page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

যমুনা, শিং মাছের সার্কাস ও হাস্যমুখী ছাগল

nadia-3446436

“সেই চরের মাঝখানে বেহুলার মত হাঁটতে হাঁটতে আমি ঝপাৎ কইরা আমার ৬৯ কেজি শরীর ও তিনটা মোবাইল ফোন ও একটা ক্যামেরা নিয়া একটা গলা সমান পানিওয়ালা গর্তে পইড়া গেলাম।”

আমি কখনো সার্কাস দেখি নাই।

সার্কাসের জন্তু জানোয়ারদের উপর খুব অত্যাচার হয় এমন জায়গা থিকাই সার্কাসের ব্যাপারে আমার অনাগ্রহ ছিলো সবসময়। জুনান এইসব কথা শুইনা আমারে রাগ রাগ গলায় কইলো, তোর এইসব ফালতু মানবতাবাদীগিরি দেখানি বন্ধ হবে কবে?

আমি খুব আগ্রহ নিয়া রিক্সাওয়ালার ‘পরিবারের’ খোঁজ নিলাম।

01. logo nadia png

তো এইবার আমরা গেছিলাম সিরাজগঞ্জ। সিরাজগঞ্জের পাশ দিয়া গেছে যমুনা নদী। তার মাঝখান দিয়া একটু পর পর চর দেখা যায়। সেই চরের মাঝখানে বেহুলার মত হাঁটতে হাঁটতে আমি ঝপাৎ কইরা আমার ৬৯ কেজি শরীর ও তিনটা মোবাইল ফোন ও একটা ক্যামেরা নিয়া একটা গলা সমান পানিওয়ালা গর্তে পইড়া গেলাম।

sirajgang-4

সিরাজগঞ্জে লেখক।

আমি সাঁতার জানি। আমার বন্ধুরাও তাই আমার দিকে বিশেষ পাত্তা দিলো না। কিন্তু এইদিকে আমি যতই উঠতে যাই ততই আমার পায়ের নিচে বালি হড়কায়। আমি ক্যামেরা সামলাইতে সামলাইতে চোরাবালির ভিতর পড়লাম কিনা এই চিন্তায় জীবনের যাবতীয় জিমন্যাস্টিক্স কইরা ফেললাম। আমার বাপ আমারে এইবেলা দেখলে নাদিয়া কোমানিচি মারফত আমার নামকরণের সার্থকতা খুঁইজা পাইতেন নিশ্চয়। বাবু কইলো, বাহ, তুমি দেখি ভালো সার্কাস জানো!

আমি জুনরে কইলাম, আইজ সার্কাস দেখুম।

sirajgang-5

সিরাজগঞ্জ।

sirajgang-1b

সিরাজগঞ্জ।

রিক্সাওয়ালা ভদ্রলোক আমাদের জন্য নদীর পাড়ে অপেক্ষা করতেছিলেন। উনি জানাইলেন, কৃষি মেলা হইতেছে একটু দূরে। সেইখানে সার্কাসও আছে।

sirajgang-3

“পরের শো শুরু হবে নয়টায়। তার টিকেট কাটা যাবে সাড়ে আটটা থিকা। তার এক মিনিট আগে না।”

সার্কাসের টিকেট বিক্রি করেন ভদ্রলোকরে বাংলাদেশের আইন কানুন মানা ও সততা উপলক্ষ্যে একটা অ্যাওয়ার্ড দেয়া জরুরী। আমরা টিকেট কাউন্টারে পৌঁছাইলাম সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায়। নেক্সট শো নয়টায়। এইদিকে আমাদের কাপড় চোপর (এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে গায়ের রঙ ও চুলের রঙ) ইত্যাদির কারণে আমাদের আশেপাশে ততক্ষণে ছোটখাট সাইজের একটা ভিড় জইমা গেছে। বাবুর গায়ের রঙ বাঙ্গালীদের তুলনায় সাদা। জুনান বেচারা চাকমা, তারেও দেখায় নেপালীদের মত। তো, আমি, বাবু আর জুন খাড়ায় আছি, এক ভদ্রলোক বাবুর হাতে চিমটি দিয়া বাংলায় কইলেন, বাই, আপনে কি বিদিশী?

