page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

মুম্বাইয়ের ‘স্মৃতি’ (৪)

(আগের কিস্তি)

১১.
মুম্বাইতে যখন নামলাম তখন শেষ রাইত। লেখা কইছিল, তুমি যখন পৌঁছাইবা তখন ঘুটঘুইট্টা আন্ধার থাকব।

আমি মুম্বাই স্টেশনে নাইমা এদিক-ওদিক দেখতাছি। কোন দিকে বাইর হমু ঠাহর করতে পারতেছি না। যে কোনো একদিকে বাইর অইলেই অয় অবশ্য।

কিছুক্ষণ স্টেশনটা, মানুষজনের চলাচল দেখলাম। টানেলের শেষে কোনটার আলো কাছে সেইটা দেইখা সেদিক নির্গমন ধরিলাম। এইসব পথ দিয়া গেলে, হাঁটলে, এমন সব জ্বিনে ধরা সময়ের ভিতর দিয়া গেলে জেমসের ওই গানটার কথা মনে হয় আর গ্লাস নিয়া বইসা পড়তে মন চায়—

“যে পথে পথিক নেই, বসে আছি সেই পথে
একা আমি একলা রাতে, শত শতাব্দি ধরে
চুপচাপ নিশ্চুপ চারিধার, বসে আছি এই আমি
একগ্লাস জোছনা আর একগ্লাস অন্ধকার হাতে”

এই গানের মত আমারেও ভাঙচুর ঝিমে ধইরা বসে।

“আরে আলো যেইখানে ম্যারম্যারাইয়া আসে
পোষ না মানা হৃদয় আমার, হাওয়ার সাথে, রঙের সাথে
আলোর সাথে, ভালোর সাথে মিলমিশে
আশেপাশে, অসম স্রষ্টার সাথে ছালা বিছায়া বইসে কেরু খায়”

সিএসটি স্টেশন। এর আশেপাশেই আমারে থাকতে কইছিল লেখা।

ছত্রপতি শিবাজী টারমিনাল স্টেশন

ছত্রপতি শিবাজী টারমিনাল স্টেশন

বাইর হইয়াই দেখি আমারে লইতে লাইন ধইরা গাড়ি খাড়ানো। আসলে আমারে লইতে না। এইসব স্টেশানে সব টেক্সিক্যাবগুলা এমনেই সিরিয়ালি থাকে।

ঐপাশে চায়ের দোকান আছে। তারা ডাকতেছে ‘এই চায়ে চায়ে…।’ এই সুমধুর ডাকেই হোক বা টাকা দিলে তারা আমারে চা দিব, মেহমানদারির খাতির করব, অচেনা, অসহায়, আজনাবি ভাব কইরা দূরে ঠেইলা দিব না এই মনসুখে আর চা খাইতে হবে এইটা ভাইবা আগাইলাম।

bhromon-logo

মাথা ঠাণ্ডা করে ভাবতে হইব। টেক্সির সারির মাঝখান দিয়া তাদের পাশ কাটায়া স্টেশনের ঐপার গেলাম। এইখান থেইকা স্টেশনটারে দেখতাছি। চায়ে লয়া এক সাইডে চুক চুক কইরা খাড়ায়া ফোন বাইর করলাম।

লেখা কয়া দিছিল নাইমা তারে ফোন দিতে। সে ট্রাই করব লইতে আইতে। আমি এত রাইতে লেখারে কল দিলাম না। লেখার দেয়া হোটেলে না গিয়া তারে না জানায়া যে হোটেল বুক দিছিলাম সেইখানে কল দিলাম। হোটেলওয়ালা কইল চইলা আইতে।

চা শেষ কইরা একটা ক্যাব লয়া ঠিকানা মত রওনা দিলাম।

টেক্সি আমার দেয়া অ্যাড্রেসমতে খালি রাস্তা ধইরা ফ্লাইওভার ধইরা আগাইতে থাকল। আমি সম্রাট আকবরের মত পিছনের সিটে ল্যাদায়া বইসা আছি। আশেপাশে তাকায়তেছি। একটা বড় সিনেমা হল (নাম মনে পড়তাছে না, ম্যাপ ঘাটলে পাওয়া যাইব। পরে এই রাস্তা দিয়া গেছি কয়েকবার), সেইটা বাঁক নিয়া কয়েকটা রাস্তা। এবং সবগুলাই চিপা। এখন?

