page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

যার নাম মাতৃকুলনাশনম্

অসুখে ভুগি ছোটবেলা থেকেই। সে নানা রকম অসুখ! জ্বরজারি, সর্দি-কাশি তো এমনিতেই থাকে, ভুগেছি হাম থেকে বসন্ত পর্যন্ত কত রকম জ্বালা-যন্ত্রণাবহুল আপদে।

ভুগে-ভুগে দেহ ক্ষীণ, প্রাণশক্তি দুর্বল। ১৯৫৯ সালের স্ট্রং ডায়রিয়ার পর সেই দুর্বলতাই হয়ে ওঠে বেশি শক্তিশালী। পাড়ার ছোট কালীবাড়ির সামনে খোলা চত্বরে আগে খেলতাম গোল্লাছুট, লবণদাঁড়ি, দাড়িয়াবান্ধা। আর সেখানে ঠাঁই হয় না আমার।

কালীবাড়ির বারান্দায় খেলি ১৬ গুটি বাঘ চাল / বাঘবন্দি খেলা। তারপর চাটকি, চেল্লা, মার্বেল, সানি নিয়ে থাকি মেতে।

ফাল্গুন এলে শুরু হয় ঘুড়ি, চিলা, চং, পতং নিয়ে মাতামাতি।

কুমুদিনী কলেজের সামনে খোলা জায়গায় খেলতাম ব্যাট-বল। হ্যাঁ, তখন ওই নামেই পরিচিত ছিল ক্রিকেট। কলেজের উত্তর পাশে, পিছনে মাঠে মাততাম ফুটবল নিয়ে। পিটিআই মাঠে ফুটবল ছাড়াও খেলতাম হ্যান্ডবল। সে সব গেল একে-একে। মাঠ ছেড়ে দেয়ায় মাততে হলো লুডো, সাপা, বাগাডুলি, ক্যারম নিয়ে। ব্যাডমিন্টন-ও খেলতাম খুব। স্কুলের শেষ দিকে শিখি তাস খেলা। রঙমিলান্তি দিয়ে শুরু, তারপর ক্রমে-ক্রমে টুয়েনটি নাইন, ব্রে, ব্রিজ, কনট্রাক্ট ব্রিজ।sazzad-kadir-logo

কলেজ-জীবনে লন টেনিস, পিং পং  (টেবিল টেনিস)। একাত্তরে বাসাইল-ঢংপাড়ায় আত্মগোপনে থাকার সময় ছোট বোন বকুলের ননদ-পরিবারের কাছে শিখি দাবা। চীনে থাকতে শিখেছিলাম মাচিয়াং (মাহজং)। কলেজ-ভারসিটি জীবনে শিখেছিলাম ফিশ, দুরি ফিশ, ফ্লাশ, কাচ্চু, নাইন কার্ড, হাইড্রোজেন। তবে অভ্যস্ত হই নি, সম্ভবত রেস্তের অভাবে।

পিং পং, কনট্রাক্ট ব্রিজ, দাবা প্রভৃতি খেলার প্রতিযোগিতায় যোগ দিয়েছি জীবনের বিভিন্ন সময়ে। সা’দত কলেজে, মোহসিন হলে, টাঙ্গাইল ক্লাবে, নাট্যবিতানে, করোনেশন ড্রামাটিক ক্লাবে। তাতে সাফল্যের মুখ দেখেছি কখনও-কখনও।

শরীর দুর্বল, মন একাগ্রতাহীন। গণিত ও ইংরেজিতে পিছিয়ে পড়ি ক্লাশ নাইন-টেনে। কলেজে চেষ্টা করি ওই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে। গণিত নিয়ে বিজ্ঞান পড়ি ইংরেজি মাধ্যমে। তখন বৃথা হলেও ফল পাই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম দিকে, পরে শিক্ষক ও সাংবাদিক জীবনে। তবে ছোটবেলার সেই সব অসুস্থতার জেরে বিভিন্ন সময়ে ভুগেছি নানা উপসর্গে, আর স্থায়ী ভাবে শিকার হয়েছি অবসন্নতা, আলস্য, বিষণ্নতা, মনোযোগহীনতার।