ওয়াসফি আশেপাশের পরিস্থিতি দেইখা টিকেট কাউন্টারে গিয়া কইল, ভাই, আমাদের কি একটু আগে টিকেট দেওয়া যায়? আমরা শো’তে ঢুকবো না। কিন্তু প্যান্ডেলের বাইরে যেইখানে বসার জায়গা আছে, সেইখানে গিয়া আমরা বসতে চাই। এইপাশে মেলায় বসার কোনো জায়গা নাই।

ভদ্রলোক ট্রাফিক পোলিসের মত হাত তুইলা কইলেন, সবকিছুর একটা নিয়ম আছে, বুঝছেন? এইখানে নিয়ম বহির্ভূত কিছুই হবে না। পরের শো শুরু হবে নয়টায়। তার টিকেট কাটা যাবে সাড়ে আটটা থিকা। তার এক মিনিট আগে না।

উনারে এইবার টাকা সাধা হইলো। উনি এইবারও হাত উঠায়ে আমাদের থামাইলেন। কইলেন, এইখানে অনায্য কোনো ‘কারবার’ হয় না। শো দেখার ইচ্ছা থাকলে আমাদের সাড়ে আটটায় আসতে হবে, আদারওয়াইজ, আমরা বিদায় হইতে পারি।

আমরা অপমানিত হবো কি হবো না এই বুঝতে বুঝতেই অনেকটা সময় কাটায়ে দিলাম। ততক্ষণে সাড়ে আটটা বাইজা গেছে। তো টিকেট কাটা হইলো অবশেষে। সেকেন্ড ক্লাস টিকেট, দাম সত্তর টাকা। নিরঞ্জন সরকার পরিচালিত ‘দ্যা লায়ন সার্কাস’। লায়ন নাই, তবে উনাদের হাতি আছে।

sirajgang-2b

“তো টিকেট কাটা হইলো অবশেষে। সেকেন্ড ক্লাস টিকেট, দাম সত্তর টাকা। নিরঞ্জন সরকার পরিচালিত ‘দ্যা লায়ন সার্কাস’। লায়ন নাই, তবে উনাদের হাতি আছে।”

আমরা টিকেট হাতে কইরা দেড় ফিট চওড়া একটা টানেলের ভিতর দিয়া ঢুইকা তিনটা বিশাল সাইজের তালা মারা একটা কোলাপসিবল গেইটের সামনে দাঁড়াইলাম। গেইটের মুখে একজন গার্ড। উনিও টিকেট কাউন্টারের ভদ্রলোকের মত অসম্ভব স্ট্রিক্ট। পৌনে নয়টা থিকা আমরা গেইট ধইরা ঝাঁকি দিতে দিতে উনারে ডাকাডাকি শুরু করলাম, উনি আমাদের দিকে একবার বিরস দৃষ্টি দিয়া কাঠি দিয়া কান খোঁচাইতে থাকলেন। কান খোঁচানো শেষ কইরা একটা সিগারেট ধরাইলেন। এরপর গল গল কইরা ধোঁয়া ছাড়লেন আকাশের দিকে মুখ কইরা। ধাক্কাধাক্কি দেইখা নিশ্চয় উনার অভ্যাস আছে।

যাই হোক, সার্কাস শুরু হইলো। প্রথমে আসলেন ‘সবার পছন্দের’ মিস মুন্নি। উনি আসার সাথে সাথেই চারদিকে মুহুর্মুহু শিষ বাজা আর হাততালি দেওয়া শুরু হইলো। বোঝা গেলো, সার্কাসের বেশিরভাগ দর্শকই নিয়মিত। মিস মুন্নিও কাউরে হতাশ করলেন না। ‘রূপবানে নাচে কোমড় দুলাইয়া’ গানের সাথে উনি কোমড় দুলাইয়া নাচলেন। পিছন থেকে ধারাভাষ্যকার ভদ্রলোক মাল্টিপল অর্গ্যাজম হইতে থাকার গলায় ধারাবর্ণনা দিয়া গেলেন।

sirajgang-3a

“প্রথমে আসলেন ‘সবার পছন্দের’ মিস মুন্নি। উনি আসার সাথে সাথেই চারদিকে মুহুর্মুহু শিষ বাজা আর হাততালি দেওয়া শুরু হইলো।”

কিছুক্ষণ পরে আসলেন ‘ট্যালেন্টেড’ শাহজাদা। সাধারণ একটা সাদা শার্ট আর খয়েরি ট্রাউজার্স পরা, ট্যালেন্টেড কেমন তা আমি প্রাথমিক ভাবে বুঝলাম না। তো উনি আইসা প্রায় দশ লিটার পানি ধরে এমন এক বালতি পানি আর দশটা জ্যান্ত শিং মাছ গিলা খায়ে ফেললেন। সামরিন সেই দৃশ্য দেইখা আমারে ধইরা ফিস ফিস কইরা বললেন, “নাদিয়া, আ’ল বি সিক। আ’ল বি সিক! আমার বমি আসছে!”

