অামাদের শরীর প্রতি মুহূর্তে একসঙ্গে অসংখ্য কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে বিভিন্ন সময় শরীর আমাদেরকে সতর্ক করতে যেই ম্যাসেজগুলি দেয়, তা অামরা খেয়াল করি না। এই খেয়াল না করার ফলাফল কিছু ক্ষেত্রে ভয়াবহ হতে পারে। যেমন ধরেন, কিডনি। সারাক্ষণ অামাদের রক্ত ফিল্টার করছে। ফিল্টার করে যেসব পদার্থ শরীরের জন্যে খারাপ তা অালাদা করে প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে বের করে দিচ্ছে। ফলে, আমরা সুস্থ শরীর নিয়ে বেঁচে অাছি। কিন্তু, কোনোভাবে এই কিডনির কর্মক্ষমতা কমে গেলে বা অচল হয়ে গেলে তা শরীরের জন্যে বিশাল ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। শরীরের রক্ত পরিষ্কার রাখতে অাপনাকে রুটিনমাফিক ডায়ালাইসিস করাতে হবে, যা অনেক খরচের ব্যাপার। নাহলে, নতুন কিডনি প্রতিস্থাপন করতে হতে পারে।

তাই সবচেয়ে ভালো হয় যদি অাগে থেকে এ ব্যাপারে সতর্ক হন। কিডনিতে সমস্যা দেখা দিলে কী কী লক্ষণ দেখে ব্যাপারটা ধরতে পারবেন তা জানা থাকা জরুরি এক্ষেত্রে। যেই ১০টা লক্ষণ দেখলে বুঝবেন যে অাপনার কিডনি অার অাগের মতো কাজ করছে না:

১. প্রস্রাবে পরিবর্তন

কিডনি শরীর থেকে দূষিত জিনিস বের করে দেয় প্রস্রাব তৈরি করে। তাই প্রস্রাবের পরিমাণ, গন্ধ এবং রঙের চেঞ্জের ব্যাপারে উদাসীন হওয়া ঠিক না। এইক্ষেত্রে যে চেঞ্জগুলি অাপনার চোখে পড়তে পারে:

  • ঘন ঘন প্রস্রাব পাওয়া, বিশেষত রাতে। এমনিতে দিনে ৪-১০ বার প্রস্রাব পাওয়া স্বাভাবিক।
  • প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত যাওয়া। সুস্থ কিডনি রক্ত থেকে দূষিত পদার্থ অালাদা করে প্রস্রাব তৈরি করে, কিন্তু কিডনির ছাঁকন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা দিয়ে প্রস্রাবের সঙ্গে রক্তকণিকা অাসা শুরু হতে পারে।
  • ফেনার মতো প্রস্রাব হওয়া। প্রস্রাবে বুদ বুদ থাকা মানে বাড়তি প্রোটিন আছে এখানে।

পরামর্শ: এই সমস্যাগুলি যে কোনোটা দেখলে দেরি না করে ডাক্তার দেখান।

২. উচ্চ রক্তচাপ

রক্ত সংবহনতন্ত্র (যে নালিগুলি দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হয়) এবং কিডনি একে অন্যের উপর নির্ভরশীল। কিডনিতে থাকা নেফ্রনগুলি রক্ত থেকে বাড়তি তরল এবং দূষিত পদার্থ অালাদা করে, যা পরে প্রস্রাব অাকারে বের হয়ে যায় শরীর থেকে। কিন্তু, রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত হলে রক্ত পরিশোধনকারী নেফ্রনগুলি যথেষ্ট অক্সিজেন এবং পুষ্টি পায় না। এই কারণে কিডনি সংক্রান্ত অসুস্থতার একটা বড় কারণ হচ্ছে উচ্চ রক্তচাপ।

পরামর্শ: কিডনি সুস্থ রাখতে সবসময় রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেষ্টা করুন। খাদ্য তালিকায় ফলিক অ্যাসিডসমৃদ্ধ খাবার রাখুন। ফলিক অ্যাসিড লোহিত রক্ত কণিকা তৈরিতে সাহায্য করে।

(ফলিক অ্যাসিডসমৃদ্ধ খাবার:
শস্য জাতীয় যেমন, গম থেকে তৈরি খাবার, গাঢ় সবুজ সবজি, মটরশুটি, ডাল, লেবু জাতীয় ফল, বাদাম এবং বীজ, শতমূলী বা অ্যাসপারাগাস, ফুলকপি, গাজর, কলিজা, অ্যাভোকাডো, কলা, পেঁপে, কমলা, টমেটোর রস প্রভৃতি)

