page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

“যারা এখন কোটি কোটি টাকার মালিক, লেখকেরা, তাদের হাত দিয়ে কিন্তু ভালো লেখা আসছে না।”—নূরুল আনোয়ার

সাঈদ রূপু: আচ্ছা আপনার লেখালেখিতে আসা কত সালে? মানে কখন আসা? কতদিন যাবৎ?

নূরুল আনোয়ার: আমি তখন ইন্টারমিডিয়েটে পড়ি। তখন আমার প্রথম বই বের হয়। তখন আমি গ্রামে ছিলাম। গ্রামে থেকে আমি প্রথম বইটা লিখি। আমার প্রথম বইটার নাম ছিল ‘আত্মচরিত’।

সাঈদ: আচ্ছা আপনার কী রকম স্ট্রাগল করতে হইছে এই বইটা বের করতে?

আনোয়ার: স্ট্রাগল বলতে আমি মাঝখানে পড়াশুনা ছেড়ে দিয়েছিলাম। ভাবছিলাম যে শুধু লেখালেখিই করব। তখন ওই সময় আমি লেখাটা লিখি। একটা, মানে মুক্তিযুদ্ধের উপরে। বয়সও অল্প ছিল তখন। আমার চাচা ছিলেন আহমদ ছফা। তো, উনি বললেন যে মানে লেখাটা খুবই ভালো। তুমি ঢাকাতে নিয়ে আসো, যে আমি একটু দেখি। তখন উনি দেখার পরে ওই বইটা বলল খুব ভালো। উনি আমার সঙ্গে বসে একসঙ্গে সম্পাদনাটাও করেছেন। এবং স্টুডেন্ট ওয়েজ থেকে ওইটা প্রকাশ পেয়েছিল ১৯৯২ সালে।boimela-logo-2016

সাঈদ: এরপরে আপনার কতগুলা বই বের হইছে?

আনোয়ার: এ পর্যন্ত আমার ১২টা বই বের হইছে। সম্পাদনা-টম্পাদনা ইত্যাদি মিলিয়ে তো প্রায় ৩০-এর কাছাকাছি।

সাঈদ: এই বইমেলাতে আপনার কয়টা বই আসছে?

আনোয়ার: এই মেলায় আমার তিনটা বই।

সাঈদ: তিনটা বই।

আনোয়ার: তিনটা বই। একটা হচ্ছে আপনার ছড়ার বই। একটা ভ্রমণ। ছড়ার বইটার নাম হচ্ছে ‘ঘিয়ে ভাজা ছড়ার হাড়ি’। তার পরের ওইটার নাম হচ্ছে ‘ভ্রমণ বাংলাদেশ’। আরেকটা বই আমার উপন্যাস। ওইটার নাম হচ্ছে ‘লেখক’। ‘লেখক’ উপন্যাসটা বের হইছে স্টুডেন্ট ওয়েজ থেকে। আর খান ব্রাদার্স থেকে বের হইছে বাকি দুইটা বই। তো আমার এবারের তিনটা বইয়ের মধ্যে একটু বিশেষত্ব আছে।

সাঈদ: যেমন?

আনোয়ার: আমার প্রথম বইটা, আমি প্রথম ছাড়ার বই লিখলাম বাচ্চাদের জন্য। এটা আগে কখনো আমি লিখি নি বাচ্চাদের জন্যে। বাচ্চাদের আবদারে আমি ছড়াগুলি লিখেছিলাম। তো ওখানে আমার পুত্র, ১০ বছর বয়স তার, সিফাত ছফা। সে বইটার প্রচ্ছদ করেছে, ভিতরের ছবিগুলা এঁকেছে।nurul-anwar-cov এটা একটা বিশেষত্ব। আর ভ্রমণ কাহিনীটা, ব্যাপারটা হচ্ছে, অনেকে ভ্রমণকাহিনী লিখে কিন্তু বাংলাদেশ নিয়ে এ পর্যন্ত ভ্রমণকাহিনী কেউ লেখে নাই। লিখলেও খুবই সীমিত। বাংলাদেশের নয়টা অঞ্চলকে নিয়ে লিখছি, কক্সবাজার, বান্দরবন, খাগরাছড়ি, সেন্টমার্টিন, তারপরে আপনার সিলেট, হাওর এলাকা, সাজেক, সুন্দরবন—মানে যেইগুলা আমাদের বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র, সেই কেন্দ্রগুলোকে আমি হাইলাইট করার চেষ্টা করেছি। দুইটা কারণে করেছি, একটা হচ্ছে আমাদের পর্যটন শিল্পটাকে আরো উন্নত করা। দ্বিতীয়ত হচ্ছে যে, এটা পঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া। তো আমার মনে হয়, এই বইটা একটা পাঠকদের কাছে ভ্রমণ রেসিপি হিসেবে কাজ করবে।

সাঈদ: অচ্ছা আচ্ছা, আর আপনার উপন্যাস?