shaat

বিন্দুবাসিনী বালিকা বিদ্যালয়।

আমাদের সময়েই, ১৯৬২ সালে, শেষ হয় বৃটিশ আমলে প্রচলিত ম্যাটরিকুলেশন (সংক্ষেপে ‘ম্যাটরিক’) পরীক্ষার পদ্ধতি। পরের বছর চালু হয় সেকেন্ডারি স্কুল সারটিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষা। তাতে  নাইন থেকেই চালু হয় কলা, বিজ্ঞান ও বাণিজ্য তিন শ্রেণী। ফাইনাল পরীক্ষা হয় দু’বার—প্রথমে নাইনে, তারপর টেনে। সেশন জুন থেকে জুলাই। আমাদের ছিল জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর। তাই ১৯৬৩ সালের জুন পর্যন্ত আমাদের ক্লাশ টেনে পড়তে হয়—এসএসসি’র সেশন শুরু হওয়া পর্যন্ত।

সেকালে এটাই ছিল জাতীয় পরীক্ষা। দেশ জুড়ে হুল্লোড় লেগে যেতো এ নিয়ে। সে হুল্লোড়ের শুরু স্কুলে-স্কুলে ‘টেস্ট’ পরীক্ষা থেকে। প্রতিটি বিষয়ে নেয়া হতো পরীক্ষা, আর সে পরীক্ষা হতো অত্যন্ত কড়া। এতে পাশ না করলে ‘এলাউ’ হতো না কেউ ফাইনাল পরীক্ষার জন্য। এ নিয়ে খুব কড়াকড়ি করতো স্কুল কর্তৃপক্ষ। কারণ ম্যাটরিক পরীক্ষা ছিল সেকালে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় পাশ করা ছিল প্রায় দুঃসাধ্য। তাই পাশের হার নিয়ে স্কুলে-স্কুলে ছিল দারুণ রেষারেষি।

তবে প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার ঘটনা জানা যায় নি কখনও। শুনতাম, দূর সমুদ্রে জাহাজে ছাপা হয় তিন সেট প্রশ্নপত্র, তাতে আছে নানা রকম সাংকেতিক নম্বর। পরীক্ষা শুরু হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে বলে দেয়া হয় সে নম্বর, আর সে নম্বর বিভিন্ন পরীক্ষা কেন্দ্রের জন্য বিভিন্ন রকম। কিন্তু আমাদেরই সময় গণিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে বলে গুজব রটায় পরীক্ষা পিছিয়ে যায় প্রায় ছয় সপ্তাহ।

‘টেস্ট’ পরীক্ষার পর-পর উত্তীর্ণদের জন্য শুরু হতো এক্সট্রা ক্লাশ। পরে এর নাম হয় কোচিং ক্লাশ। যারা উত্তীর্ণ হতে পারে নি তারা ফাইনাল পরীক্ষায় অকৃতকার্যদের সঙ্গে সুযোগ পায় ‘এডিশনাল’ ম্যাটরিক পরীক্ষা দেয়ার। ওদিকে উত্তীর্ণদের অনেকে কোচিং-এর বাইরেও পড়তে শুরু করে প্রাইভেট টিউটরদের কাছে। তখন স্কুলে-স্কুলে টিউটরে-টিউটরে কী প্রতিযোগিতা! সকলের কাছে সকলের কার্যক্রম গোপন রাখার কী সতর্কতা!