সামরিনরে দেখার আমার টাইম নাই তখন। ট্যালেন্টেড শাহজাদা তখন গলা থিকা সেই দশ লিটার পানি বাইর করতেছেন। পানি বাইর হওয়া শেষ হইলে উনি মুখের ভিতর হাত ঢুকাইয়া এক এক কইরা দশটা জ্যান্ত শিং মাছ টাইনা বাইর করলেন। দর্শকের ভিতর থিকা একজন আবার হাত বাড়ায়া একটা শিং মাছ নিলেন। আমি চোখের কোনা দিয়া দেখলাম, সামরিন হাত দিয়া চোখ ঢাইকা আঙুলের ফাঁক দিয়া এই জিনিস দেখতেছে।

এরপর সার্কাসের বাকি খেলা চললো। কেউ তিরিশ ফিট উপর থিকা ঘুরতে ঘুরতে লাফ দিয়া পড়লেন, কেউ হাজারখানেক জিনিস সমেত দড়ির উপর ডিগবাজি খাইলেন, কেউ একইসাথে পাঁচটা ফুটবল ব্যালেন্স করলেন, কেউ হাতে জ্বলন্ত আগুন বা ছুরি জাগল করতে করতে দড়ির উপর দিয়া হাঁইটা গেলেন।

সোহেল ঘড়ি দেইখা জানাইলো সাড়ে দশটা বাজে। আমাদের এখন উঠতে হবে। সিরাজগঞ্জ শহর আমরা চিনি না, পরে ঝামেলা টামেলা হইতে পারে। আমরা নদীর পাড়ে গেছিলাম রিক্সা নিয়া, এখন রিক্সা না পাওয়া গেলে মুশকিল। এইদিকে তখনো হাতি আসেন নাই মঞ্চে। আমার আর জুনানের এই মাঝরাস্তায় চইলা যাওয়ারও ইচ্ছা নাই। কিন্তু সবার তাড়ায় আমরা উইঠা দাঁড়াইলাম।

তখন মঞ্চে ঢুকলেন বাদামি রঙ্গের একজন ছোটখাট সাইজের ছাগল। ওয়াসফি আমারে ধাক্কা দিলো পিছ থিকা। ‘নামো, নামো, দেরি হয়ে যাবে!’

sirajgang-2c

“ছাগল সাহেব একটা সিঁড়ি বাইয়া একটা চিকন দড়ির এইমাথা ওইমাথা হাঁটাহাঁটি করলেন।”

ছাগল সাহেব একটা সিঁড়ি বাইয়া একটা চিকন দড়ির এইমাথা ওইমাথা হাঁটাহাঁটি করলেন। এরপর সেই দড়ির উপরে আরো কতগুলি বাক্স রাখা হইলো। উনি ওইগুলার মাথায় চইড়া এক ঠ্যাঙ্গে ভর দিয়া একটা বাটি সাইজের জিনিসের উপর দাঁড়াইলেন। এরপর যখন দর্শকরা একটানা হাততালি দেওয়া শুরু করলেন, তখন উনি বাচ্চা ছেলের মত মাথা নিচু কইরা লজ্জা লজ্জা মুখে দৌড় দিয়া তাঁবুর ভিতরে গিয়া লুকাইলেন।

আমি লজ্জাবতী ছাগলকে দেইখা মুগ্ধ হইয়া জুনরে কইলাম, এখন তো কাউরে ছাগল বইলা আর গালিও দিতে পারবো না আমি! কী যন্ত্রণা!

About Author

নাদিয়া ইসলাম
নাদিয়া ইসলাম

ফ্যাশন ডিজাইনার। লন্ডন সাউথ ব্যাংক ইউনিভার্সিটির ফরেনসিক সাইন্স থেকে পাশ করে এখন রিসার্চ সায়েন্টিস্ট হিসাবে কাজ করেন। ২০০৭ থেকে ইংল্যান্ডে আছেন। এর আগে বাংলাদেশে বসবাস করেছেন। জন্ম লিবিয়ার সির্তে। মিছুরাতায় থাকতেন। ১১ বছর বয়সে লিবিয়া ত্যাগ করেন।