৩. চোখ ফুলে যাওয়া

কিডনি সমস্যার প্রাথমিক লক্ষণগুলির একটা হল প্রস্রাবে প্রোটিনের উপস্থিতি। যেটার কারণে চোখের চারপাশে ফুলে যেতে পারে। বা বলা যায়, যে প্রোটিনগুলি শরীরে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা, তা না করে কিডনি সেগুলি প্রস্রাব দিয়ে বের করে দিচ্ছে।

পরামর্শ: পর্যাপ্ত পরিমাণ প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া এবং বিশ্রাম নেওয়া সত্ত্বেও যদি দেখেন চোখের চারপাশে ফুলে যাচ্ছে, তাহলে ডাক্তার দেখান।

৪. পিঠ ব্যথা

কিডনি সমস্যার কারণে পিঠ ব্যথা করতে পারে, বুকের খাঁচার ঠিক নিচে। বলা যায় কোমর এবং পায়ের সন্ধিস্থলের সামনের অংশে বা পাছার দিকটায়। কিডনিতে সিস্ট (তরলে পূর্ণ একপ্রকার বড় বড় থলির মতো অংশ) হলে পিঠে এবং পায়ে ব্যাথা হতে পারে।

পরামর্শ: কিডনি সমস্যার কারণে হওয়া পিঠ ব্যথার সঙ্গে অসুস্থ বোধ করা, বমি বমি ভাব, শরীরে তাপ বেড়ে যাওয়া এবং ঘন ঘন প্রস্রাব পাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে, সারারণ পিঠ ব্যথার সঙ্গে কিডনির সম্পর্ক নাই। ব্যথা সাধারণ হলে তা নির্দিষ্ট জায়গা জুড়ে এবং হঠাৎ হঠাৎ হবে। এর সঙ্গে জ্বর হবে না। কিন্তু, যদি সবসময় এরকম ব্যথা হয় অার ওষুধও কাজে না দেয়, তাহলে ডাক্তার দেখান।

৫. গোড়ালি, পা এবং হাত ফুলে যাওয়া

পুরাপুরিভাবে কাজ করতে অক্ষম কিডনি শরীর থেকে বাড়তি তরল বের দিতে পারে না। এর কারণে সোডিয়াম জমতে থাকে এবং গোড়ালি, পা ও হাত ফুলে যায়। তবে, শরীরের নিচের অংশে ফুলে যাওয়ার অর্থ হৃৎপিণ্ড, লিভার কিংবা পায়ের শিরার কোনো সমস্যাও হতে পারে।

সাবধানতা: ওষুধ খেয়ে, খাবারে লবণ কমিয়ে কিংবা শরীরে থাকা বাড়তি তরল বের করে দিয়ে হয়ত এ সমস্যা থেকে অাপনি মুক্তি পেতে পারেন। কিন্তু, তা কাজে না দিলে এই ফোলার জন্যে আলাদাভাবে চিকিৎসা করান।

৬. নিঃশ্বাসের দুর্বলতা

এ সমস্যার সঙ্গে কিডনি সম্পর্কিত হতে পারে দুইটা কারণে, প্রথমত, যখন কিডনি ঠিকমতো কাজ করছে না তখন শরীরে থাকা বাড়তি তরল ফুসফুসে চলে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, আ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতার কারণে অাপনার শরীরে অক্সিজেনের অভাব হচ্ছে।

সাবধানতা: অারো বিভিন্ন কারণে নিঃশ্বাসের দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। তা যেমন কিডনির সমস্যার কারণে হতে পারে, তেমনি অ্যাজমা, ফুসফুসের ক্যান্সার কিংবা হার্টের কোনো রোগের কারণেও হতে পারে। যদি দেখেন ঘন ঘন শ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছে, তাহলে দ্রুত ডাক্তার দেখান।

৭. নিঃশ্বাসে দুর্গন্ধ এবং জিহ্বায় ধাতব স্বাদ

রক্তে দূষিত পদার্থের পরিমাণ বেড়ে গেলে তা খাবারের স্বাদ বদলে দিয়ে মুখে একধরনের ধাতব স্বাদ তৈরি করে। অার দুর্গন্ধ হলো রক্তে ক্ষতিকর পদার্থ বেড়ে যাওয়ার অারেকটি লক্ষণ। এজন্য আপনি হয়ত মাংস খাওয়া কমিয়ে দিতে চাইবেন, খাওয়ার পরিমাণ কমিয়ে দিতে চাইবেন। তবে তাতে শুধু অাপনার স্বাস্থ্যহানি হবে এবং ওজন কমে যাবে।

