ব্লাড প্রেশারের রোগীরা প্রায়ই শুনে থাকবেন লবণ কম খাওয়ার কথা। কারণ দেহে বাড়তি লবণ শরীরে ধারণকৃত পানির পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। ফলে রক্তনালী ও হার্টের ওপর স্ট্রেস বাড়ে।

কিন্তু শুধু লবণ খাওয়া এবং দুঃশ্চিন্তা ও রাগারাগি করাই আপনার রক্তচাপ বাড়ার মূল কারণ না। আরো বেশ কিছু ঘটনা আপনার রক্তচাপ আকস্মিকভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে।

বাড়তি চিনি

প্রক্রিয়াজাত চিনি আপনার রক্তচাপ বাড়াতে লবণের চাইতে কম ভূমিকা রাখে না; কিছু কিছু ক্ষেত্রে বরং আরো বেশি প্রভাব রাখতে পারে।

উপরের ও নিচের (সিস্টোলিক ও ডায়াস্টোলিক)—উভয় প্রকার প্রেশারই এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যেমন, মাত্র ৭০০ মি.লি. সফট ড্রিংক আপনার উপরের রক্তচাপ ১৫ পয়েন্ট এবং নিচের রক্তচাপ গড়ে ৯ পয়েন্ট বাড়িয়ে দিতে পারে।

একাকীত্ব

ব্যাপারটা শুধু বন্ধুবান্ধব কম বা বেশি থাকা না—আসল প্রশ্ন হলো, আপনি কি আপনার পরিচিত মানুষদের সাথে ঠিকমতো কানেক্টেড থাকছেন? গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ৪ বছর বা তার বেশি সময় ধরে একাকীত্বে ভুগেন, তাদের সিস্টোলিক ব্লাড প্রেশার গড়ে প্রায় ১৪ পয়েন্ট বেড়ে যায়। রিসার্চাররা মনে করেন, হতাশা ও প্রত্যাখ্যানের ভয় এবং নিরাপত্তাজনিত আতঙ্ক আমাদের শরীরের কার্যকারিতার ধরন পালটে দেয়।

স্লিপ অ্যাপনিয়া

ঘুমের মধ্যে শ্বাস নিতে সমস্যা হলে (নিদ্রাকালীন শ্বাসব্যাঘাত বা স্লিপ অ্যাপনিয়া) আপনার স্নায়ুতন্ত্র এমন সব কেমিক্যাল ক্ষরণ করে যা শরীরের রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়। এতে হৃদরোগের আশঙ্কাও বাড়ে। তাছাড়া যেহেতু আপনার অক্সিজেনের অভাব হচ্ছে, তাই আপনার রক্তনালীর দেয়াল ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং রক্ত নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দেয়।

পটাশিয়ামের অভাব

রক্তের তারল্য যথেষ্ট পরিমাণে ধরে রাখার জন্য কিডনিতে নির্দিষ্ট পরিমাণ সোডিয়াম ও পটাশিয়াম থাকা লাগে। কাজেই আপনি কম লবণ খেয়েও অধিক রক্তচাপে ভুগতে পারেন যদি আপনার ডায়েটে ঠিকমতো শাকসবজি, ফল, দুগ্ধজাত খাবার (তবে এতে চর্বি কম থাকতে হবে) কিংবা মাছ না থাকে।

পটাশিয়ামের জন্য সবাই কলার কথা চিন্তা করলেও ওজন বেড়ে যাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকতে চাইলে ব্রকোলি, চেস্টনাট আর শাক জাতীয় খাবার আপনার ডায়েটে রাখতে পারেন।

তীব্র ব্যথা

হুট করে শরীরের কোথাও ব্যথা পেলে আপনার স্নায়ুতন্ত্র উত্তেজিত হয়ে পড়ে, ফলে রক্তচাপের স্বাভাবিকতায় ব্যাঘাত ঘটে। আঙুলের নখে বা গালে কোনো কারণে চাপ পড়লে অথবা ইলেক্ট্রিক শকের কারণে এরকম হতে দেখা যায়।

হারবাল সাপ্লিমেন্ট

জিংকো, জিনসেং, এফিড্রা ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের হারবাল সাপ্লিমেন্ট নিয়ে থাকেন অনেকেই। এগুলি আপনার ব্লাড প্রেশার যেমন বাড়িয়ে দিতে পারে, তেমনি অন্যান্য প্রেশারের ওষুধের কার্যকারিতায়ও এসব প্রভাব ফেলে থাকে।

থাইরয়েডের সমস্যা

থাইরয়েড গ্রন্থি যখন যথেষ্ট পরিমাণে থাইরয়েড হরমোন উৎপাদন  করতে পারে না, তখন আমাদের হার্ট রেট কমে আসে। তাছাড়া এতে এলডিএল (লো ডেন্সিটি লাইপোপ্রোটিন, যা খারাপ কোলেস্টেরল নামে পরিচিত) এর পরিমাণ বেড়ে যায়। এর মাধ্যমে ধমনীগুলি শক্ত হয়ে আসে। এসব অপেক্ষাকৃত শক্ত ধমনী দিয়ে রক্ত দ্রুত চলাচল করে এবং চাপ বাড়তে থাকে। অন্যদিকে, থাইরয়েড হরমোন বেশি হওয়ার কারণেও প্রেশার বাড়তে পারে, তবে তা সচরাচর দেখা যায় না।