আমি ড্রাইভাররে কইলাম, চিনি না। হোটেলে ফোন দিলাম, ওরা রোড নাম্বার আর হাউজ নাম্বার দিয়া সারা। রোড তো আর পাই না।

হুটহাট কিছু গাড়ি যাইতেছে। কদ্দুর গিয়া মানুষ পাওয়া গেল। ড্রাইভার তাদের জিগাইয়া আগাইতে থাকল। এখানে টেক্সির ড্রাইভারগুলারে যেখানে যাইতে কমু যতক্ষণ কমু যাইব, পরে মিটারে যত বিল ওঠে দিয়া দিলেই হইল।

কিন্তু এমনে কতক্ষণ?

চিপা-চাপা রাস্তা দেইখা আমি চিন্তা করলাম, ইন্টারনেট দেইখা ছোট কিন্তু সুন্দর হোটেল বুক দিছিলাম। সেইটা কেউ চিনব না? আর সেইটা কি এত চিপার মইধ্যে হইব? টেক্সি থেইকা নাইমা মিটার মোতাবেক ভাড়া মিটাইয়া দিলাম। হাঁইটা খুইজা বাইর করি।

১২.
হোটেলের মত দেখতে একটা জায়গা পায়া খুশ হয়ে খাড়াইলাম। লেখার কথামতে ব্যালেন্স ফুল রিচার্জ কইরা নিছিলাম বইলা। ফোন দিয়া আশেপাশের বর্ণনা দিলাম। তারা কইল, “হ্যাঁ। সেটাই।”

বাপরে, পাওয়া গেল সহজে। আমি ইহারে পাইছি রে!

ব্যাগ রাখুম, গোসল দিয়া হালকা খায়া ঘুমামু এইসব ভাবতেছি। কিন্তু কই? এইটা হোটেলের হাব-ভাব তো লাগে না। কেউ নাই। ঢুকমু কেমনে?

পাশের বিল্ডিং-এর একজনরে “এক্সকিউজ মি” বলে ডাইকা আমার হোটেলের নাম বললাম। জিজ্ঞেস করলাম, এইটা সেইটা কিনা।

সে কইল, কীয়ের হোটেল! এইটা হোটেল না।

এলা কী হইব? কই যামু? রাস্তায় রাস্তায় ঘুরমু? রিস্কের মইধ্যে পইড়া গেলাম। এই চিপা রাস্তারই আরো উপরাস্তা আছে, যেগুলার মুখে উঁকি দেই, ভিতরে ঢুকি না।

একজনের হেল্প লইলাম। দূর থেইকা নিয়ন সাইনে কোনো কিছুর নাম দেইখা একটা ক্লু পায়া গলির ভিত্রে ঢুকলাম। কাছে গিয়া দেখি—না, মিলল না। হোটেলের নামে একই নামের সেলুন না জানি কী।

আমি ব্যাক করতেছি, এক পথচারি বড় রাস্তা ধইরা যাওয়ার সময় আমারে গলির মইধ্যে দেইখা ব্যাক করল। তারে জিগাইও নাই। সে অপর দিকে আরেকটা উপরাস্তা দেখায়া দিয়া কইল, আমি যেইটা খুঁজতেছি সেইটা এইদিকে ভিতরে হওয়ার কথা।

সম্ভবত টুরিস্টদের এই অবস্থার ভরপুর অভিজ্ঞতা তার আছে। তার কনফিডেন্সের কারণে তার দেখায়া দেয়া রাস্তা ধইরা আগাইলাম। হলিউডের বানানো সেটের মত পুরান ভাঙ্গা গাড়ি, গ্যারেজ, বাড়ির ভিতর দিয়া আগাইতেছি আর ভাবতেছি এইখানে হোটেল কেমনে সম্ভব। শেষমেশ এইখানেই মিলল।

রঙিন আলোয় ইংলিশে নাম দেইখা ছুটলাম। একটা ছোট বিল্ডিং সেইখানে হোটেল, ভিতরে ছিমছাম। ইন্টারনেটে ঐ ভিতরের ছবি দেয়া। আশেপাশে আরো এরকম হোটেল আছে। আমি বুকিং দেয়া হোটেলে ছোট্ট দরজা দিয়া ঢুকলাম।

রিসেপশানে বললাম, আমি এই হোটেল বুক দিছিলাম। এতক্ষণ কি আপনার লগেই কথা কইতেছিলাম?

সে কইল “হ্যাঁ।” আইডি কার্ড চাইল।

তারা সবখানেই আইডি কার্ড চায়। ট্রেনেও চায়। কিন্তু ট্রেনে আমার কাছে চায় নাই। সো এখানেই ফার্স্ট আইডি’র ব্যাপারটা ফেস করতেছি। কইলাম, আমি ইন্ডিয়ান না। পাসপোর্ট আছে।

দিলাম। তা দেইখা আমার দিকে তাকাইল।

—বাংলাদেশ?

আমি: ইয়েস।

সে: না না। বাংলাদেশী অ্যালাউ না।

আমি মনে হইল বিল্ডিং-এর ছাদ থেইকা পড়লাম। এইটা আবার কী!

আমি: দেখেন হোটেল বুক আছিল। আমি বহু জার্নি কইরা আইতেছি। এখন কই যামু?

রিসেপশনের লোকটা আমাকে আশ্বাসের মত দিয়া ভিতরে গেল। আবার কারে জানি নিয়া ব্যাক করল। যারে নিয়া আইছে সে পাসপোর্ট লাইরা চাইরা দেখে আর কয়, না না সম্ভব না।

অমা, এ কী কাণ্ড। বিপদের উপর বিপদ। কোনো মতেই রাজি করানো যাইতেছে না। আর আমি টার্মটাই বুঝতাছি না। কেন নিব না! কী কইলে বা কী করলে নিব। তাইলে এবার? অসহায় ভাব দেখাইলাম। লাভ হইল না। কোনো হেল্পও করল না।

ফিরা আসতে আসতে হাসি আয়া পড়ল। এরকম হোটেল জানলে বুকই দিতাম না। এই জায়গায় থাকা যায় নাকি? লেখা সিএসটি’র আশেপাশে থাকতে কইছিল বইলা, আর হোটেলের রিভিউতে ফরেনার মরেনার থাকে, ‘গুড’ কইছিল, তাই না।

১৩.
রাস্তায় আইসা টুইকা নেয়া পকেট থেইকা কাগজ বাইর কইরা এইবার একটু বেটার ক’টা হোটেলে কল দিলাম। একটা অফ বা ধরে না জানি কী। আরেকটা হোটেলে কয়েকবার করার পর খুব বিরক্তি লয়া ধরল। কী কইল বুঝলাম না। নাম্বার বাইর কইরা আরেকটা মারলাম। বিজি বা অফ। আবার আগের অই বিলা ম্যানরে মারলাম। সে কী কয় বুঝি না।

আমি ইংলিশে কই, এইটা অমুক হোটেল না? আমি খুব বিপদে আছি। দয়া কইরা কাইটা দিয়েন না। আমারে আপাতত একটা রুম দিয়া বাধিত করেন। ইতি আপনার বাধ্যগত ভোক্তা।

সে রিঅ্যাক্ট করল। এবার বুঝলাম সে সাউথের কোনো একটা ভাষায় কথা কইতেছে, হিন্দিও না। সে গভীর ঘুম থেইকা উঠছে। যে কয়টা ইংলিশ ওয়ার্ড সে কইতে পারল তার মমার্থ বুঝলাম, সে বুঝাইল, কোন কুত্তার বাচ্চা আমারে তার নাম্বার দিছে ডিস্টার্ব করার লাইগা? তার সকালে অফিস।

আমি ভয় পামু এই সময় আজান দিয়া উঠল।

এইখানে কড়া কিছু মুসলিম পাইলাম, শুধু টুপি না, জোব্বা টাইপ জামা পরা ওরা। এইবার আরো একটু ভাল হোটেলে কল দিলাম, এইটা আছিল সমুদ্রের পাশে, আমিও জানি না। নাই জাইনা কল দিলাম। তারা আইতে কইল। বাচ্চি! টেক্সি লইলাম।

ড্রাইভার: রেডিও ক্লাবের ওখানে তো। আপনাকে রেডিও ক্লাবের ওখানে নামায়া দিয়া আমি সোজা যামু গা।

আমি: রেডিও ক্লাব চিনি না।

সে ফোন দিতে কইল। আমি ফোন দিয়া তারে ধরায়া দিলাম। সে জায়গামত নিয়া গেল। বিচের পারে রেডিও ক্লাব নামের ঐখানে আমারে নামায়া দিয়া সে সোজা চইলা গেল। এইটা ইজিলি খুঁইজা পাইলাম।