আনোয়ার: উপন্যাসটা, আমার উপন্যাসটা হচ্ছে, নাম হচ্ছে, ‘লেখক’। লেখকের যে মনস্তাত্ত্বিক… এবং লেখকের যে স্ট্রাগল, আমরা তো বই পেলে হাতে নিই। কিন্তু স্ট্রাগল যে, লেখকদের যে জীবন এবং তাদের যে কঠিন একটা জীবন পার করতে হয়, এবং কত কষ্ট তাদের করতে হয়। মোটামুটি আমার মনে হয় যারা লেখে, পাঠক, ওদের কাজে আসবে।

NURUL 2

সাঈদ: তিনটা বই, মানে এক সময় তো লেখেন নাই। মানে কতদিন যাবৎ লিখছেন?

আনোয়ার: আমি যখন লিখি না, খুব দ্রুত লিখি। যেমন আমার এইবারের উপন্যাসটা, আমি লিখেছি মাত্র ২ মাসে, ১৬০ পৃষ্ঠার বই। তারপরে ছড়াগুলো লিখেছি দশপনেরো দিন বসে, বাচ্চাদের সঙ্গে বসে বসে। আমি ওই ধরনের লেখা লিখি না। আমি যেই প্রেমের গল্প, হালকা ইয়ের গল্প, এগুলো আমি লিখি না। আমি লিখি—সমাজ, রাষ্ট্র, ব্যক্তির কাজে যদি কমিটমেন্ট না থাকে, প্রতিশ্রুতি না থাকে, সে ধরনের লেখা আমি লিখি না।

সাঈদ: লেখালেখির পাশাপাশি আপনি কী করেন?

আনোয়ার: আমি একজন গবেষক। আমি পিপিআরসি নামে একটা প্রতিষ্ঠানে কাজ করি। ১৫-১৬ বছর ধরে, এখনো আছি।

সাঈদ: আচ্ছা ওই কাজের ফলে কি আপনার লেখালেখিতে কোনো প্রভাব পড়ছে কিনা? বা কাজ না করলে লেখালেখি কি আরো বেশি করতে পারতেন?

nurul1

আনোয়ার: এটা আমি বিশ্বাস করি না। আমাকে যদি কেউ যদি এখন দুইবেলা খেতে দেয়, পড়তে দেয়, একটা ভালো বাড়ি দেয় আমি কিন্তু লিখতে পারবো না। আমি কিন্তু এই উপন্যাসে লিখেছি এটা।

সাঈদ: কোন ব্যপারটা?

আনোয়ার: এই যে একজন লেখক, তাকে যদি একটা বিলাসব্যাসনের মধ্যে রেখে দেয় সে ভালো লেখা লিখতে পারবে না। এখন প্রশ্ন হতে পারে যে, রবীন্দ্রনাথ কেন লিখেছিলেন এত কিছু থাকার পরেও। রবীন্দ্রনাথের একটা বাইরের জগৎ ছিল। আপনি দেখেন, যারা এখন কোটি কোটি টাকার মালিক, লেখকেরা, তাদের হাত দিয়ে  কিন্তু ভালো লেখা আসছে না। একটা কারণ এটা। আমি সাধারণ মানুষের কাছে যাচ্ছি, একজন খেটে খাওয়া মানুষের কাছে যাচ্ছি। আমার বাড়ি গ্রামে, আমি মাঠে কাজ করেছি। এই যে শহরে যারা লেখালেখি করছে, এরা তো কখনো মাঠে কাজ করে নাই, খেটে খায় নি, দুইবেলা উপাস থাকে নাই। তারা সাধারণ মানুষের, গরিব মানুষের মর্মটা বোঝে না। এই জন্যে ভালো লেখক কিন্তু সৃষ্টি হচ্ছে না। আপনি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে, অদৈত মল্লবর্মণ থেকে শুরু করে আপনি যদি বিভূতিভূষণকে ইয়ে করেন, দেখবেন যে ওদের সাহিত্য… আমাদের এই বর্তমান সাহিত্য যে সৃষ্টি হচ্ছে, আহমদ ছফার সাহিত্য দেখেন, কতো ইয়ে থেকে উঠে এসেছে।

সাঈদ: আপনি কি মনে করেন যারা স্ট্রাগল করে বড় হচ্ছে, বা মফস্বলে যারা থাকছে, তাদের লেখালেখি যদি ইয়ে হয়, তাহলে সেটা মানসম্মত…?

আনোয়ার: আমি মনে করি। আমি মনে করি, এই কারণে মনে করি যে, সাহিত্যটা আমার যদি অভিজ্ঞতা না থাকে আমি কল্পনা করে কোনো কিছু লিখতে পারবো না।

বাংলা একাডেমি বইমেলা, ৪/২/২০১৬

ইউটিউব ভিডিও

About Author

সাঈদ রূপু
সাঈদ রূপু

স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে সাংবাদিকতায় অনার্স। ইন্ডিপেনডেন্ট টিভিতে শিক্ষানবিশ সাংবাদিক।