পরীক্ষার্থীদের আদর-যত্ন বেড়ে যায় তখন। তাদের জন্য বরাদ্দ হয় দুধ, ঘি, মাখন, ছানা, সন্দেশ, আপেল, নাশপাতি, বেদানা, সরু চালের ভাত। কলা, কাচকলা, ডিম, কচু, তেঁতুল, জলপাই ইত্যাদি অপয়া খাবার এবং বাইরে ঘোরা, আড্ডা দেয়া, খেলাধুলা, সিনেমা দেখা বন্ধ। আমার টিউটর ছিল না, একা-একা পড়েছি, এক্সট্রা ক্লাশ করার সুযোগ অবশ্য পেয়েছিলাম বহু কষ্টে ১০ টাকা যোগাড় করে।

shaat 3

আকুর-টাকুর পাড়া।

‘টেস্ট’ পরীক্ষার সময় থেকেই শুরু হতো আত্মীয় স্বজনদের খোঁজখবর নেয়া। মিষ্টির হাঁড়ি সঙ্গে নিয়ে বাসায় আসা-যাওয়া করতেন তাঁরা, উপদেশ পরামর্শ দিতেন পরীক্ষার আদ্যোপান্ত নানা ব্যাপার নিয়ে। দূরের আত্মীয়রা চিঠি লিখতেন একের পর এক—কার্ডে অথবা খামে। টেলিগ্রামও করতেন অনেকে। মানি অর্ডার করতেন ১০-২০ টাকা; লিখতেন, “ভাল-ভাল খাবার খাইবে… নতুন জামা-কাপড় পরিবে… এইজন্য পাঠাইলাম… পরে আরও পাঠাইব…।”

পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত চলতো এ রকম। তারপর আবার শুরু হতো পরীক্ষার ফল প্রকাশের সময়। উত্তীর্ণদের বাসায়-বাসায় তখন তো ধুম লেগে যেতো রীতিমতো।

‘টেস্ট’ পরীক্ষা শেষ হওয়ার দু’ সপ্তাহের মধ্যে বাজারে আসতো ‘টেস্ট পেপারস্’—সারা দেশের প্রশ্নপত্রের সংগ্রহ। থান ইটের মতো পেল্লায় এক বই, নিউজপ্রিন্টে ছাপা। ওটা নিয়ে কাড়াকাড়ি পড়ে যেতো পরীক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষকদের মধ্যে। পরীক্ষার্থীদের কাজ ছিল তখন দিন-রাত ওই বই থেকে নামী স্কুলগুলোর প্রশ্নগুলো ‘সল্ভ্’ করা। তা হলেই অনেক কিছু ‘কমন’ পড়ে যাবে পরীক্ষায়!

শহরের লাইব্রেরিগুলো সরবরাহ করে  কুলাতে পারতো না কিছুতেই। ঢাকা থেকে আসা চটের প্যাকেট খুলতে না খুলতে নেই হয়ে যেতো বই। ঢাকায় যেতো অরডারের পর অরডার। তখন ওই ‘টেস্ট পেপারস্’-এর প্রকাশক ছিল আদিল ব্রাদার্স। একচেটিয়া ব্যবসা। পরে তাতে ভাগ বসায় গ্লোব লাইব্রেরী। স্কুল শিক্ষকদের এক সংগঠন খাড়া হয় ওই সময়। ভাগ বসাতে তারা নিজেরা খাড়া হয়েছিল নাকি ভাগ দিয়ে তাদের খাড়া করানো হয়েছিল—এ নিয়ে ছিল নানা কথা।

সে সময় নোট বই ছিল শুধু ইংরেজি, গণিত ও বাংলার। সেগুলো থাকতেও টেস্ট পেপারস্-এর সপ্তাহ খানেক পরেই বইয়ের বাজার ছেয়ে যেতো বিভিন্ন প্রকাশকের টেস্ট পেপারস্ মেড ইজি, সলিউশনস্, সাজেশচনস্, টু উইকস্ প্রিপারেশন, ওয়ান উইক প্রিপারেশন ইত্যাদিতে। এগুলোর মধ্যে কোনটা ভাল তা বাছাই করা নিয়ে ছিল আরেক হুলস্থুল। শিক্ষক, অভিভাবক, সাবেক পরীক্ষার্থীদের ছিল নানা মত। আমার বইপত্র ছিল না; আগের বছরের একটা ঢাউস সাজেশচন বই আর ইংরেজির একটা পুরনো নোট বই—যার অনেক কিছুই বাদ পড়েছিল আমাদের সময়কার পাঠ্যতালিকা থেকে। তবে অল্প কিছু মুখস্থ করার সামান্য ক্ষমতা আর নিজের বিদ্যা ফলানোর দুঃসাহস ছিল আমার ভরসা। শুনেছিলাম নোট বই মুখস্থ করে লিখলে নম্বর পাওয়া যায় না, নিজের মতো করে লিখলে পাওয়া যায় বেশি-বেশি নম্বর। পাশ করবো বলে আমার মনে যে জোর ছিল তা এ কারণে।

