page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

মেমসাব

পাখিদের সাথে আমার শত্রুতা ছোটকাল থিকা। বিড়ালদের সাথে আমার প্রেমের কারণেই মনে হয় এমন ব্যপার ঘটছে।

আমার পাঁচ বছর বয়সে সোবহানবাগের আমার চাচার বাসার সামনে এক কাঁঠাল গাছ বাইয়া উঠলে এক কাক আমার মাথায় ঠোকর দিয়া এবং খামচাইয়া আমার মাথার প্রায় আড়াইশো চুল ও মাথার তালুর একাংশ ছিঁড়া উঠাইয়া নিয়া যান। আমি চিৎকার দিয়া গাছ থিকা পড়তে পড়তে গাছের নিচে দৌড়াইয়া আসা বাসার দারোয়ানের কোলে গিয়া পড়লাম। সেই থিকা দারোয়ানদের সঙ্গেও আমার প্রেম। কাকের পক্ষ নিয়া আমার মাতাশ্রী কইছিলেন, ঐ গাছের উপরে কাকের বাসায় কাকের ডিম এবং ডিমের ভিতরে কাকের বাচ্চা ছিলেন।

আমরা মিসরাতায় যেই এলাকাতে থাকতাম, সেই এলাকাটা ছিলো সমুদ্রের একদম পাশে। সমুদ্র মানে ভূমধ্যসাগর। আমাদের এলাকার দারোয়ান ভদ্রলোক ছিলেন আমার একপাক্ষিক বন্ধু দরিয়ানার আব্বা। বন্ধু আমিই উনারে ভাবতে চাইতাম। উনি আমারে কোনোদিন বিশেষ পাত্তা দেন নাই।

01. logo nadia png

উনি বয়সে আমার চাইতে প্রায় দশ বছরের বড় ছিলেন, আমার যখন ছয়, তখন উনার ষোল বছর বয়স। উনি উনার লম্বা লম্বা বাদামী রঙের উস্কোখুস্কো বেণী নাচায়ে আর নীল নীল রঙের চোখ ঘুরায়ে ঘুরায়ে—‘তিকি তিকি হাম, গাইয়া মাম’ গান গাইতে গাইতে ‘পাপায়া’ নামের এক বজ্জাত কথা বলা পাখিরে কান্ধে নিয়া সমুদ্রে সাঁতার কাটতে যাইতেন প্রতিদিন দুপুরে।

উনার এক হাতে থাকত একটা মই, অন্য হাতে বালিতে বিছানোর তোয়ালে আর সানস্ক্রিন লোশান। মই কী জন্য, আমি জানি না।

পাপায়া ছিলেন পেটমোটা নর্থ আমেরিকান নীল-হলুদ ম্যাকো। উনি দরিয়ানার মতই আরবি ভাষায় একলাই একটানা বক বক কইরা যাইতেন সারাক্ষণ। দরিয়ানা পানিতে নাইমা গেলে উনি বালিতে বিছানো তোয়ালের উপর ব্যাঁকা হইয়া বসতেন, মাঝেমধ্যে রোদ বেশি হইলে এইদিক ঐদিক ঘাড় কাৎ কইরা হাঁইটা একটু ছায়া খুঁজতেন, বা তোয়ালের এক কোণা ভাঁজ কইরা নিজের মাথা ঢাকতেন, আর—আমার বাপ মা আমার আশেপাশে না থাকলে উইড়া আইসা আমার বালি দিয়া বানানো ঘরবাড়ি ও প্রাসাদ পা দিয়া ভাইঙ্গা পাখার ঝাপটা দিয়া আমার মুখে বালি ছিটাইয়া আবার তাড়াতাড়ি নিজের তোয়ালেতে ফেরত যাইতেন।

আমি দরিয়ানা ও নিজের বাপ মা’রে কোনোদিন বিশ্বাস করাইতে পারি নাই যে বড় বড় চোখের নিপাট ভালোমানুষ মার্কা চেহারার এই বজ্জাত পাখি আমারে কী পরিমাণ ডিস্টার্ব দিতেছেন। দরিয়ানার সামনে উনি আমার হাত থিকা ভদ্র সভ্য পাখির মত মৃদু গর গর আওয়াজ করতে করতে সূর্যমুখী ফুলের বিচী খাবেন ঠিকই, কিন্তু দরিয়ানা ঘুইরা অন্য দিক যাওয়া মাত্রই মুখ থিকা বিচীর শক্ত খোসা ফুঃ ফুঃ কইরা আমার দিকে ছুইড়া দিবেন, যেন জন্ম থিকা উনি আমার শত্রু।

