রাতে জীবনে এই প্রথম আমি বাইর হইছি। সবকিছু বন্ধ। আবার সবকিছু খুলবে, রাস্তায় জ্যাম হবে ভাইবা আমার অদ্ভুত লাগল।

আমরা বন্ধুরা মিলা একবার মেঘদলের কনসার্ট দেখতে গেছিলাম বুয়েটে। বিকালে ওইদিন যুঁথি আমাকে ফোন দিয়া বলল যে ওরা আজকে কনসার্ট দেখতে যাইতেছে। আমি কি যাব? তানজিম আর তন্ময়ও যাবে।

আমি রেডি টেডি হইয়া রওনা দিলাম। গাড়িতে ওঠার পর তন্ময় টেক্সট করল আমি আসব কিনা। আমি বললাম আসতেছি, গাড়িতে। জানালা দিয়া তাকাইয়া দেখলাম একই রকম বৃষ্টি হইতেছে আজকে সারাদিন। জোরে বৃষ্টি নামে, অনেকক্ষণ হইয়া আবার থামে। বাইরে বৃষ্টির ফোঁটা পড়েতেছে কিন্তু আকাশ কত কালো এইটা সন্ধ্যায় বোঝা যায় না।

তখন তন্ময়কে আমি অনেক পছন্দ করতাম। কিন্তু বলতে পারতাম না। কারোর সাথে শেয়ারও করতাম না। করলে জানাজানি হবে। এইটা আমার ভাল লাগত না।

অন্যদিনের তুলনায় অনেক তাড়াতাড়ি পৌঁছাইলাম ভার্সিটি। গলিতে আমার বন্ধুরা কেউ নাই। শুধু সামিরা আর ওর বয়ফ্রেন্ডকে দেখলাম একসাথে বইসা গল্প করতেছে। আমি তন্ময়কে ফোন দিলাম। ও ফোন ধইরা বলল, “কী বলো, আইসা পড়ছো? আচ্ছা আসতেছি।”

কথা শুইনা বুঝলাম ও দেরি করবে। আমি সামিরার কাছে গিয়া বললাম, “হাই।”

“হাই, কী অবস্থা, বসো।”

বইসা অপেক্ষা করতে থাকলাম। একটু পরে যুঁথি আর সাদমান ভাই আসল, আসতে আসতে ওরা আলাদা হইয়া গেল। যুঁথি আমাকে দেইখা বলল, তুই এত সেক্সি হইয়া ঘুরস কেন রে? আর আমার জামাকাপড়ের প্রশংসা করল। সাদমান ভাই তখন দূরে চা খাইতেছে। যুঁথি পরে বলল সামিরা কত সুন্দর—ওর জামা, জুতা, মালা। জামা, গয়নার ডিজাইন করত বইলা স্টাইলিশ কিছু দেখলেই আকর্ষিত হইত সে।

একটু পরে সামিরা রিকশা কইরা ওর বয়ফ্রেন্ডের সাথে বাসায় চইলা গেল। তখন আমি আর তানজিম মুনশী মামার চায়ের দোকানে গিয়া বসলাম। আর যুঁথি গলিতে বসল। চা খাইয়া আবার গলিতে গেলাম। দেখি অহনা অনেক ছেলেদের সাথে আলাপ করে। আর ফয়সাল অন্য জায়গায় ব্যাগ কোলে ওর অতি পরিচিত ভঙ্গিতে বইসা আছে। পাশে তন্ময় দাঁড়াইয়া লাজুক মুখে কথা শুনতে শুনতে হাসতেছে। আমার রাগ হইল, তন্ময় কেন আমাকে বলল না যে সে আসছে?

আমি চেষ্টা করলাম অহনার দিকে মনোযোগ দিতে। খুবই ক্লান্তভাবে অহনা কথা বলতেছে সবার সাথে। এইমাত্রই কাজ শেষ কইরা ফ্রি হইছে। তখন দেখি যুঁথি আর আরেকটা আপু বলল অহনার জামার কথা। সে এমন জামা পরে কেন? আমার ভাল লাগল না কথাটা। তাতে ওদের কী, ওরা কি জেলাস কারণ অহনা সুন্দর?

আমি আগাইয়া গেলাম তন্ময় আর ফয়সালের দিকে। ওরা আরো অনেকক্ষণ পরে কথা শেষ কইরা আমার সাথে কথা বলল। আমি জিগাইলাম, আমরা কখন যাবো? ওরা কিছু বলল না, কিন্তু একটু পরেই আমরা যাওয়ার জন্য রেডি হইলাম। দেখলাম অহনাও আমাদের সাথে যাইতেছে। কিন্তু ওর বয়ফ্রেন্ড বিধান যাইতেছে না। আমি কাউরে কিছু জিগাইলাম না এই ব্যাপারে।

বুয়েটে যাওয়ার জন্য রাস্তা পার হইলাম আমরা। আমি, অহনা, আর ফয়সাল আগে রিকশায় উঠলাম। সাদমান ভাই, যুঁথি, তন্ময়, আর তানজিম বাসের জন্য দাঁড়াইল।