কিন্তু এইটাও যে লাউ সেই কদু। ফ্ল্যাটের মত বিল্ডিং ভাড়া নিয়া সেইটারে হোটেল বানাইছে। আশেপাশে বড় বড় বিল্ডিং আছে। আবার নোংরা বিল্ডিং, রেস্টুরেন্টও আছে।

হোটেল পাই হোটেলের নাম দেখি কিন্তু আমি তো আর ঢুকতে পারি না। গেট নাই কোনো। ততক্ষণে আলো ফুইটা গেছে। এরে জিগাই অরে জিগাই। হেল্প হিসাবে হাত দিয়া দেখায়া দেয়। কিন্তু কোনো গেট নাই। লিফট দিয়া উপরে উঠতে হয়। সিঁড়ি নাই। লিফটেও সমস্যা। বুদ্ধি কইরা বা উপায়হীন হয়া ওয়েট করি। একজনরে ঢুকতে দেখে তার সাথে সাথে ঢুকলাম। ও আল্লাহ্‌!

হোটেলের ফ্লোরে আইসা টাস্কি। যে বিল্ডিং, যে লিফটিং, যে হোটেল যদি না দুর্ঘটনা জাতীয় কিচ্ছু হয় ছাদে উইঠা লাফ দেবার ব্যবস্থা থাকলে তো থাকল নাইলে কেউ বাঁইচা ফিরতে পারব না। গ্যারান্টি।

ভিতরে ঢুইকা রিসেপশন পাইলাম। ভোর হইছে বটে কিন্তু রিসেপশনে কেউ নাই, পাশের সোফায় একজন কাথামুড়ি দিয়া সেই ঘুম দিতাছে। তারে ডাকা উচিত। আর কেউ নাই, আমারো উপায় নাই। ডাকতেই হইব।

সে উইঠা জিগাইল, কী?

এখানে আর কী কামে আসে! কইলাম—রুম।

সে ঠ্যাং-মাথা-প্যান্টের ভিত্রে খাওজ্জাইতে খাওজ্জাইতে উইঠা রিসেপশনে গেল। যথারীতি আইডি কার্ড চাইলে পাসপোর্ট দিলাম। পাসপোর্ট দেইখা তার ঘুম উবে গেছে। লাইড়া চাইড়া দেইখা কয়—এইটা কী?

passports-12

“আমারে পাসপোর্ট ধরায়া দিয়া কইল—রুম নাই। স্যরি, আপনারে রুম দিতে পারতেছি না বইলা।”

কইলাম, পাসপোর্ট।

—কোন দেশের?

—বাংলাদেশের।

কইল, ম্যানেজার নাই। ম্যানেজার আসুক।

১৪.
পাসপোর্ট রাইখা দিল। রুম দিল না। একটা সিট বুঝায়ে দিয়া আবার ঘুমাইতে গেল গা। ভিনদেশে পাসপোর্ট খুব জরুরি জিনিস। সেইটা হারায়া আর সিট পায়া আমি সারেন্ডার। তবু এতক্ষণে ব্যাগ নামাইয়া, নিজেরে সামলাইয়া ওয়াশরুমের দিকে ছুটলাম। ছোট্ট রিসেপশনের বাইরে ছোট্ট জায়গাটাতে পাক খাইতেছি।

এক ফরেনার জিজ্ঞেস করল, আমি কিছু খুঁজতেছি কিনা।

কইলাম, হ্যাঁ, ওয়াশরুম।

সে বামহাত দিয়া ডাইনে আরেক ঘুপচি দেখায়া দিল। কৃতজ্ঞতায় থ্যাংকিউ দিয়া ঢুকলাম। ছোট্ট প্যাসেজের ঘুপচির একপাশে সিরিয়ালি রুম। আমি ঘুপচির শেষে আইসা ওয়াশরুম পাইলাম, মজা পাইলাম না। সুবিধার না। ছোট্ট, পিছলা।

আগে আমার কাম সারার দরকার। তারপর ফ্রেশ হমু। দেখি পানি নাই। এ কী! তাজমহলের আশা কইরা ঢুইকা ওয়াশরুমের এই অবস্থা পামু কল্পনাও করি নাই। তার উপর ওয়াশরুম লইয়া আমার এলার্জি আছে। রুম ঠিকঠাক না থাক, ওয়াশরুম মাক্ষন হইতে হইব।