‘টেস্ট’ পরীক্ষায় পাশ করার পর স্কুলে-স্কুলে শুরু হয় রেজিস্ট্রেশন, আমরা বলতাম ‘ফর্ম ফিলআপ’। এ কাজ সহজ ছিল না, অনেক সাবধান হয়ে লিখতে হতো তথ্যগুলো। কারণ ওই নাম, বানান, তারিখ ইত্যাদি বয়ে বেড়াতে হবে বাকি জীবন। ফলে লেখালেখির কাজে সহায়তা করতেন শিক্ষকেরা।

আমার নামের বানান একেক ক্লাশের শিক্ষক হাজিরা খাতায়, বেতনের রসিদে লিখতেন একেক রকম। এ ভাবে নানা রকমে ঘুরপাক খেতে-খেতে ক্লাশ টেনে ওঠার সময় বানান দাঁড়িয়েছিল Saha Nur Mohd. আমি অবশ্য ফরমে লিখলাম Shah Noor Mohammad. Shah / শাহ আমাদের বংশগত উপাধি। বাবার নাম Shah Mohammad Abdus Salam. তিনি লিখতেন S. M. Abdus Salam. ফরমে লিখি তা-ই। কিন্তু জন্মতারিখ লেখার সময় স্যার বললেন, “কমিয়ে লেখো।” তারপর কী হিসাব করে স্যার কমিয়ে দিলেন তিন মাস। ‘১৪ই এপরিল ১৯৪৭’ আমার প্রকৃত জন্মতারিখ, স্যার লিখতে বললেন ‘১৩ই জুলাই ১৯৪৭’। লিখলাম তা-ই। লিখে বড় খচ-খচ করতে থাকে মন। সে খচখচানি যায় নি এখনও।

shaat 2

এক্সামিনেশন পেপার (স্যাম্পল)।

ফরম ফিলআপ করার পর বেশ সাবালক মনে হয় নিজেকে। বিকালে নিরালার মোড়ে গিয়ে মদনের চানাচুর খাই এক আনার, বইয়ের দোকানে গিয়ে ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়ের ‘মধুরাতি’ বা ‘বধূ জাগো’ নামের উপন্যাস কিনি, করোনেশন পার্কে যাই ফুটবল খেলা দেখতে, কিছুক্ষণ সে খেলা দেখে পাশে লৌহজঙ্গ নদের তীরে—পার্কের এক কাঠবাদাম গাছের নিচে বসে বইয়ের পাতা ওলটাই, পড়ে ফেলি ২০-২৫ পৃষ্ঠা, তারপর কালী সিনেমায় ভিড় ঠেলে ইনটারমিডিয়েট ক্লাশের টিকিট কিনে দেখি কী একটা নাচে গানে ভরপুর ফাইটিং ছবি। তখন বই পড়া ও ছবি দেখার নেশা আমার প্রচণ্ড। আরেকটা নেশা গান শোনা। পরীক্ষার সময়ও বিরতি ছিল না এ সবের। সেই থেকে পরীক্ষার আগের রাতে নাইট শো দেখা পরিণত হয় অভ্যাসে। এম এ পরীক্ষা পর্যন্ত এতে ছেদ পড়ে নি আর।

তবে আমি ম্যাটরিক পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি তা বিশ্বাস করে নি অনেকে। পাড়ার, শহরের কারও-কারও মন্তব্য শোনা যেতো, “ওই পুঁচকে ছোড়া? বলো কী?”