আমার আরেক বন্ধু ক্লডিয়াও পাখি পালতেন। উনার দুইটা সাদা রঙের লাভ-বার্ড ছিল। উনারা অবশ্য খাঁচার ভিতরেই থাকতেন বেশির ভাগ সময়। মাঝে মধ্যে যখন আমি আর ক্লডিয়া উনাদের খাঁচার দরজা খুইলা বাইর কইরা আনতাম, তখনই উনারা আমার আঙ্গুলে কামড় দিয়া চামড়া উঠায়ে রক্তারক্তি কইরা ফেলতেন। একমাত্র আমার সাথেই এমন হইত। ক্লডিয়া বা উনার বাকি বন্ধুদের বা কাজিনদের সাথে উনারা এমন কখনো করেন নাই।

ক্লডিয়ার আম্মা খুব দুঃখ দুঃখ স্বরে আমার আঙ্গুলে ব্যান্ডেজ বান্ধতে বান্ধতে কইতেন, “কিউয়ি আর সানশাইন তো এমনিতে কী ভদ্র পাখি! ক্যানো যে এমন করলো—তুমি কি ওদের কিছু করেছিলে, ডার্লিং?”

আমি না-সূচক মাথা নাড়ি। আমার যা মারামারি তা ক্লডিয়ার সাথেই। আমার বাপ একটা হলুদ রঙের আর একটা লাল রঙের ফুঁ দেওয়া বাঁশি নিয়া আইসা আমারে বললেন, “একটা তোমার, একটা ক্লডিয়ার। ক্লডিয়াকে আগে জিজ্ঞেস করবা, সে কোনটা চায়।”

বাপের কথা এক কান দিয়া ঢুকাইয়া আরেক কান দিয়া বাইর করতে করতে আমি ভাবলাম, আমি লাল রঙেরটা নিবো। ক্লডিয়া যখন কইলেন, উনি হলুদটাই নিতে চান, তখন আমার মনে হইল, হলুদটাই মনে হয় বেশি সুন্দর। সুতরাং আমাদের মারামারি শুরু হইল। কিন্তু পশুপাখিদের আমি কখনো মারি নাই। তবে পাখিরা মনে হয় আমার হিংসুটিনেস ধরতে পারেন। পাখিদের ইনটুইশান খুব ভালো বইলা শুনছি আমি।

“দেওয়ালে দুইটা হাস্যোজ্জ্বল মোটা মোটা হরিণের ছবি আঁকা আছে। তার সামনে দুইজন শুকনা হরিণ বিমর্ষ হইয়া কিছু ঘাস লতা পাতা নিয়া বইসা আছেন।”

আমার ঢাকার নানাবাড়ির ছাদে একটা বিশাল তারের ঘর ছিল। সেই ঘরভর্তি ছিলো প্রায় শ’ দেড়েক বিভিন্ন জাতের পাখি। নানা আমারে এইখান থিকা একটা ময়না একবার জন্মদিনে উপহার দিছিলেন। বলছিলেন, “তুই কি জানিস ঠাকুমার ঝুলিতে যে শুক আর সারি ছিল, তারা আসলে ছিল এই ময়না পাখি? ময়নারা সব সময় জোড়ায় জোড়ায় থাকে, দেখিস!”

উপহার এবং জ্ঞানের পিছে পয়সা খরচ হয় নাই এই উপলব্ধির পরে নানা এবং ‘বেজোড়’ ময়না দুই জনের ব্যপারেই আমার আগ্রহ কইমা যায়। ময়নাও আমার অনাগ্রহ বুঝতে পারতেন। উনি আমি সামনে আসলেই কথা বন্ধ কইরা আরেক দিক ঘাড় ঘুরাইয়া গম্ভীর হইয়া বইসা থাকতেন। উনার আমার ‘গলা’য় কথা বলা শুরু হইত আমি যখন আশেপাশে নাই, তখন।

দেখা গেল, আমি ঘরে শুইয়া ঘুমাইতেছি, ময়না তারঃস্বরে আমার মা’রে ডাকা শুরু করছেন এমন ভঙ্গিতে, আমার মা’র নিশ্চিত ধারণা হইল আমি নিশ্চয় মাথা ফাটায়ে ফেলছি বা পইড়া টইড়া হাত পা ভাঙছি।

আরেক দিন আমি দুপুরবেলা মা’রে কী দিয়া ভাত খাব তার বিস্তারিত ফিরিস্তি দিয়া ঘরে বইসা তিন গোয়েন্দার অথৈ সাগর-২ পড়তেছি, ময়না জোর গলায় বইলা উঠলেন, “আমি ভাত খাব না। আমি ভাত খাব না। আমি ভাত খাব না।”