আমাদের অনেকক্ষণ লাগল বুয়েট যাইতে। রাস্তার বেশিরভাগ দোকানপাট তখন বন্ধ কইরা দিতেছে, নীলক্ষেত অর্ধেক বন্ধ, অর্ধেক খোলা। যাইতে যাইতেই বৃষ্টি শুরু হইল। প্রথমে ফোঁটা ফোঁটা পড়ল, এরপরে জোরে আরম্ভ হইল, আবার কমল। অহনা জিগাইল আমার কাছে ওড়না আছে কিনা, ওর টপটা পাতলা, ভিজা গেলে সব দেখা যায়, তখন ওড়না লাগবে।

বুয়েটে গিয়া প্রথমে গান শুনতে গেলাম। আমি ফয়সাল আর তন্ময় পাশাপাশি হাঁটতেছিলাম, অহনা একটু দূরে। ফয়সাল তন্ময়রে জিগাইল, অহনা আসল যে, বিধানের সাথে কিছু হইছে? তন্ময় বলল, ভাল হইছে আসছে, এইখানে ঠিক আছে। আমার মনে হইল, তন্ময় এত খুশি অহনা আসাতে, সেটা প্রকাশও করতেছে!

তখনও মেঘদল‌ আসে নাই। বুয়েটের ছেলেরা গান গাইতেছে, আর পাশে ওদের বন্ধুরা গানের সাথে সাথে নাচতেছে। আমরা সিমেন্ট দিয়া বানানো ছোট একটা গোল জিনিসের উপর বসলাম। পরে একটা ছেলে আইসা আমাদেরকে পিছাইয়া বসতে বলল। তো আমরা ঘাসে গিয়া বসলাম।

বৃষ্টিতে ভিজা পুরাটা মাঠ। ওইখানে গোল হইয়া বসলাম সবাই। একটু পরে আমরা খাইতে যাব ঠিক করলাম। আমার ইচ্ছা ছিল নীলক্ষেতে বিরিয়ানি খাব। কিন্তু দেরি হইয়া‌ গেলে গান মিস হবে, আর নীলক্ষেত খোলা কিনা তাও জানি না, তাই পলাশীতে গেলাম খাইতে। একটা বড় স্টিলের ডেকচিতে খিচুড়ি বেচতেছে একটা ছেলে। প্লেটে খিচুড়ি দিয়া উনি আরেকটা হাঁড়ি থেকে ডিম আর ঝোল দিতেছেন। চল্লিশ টাকা প্রতি প্লেট। আমরা সবাই ডিম-খিচুড়ি খাইলাম রাস্তার পাশে দাঁড়াইয়া।

খিচুড়ি খাইয়া বুয়েটে যাইতে যাইতেই গান শুরু হইল। ভিতরে যাওয়ার পথে একটা জায়গায় সফট ড্রিংক্স, চিপস, আর ডাল ভাজা বেচতেছেন এক মহিলা।

মাঠে গিয়া দাঁড়াইলাম আমরা। মেঘদলের সাথে সাথে তখন অন্যরাও গাইতেছে গানগুলি। না গাইলেও রিকোয়েস্ট করতেছে অমুক গানটা গাইতে। আমি একলাই শুধু ব্যান্ডের নামটা ছাড়া আর কিছুই জানি না।

গান শুনতে শুনতে হঠাৎ ঝুম ঝুম কইরা জোরে বৃষ্টি নামল। আমি, তানজিম, যুঁথি, সাদমান ভাই ভিতরে গেলাম। যুঁথি বলল, অহনা আর ফয়সাল মাঠে, ওদের কাছে ছাতা আছে, আর তন্ময় কোনো গাছের নিচে দাঁড়াইছে।

তানজিম বলল সে পানি খাবে, আর ওয়াশ রুমে যাবে। আমিও গেলাম ওর সাথে। আমি আরেকবার একা দুইতলায় উঠছিলাম। একা গেছিলাম তাই সাথে সাথে চইলা আসছিলাম। এইবার গিয়া বারান্দা দিয়া হাঁইটা অনেকদূর গেলাম। রাত মনে হয় তখন দেড়টা বাজে। বিশাল বড় রুমে লাইট জ্বালাইয়া মেয়েরা ভিতরে কাজ করতেছে, পড়ালেখা করতেছে।

দুইতলার ফিল্টারে পানি নাই, তিনতলায় গেলাম, ওইখানেও পানি শেষ। তানজিম কয়েক ফোঁটা পানি অনেক চেষ্টা কইরা ভরল বোতলে, এরপর ওইটা খাইল। বৃষ্টিতে তখন বাইরে গিয়া পানি কিনারও উপায় নাই।

নিচে নামার পর বৃষ্টি আরও বাড়ল। মেঘদলও মনে হয় ভিতরে আসল একটু।

তানজিম ভিড়ের মধ্যে একজনরে দেখাইয়া বলল, সে তারে চিনে, কিন্তু গিয়া কথা বলল না। যুঁথি আর সাদমান ভাই একসাথে তখন দাঁড়াইয়া আছে। যুঁথি বলল সে অহনার কাছে তার আইফোনটা রাখছে। অ্যান্ড্রয়েডটা ওর সাথে আছে। অহনা ফোন ধরতেছে না, আর বৃষ্টিতে যুঁথি অহনার কাছ থেকে ফোন আনতে যাইতেও পারতেছে না। ফোনটা ঠিক আছে নাকি সেই ভাবনায় অস্থির হইয়া বৃষ্টি কমার জন্য সে ওয়েট করতেছে। বৃষ্টি কমলে তাড়াতাড়ি মাঠে গেল।