কারণ ছিল এমন ধারণার। এমনিতে ছিলাম রোগা টিঙটিঙে, তারপর জামাকাপড় পরতাম ঢিলঢিলা। হাফ প্যান্ট (ইজার ও ইংলিশ) ও হাফ শার্ট, পায়জামা ও ফুল শার্ট ছিল আমার পোশাক। ইস্ত্রি ছিল না, ভাঁজ করে সেগুলো রাখতাম বালিশের নিচে, নয় মসৃণ করতাম ভারি মালশা চেপে-চেপে। আমাকে ‘পুঁচকে’ বলার আরেক কারণ, ম্যাটরিক পরীক্ষার্থীদের মধ্যে বেশির ভাগই ছিল আদু ভাই। ক্লাশেও তারা ছিল অনেক। আমাদের সঙ্গে সে বছর পরীক্ষা দিয়েছিলেন আমার চেয়ে ৯-১০ বছরের বড় আরজু ভাই (আবদুল লতিফ সিদ্দিকী), শাজাহান সিরাজ সহ অনেকে। ওই বছর পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলেন আবদুল মঈন খান। এই তিনজনই সাবেক মন্ত্রী।

তবে আদু ভাইদের কারণে ম্যাটরিকুলেশন-এর নাম হয়েছিল ‘মাতৃকুলনাশনম্’। তাদের দাপটও ছিল বেশ। যে ম্যাটরিক পরীক্ষায় যত বেশি ফেল করেছে তার তত বেশি ছিল ডাঁট। তাদের সামনে আই এ, বি এ, এম এ পাশরাও পারতো না কুলিয়ে উঠতে। অন্তত ১১ বার ম্যাটরিক ফেল করেছে এমন একজনকে দু’-একবার দেখেছি আমি শহরে ঘোরাঘুরি করতে, তার যে কত খাতির ছিল তা এখনও খুব মনে আছে আমার।

সে সময় গোটা মহকুমার জন্য শহরে পরীক্ষা কেন্দ্র নির্দিষ্ট ছিল তিনটি—বিন্দুবাসিনী বালক ও বালিকা স্কুল এবং শিবনাথ স্কুল। আমার সিট পড়েছিল বিন্দুবাসিনী বালিকা বিদ্যালয়ে—প্রথম রুমের প্রথম বেঞ্চের প্রথম আসনে। আমার পাশে বসেছিল জাঙ্গালিয়া স্কুলের মনসুর। পরে তার সঙ্গে বিয়ে হয় আমার এক খালাতো বোনের। ব্যাঙ্কে চাকরি করেছে, অবসরের পর ইদানীং বদ্ধ ঘরে বসে দিনরাত গল্প উপন্যাস কবিতা লিখে চলেছে খাতার পর খাতা।

পরীক্ষার চার-পাঁচ দিন আগে থেকেই শহরে ভিড় বেড়ে যায় সবখানে। বাইরের স্কুলের শিক্ষকেরা পরীক্ষার্থীদের নিয়ে আসেন দলে-দলে। অভিভাবক, আত্মীয় স্বজন, চোথা-কর্মীরাও আসে সেই সঙ্গে। হোটেল, মেস, বোর্ডিং সব ভরে যায় দেখতে-দেখতে। তখন সুবিধামতো ফাঁকা জায়গাগুলোতে অস্থায়ী চালা তুলে চট বা মাদুরের ওপর বিছানা পেতে থাকার ব্যবস্থা হতো তাদের জন্য। খুশি হয়ে সে ব্যবস্থা করে দিতেন শহরবাসী। সে সময় আমাদের বাসার সামনেও খোলা জায়গায় ধাড়ি দিয়ে লম্বা-লম্বা ছাপরা তৈরি হয়েছে কয়েক বছর।

শুনেছিলাম খাতায় খাতায় উত্তর মিললে পরীক্ষকরা কেটে দেন সে উত্তর অথবা কম নম্বর দেন উভয়কে। এ জন্য খুব সতর্ক ছিলাম, কিন্তু চাপে পড়ে উত্তর বলে দিতে বা খাতা দেখিয়ে-দেখিয়ে লিখতে বাধ্য হয়েছি আগাগোড়া।

shat 1

শিবনাথ স্কুল।

নকলের বিরুদ্ধে খুব কড়াকড়ি ব্যবস্থা নিতেন ইনভিজিলেটররা। ধরা পড়লে বহিষ্কার নয় ঘণ্টা খানেক বাইরে বসিয়ে রাখা, নিদেনপক্ষে খাতায় উত্তর দেয়া ছিল নিয়মমাফিক শাস্তি। তারপরও নকলের চেষ্টায় বিরতি ছিল না অনেকের। ক্ষুদে-ক্ষুদে অক্ষরে লম্বা ফালি কাগজে উত্তর লিখে সেটা আঙুলের ভাঁজে রেখে নকল করতো কেউ-কেউ। ওই নকলের কাগজের নাম ‘চোথা’। কিন্তু সে চোথা নিয়ে সোজা নয় ভেতরে ঢোকা। কেন্দ্রে ঢোকার মুখেই শরীরে তল্লাশি চালানো হয় পিয়ন-আয়াদের দিয়ে। চোথা থেকে আস্ত নোট বই জাঙ্গিয়ার ভেতরে অথবা জামার নিচে বগলে রবার দিয়ে আটকিয়ে চলতো নকল পাচারের চেষ্টা। পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর-পর কোনও না কোনও ভাবে বাইরে চলে যেতো প্রশ্নপত্র। তখন আশপাশের বাড়ির বারান্দায় বা ফাঁকা জায়গায় ভিড় লেগে যেতো বসে-বসে চোথা লেখার বা নোট বইয়ের পৃষ্ঠা কাটার। ব্যস্ততা বাড়তো সরবরাহকারীদের। জানালা দিয়ে ছুড়ে-ছুড়ে তারা চোথা পাঠাতো উদ্দিষ্ট জনের কাছে। ইনভিজিলেটরদের অনেকে শূন্যে থাকতেই খপ-খপ করে ধরে ফেলতেন ওগুলো। সে সব চোথা কারও কাছে পাওয়া গেলে তাঁরা শাস্তি দিতেন সঙ্গে-সঙ্গে। অনেক সময় এর শিকার হতে হয়েছে অনেক নিরপরাধকে। হয়তো সিটের আশপাশে উড়ে এসে পড়েছে কিছু চোথা, সেগুলো হয়তো চোখেও দেখে নি পরীক্ষার্থী—তারপরও পড়তে হয়েছে বিপদে। এ ঝামেলা থেকে বাঁচতে এক-দেড় ঘণ্টা পর পানি খাওয়া বা মল-মূত্র ত্যাগের অনুমতি মিললে সেখানে গিয়েই নকল যোগাড় করা বা পড়ে আসার কাজ সারতো অনেকে। এ সব কারণে পরীক্ষা দিয়েছি খুব ভয়ে-ভয়ে। কী জানি কখন কোন উটকো ঝামেলায় পড়ি!

পরীক্ষার প্রথম দিন কেন্দ্রের গেটে পৌঁছতেই ঢং-ঢং করে বেজে যায় তৃতীয় ও শেষ ঘণ্টা। বন্ধ হতে যাওয়া গেটের এক পাল্লা ঠেলে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করি, কিন্তু হাফ প্যান্ট হাফ শার্ট পরা আমাকে দেখে ধমক দেন ইনভিজিলেটর, এই খোকা… যাও এখান থেকে!