সাবধানতা: অনেক কারণেই মুখে এমন ধাতব স্বাদ অনুভূত হতে পারে (যেমন: অ্যালার্জি, বা কোনো ওরাল সমস্যা)। ফলে, আন্দাজে কিছু না করে এ বিষয়ে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

৮. ত্বকে শুষ্কতা এবং চুলকানি

কিডনি কিছু অসাধারণ কাজ করে আমাদের শরীরে। রক্ত থেকে দূষিত পদার্থ এবং বাড়তি তরল বের করে দেয়, লোহিত রক্ত কণিকা তৈরিতে সাহায্য করে সঙ্গে খনিজের ভারসাম্য বজায় রাখে। ত্বকের শুষ্কতা এবং চুলকানির মানে হচ্ছে খনিজ পদার্থ এবং পুষ্টি ভারসাম্য ঠিক নেই শরীরে। যার কারণে হাড় এবং কিডনির সমস্যা দেখা দিতে পারে।

সাবধানতা: ত্বকে শুষ্কতা এবং চুলকানি থাকলে পর্যাপ্ত পানি পান করছেন কিনা খেয়াল করুন। এবং যেকোনো ওষুধ খাওয়ার আগে ডাক্তার দেখিয়ে, পরামর্শ নিয়ে তারপরে খান। ভুল ওষুধ খেলে তার যেকোনো উপাদান অাপনার ত্বকের জন্যে অারো বেশি ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে।

৯. মাথা ধরা, অবসাদ এবং সাধারণ দুর্বলতা

সুস্থ এবং কর্মক্ষম কিডনি ভিটামিন ডি’র সাহায্যে শরীরের হাড় মজবুত রাখে এবং, ইরিথ্রোপ্রোটিন নামে এক ধরনের হরমোন তৈরি করে। এই হরমোন লোহিত রক্ত কণিকা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যা শরীরে অক্সিজেন সরবরাহ করে। কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেলে ইরিথ্রোপ্রোটিনের উৎপাদনও কমে যায়। ফলে, অক্সিজেনের অভাবে মাংশপেশী এবং মস্তিষ্কে অবসাদ তৈরি হয়।

সাবধানতা: যাদের কিডনি সাধারণ কিডনির তুলনায় মাত্র ২০% থেকে ৫০% কাজ করে তাদের অ্যানিমিয়া হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং ঘুম হওয়া সত্ত্বেও যদি দেখেন ক্লান্ত লাগছে, দুর্বল লাগছে তাহলে দেরি না করে ডাক্তার দেখান।

১০. ঘুম না অাসা

অাপনার কিডনি ঠিকমতো কাজ করছে না মানে, শরীরে থাকা বিষাক্ত পদার্থগুলো প্রস্রাবের সঙ্গে শরীর থেকে বের হয়ে যেতে পারছে না। রক্তেই থেকে যাচ্ছে। এই পদার্থের পরিমাণ রক্তে বেড়ে গেলে ঘুমে অসুবিধা দেখা দেয়। তাই, যখন কম ঘুমাচ্ছেন আপনার কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সুযোগ বেড়ে যাচ্ছে।

সাবধানতা: কিডনির সমস্যায় ভোগা লোকেদের স্লিপ আ্যাপনিয়া হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। স্লিপ অ্যাপনিয়া সমস্যাটা হচ্ছে, ঘুমের মধ্যে এক বা একাধিকবারের জন্যে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। এই বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিধি কয়েক সেকেন্ড থেকে এক মিনিটও হতে পারে। এবং প্রত্যেকবার বন্ধ থাকার পর যখন নিঃশ্বাস ফিরে অাসে, এর সঙ্গে নাক দিয়ে জোরালো আওয়াজ বের হয়। তাই, নাক ডাকার সমস্যা হলে দ্রুত ডাক্তারের কাছে যান।

আরো পড়ুন: এক মিনিটে ঘুমিয়ে পড়বেন যেভাবে

Facebook Comments

1 COMMENT

  1. ভালো লেগেছে। এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিয়মিত আর্টিকেল ছাপা হলে সুবিধা হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here