এইখানে বেশ কজন ফরেনার আছে। সে হিসাবে ওয়াশরুমের অবস্থা মিনিমামও হবার কথা না? থাউক, পরে দেখা যাইব। আগে খায়া ঘুম দেই একটা। শান্তি হইয়া পরে হইল কী, লেখারে ফোন দিলাম। বিপদের কথা কিচ্ছু কইলাম না।

শুধু কইলাম, আরামসে উঠছি।

এখানকার কন্ডিশন জিগাইল। কইলাম। সে জবে যাইতেছে বা গেছে। খানাদানা আরো নানা কথাবার্তা কইয়া ঘুম থেইকা জাইগা কল দিমু কইয়া রাইখা দিলাম।

গতরের জামা কাপড় খুলতে খুলতে জানালায় কবুতরের ঝাপ্টা ঝাপ্টি দেইখা সেদিকে তাকাই। আরে এতুক্ষণ দেখি নাই! আমার জানালার সামনে তাজ হোটেল। সবাই জানে এইটা ইন্ডিয়ার খুবই নামকরা ও ঐতিহ্যবাহী হোটেল। তার সামনেই ‘গেটওয়ে অব ইন্ডিয়া’।

মুগ্ধতা আর ক্লান্তি লয়া লেপ ঝাঁপি দিয়া শুইয়া পড়লাম। আটটা, সাড়ে আটটার দিকে যে পোলায় সিট দিছিল সে ডাক দিয়া ওঠাইল। তখন আমি গভীর ঘুমে। উঠে তাকাইলাম, বোঝার ট্রাই লইলাম।

সে কইল, আসতে হবে। ম্যানেজার আইছে।

গায়ে জামা দিয়া রিসেপশনে গেলাম। ম্যানেজার পাসপোর্ট আরেকবার দেইখা কইল, বাংলাদেশী?

আমি: হুম।

ঐ পোলাটা যেমন হোটেলের মতই কিন্তু এই ম্যানেজারটারে শিক্ষিত, স্মার্ট মনে হইল হোটেলের তুলনায়। আমারে পাসপোর্ট ধরায়া দিয়া কইল—রুম নাই। স্যরি, আপনারে রুম দিতে পারতেছি না বইলা।

এই সিটেই থাকতে হইব ভাইবা একটু হতাশ হইলেও অভিব্যক্তি প্রকাশ করার মত পরিস্থিতিতে নাই। চোখে ভাল মতন দেখতে পাইতেছি না। তাও আর্গু শুরু করলাম।

ম্যানেজার তার ব্যক্তিত্ব ধইরা রাইখা কঠিন শান্তভাবে কইল, স্যরি! রুম দিতে পারব না। আমাদের হোটেলে সমস্যা। আপনারে হোটেল ছাইড়া দিতে হবে।

আমি ঠিকঠাক শুনি নাই বা বুঝি নাই। সে বাতচিত করতাছিল হিন্দিতে। সে ডেস্কটপ কম্পিউটারের দিকে তাকায়া কথা কইতেছিল।

আমি মনে করছিলাম, আজকে রুম দিতে পারব না। কষ্ট করে সিটে থাকতে হইব। যখন বুঝলাম যে আমারে চইলা যাইতে কইতাছে, আমার মনে হইল কেউ জানি আমারে কম্পিউটার দিয়া মাথায় বাড়ি দিছে। কয় কী! যামু গা মানে? কই যামু? এমন কথা কোনোদিন শুনি নাই।

আমার গায়ে বা মুখে কী শক্তি আইল কে জানে, আমি ইংলিশে ফটাফট কইতে থাকলাম, এইটা হইতে পারে না। আমি হোটেল বুক দিছি, আমারে তুলছে, এখন কইতাছ চইলা যাইতে।

রূঢ় হয়া গেছিলাম মে বি। এবার ম্যানেজারও স্পষ্ট শুদ্ধ, সুন্দর ইংরেজিতে কওয়া ধরল, আমরা রাখতে পারব না। পুলিশ ইনভেস্টিগেশনে আসার আগে যাতে দ্রুত চইলা যাই।

আমি তর্কাতর্কি করতে চাইছি সে কোনো তর্কাতর্কিতেই যাইব না। আইন, নিয়ম শুনব না। এইটা নাকি ইন্ডিয়ার নতুন আইন বা মুম্বাইর। কই যামু?