অহনা এক হাতে ব্যাগটা কোলে নিয়া আরেক হাতে ছাতা ধইরা বইসা আছে। যুঁথি ফোন চাইতেই ওর মনে হয় ঘোর কাটল। ব্যাগটা যুঁথিরে দিয়া ও আর ফয়সাল ভ্যান থেকে নামল।

আমরা বাইর হইলাম বুয়েট থেকে। পলাশী পর্যন্ত হাঁইটা গেলাম। মোড় থেকে তিনটা রিকশা নিয়া আমি তানজিম আর তন্ময় উঠলাম এক রিকশায়, অহনা আর ফয়সাল আরেকটায়, যুঁথি আর সাদমান ভাই আরেকটায়।

ততক্ষণে বৃষ্টি আরো কমছে। রাতে জীবনে এই প্রথম আমি বাইর হইছি। সবকিছু বন্ধ। আবার সবকিছু খুলবে, রাস্তায় জ্যাম হবে ভাইবা আমার অদ্ভুত লাগল। কিন্তু রিকশা চলতেছে। আর যাত্রীও আছে। দিনের বেলার মতোই মানুষ রিকশা কইরা যাইতেছে। একটা লোককে দেইখা আমার মনে হইল উনি বাসায় গিয়া ঘুমায় না কেন? শুধু শুধু এখন রিকশা কইরা যাইতেছেন!

খাবারের দোকান সব বন্ধ। শুধু একটা ছোট খোলা দোকান পাইলাম যেখানে কিছুক্ষণ বসলে ওরা খাবার দিবে। ওইখানে নাইমা আমরা অপেক্ষা করলাম। কয়টা পরোটা, কয়টা তেলছাড়া রুটি, আর কয়টা ডিম দিতে হবে আমাদেরকে জিজ্ঞাসা কইরা উনারা বানাইলেন।

আমি ছাড়া কেউ ডিম পোঁচ নিল না। অহনা বলল, সে কখনো ডিম পোঁচ খায় নাই‌। কুসুমটা দেইখা ওর মনে হয় কখনো ইচ্ছা করে নাই। ও ডিম ভাজি খাইল। খাওয়া শেষ কইরা যুঁথি আর সাদমান ভাই যাবে বলল। সাদমান ভাই যুঁথিরে তার খালার বাসায় নামায় দিবে। আর ফয়সাল ওর কোনো বড় ভাইয়ের বাসায় যাবে থাকতে। আমি, অহনা আর তানজিম থাকব তন্ময়ের বাসায়।

আমরা হাঁইটা হাঁইটা গেলাম ওর বাসায়। ওদের বাসায় তখন সবাই ঘুমায়। তন্ময় চাবি দিয়া দরজা খুইলা আমাদের ভিতরে ঢুকাইল। অন্ধকারে আমরা ওর রুমে গেলাম। এরপর কম্পিউটারে একটা মিউজিক ছাইড়া তন্ময় গেল ঘুমাইতে। আমি মোবাইলে তিন চারটা অ্যালার্ম দিয়া শুইলাম। অহনা ততক্ষণে একটু ঘুমায় গেছে। আর তানজিম শুইছে। আমি বললাম পাঁচটায় আমি বাইর হবো। তুমি দরজাটা লাগায় দিও।

বইলা আমি ঘুমায় গেলাম। পাঁচটায় কোনোমতে লাল চোখ নিয়া উইঠা মুখে পানি দিয়া তানজিমরে ডাকলাম। ও উইঠা দরজা লাগাইল কিন্তু ঘুমে কিছু বুঝল না কী হইতেছে।

আমি বাইর হইয়া শ্যামলী গিয়া জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটি যাওয়ার বাসে উঠলাম এক ফ্রেন্ডের সাথে। সে বলল, “কালকে ঘুমাও নাই তাইলে আরেকদিন যাইতা?”

“না আরেকদিন প্রিপারেশন নিতে পারব না।”

জাহাঙ্গীরনগর পৌঁছাইয়া আরেকজন বন্ধুর সাথে দেখা হইল। সে বলল কালকে সে বাসে উঠছিল বুয়েটে যাওয়ার জন্য। মেঘদলের কনসার্ট দেখতে। পরে আবার ফিরত আসছে জ্যামের জন্য। আমি বললাম, ও তুমি ওইটাতে যাইতে চাইছিলা? আমি তো কালকে গেছি। তিনটা পর্যন্ত কনসার্ট দেইখা পরে আজকে জাহাঙ্গীরনগর আসছি। ভালই কনসার্টটা। আর রাত্রে আমি কখনো বাইরে থাকি নাই। এইজন্য মনে হয় অন্যরকম লাগছে।

কভার. শৈলী নাসরিন