম্বর ২০১৮