সময়মতো প্রস্রাব না করা

গবেষণায় দেখা গেছে, মাঝবয়সী মহিলাদের মধ্যে যারা কমপক্ষে ৩ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে টয়লেটে যাননি, তাদের সিস্টোলিক ও ডায়াস্টোলিক প্রেশার যথাক্রমে ৪ ও ৩ পয়েন্ট বেড়ে গেছে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে প্রেশার বাড়ার আশঙ্কাও বেড়ে যায়। আর মূত্রথলি যতটা সম্ভব খালি রাখলে সেই আশঙ্কা কমে।

ব্যথা ও প্রদাহ কমানোর ওষুধ [এনএসএইড]

যেসকল ওষুধ ব্যথা, জ্বর, জমাট বাঁধা রক্ত ও নানা ধরনের প্রদাহ দূর করার জন্য খাওয়া হয়ে থাকে (যেমন অ্যাস্পিরিন, ইবুপ্রোফেন ইত্যাদি) সেগুলি এনএসএইড নামে পরিচিত (নন-স্টেরয়েডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যাম্যাটোরি ড্রাগস)। এই প্রকারের ওষুধও উচ্চ রক্তচাপের কারণ হতে পারে।

ডাক্তারের অফিস

এটাকে ‘হোয়াইট কোট ইফেক্ট’ বলা হয়; নিয়মিত ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়াদের অনেকেই এ সাইকোলজিক্যাল ঘটনাটি খেয়াল করে থাকবেন। ডাক্তারের কাছে গিয়ে রক্তচাপ পরীক্ষা করার নার্ভাসনেসের কারণে আমাদের সিস্টোলিক প্রেশার সর্বোচ্চ ১০ পয়েন্ট ও ডায়াস্টোলিক প্রেশার সর্বোচ্চ ৫ পয়েন্ট পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার নমুনা পাওয়া গেছে।

সাইনাসের ওষুধ

সিউডোএফিড্রিন জাতীয় সাইনাসের ওষুধ আপনার রক্তনালী সংকুচিত করে ফেলতে পারে। এছাড়া এই ওষুধগুলি অনেক সময় ব্লাড প্রেশারের ওষুধের কার্যকারিতাও কমিয়ে দেয়। রক্তচাপের সমস্যা থেকে থাকলে আপনার ডাক্তার সাইনাস বা ঠাণ্ডার সমস্যার জন্য উপযুক্ত ওষুধ প্রিস্ক্রাইব করতে পারেন।

ডিহাইড্রেশন

আপনার দেহের কোষে যথেষ্ট পরিমাণ পানি না থাকলে আপনার ব্রেইন পিটুইটারি গ্রন্থিতে এক ধরনের সিগনাল পাঠায়। ফলে সেখান থেকে এক প্রকার কেমিক্যাল নিঃসরিত হয় যা রক্তনালীকে সংকুচিত করে ফেলে। এছাড়া পানি কম থাকায় কিডনিতে যথেষ্ট তরল না থাকলে তা অবশিষ্ট মূত্র ধরে রাখার জন্য আপনার হার্ট ও ব্রেইনের চিকন নালীগুলিকে আরো বেশি সংকুচিত করতে থাকে। ফলে সব মিলিয়ে আপনার ব্লাড প্রেশার হয় অনিয়মিত।

জন্ম নিয়ন্ত্রণ

ইনজেকশন, বড়ি বা জন্ম নিয়ন্ত্রণের এ জাতীয় অন্য সব উপকরণ সাধারণত রক্তনালী সরু করে ব্লাড প্রেশার বাড়িয়ে দিতে পারে। ৩৫ বছরের অধিক, ধূমপায়ী অথবা স্থূল স্বাস্থ্যের নারীদের এ সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা বেশি।

কথা বলা

এটা সব বয়সের মানুষের ক্ষেত্রেই দেখা যায়। আপনার নিচের ব্লাড প্রেশার যত বেশি হবে, কথা বলার সময় তা আরো বাড়তে থাকবে। এর প্রভাব স্থায়ী হয় কয়েক মিনিট পর্যন্ত। তবে আপনি কত বেশি সময় ধরে মুখ নাড়াচ্ছেন তার চাইতে বরং আপনি কোন বিষয় নিয়ে কথা বলছেন—রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে তা গুরুত্ব রাখে বেশি।

অ্যান্টি-ডিপ্রেসেন্ট

ডিপ্রেশন দূর করার জন্য আমরা যেসব মেডিসিন ব্যবহার করি, সেগুলি ডোপামিন এবং সেরোটোনিনের মতো ব্রেইন কেমিক্যালের উপর সরাসরি কাজ করে থাকে। ফলে এ ধরনের ওষুধ আমাদের মুডের পাশাপাশি ব্লাড প্রেশারও চেঞ্জ করে দিতে পারে।

সূত্র. ওয়েবএমডি.কম

Recommended Posts

No comment yet, add your voice below!


Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *