আপনার সাফল্য একান্তই আপনার নিজের; কিন্তু তাই বলে এমন ভাবার কারণ নাই যে, সেই সফলতা অর্জনে অন্য মানুষদেরকে আপনি কোনোই ভূমিকা রাখতে দিবেন না।

প্রায় কোনও মানুষের সাফল্যই রাতারাতি আসে না। আপনি হয়তো বহুদিনের প্রতীক্ষিত ব্যবসাটা এখনো শুরু করতে পারছেন না কিংবা চাকরিতে আপনার আকাঙ্ক্ষিত প্রোমোশন এখনো আপনাকে দেওয়া হয় নাই— তাই বলে এমন ভাবার কারণ নাই যে এগুলি আর কখনোই আপনার দ্বারা হবে না।

সাকসেসফুল না হওয়ার পেছনে বিবিধ কারণ থাকতে পারে। হয়তো যে কয়বার আপনি উদ্যোগ নিতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন, সাকসেসফুল হওয়ার জন্য সে কয়েকবারের ব্যর্থতাই যথেষ্ট না। হতে পারে আপনার ইগো আপনার সাফল্যের ক্ষেত্রে বাঁধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, আর আপনি তা এখনো টের পান নি।

সাকসেস পেতে দেরি হবার পেছনে নিচের কারণগুলি থেকে যেকোনো একটি/বেশ কয়েকটিই হতে পারে আপনার জন্য প্রাসঙ্গিক।

ঠিক যেসব কাজ করা দরকার, সেগুলি করছেন না

গুরুত্বপূর্ণ কাজের সংখ্যা সবসময় হাতেগোনা হয়, আর বাদবাকি সব কাজ থাকে সেসবের সহায়ক। বিজনেস, চাকরি কিংবা রিলেশনশিপে ইতিবাচকভাবে এগিয়ে যেতে হলে আপনাকে গুরুত্বপূর্ণ এবং আনুষঙ্গিক কাজগুলিকে আলাদা করে সেই অনুযায়ী প্রাধান্য দিতে হবে।

বিজনেস চালানো অনেকটা জিমে যাওয়ার মতো। আপনি শরীরচর্চা নিয়ে যত ইচ্ছা বই পড়েন না কেন, সপ্তাহে মাত্র একদিন জিমে গিয়ে আপনার শরীরের কোনো উপকার হবে না। অন্যদিকে, জিম নিয়ে অনেক অল্প ধারণা নিয়েও আপনি প্রতিদিন দুই ঘণ্টা জিম করে আপনার দৈহিক উন্নতি ঘটিয়ে ফেলতে পারেন।

আরও বেশি ব্যর্থ হতে হবে

আপনি যখন ব্যর্থতার ভয়ে হতাশা নিয়ে বসে আছেন, সেই সময়ে আরও অনেকেই আছে যারা বারবার কাজ করছে ও ব্যর্থ হচ্ছে। সেই ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা ও ধারণা পাচ্ছে তারা।

বারবার ব্যর্থ হলে আপনার কাজের ক্ষেত্রে স্কিল ও উইট বাড়বে। উদ্বেগকে সচেতনতার সাথে গুলিয়ে ফেলবেন না। আপনার বর্তমান সতর্কতাই ভবিষ্যত হতাশার পূর্বপ্রস্তুতি।

আসলেই শর্টকাট বলতে কিছু নাই

১৯১৯ সালে ওয়াল্ট ডিজনি আমেরিকার ক্যানসাস সিটিতে এসেছিলেন নিউজপেপার আর্টিস্টের ক্যারিয়ার বেছে নিয়ে। অথচ তার সম্পাদক তাকে একারণে চাকরিচ্যুত করেন যে, “তার কল্পনাশক্তির ঘাটতি আছে এবং ভালো কোনো আইডিয়া তার কাছে নাই।” চাকরি চলে যাওয়ার পর ওয়াল্ট ডিজনি তার স্টুডিও থেকে প্রডিউস করা কার্টুনগুলি প্রদর্শনের জন্য একটি স্থানীয় থিয়েটারের সাথে চুক্তি করেন। ১৯২৩ সালে তার সেই স্টুডিও দেউলিয়া হয়ে যায়। এরপর আবারো সাকসেস পেতে ডিজনির সময় লেগেছে আরও ২০ বছর।

১৯৩৭ সালে অ্যানিমেটেড মুভি ‘স্নো হোয়াইট অ্যান্ড দ্য সেভেন ডোয়ার্ফস’ মুক্তির পর তার জনপ্রিয়তা সর্বব্যাপী হওয়া শুরু করে। ওয়াল্ট ডিজনির একসময়কার সেই দেউলিয়া হওয়া কোম্পানিই বর্তমান বিশ্বের চতুর্থ সর্বোচ্চ ধনী মিডিয়া কোম্পানি।

সাফল্য পাবার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই

কেউ কেউ অনেক কম বয়সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ঢুকে পড়েন। আবার কারো লেগে যায় কয়েক দশক। সবাই যেমন উপযুক্ত সুযোগের অভাবে অল্প সময়ের মাঝেই নিজের দক্ষতা প্রকাশ ও প্রয়োগ করে উঠতে পারেন না, তেমনি সফলতার ক্ষেত্র সম্পর্কে নিশ্চিত হতেও নানারকম পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়ে নিজের লক্ষ্য খুঁজে নিতে হয় অনেককে।

সবাই মার্ক জাকারবার্গ, স্টিভ জবস বা জেফ বেজোস হতে পারবেন না। কারো কারো সাকসেসফুল হতে যৌবনকে অনেক পিছনে ফেলেও আসতে হতে পারে—যেমন কেএফসি’র কর্নেল স্যান্ডার্স (বয়স ৬০ হবার পর), ওয়ালমার্টের স্যাম ওয়াল্টন (৪৮ বছর), ম্যাকডনাল্ড’সের  রে ক্রক (৫২ বছর) অথবা ইন্সট্যান্ট নুডলসের আবিষ্কারক ও নিসিন ফুড প্রোডাক্টসের প্রতিষ্ঠাতা মোমোফুকু আন্দো (৪৮)।

তাছাড়া সব প্রকারের কাজে একই রকম সময় লাগবে এমন আশা করা ঠিক না। মুরগির বাচ্চা ফুটতে সময় লাগে মোটামুটি ২১ দিন, অন্যদিকে মানুষের সন্তান প্রসব করতে লেগে যায় ৯ মাসের মতো। কাজেই কেবল দ্রুততার ওপর নির্ভর করে কোনও উদ্যোগের প্রভাবশালীতা ও কার্যকারিতা নিয়ে সামগ্রিক ধারণা পাওয়া সম্ভব না।

হারানোর ভয়ে আপনি আতঙ্কিত

অনেক মানুষের কাছে কিছু অর্জন করার তৃপ্তির চাইতে বরং কোনো কিছু হারানোর দুঃখবোধ অনেক ব্যাপক হয়ে দেখা দেয়। সেই আতঙ্কে বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তারা রিস্কই নিতে চান না।

এধরনের মানুষজন সচরাচর কমিশন-বেজড চাকরি করতে আগ্রহী হয় না। অথবা দেখা যায়, কোথাও ইনভেস্ট করে টাকা হারানোর ভয়ে কেবল ব্যাংকেই টাকা রেখে দেন তারা।  এধরনের মানসিক বিচার আপনার সাকসেসের অন্যতম অনাকাঙ্ক্ষিত অনুষঙ্গ হতে পারে।

নেগেটিভ ইভেন্টে বেশি মনোযোগ দেওয়া

নিজেকে নিয়ে খারাপ ধারণা কিছু লোকের এতই গভীর ও শক্তিশালী যে, তারা প্রায় যেকোনো ধরনের পরিবর্তনের ব্যাপারে অনাগ্রহী। এমনকি সফলতার খুব কাছাকাছি এসেও তারা এমনটা ভেবে থেমে যাওয়ার চেষ্টা করে যে, সেই সাফল্য ধরে রাখার মতো ক্ষমতাও হয়তো তার নাই।

এরকম “বদ্ধমূল” ধারণা তাদের চিন্তাকে কাজে রূপান্তরিত হতে দেয় না। তারাও যে ইউনিক ও ট্যালেন্টেড মানুষ হতে পারে, এই ভাবনা আসতে অনেক সময় বছরের পর বছর লেগে যায় তাদের।

নিয়মিত লক্ষ্যের দিকে নজর দিন

আপনি আসলেই ঠিক কোন জিনিসটার প্রতি সবচাইতে বেশি ইন্ট্রেস্টেড? সেই লক্ষ্যের জন্য আপনি ঠিক কতটা একগুঁয়ে? নিজের লক্ষ্যের দিকে আপনি যদি নিয়মিত নজর না দেন, তাহলে সময় ও পরিস্থিতির সাথে সাথে লক্ষ্য অর্জনের জন্য আপনার অ্যাপ্রোচে সঠিক পরিবর্তনগুলি আনতে পারেবেন না আপনি।

এমনকি আপনার লক্ষ্য পুরাপুরি চেঞ্জও করে ফেলতে হতে পারে। তার মানে এই না যে আপনার প্রথম সিদ্ধান্ত ভুল ছিল; বরং এই লক্ষ্যবদল আপনার বাস্তবতা উপলব্ধি করা ও নিজের প্যাশনকে আরও ব্যবহারিক করে তোলার দিকে ইঙ্গিত করে।

ইগো আপনার পথ আটকে দিচ্ছে

অন্য মানুষদের জন্য নয়, বরং নিজের ইগোর কারণেও আপনার সফলতা বিলম্বিত হতে পারে৷ আপনি নিজেকে হয়তো অনেক বেশি বুদ্ধিমান মনে করেন। ধরে নিলাম আপনি আসলেই বুদ্ধিমান, কিন্তু আপনার ইন্টেলিজেন্স বোঝা যাবে আপনি ঠিক কীভাবে আপনার জীবন যাপন করছেন সেখান থেকে।

একটু চতুরভাবে ব্যাপারটা দেখেন। আপনার সাফল্য একান্তই আপনার নিজের; কিন্তু তাই বলে এমন ভাবার কারণ নাই যে, সেই সফলতা অর্জনে অন্য মানুষদেরকে আপনি কোনোই ভূমিকা রাখতে দিবেন না। কাজ হাসিল করার জন্য অন্যদের প্রতি প্রকৃত অর্থেই কৃতজ্ঞ হওয়া অপরিহার্য।

আপনার লক্ষ্যগুলি হয়তো বেশিই অবাস্তব

অনেক সময় আমরা অন্যদের বা সমাজের কাছ থেকে স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য ‘অসম্ভব’ কোনো কিছু ছিনিয়ে আনার দিকে বেশি মনোযোগী হয়ে পড়ি। যেহেতু আপনি সেরকম কিছু অর্জনের জন্য পুরাপুরি প্রস্তুত হতে পারেননি এখনো, তাই গড়িমসি করার একটা প্রবণতা চলে আসে আপনার মাঝে। ফলে হতাশা ও নেগেটিভ ইভেন্টের সম্ভাবনাও বেড়ে যায়।

আপনার লক্ষ্যকে হাতের নাগালে রাখেন। ফেসবুকেরও কিন্তু শুরু হয়েছিল একটা ইউনিভার্সিটির ডেটিং সাইট হিসাবে, অন্যদিকে অ্যামাজনের উদ্দেশ্য ছিল কেবল অনলাইন বইয়ের দোকান হিসাবে কাজ করা। কাজেই ছোট পরিসরের ভিশনকে খাটো করে দেখবেন না অযথা।

সঠিক প্রকার অনুপ্রেরণার অভাব

আশেপাশে একটু খেয়াল করে দেখেন যে, যেখানে আপনি আছেন, সেখানকার লোকজন আপনার কাঙ্ক্ষিত সুবিশাল সেই ক্যারিয়ার, আইডিয়া বা সৃজনশীল উদ্যোগের ব্যাপারে আসলেই সমর্থন দেয় কিনা।

হতে পারে আপনি অনুপ্রেরণাদায়ক মানুষদের অভাবে আপনার সাকসেসের জন্য ইতিবাচক প্রতিবেশ খুঁজে পাচ্ছেন না। যারা আপনার সাফল্যের ব্যাপারে বেশিই সন্দিহান, তাদের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে শুভাকাঙ্ক্ষী সঙ্গীদের কাছাকাছি চলে আসেন।

সূত্র. বিজনেস ইনসাইডার