অভিযোগটা হলো, পেশাদার অভিনেতাদের প্রতি আমার নাকি এক ধরনের তাচ্ছিল্য ও অবিশ্বাস কাজ করে।

ফিল্মমেকার রবের ব্রেসোঁ বিখ্যাত তার অগতানুগতিক সব ফিল্মমেকিং অ্যাপ্রোচের জন্য। এসব অ্যাপ্রোচের মধ্যে সবচাইতে প্রকট তার সিনেমাগুলিতে অভিনয়ের নমুনা। থিয়েটার থেকে ধার নেয়া অভিনেতাদের অতিরঞ্জিত সব এক্সপ্রেশনকে ‘ভাঁড়ামি’ মনে করতেন তিনি; নিজের প্রথম দুই সিনেমার পর প্রয়োজন ছাড়া আর পেশাদার অভিনেতাদের সাথে কাজ করেননি তাই।

ক্রিটিক রজার ইবার্ট ব্রেসোঁকে নিয়ে লিখেছিলেন, “উনার সিনেমায় রবার্ট ডি নিরো বা শন পেন এর মতো নায়কদের কোনো জায়গা নাই। আপনাদের মনে হতে পারে যে একারণে হয়তো তার মুভি জুড়ে আমরা কেবল জম্বিদেরকে ঘুরে বেড়াতে দেখব, কিন্তু আসলে হয়েছে এর উলটা। অভিনেতাদের কথা বলার সময় স্বরের ওঠানামা বা বিশেষ কোনো স্টাইল ফলো করতে না দিয়ে আর তাদের পারফরমেন্সকে শুধু সরল কিছু অ্যাকশনে রূপান্তরিত করে তিনি এক ধরনের বিশুদ্ধতা খুঁজে পান, যাতে তার সিনেমাগুলি দুর্দান্ত রকমের ইমোশনাল হয়।”


অনুবাদ ও ভূমিকা: আয়মান আসিব স্বাধীন


আমি ২০১৬ সালে প্রথম তার সিনেমা দেখি। ওই বছরই তাকে নিয়ে আমার একদম শুরুর প্রতিক্রিয়া হিসাবে লিখেছিলাম, “ব্রেসোঁ’র এই অনম্য পদ্ধতির লক্ষ্য মনে হয় তার ছবিতে নিজের পরিচালনা ও শৈলীর নিয়ন্ত্রণকে ছাপিয়ে অভিনয় বা কাহিনিধারাকে উঠে দাঁড়াতে না দেওয়া।”

ব্রেসোঁর তৃতীয় সিনেমা ‘ডায়েরি অফ আ কান্ট্রি প্রিস্ট’ মুক্তি পাবার পর তার এই সাক্ষাৎকারটি নেন ফ্রেঞ্চ সাংবাদিক রবের বাঁহা। ‘ক্যাথোলিক সেন্টার ফর ফ্রেঞ্চ ইন্টেলেকচুয়ালস’ প্রকাশিত ম্যাগাজিনে এটা ছাপা হয় ১৯৫১ সালের ১২ই মার্চ।

‘অঁ অ্যাজাঁ বালথাজার’ (১৯৬৬) সিনেমার শুটিংয়ের সময় অভিনেত্রী অ্যান ভিয়াজেমস্কিকে ডিরেকশন দিচ্ছেন ব্রেসোঁ

 

রবের বাহাঁ

আজকের এই আলাপের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য আমরা যখন প্রথম দেখা করেছিলাম, আমার মনে আছে, আপনি সিনেমা বানানোর ক্ষেত্রে আপনার অ্যাপ্রোচ নিয়ে বলতে গিয়ে বলেছিলেন: “আমি এমনভাবে সিনেমা বানাই যেন আমি কোনো কবিতা লিখছি। আমি আসলে একটা নির্দিষ্ট টোনের সন্ধানে থাকি।” তারপর আপনি বললেন যে শ্যুটিংয়ের সময় আপনার মাথায় কেবল সেই টোনই ঘুরতে থাকে। তার মানে ক্যামেরা অপারেটের, টেকনিশিয়ান ও বাকি সহকারীদের জন্য ব্যাপারটা বেশ “বিরক্তিকর” হয়ে যায়। এডিটিংয়ের কাজ শেষ হবার পর পুরা সিনেমাটা না দেখা পর্যন্ত তারা এর ভেতরের কাব্যিক সৌন্দর্যটা আসলে বুঝে উঠতে পারেন না।

রবের ব্রেসোঁ

আমার নামে একটা অপবাদ প্রচলিত আছে, আজকের এই প্ল্যাটফর্মের সুযোগ নিয়ে আমি প্রথমে সেই অপবাদের বিপরীতে নিজের সমর্থনে পাবলিকলি কিছু কথা বলতে চাই। অভিযোগটা হলো, পেশাদার অভিনেতাদের প্রতি আমার নাকি এক ধরনের তাচ্ছিল্য ও অবিশ্বাস কাজ করে। অথচ আমি অভিনেতাদের এই চমৎকার ক্রাফটকে পুরাদমে অ্যাপ্রিশিয়েট করি।