ম্যানেজার কইল, আরো অনেক হোটেল আছে সেখানে দেখতে।

আমি কিছুটা অসহায়, কিছু প্রত্যাশায় কিছু জিদে কিছুক্ষণ চায়া রইলাম। মেনে নিতে পারতেছি না। এমনও কি হইতে পারে? এত অমানবিক!

এমন পরিস্থিতিতে পড়তে পারি ধারণাও আছিল না। কী আর করা। ভিতরে গিয়া ড্রেস আপ কইরা আবার ব্যাগ কান্ধে লইয়া বের হয়া গেলাম। বের হওনের সময় তখনও বিস্মিত ভাব, শুধু কইলাম, দিসিস নট ফেয়ার!

১৫.
বাইরে আইসা পাশেই একটা ভাল রেস্টুরেন্ট পায়া, কাস্টমার নাই, সেটাতে ঢুকলাম। মাথা ঠাণ্ডা করতে হইব। আর খাইতে খাইতে চিন্তা করতে হইব, কী হইল আর কী হইবে?

পরোটার সাথে ছোলা-মোলা কী অর্ডার করলাম, খায়া বদ হজম হয়া গেল। পকেট থেইকা কয়েকটা হোটেলের নাম্বার বের করলাম। খায়া বের হইয়া রাস্তায় একটা চায়ের দোকান থেইকা মাটির কাপে চা খাইতে খাইতে ভাবি। রোদ তখন চড়া। লেখারে জানাইলাম না কিছুই। ভাবলাম ওরে ঝামেলায় না ফেলি। নতুন আরেকটা হোটেলে উইঠা তারপর সব কমু।

বাঁধানো বিচে বইসা-খাড়াইয়া নাম্বারগুলায় ফোন করলাম। প্রত্যেকটারে রুম আছে কিনা জিগানোর সাথে সাথে মনে কইরা ‘আমি বাংলাদেশী’ কইলাম। নট অ্যালাউড।

এর মধ্যে বড় বিপদ সঙ্কেত হাজির। ঘুমাইছি যে মোবাইল চার্জও দেই নাই। চার্জ লাস্ট মোমেন্টে। লগে আরেকটা ফোন আছিল সেইটা আগে থেকে অফ। কী করা যায়? কারো হেল্প নেয়া যায়? ফোনে চার্জ থাকলেও তো ফোন কইরা ভাই-ব্রাদার ম্যানেজ কইরা ফেলতাম।

লাস্ট কলটা করলাম মুম্বাইওয়ালী লেখারেই। সে শুইনা আৎকায়া উঠল, কইল, তুমি না হোটেলে উঠলা? ডাক্তার, উকিল আর মুম্বাই’র লেখার কাছে কিছুই গোপন করা যাইব না। বান্ধবীরে সমস্ত খুইলা কইলাম।

লেখা জবে আছিল। এটা শুইনা আমি আবার ভদ্রতা দেখায়া ফেললাম, তুমি টেন্স হইও না। দেখি আমি কী করা যায়।

আমার প্যান্ট খুলিয়া গেছে, ইজ্জত যায় যায় অবস্থা। আমার তখন সেই মাষ্টারের দশা “আজকে তাহারা জুতা মারিয়াছে, কবে না অপমান করিয়া বসে।”

আমার অপমান এত উপর দিয়া গেছে যে নিজেরে অপমানিত লাগে নাই। মনে হইছে মানুষ জাতির পরাজয়। পরাজয়ে ডরে না বীর। এগুলাই রাষ্ট্রের ত্রুটি। মানুষের চাইতে নিশ্চয় সীমানা, রাষ্ট্র, ভূখণ্ড বড় না। মানুষের লাইগাই নিয়ম-কানুন সব যেখানে সেখানে মানবিকতাই কি সবচাইতে আগে না? আমার পজিটিভ মন এখানেও সুন্দর খুঁইজা পাইল। “যেখানে যত কুৎসিত সেখানে তত সম্ভাবনা।”

লেখা স্ট্রেইট কইল, তুমি কোথায়?

তারে জায়গা বুঝায়া দিয়া কইলাম, ফোনে চার্জ নাই। পরে পাইবা না। কী করতে হইব কও, আমি করতাছি।

সে কইল, জায়গাটা তার ওয়ার্ক প্লেসের কাছেই। ঠিক ঐ জায়গাতেই যাতে আমি থাকি। সে আসবে।

(চলবে)

About Author

হুমায়ূন সাধু
হুমায়ূন সাধু