আম্মু একটু পরে আমার ঘরে আইসা খুব রাগ রাগ গলায় জিগাইলেন উনারে এইরকম ঝামেলা দেওয়ার জন্যই আমার জন্ম হইছে কিনা। আমি আকাশ থিকা পড়লাম।

আমার এই ময়নার কোনো নাম ছিল না। কিন্তু লোকজন জিগাইলে উনি নিজে থিকা বলতেন, “আমার নাম বেলায়েত। রাধাকৃষ্ণ মন্দির চিনিস তুই?”

আমার আম্মা এই ময়নার অত্যাচার বেশিদিন সহ্য করতে না পাইরা একদিন উনার খাঁচা খুইলা উনারে উড়াইয়া দেন। আমারে অবশ্য বলছিলেন ময়না নিজেই খাঁচা খুইলা পালাইছেন। আমিও বিশ্বাস করছিলাম।

***

প্রায় পনেরো বছর পর এইবার আমি ময়মনসিংহে আমার ‘আসল’ নানাবাড়ি গেলাম।

ময়মনসিংহ আমার খুব প্রিয় শহর।

কোনোদিন না দেইখাই প্রিয়। ছোটবেলায় প্রায় প্রতি ঈদেই ময়মনসিংহ যাওয়া হইত আমাদের। কিন্তু কোনোদিনই নানাবাড়ির বাউন্ডারির বাইরে পা দেওয়া হয় নাই নানুর মিলিটারি মেজাজের কারণে।

ময়মনসিংহ নিয়া আমার যা রোমান্টিসিজম তা আমার মা’র মারফত পাওয়া মনে হয়। এইখানে পণ্ডিতপাড়ায় ছিল নানা-নানুর প্রথম বাড়ি। সেইটা ১৯৬০ সালের কথা। সেই বাড়ির সামনে বিশাল কালো পানির পুকুর। পুকুরের সামনে বাড়ির টানা বারান্দায় মাদুর বিছায়ে আমার মা পা নাড়াইয়া হাত নাড়াইয়া পড়তেন,

বক সাহেবের শখ হয়েছে খাবেন কিছু পুষ্টিকর
সবজি আনাজ চিকেন টিকেন তরতাজা ও তুষ্টিকর!

অথবা—

হটেকটেটা বলে আমি ঐ গাছেতে থাকি
যে মেয়েটা কাঁদে তার জুলফি ধরে ঝাঁকি—

আমার মা’দের ছোটবেলার কবিতাগুলি বাচ্চাদের কান্নাকাটি থামানোর জন্য ও সবজি এবং দুধ খাওয়ানোর জন্য কত রকম যে ফন্দি-ফিকিড় করত তা বলার না। আমার মা অবশ্য কবিতা পইড়াও দুধ ও সবজি টবজি খাইতেন না। এবং উনি রেগুলার কারণে-অকারণে কানতেন। এখনো কান্দেন।

ময়মনসিংহ শহরের পাশে শুকনা ও বৃদ্ধ ব্রহ্মপুত্র ঘোলাপানি, কাদামাটি ও মলিন চেহারার কিছু নৌকা ও ততধিক মলিন চেহারার কিছু নৌকা চালক এবং অমলিন চেহারার অল্পবয়স্ক নৌকাচালক হেল্পারদের নিয়া যক্ষা আক্রান্ত রোগীর মত খক-খক খক-খক কইরা চলতেছেন।

mem-shaheb-2

“থাকনের মদ্দে আছে এক হিয়াল, হেরে আবার গাঙ্গিনার পাড়থন লইয়া আইছে…”

নদীর (ব্রহ্মপুত্র আসলে নদ) পাশেই ময়মনসিংহ শহরের একমাত্র চিড়িয়াখানা। আমি যেহেতু বাংলাদেশের নাগরিক তাই বিশ টাকা দিয়া টিকিট কাইটা ভিতরে ঢুকলাম। বিদেশি নাগরিকদের জন্য টিকিটের দাম সত্তর টাকা। শিশুরা যথারীতি নির্লজ্জভাবে ফ্রি।

তো লুঙ্গিপরা ও টুথপিক (বা অন্য কিছু) দিয়া লাল লাল রঙের দাঁত খুঁচাইতে থাকা একজন টিকিট চেকার সাহেবরে টিকিট দেখাইয়া আমরা ভিতরে ঢুকলাম। উনি আমাদের দিকে একবার ও টিকিটের দিকে একবার উদাস দৃষ্টি দিয়া আরেক লুঙ্গিপরা কমবয়স্ক ভদ্রলোকের সাথে শুঁটকি নিয়া আলাপ শুরু করলেন।

আমি বললাম, টিকিট ছিঁড়বেন না?