এ ক্রাফট চর্চা করার জন্য তাদেরকে এমন সব প্রতিভার সম্মিলন ঘটাতে হয় যেগুলিকে সহজে খাপ খাওয়ানো যায় না। মাইন্ডের ধারণক্ষমতা যেমন বাড়াতে হয়, তেমনি আত্মসমর্পণেরও দরকার আছে। আন্তরিক হবার সাথে সাথে কৌশলীও হতে হয়; আবার আত্মনিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বেপরোয়া হওয়াও জানতে হয় তাদের। আমি স্বীকার করছি, এ গোটা ব্যাপারটাই আমার কাছে অনেক সময় অভাবনীয় লাগে।

রবের ব্রেসোঁ, সাথে ইতালিয়ান ফিল্মমেকার লুকিনো ভিসকোন্তি (মাঝখানে) ও অ্যামেরিকান ফিল্মমেকার অরসন ওয়েলস (ডানে)

কিন্তু আমি যখন একেবারেই অপরিচিত, অপেশাদার বা নবিশ অভিনেতাদের নিয়ে ছবি বানাই, আমি যখন আমার সিনেমায় নাটকীয় বিষয়বস্তু ও পূর্বনির্ধারিত প্লটওয়ালা কাহিনি এড়িয়ে চলি—আমি যখন একটা ল্যান্ডস্কেপকে এমন একটা ফ্রেমে সংকুচিত করে ফেলি যা কোনো মানুষের চেহারা আসার সাথে সাথেই সরে পড়ে বা গায়েব হয়ে যায়—এর কারণ, আমি অ্যাকশন বা ইভেন্ট না, বরং অনুভূতিকে তুলে ধরার চেষ্টায় আছি।

পেশাদার কোনো অভিনেতা যখন এই অনুভূতির চৌহদ্দিতে থাকেন, তখন তার ওপর আমার ক্যামেরা তাক করলেই কেমন জানি অদ্ভুত এক অস্বস্তি বোধ করেন উনি। উনি বুঝতে পারেন যে, থিয়েটার বা অন্যান্য মুভি করার সময় তার যে অভ্যাসগুলি গড়ে উঠেছে, সেসব অভ্যাস তাকে আটকে দিচ্ছে। তার বাস্তবতার কিছু নির্দিষ্ট ধরন ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটনা—তার মেজাজ ও বিশেষ সব স্বভাব; এর সকল কিছু তাকে আটকে দেয়। বলতে গেলে তার প্রতিভাই আমার কাঙ্ক্ষিত জায়গা থেকে তাকে দূরে রাখছে ও বাধা দিচ্ছে। আর তারপর অদ্ভূতভাবে আমি নিজেও সেসব বাধার মুখোমুখি হয়ে যাই। এগুলি আমাদের দুজনের মাঝে এসে তাকে আমার কাছ থেকে একরকম লুকিয়েই ফেলে, যেন কোনো মুখোশ পরে আছেন উনি।

আমি আসলে বোঝাতে চাচ্ছি যে, আমাদের হাতে থাকা অসামান্য এই ক্যামেরা—যেখান থেকে সিনেমার সৃষ্টি—যা কিনা আমাদের প্রধান হাতিয়ার, সেই ক্যামেরাই আবার একই সাথে আমাদের সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে ভয়ানক দুশমন। কারণ ক্যামেরা সব কিছু রেকর্ড করে ফেলে, নির্বোধ যন্ত্রের মতো উদাস ভঙ্গিতে যা পায় তা-ই ধারণ করে।

যুদ্ধের কয়েক বছর আগে প্যারিস দিয়ে যাওয়ার সময় চার্লি চ্যাপলিন আমাকে এই গল্পটা শুনিয়েছিলেন: “ধরেন দুর্দান্ত এক অভিনেত্রী, ধরেন গ্রেটা গার্বো একদম নিখুঁতভাবে কোনো দৃশ্যে অভিনয় করছেন,” এটা কিন্তু চ্যাপলিনের কথা, আমার না—“মনে করেন শুটিংয়ের সময় অনেক গরম পড়লো। পুরা স্টুডিও জুড়ে মাছি উড়ছে ভন ভন করে। এখন ওই সিনে পারফেকশনের সাথে অভিনয় করার এক ফাঁকে গার্বো চিন্তায় পড়ে গেলেন, আরে, আমার নাকের ওপর এখন যদি একটা মাছি এসে বসে? ক্যামেরা কিন্তু সাথে সাথে তার সেই চিন্তাটা রেকর্ড করে ফেলবে।”

ক্যামেরায় একটা ‘টেক’ নেওয়া আর ‘ধারণ’ করাকে সমার্থক ধরা হয়। এই ‘ধারণ’ করা বলতে আমরা অভিনেতাকে ধারণ করা বুঝি। তবে সেটা কিন্তু তার অভিনেতাসুলভ মেজাজকে ধারণ করা না; বরং একটা জীবিত সত্তা হিসাবে সেই অভিনেতাকে অপ্রস্তুত করে দিয়ে তার বিশেষ কোনো মুখভঙ্গি থকে বের হয়ে আসা গোপন, মহামূল্য ও বিরল এক ঝলককে ধারণ করা। এ ঝলকটাই আমাকে সব ধাঁধার জবাব এনে দিতে পারে।

‘ডায়েরি অফ আ কান্ট্রি প্রিস্ট’ এর কোন একটা প্রদর্শনীতে ব্রেসোঁ

অপেশাদার বা আনাড়ি যে অভিনেতা, তিনি তো আর অতটা আত্মসচেতন না। উনি অনেক বেশি সাদাসিধা আর স্ট্রেইট-ফরোয়ার্ড। তার ধৈর্য্যও বেশি। এই অপেশাদার অভিনেতাই একটা টেক নেওয়ার সময় নিজেকে সম্পূর্ণরূপে উজাড় করে দেন। খেয়াল করলে দেখবেন যে, সিনেমার অভিনেতাদের নিয়ে আমার এই বিশেষ কনসেপ্ট অভিনেতাদের সম্বন্ধে আমাদের প্রথাগত ধারণা থেকে একেবারেই আলাদা। কোনো পেইন্টার বা ভাস্কর তার কাজের জন্য যে মডেল ব্যবহার করেন তার সাথে এই কনসেপ্টের মিল আছে।

তো মি. বাহাঁ, এবার আপনার কথায় ফিরে যাই। এটা সত্যি যে, শুটিং চলাকালীন আমি বেশিরভাগ সময়ই শুনতে পাই, অপারেটর বা ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রীদের পুরা দলটাই চোখের কোণা দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে নিজেরা বলাবলি করছে—”এই সিনেমাটা খুব বিরক্তিকর রে ভাই!” অথবা “এই মুভি ভালোই বিরক্তিকর হবে যা বুঝছি।”

এক্ষেত্রে আমার প্রথম ব্যাখ্যা এরকম যে, সিনেমাটা হয়ত আসলেই বিরক্তিকর বা শেষ পর্যন্ত বিরক্তিকরই হবে। আবার এর আরেকটা ব্যাখ্যা এমনও হতে পারে, এই ইলেক্ট্রিশিয়ান বা অপারেটর যারা সারা বছর জুড়ে অগুনতি সিনেমার শুটিংয়ে কাজ করেন, তারা ব্যাপারটাকে এমনভাবে দেখেন যেন উনারা থিয়েটারে আছেন। এমন সব দৃশ্য দেখে তারা অভ্যস্ত যেখানে অভিনেতাদের নানারকম অঙ্গভঙ্গি, ইশারা, কথা বলার ধরন আর অতিরঞ্জিত অভিব্যক্তিগুলিকে একেবারে চরম মাত্রা পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। কাজেই তাদের দৃষ্টিতে আমার পরিচালনায় সবকিছু কেমন নীরস আর অভিব্যক্তিশূন্য লাগে।

কিন্তু আমার পথ আসলে একদম আলাদা। আমি তো ডায়লগ, ইশারা, মিমিক্রি বা অঙ্গভঙ্গি নকল করার মাধ্যমে অভিব্যক্তি খুঁজি না—বরং নানা রকম ছন্দ ও ইমেজের সমন্বয় এবং সেসব ইমেজের নিজস্ব অবস্থান, সংখ্যা ও একে অপরের সাথে সম্পর্কের মধ্য দিয়ে যে অভিব্যক্তির সৃষ্টি হয় তারই সন্ধানে থাকি আমি।

একটা ইমেজের প্রকৃত মূল্য হলো এর বিনিময় মূল্য। কিন্তু এ বিনিময় তখনই সম্ভব হয় যখন আপনার সিনেমার ইমেজগুলির মধ্যে একটা কমন ব্যাপার থাকে, যাতে করে একটা ঐক্যের অংশ হতে পারে তারা। একারণে আমার মুখ্য উদ্দেশ্য থাকে আমার তৈরি চরিত্রদের মাঝে একটা স্বভাবগত সাযুজ্য নিয়ে আসা। আর এজন্যেই আমার অভিনেতাদেরকে একটা নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে কথা বলতে বলি আমি।

বাক্যের ভেতরে থাকা কোনো শব্দের সাথে চাইলে একটা ইমেজের তুলনা করা যায়। কবিরা তো শব্দভাণ্ডার নির্মাণ করেন; তবে অনেক সময় উনারা ইচ্ছা করেই একদম সাদামাটা শব্দগুলি বেছে নেন তাদের কবিতার জন্য। আর বার বার ব্যবহার হওয়া সবচেয়ে জীর্ণ, সাধারণ শব্দটাও ঠিক জায়গায় বসাতে পারলে ব্রিলিয়ান্সের ছোঁয়া পেয়ে যেতে পারে।