page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব
আন্তর্জাতিক

মুখক তাম্বুল

‘পান একটি রোমান্টিক খাদ্য’ লিখ্যা আমার এক ফেইসবুক ফ্রেন্ড স্টেইটাস আপডেট দিছেন, বক্তব্যটা নাকি অভিনেতা মোশাররফ করিমের। নিচে সেইটাও লেখা। মোশাররফ করিম আমার পছন্দের অভিনেতা নন। কিন্তু তাতে উনার অভিনয় প্রতিভার কিংবা জনপ্রিয়তার কিছু বেশকম হয় না। অস্কার পাওয়া অভিনেতাও কারো ব্যক্তিগত পছন্দের তালিকায় না থাকতে পারেন। কিন্তু আমার কাছে যেই ব্যাপারটা খারাপ লাগে তা হইলো উনি কমেডি চরিত্রে অভিনয় করেন দেইখ্যা উনারে কৌতুক অভিনেতা হিসাবে বিচার করা কিংবা উনার সকল কিংবা অধিকাংশ বক্তব্যরেই কমিক ধইরা নেওয়ার প্রবণতাটা।

ওই স্টেইটাস আপডেট যিনি দিছিলেন তার হয়তো এমন উদ্দেশ্য ছিল না কিন্তু অনেকের মধ্যে আমি এই প্রবণতা দেখছি। আর পানরে খাবার বা নেশাবস্তু বা খাদ্যগ্রহণ পরবর্তী মাউথফ্রেশনার হিসাবে স্বাভাবিক ভাবে নিতে না পারার প্রবণতাটাও আমারে সমান ভাবে বিরক্ত করে।

আমি যখন প্রথম চাকরি নিছিলাম, আমার এক কলিগ দুপুর বেলায় আমারে পান চাবাইতে দেইখ্যা বিস্মিত হইয়া কইলেন, “আর ইউ চিউইং বেটেল লিফ?”

umme-farhana-logo

আমি অপ্রস্তুত হইয়া হাইসা দিলাম, য্যান খুব বড় অপরাধ কইরা ফালাইছি, কাজের জাগায় পান চিবাইয়া। এই অপরাধবোধের উৎস হইল এই ঘটনার কিছুদিন আগের আমার মেজোমামা আমিনুল আহসানের বক্তব্য। উনি আগে আমারে পান খাওয়া থাইকা নিবৃত্ত করার জন্যে কইতেন, “তুই ত চাকরি পাবি না, এমপ্লয়ারেরা তর দাঁত দেইখ্যাই তরে বাদ দিব।”

চাকরি নেওনের পরে কইতে শুরু করলেন, “তুই মাষ্টর মানুষ, নিজেই নিশাপাতি করলে ছাত্রগরে শিখাইবি কী?”

পানের লগে জর্দা খাওয়া হয়, জর্দা তামাক থাইকা বানানি জিনিস, অতএব ওইটা একটা নেশাবস্তু। শিক্ষকেরা নেশা করতে পারবেন না এইটা মনে হয় সর্বস্বীকৃত ব্যাপার, অথচ শিক্ষকেরাও তো মানুষ, ফেরেশতা তো আর না।

আমাদের সহকর্মীদের মধ্যে সিনিয়র অনেকে, প্রফেসর এবং সিন্ডিকেট মেম্বার ধরনের উঁচা পদে আছেন এই রকম দুই একজন নিয়মিত পান সেবন করেন। তাগর একজনের পান খাওয়া নিয়া কথা কইতে গিয়া আমার এক সহকর্মী কইলেন যে অমক স্যার চাবানো পান গালের এক পাশে রাইখা চা বিস্কুট খান, চা খাওয়া শেষ হইলে গাল থাইকা আবার ওই পান বাইর কইরা চাবান।

mukh-tambul3

আমার ছোটখালু মরহুম হাসিবুর রহমান এবং ছোটখালামনি লুৎফুন্নাহার বেগম। ছবিটা উনাদের মেজো মেয়ের ফেইসবুক থাইকা নেওয়া।—লেখক

আমি সরল ভাবে কইলাম যে আমার মায়ের এক খালাতো বোনও অইভাবে খাওয়া-দাওয়া করেন কারণ দিনের অধিকাংশ সময় উনার মুখে পান থাকে।

আমার সহকর্মী কইলেন, “তোমার খালা ত আর ইউনিভার্সিটির প্রফেসর না।”—ভাবখানা এমন য্যান পান চাবানো একটা অশিক্ষিত মূর্খ লোকেদের ব্যাপার, আমার গেরামে বসবাস করা খালারে ওইটা মানায়, একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসররে মানায় না। উনার আপত্তির কারণ যে কী, সেই স্যারের পান খাওয়া নাকি পান খাওয়ার সেই বিশেষ ভঙ্গি তা অবশ্য উনি খোলাসা কইরা কন নাই।

পান খাওয়াটা যে স্মার্টনেসের পক্ষে খুবই হানিকর তা আমি জানতাম, কিন্তু সেইটা যে এত আপত্তিকর তা বুঝছি শাহীন ম্যাডামের (জাহাঙ্গীরনগরের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক ডক্টর শাহীন এম কবীর) কথায়। ক্লাস ছিল না, অন্য কী এক কাজে বিভাগে গেছি, একটু আগেই পান খাইছিলাম আর ‘পড়বি তো পড় মালির ঘাড়ে’ স্টাইলে শাহীন ম্যা’মের সামনে পইড়া গেলাম।

উনি আমারে কইলেন, “মাউথ ফ্রেশনার হিসাবে তুমি এলাচ দারুচিনি সঙ্গে রাখতে পারো, কিংবা চিউং গাম খাও, দরকার পড়ে সিগারেট খাও, পান কেন?”—উনার পানের প্রতি অসম্ভব বিরক্তি প্রকাশ পাইল সিগারেটের কথা বলাতে। মেয়েরা সিগারেট খায় না এমন না, কিন্তু সেইটা সামাজিকভাবে গ্রহণীয় না, সেইটা ম্যাডামও জানেন, আসলে সিগারেট খাইতে কেউ কাউরে, বিশেষত ছাত্র গোত্রের কাউরে উৎসাহিত করে না। কিন্তু পানের প্রতি প্রচণ্ড বিদ্বেষে উনি এই কথা কইয়া ফেলছিলেন। উনার কাছে পান এতই খারাপ যে সিগারেট অত্যন্ত খারাপ হইলেও পানের চাইতে কম আপত্তিকর।

mukh-tambul2

স্বদেশী বাজারের রাধাগোবিন্দ স্টোর।—ছবি. লেখক

অথচ আমরা ছোটকাল থাইকা পান খাওয়া নিয়া এক পদের আগ্রহ নিয়া বড় হইছি।আমার মেজোখালা স্বদেশী বাজারের ‘রাধাগোবিন্দ স্টোরে’র মিক্সচার জর্দা দিয়া পান খাইতেন।পাশের দোকান থাইকা কিনলেও উনার চলতো না। কলেজে পড়ার সময় দুই একবার তার ফরমায়েশে ওই দোকান থাইকা জর্দা কিন্যা আনছি। তখনই ভাবছি, বড় হইয়া ছোটখালামনির (আমার মা বইনেদের মধ্যে ছোট, তাই মেজোজনেরে আমরা ছোটখালামনি ডাকি) কাছ থাইকা এই জর্দা খাইয়া দেখবো। কী এমন স্পেশাল এই জর্দা যে পাশের দোকানের একই রকম দেখতে জর্দা দিয়াও চলবো না? দুঃখের বিষয়, আমি জর্দা খাওয়ার মতন লায়েক হইতে হইতে আমার খালা তিনবার স্ট্রোক কইরা ফেললেন, জর্দা দূরের কথা, পান খাওয়াও উনার নিষেধ। আমার খালা অত্যন্ত আসক্তভাবে পান খাইলেও উনার দাঁত দেইখা তা বুঝার কুনোই উপায় আছিল না। উনি কয়লা চাবাইয়া নিমের ডাল দিয়া দাঁত মাজতেন।

আমি ফাইনালি পানের লগে জর্দা খাওয়া শিখছি আমার এক সময়ের রুমমেট ও বন্ধু রুবানার কাছ থাইকা। আমি আর রুবানা হল থাইকা বাইর হইয়া ডেইরি গেইটের দিকে যাইতেছি, মেহের পর্যন্ত আইসা মনে হইল পান খাওয়া যাক। আমি শুধু পান নিতেছি, দেখলাম রুবানা হাকিমপুরি জর্দা দিয়া নিতেছে। আমার বেশ ইগোতে লাইগা গেল ব্যাপারটা। রুবানা আমার চাইতে দুই/আড়াই বছরের ছোট, সে যদি জর্দা দিয়া পান খাইতে পারে তাইলে আমি ক্যান দুধভাতের মতন চমনবাহার খাবো? বিসমিল্লাহ বইলা একটা পান মুখে দিলাম হাকিমপুরী জর্দা দিয়া। পরে আমার মেজোখালার বড় মেয়ে রিমি আপার কাছ থাইকা রতন জর্দা খাওয়াও শিখছি। সেইটা আরো কড়া জর্দা।

mukh-tambul

রুবানা (আমার জর্দা খাওনের গুরু) আর আমি।—লেখক

আটের দশকে বিটিভিতে আর কোনো অনুষ্ঠান দেখানের মতন না থাকলেই রুনা লায়লার গান দেখাইতো, “পান খাইয়া ঠোঁট লাল করিলাম, বন্ধু ভাগ্য হইলো না।” সেই গানের চিত্রায়নে রুনা লায়লা বিরাট এক পানের বাটা কাঁখালিত নিয়া কোমর দুলাইয়া হাঁইটা যাইতেন। কলেজে যখন পড়ি, আনুশেহ আনাদিল কিংকর্তব্যবিমূঢ় নামের এক গানের অ্যালবাম বাইর করলেন, সেই অ্যালবামের প্রথম গানটাই ছিলো “ঘাটে লাগাইয়া ডিঙা পান খাইয়া যাও”। গানটানে পানের এত উল্লেখ থাকার পরেও সাংস্কৃতিকভাবে আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজ পান খাওয়ারে ভালোভাবে নিতে পারে না। উনাদের কাছে পান খাওয়া একটা গ্রাম্য এবং বয়স্ক ব্যাপার।

ঢাকার বিয়া বাড়িতেও পান পরিবেশন করা হয়, কিন্তু ধইরা নেওয়া হয় সেইটা নানিদাদি কিংবা জ্যাঠা ধরনের লোকেদের জন্যে দেওয়া হইছে। বিউটি পার্লার থাইকা সুন্দর কইরা মেইকআপ মাইরা আসা কোনো যুবতী বা দামি পারফিউম দিয়া সাইজা আসা কোনো যুবক সেই পান খাইলে তার সকল সাজগোজই মাটি হইব। সে যথেষ্ট স্মার্ট না বইলা প্রমাণিত হইয়া যাইব।এই যুবসমাজ আবার হিন্দি ছবিতে শাহরুখ খানের “খাইকে পান বানারসওয়ালা” গানের রিমিক্সের লগে নাচেন গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে।

পানের গ্রহণযোগ্যতা নাই শহুরে সমাজজীবনে, কিন্তু গানে হয়তো আছে। শিল্পসাহিত্যরে মানুষ জীবন থাইকা আলাদা ধইরা নেয়। আমার ছোটখালার বান্ধবী হেলেনখালা বাস্তবে কেউ প্রেম করলে তা অত্যন্ত নিন্দার বইলা ধইরা নিতেন কিন্তু বুদ্ধদেব গুহের তৃতীয় শ্রেণীর উপন্যাস বাবলি  পইড়া খুবই মুগ্ধ ছিলেন, ওইটা নাকি একটা ‘নিটোল প্রেমের উপন্যাস’। ইদানিং রেখা ভরদ্বাজের গাওয়া আর গুলজারের লেখা একটা হিন্দী গান শুইন্যা আমার সেই ফেইসবুক ফ্রেন্ডের পান বিষয়ক স্টেইটাস আপডেট মনে পড়ছে। গানটা হইলো, “হামারি আটারিয়া পে”, মাধুরী দীক্ষিত এই গানের লগে নাচছেন।ছবির নায়িকাও উনিই। গানের মাঝের একটা স্ট্যানজাতে বলে “আজা গিলউরি, খিলা দু কিমামি, লালি পে লালি তানিক হুই যায়ে”। নাচের মুদ্রাতে বুঝা যায় উনি সুগন্ধী পান খাওনের দাওয়াত দিতেছেন। ঠোঁটের লাল হইয়া যাওয়ার উল্লেখ করাতে এইটা আর স্বাভাবিক দাওয়াতের জাগায় নাই। একটা অ্যামোরাস ইনভাইটেশনের পর্যায়ে চইলা গেছে। গিলউরি শব্দের মানে আমি জানি না, কিমামির অর্থ হইল কিমাম নামক সুগন্ধীজর্দা যুক্ত পানের খিলি।খুশবন্ত সিঙের দিল্লী উপন্যাসে নওয়াবি আমলের যে অংশটা আছে সেই রকম একটা ফ্লেভার পাওয়া যায় এই ছবির গান দেখলে।যে কেউ পাবে এমন না, আমি পাইছি। দিল্লী তেও কবিদের লড়াইয়ের একটা বিষয় ছিল। ওই বইটা পড়ার আগে আমি জানতাম না যে ‘পারওয়ানা’ শব্দের অর্থ হইল মথ।   

মাউথ ফ্রেশনার হিসাবে পানের ভূমিকা সম্ভবত সুগন্ধের জন্যেই খুব জরুরি ছিল আগে। মানুষ কিছু খাইলে তার মুখে খাবারের গন্ধ থাইকা যায়, অনেকক্ষণ না খাইলেও এক ধরনের একটা দুর্গন্ধ তৈরি হয়। কাছের থাইকা কথা কইলে শ্রোতা সেই গন্ধ পাইতে পারেন। রোমান্সের জন্যে সেইটা ক্ষতিকর হইতেও পারে।চুমা খাইতে চাইলে অবশ্য পান সাহায্য করবে না, যে পান খাইতেছে না তার কাছে অন্যের মুখের চাবাইন্যা পানের স্বাদ ভালো লাগার কথা না।

যদিও সেই স্টেইটাস আপডেটে মোশাররফ করিমের বক্তব্যে ‘রোমান্টিক’ শব্দটারে খুব উপযুক্ত অর্থে ব্যবহার করা হয় নাই, কিন্তু সাধারণের বোধগম্যতার হিসাবে আমি এই শব্দ সঠিক বইলাই ধইরা নিছি।

আমি মন্তব্যে লিখলাম, “ভাই আপনেরা জুম্মায় জুম্মায় আষ্ট দিন হইলো ই-স্মার্ট হইছেন, তাই ভ্যালেন্টাইন ডেতে ডার্ক চকলেট কিনেন আর সেইটারে রোমান্টিক ভাবেন, আসলে পানই বেশি রোমান্টিক। শ্রীরাধারে জিগানো হইছিলো শ্রীকৃষ্ণ তার কী হন, উনি উত্তর দিছিলেন, নিজের কিছু প্রিয় জিনিসের নাম কইয়া, ‘হাথক দর্পণ/মাথক ফুল/নয়নক অঞ্জন/মুখক তাম্বুল’”। উনি দেখলাম সেই মন্তব্যে ‘লাইক’ও দিছেন। কিন্তু আর কেউ লাইকায় নাই দেইখা আমি ধইরা নিলাম যে উনারা আমার কথা পছন্দ করেন নাই। হয়তো আমার বক্তব্যরে পশ্চিমা আধুনিকতার প্রতি কটাক্ষ বইলা মনে হইছে উনাদের।

বৈষ্ণব পদাবলীতে রাধা যতই হাতের আয়না মাথার ফুল চক্ষের কাজলের লগে মুখের পানেরেও প্রিয় বস্তুর তালিকায় রাইখা শ্রীকৃষ্ণর সঙ্গে সম্পর্কের লগে তুলনীয় হিসাবে মর্যাদা দিয়া থাকেন না ক্যান, এই জমানায় কোনো যুবক তার প্রেমিকার লাইগ্যা ডেইরি মিল্ক সিল্ক কিংবা বোউর্নভিল নিয়া দেখা করতে গেলে প্রেমিকা যত খুশি হইবো, এক খিলি পান নিয়া গেলে তো আর হইবো না, উলটা আরো ক্ষেইপা যাইতে পারে। প্রেমিকা রাগী হইলে সম্পর্ক ভাইঙ্গাও যাইতে পারে। প্রেমিকা যদি বিটিভিতে রুনা লায়লার পান খাইয়া ঠোঁট লাল করিলামের ভিডিও না দেইখা থাকে তাইলে তো আর সে পানের সঙ্গে ‘বন্ধুভাগ্য’রে মিলাইতে পারবে না।

আমরা ছোটকালে শুনতাম পান খাইলে যে মেয়ের ঠোঁট লাল হয় তারে তার স্বামী অনেক আদর করে বা ভবিষ্যতে করবে। যে সকল নারী এই প্রবাদ শুনে নাই কিংবা কিশোরী বয়সে মুখ লাল হইবার আশায় বেশি চুন খাইয়া জিহবা পুড়ায় নাই তাগর কাছে পানের কোনো রোমান্টিক অ্যাপিল থাকার কথা না।

About Author

উম্মে ফারহানা
উম্মে ফারহানা

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। ইংরেজি সাহিত্য পড়ান। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন ২০০৩ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত। জন্ম ময়মনসিংহ শহরে, ৬ অক্টোবর ১৯৮২। প্রকাশিত গল্পগ্রস্থ: দীপাবলি। shahitya.com-এ ধারাবাহিক উপন্যাস লিখছেন: লৌহিত্যের ধারে।