—ছিড়ন লাগত না। আফনে যান।

—পরে তো আপনি এই জিনিস আরেকজনের কাছে ব্ল্যাকে বেঁচবেন।

—কারে বেচুম? এইহানে থাকনের মদ্দে আছে এক হিয়াল, হেরে আবার গাঙ্গিনার পাড়থন লইয়া আইছে আমার ভাই, এই পারভেইজ্যা (হাত দিয়া দ্বিতীয় ভদ্রলোকরে দেখাইলেন)। আর আছে এক মেমসাব ময়না, হেরে বিছুন দি বাও দেওন লাগে রেগুলার। বেচুম কারে এই টিকিট?

আমি টিকিট ছিঁড়া ভিতরে ঢুইকা পাখার বাতাস দিতে হয় এমন মেমসাহেব ময়নার খোঁজ করলাম। শুকনা শুকনা দুই চারজন লোক টাইট এবং চক চকা জামাকাপড় পইরা নায়ক আলমগীরের মত কোমড়ে হাত দিয়া এদিক ওদিক দাঁড়ায়ে ছিলেন। এখানেই কাজ করেন উনারা মনে হয়। কেউ আমার প্রশ্নের উত্তর দিলেন না অবশ্য।

একজন বললেন, “আফনে বিদিশি? আম্নের চুল আসল না নকল?”

আমি চুলের ব্যাখ্যা দিয়া সামনে আগায়া দেখি একটা খাঁচার দেওয়ালে দুইটা হাস্যোজ্জ্বল মোটা মোটা হরিণের ছবি আঁকা আছে। তার সামনে দুইজন শুকনা হরিণ বিমর্ষ হইয়া কিছু ঘাস লতা পাতা নিয়া বইসা আছেন।

পাশেই একটা নোংরা বাজে গন্ধওয়ালা খাঁচায় একটা শুকনা চৌবাচ্চার উপরে জলহস্তির ছবি আঁকা দেখা গেল। কিন্তু জলহস্তি নাই। মারা টারা গেছেন মনে হয়। অথবা দেওয়ালে দেওয়ালে হাস্যমুখী পশুপাখি আঁইকা আসল পশুপাখিদের এবং পশুপাখিদের ‘দেশি’ ‘বিদেশি’ ও ‘ফ্রি শিশু’ দর্শকদের দুঃখ লাঘব করার চেষ্টায় আছেন চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ।

বেশ দূরে একটা কটকটা গোলাপী রঙা ঘরে একটা বাদামী রঙের শেয়ালরে আসলেই পাইলাম আমি, উনি আমারে দেইখা মুখ ঘুরাইয়া দেয়ালের দিকে চাইয়া থাকলেন।

অনেক খোঁজ করার পরে এক কোণায় অবশেষে ‘অনেক সাধের’ ময়নারে পাওয়া গেল। খাঁচার ভিতরে খাঁচা। তার ভিতর ময়না। খাঁচার পাশে দেওয়ালের একধারে তালপাতার একটা পাখা গ্রিলের সাথে নাইলনের দড়ি দিয়া বাইন্ধা রাখা। এই দিয়েই উনারে বাতাস দেওয়া হয় বইলা মনে হয়। আমি আর মৌ ময়নারে অনেক খোঁচাইলাম কথা কওনের জন্য।

উনি আমাদের পাত্তা না দিয়া উনার হলুদ রঙ্গা ঠোঁট দিয়া পালক খোঁচাইতে ব্যস্ত থাকলেন।

চিড়িয়াখানার তেল চকচকা মালিকরে দেখা গেল সেই সময়। উনার চোখে মুখে প্রশান্তির ভাব আর শার্টের গোটানো ডান হাত ও কলারে হলুদ রঙ দেইখা বোঝা গেল উনি কিছুক্ষণ আগেই মাছের ঝোল দিয়া ভাত খাইয়া আসছেন। সেই মাছ চিড়িয়াখানার চৌবাচ্চায় চাষ হয় কিনা জিগানোর আমার খুব ইচ্ছা হইল একবার।

mem-shaheb-3

“ছোমায়া ঘাড় ঘুরাইয়া মাথা ব্যাঁকাইয়া আমাদের এড়াইয়া দেখলেন নতুন কেউ আসলো কিনা উনার ঘরে।”

উনি আমাদের পরিচয় টরিচয় জানতে চাইয়া জানাইলেন উনি এই এলাকার একজন স্বনামধন্য—উচ্চশিক্ষিত—এবং সমাজসেবা করা পশুপ্রেমী ব্যক্তি এবং উনি আসার পরে এই চিড়িয়াখানার প্রভূত উন্নতি হইছে এবং পশুমৃত্যু কমছে ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমি হাত ইশারায় ময়নারে দেখাইয়া বললাম, “উনার নাম কী?”