আশপাশে ছিলেন পাড়ার দুই জ্যেষ্ঠজন। তাঁরা চেঁচিয়ে ওঠেন, খোকা নয়… পরীক্ষা দেবে…।

তাড়াতাড়ি প্রবেশপত্র দেখিয়ে ঢুকি ভেতরে। ইংরেজি ও বাংলা দুই পত্রের পরীক্ষা তখন দুই বেলা। এক পত্রের পরীক্ষা হওয়ার পর বিরতি এক ঘণ্টা। ওই সময়ে কী করি? রাসতার ওপার নাক-কাটা বাচ্চুদের বাড়ির ওপাশের দোকান থেকে দু’ আনার লিলি বিস্কুট কিনে খাই, তারপর পাশের লতিফ স্যারের বাড়ির সামনের টিপকল থেকে ঢক-ঢক করে খাই পানি।

পরীক্ষা শুরু হবে, শেষ ঘণ্টা পড়ে গেছে, ইনভিজিলেটররা শুরু করেছেন খাতা দিতে, তখন শুনি জানালা দিয়ে নাম ধরে ডাকাডাকি। মুখ বাড়িয়ে দেখি, পাশের বাড়ির দেলখোশ ভাই, তাঁর বাড়িয়ে ধরা হাতে এক গ্লাশ দুধ। দেখেই মনে হয় এসেছেন ছুটতে-ছুটতে। আমাকে ইতস্তত করতে দেখে বলেন, নাও—নাও—কিছু বলবে না টিচাররা…।

হাত বাড়িয়ে গ্লাশটা নিই, ঢাকনা সরিয়ে মুখ দেই গরম দুধে।

আমার ম্যাটরিক পরীক্ষার স্মৃতিতে এই ছবিটাই এখনও সবচেয়ে উজ্জ্বল অমলিন।

১৬.০৭.২০১৬

About Author

সাযযাদ কাদির
সাযযাদ কাদির

কবি ও বহুমাত্রিক লেখক। জন্ম: ১৯৪৭, টাঙ্গাইল। পেশা: সাংবাদিকতা, শিক্ষকতা। সাবেক সহকারী সম্পাদক, বিচিত্রা; দৈনিক সংবাদ। ভাষা-বিশেষজ্ঞ, রেডিও পেইচিং, গণচীন। পরিচালক, বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট। বই— কবিতা: যথেচ্ছ ধ্রুপদ; রৌদ্রে প্রতিধ্বনি; দূরতমার কাছে; দরজার কাছে নদী; এই যে আমি; জানে না কেউ; বিশ্ববিহীন বিজনে; মণিমালা সিরিজ; বৃষ্টিবিলীন; কবিতাসংগ্রহ। গল্প: চন্দনে মৃগপদচিহ্ন; অপর বেলায়; রসরগড়; গল্পসংগ্রহ। উপন্যাস: অন্তর্জাল; খেই; অনেক বছর পরে; জলপাহাড়: চার চমৎকার; আঁচ। প্রবন্ধ-গবেষণা: ভাষাতত্ত্ব পরিচয়; হারেমের কাহিনী: জীবন ও যৌনতা; রবীন্দ্রনাথ: মানুষটি; রবীন্দ্রনাথ: শান্তিনিকেতন; বাংলা আমার; সহচিন্তন; বিচলিত বিবেচনা; চুপ! গণতন্ত্র চলছে...; ম্যাঙ্গো পিপল উবাচ; সহস্রক; রমণীমন; রাজরূপসী; নারীঘটিত; সাহিত্যে ও জীবনে রবীন্দ্র-নজরুল। শিশুতোষ: মনপবন; রঙবাহার;এফফেনতি; উপকথন; উপকথন আরও; উপকথন আবারও; উপকথন ফের; উপকথন তেপান্তর; উপকথন চিরদিনের; ইউএফও: গ্রহান্তরের আগন্তুক; সাগরপার; মহাবীর হারকিউলিস; জানা-অজানা বাংলা; তেনালি রামন। ভাষান্তর: লাভ স্টোরি; রসচৈনিক। স্মৃতিকথা: নানা রঙের দিন। সম্পাদনা: শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ কবিতা; দুষ্প্রাপ্য প্রবন্ধ; এই সময়ের কবিতা; এই সময়ের কবিতা ২০১৪; এই সময়ের কবিতা ২০১৫; শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের প্রেমের কবিতা।