—নাম আর কী। আমার ইস্ত্রী, ছেলেমেয়ে এরে ডাকে ছোমায়া।

—সুমাইয়া?

—জ্বি। পোলাপাইন্না কারবার। পশুপাখির আবার নামধাম বংশপরিচয় কী? তবে এরে দেখার জইন্য আপনারার ঢাকা থাইকা লুক আসেন।

আমি বোঝার চেষ্টা করলাম ছোমায়ার কী এমন বিশেষত্ব যে ‘ঢাকা’ থিকা আসতে হবে উনারে দেখতে। আমার বাসার ‘বেলায়েত’-এর মতই একই রকম দেখতে উনি, গায়ের রঙ চক চকা সেরেন্ডিবিট পাথরের মত সবুজাভাব কালো, ঠোঁট আর গলায় ইয়েলো অকার রঙ, পাখার কয়েকটা পালক সাদা, চোখে মুখে ধূর্ত চাউনি; পাখিরা হাসতে পারলে আমি নিশ্চিত উনারে জনি ডেপের অভিনয় করা শয়তানি চেহারাগুলির মত দেখাইত।

তবে সাইজে উনি বেলায়েতের চাইতে একটু ছোট। এবং উনি নড়াচড়াও করেন বেশি। এক মিনিট পর পরই উনি একবার এইদিক একবার ঐদিক করতেছেন, যেন কোথাও বইসা ঠিক আরাম পাইতেছেন না।

আমি অবশ্য এত বড় একটা খাঁচা থাকতে সেই খাঁচার ভিতর দুই ফিট বাই দেড় ফিট আরেকটা ছোট খাঁচায় উনারে আটকাইয়া রাখার তেমন কোনো যৌক্তিকতা পাইলাম না।

ছোমায়া ঘাড় ঘুরাইয়া মাথা ব্যাঁকাইয়া আমাদের এড়াইয়া দেখলেন নতুন কেউ আসলো কিনা উনার ঘরে।

মালিক সাহেব জানাইলেন, এখন ময়নার দুপুরের খাবারের সময়। ময়নারে সকালে দেওয়া হয় মৃত পোকা মাকড়, ছোট আকারের ব্যাঙ, মাকড়শা বা চিংড়ি এবং রাত্রে শুকনা চাল ও ধান বা গম, সাথে কলা।

সাধারণতঃ দুপুরের এই সময় উনারে দেওয়া হয় মাছের কাঁটা ও অবশিষ্টাংশ এবং মাছের ‘ঝুল’ দিয়া মাখানো ভাত ও পানি, তবে শনি রবিবার উনার জন্য বরাদ্দ থাকে সিজনাল ফল। আমের সময় আম। ঋতুভেদে কমলা, আঙুর, পেয়ারা, পেঁপে ও নাশপাতি। পেঁপে উনার প্রিয় ফল। যেইদিন পেঁপে দেওয়া হয়, সেইদিন উনি মাথা দুলাইয়া গান গান।

আমরা ময়নার কথা শোনার আশা ছাইড়া দিয়া চইলা আসব, এমন সময় খাবারের টিনের বাটি হাতে এক ভদ্রলোক আগায়ে আসলেন খাঁচার দিকে। উনারে দেইখা ময়না উল্লসিত স্বরে পাখা ঝাঁপটাইয়া বইলা উঠলেন, ময়না খাইছুইন? ময়না খাইছুইন?

About Author

নাদিয়া ইসলাম
নাদিয়া ইসলাম

ফ্যাশন ডিজাইনার। লন্ডন সাউথ ব্যাংক ইউনিভার্সিটির ফরেনসিক সাইন্স থেকে পাশ করে এখন রিসার্চ সায়েন্টিস্ট হিসাবে কাজ করেন। ২০০৭ থেকে ইংল্যান্ডে আছেন। এর আগে বাংলাদেশে বসবাস করেছেন। জন্ম লিবিয়ার সির্তে। মিছুরাতায় থাকতেন। ১১ বছর বয়সে লিবিয়া ত্যাগ করেন।