page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

রমণী ও মহিলার বিপর্যয়ের ইতিহাস

প্রথাগত শব্দবিদ্যায় শব্দের দুই অর্থ ধরা হয়—একটা হল ব্যক্তার্থ বা ডিনোটেশন আরেকটা হল ব্যঞ্জনার্থ বা কনোটেশন। আধুনিক ভাষাবিদগণ মনে করেন, ডিনোটেশন একটি আপাত ব্যাপার—আদতে তেমন কিছু নাই। শব্দ নিজে কিছু নির্দেশ করে না—শব্দের ব্যবহারকারী শব্দের মাধ্যমে কোনো কিছুকে নির্দেশ করে—আজ এটা, কাল সেটা। একই শব্দ অতীতে এক অর্থে ব্যবহার হত, বর্তমানে অন্য অর্থে হয়—ভবিষ্যতে আরেক  অর্থে হয়ত ব্যবহার হবে।

এর মধ্যে শব্দ ধ্বনিগতভাবেও একই রকম থাকে না প্রায়শই। এর পরিবর্তন হয়। কিছু ভুল বোঝাবুঝিও তৈরি হয়। যেমন, মহিলা শব্দটির সঙ্গে মহলের যোগ নেই, তবু জনপ্রিয় নিরুক্তি নিয়ে কবি লিখলেন, “…মহলে মহলে থাকো তাই তোমার নাম মহিলা” (‘কর্তৃত্ব গ্রহণ কর নারী’, ফরহাদ মজহার)। আবার, রমণী শব্দের উৎসে যৌনসম্ভোগের বিষয়টি না থাকলেও জনপ্রিয় নিরুক্তিতে তা সে ভাবেই আলোচিত। ফলে কবি লেখেন, “তুমি রমণযোগ্য তাই তোমার নাম রমণী” (পূর্বোক্ত)। কবির ব্যবহৃত নিরুক্তি ও ব্যঞ্জনা নিয়ে কথা বলব না, কেননা পুরো কবিতার বক্তব্যের সঙ্গে তা বেশ মানিয়ে গেছে। তবে, শব্দ দুটির ইতিহাস কিন্তু ভিন্ন কথা বলে; সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি শব্দকে নতুন ইতিহাস দেয়—এখানে সে কথাই বলব। 

ahmed-shamim-logo

একটু খেয়াল করে দেখুন, মহিলা ও মহোদয়গণ শব্দের মূলে আছে সংস্কৃত মহ শব্দটি। মহ-এর অর্থ আপনি পাবেন, মহাতে, মহতে, মহানে, মহন্তে, মহতীতে, মহিমে, মহিমায়, পিতামহ আর পিতামহী প্রভৃতি শব্দাবলীতে। বৃহৎ, মহত, সম্ভ্রম জাগানিয়া অর্থে মহ। মহ-এর মানে পূজা। সম্মানার্থেই মহিলা, মহোদয় বলার চল ছিল। পুরুষের বেলায় সে চল চলতে থাকল। কিন্তু সংস্কৃত মহিলা শব্দটি আটকে গেল আরবি শব্দ মাহাল্লি (محلي)-তে এসে। মাহাল্লি মানে আঞ্চলিক, স্থানীয়, গার্হস্থ্য ইত্যাদি। একই রূপমূল থেকে এসেছে মহল এবং মহল্লা শব্দাবলী। অতঃপর প্রচার হল, মহলে মহলে থাকে বলে নারীর নাম হল মহিলা।

এই প্রচারের পিছনে উচ্চারণের সাদৃশ্য এবং সমাজে নারীর অবস্থা ইত্যাদি ভূমিকা পালন করেছে বৈ কি। তবে রূপতাত্ত্বিক বিচারে ওটা মহিলা শব্দের লোক নিরুক্তি, যা তার ব্যুৎপত্তিকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। এই আচ্ছন্নতায় ব্যবহৃত হতে হতে মহিলা শব্দটি কার্যতই একটি নেতিবাচক ব্যঞ্জনা লাভ করেছে, অন্তত  আমাদের প্রগতিশীল মহলে। তাই আমরা মহিলা না বরং নারী শব্দটি ব্যবহার করছি। না, মহিলার গায়ে আরবি আবিল এসে লেগেছে বলে নয়, আমাদের প্রগতিশীল রাজনীতিতে নারী একটি রাজনৈতিক প্রত্যয় বলে। আর মানুষ অর্থে নৃ থেকে নর আর নারী, সে বাবদে মহিলার পরিবর্তে নারী শব্দটির ব্যবহারের বিবেচনাটি নিয়ে নিরাপদ বোধ করতে পারি।

রমণী শব্দটির ভাগ্যেও জুটেছে তেমন এক বিপর্যয়। জনপ্রিয় একটা ধারণা—রমণী শব্দটির উৎস হল রমণ শব্দটি, যার মানে যৌনসম্ভোগ। বর্তমানে রমণ শব্দটির যৌনসম্ভোগ অর্থটিই বহাল তবিয়তে আছে এবং রমণীকে সেই ব্যঞ্জনা থেকে আর আলাদা করে ভাবা কঠিন। তবু রম্য রচনা, সুরম্য প্রাসাদ, মনোরমা ইত্যাদি শব্দ দেখে মনে হয় রমণীর উৎস জনপ্রিয়তায় যেভাবে দেখা হয়, তা বোধ হয় ঠিক নয়। রমণ কথাটিরও মনে হয় ভিন্ন কোনো অর্থ ছিল।

আসলেই তাই। ওই শব্দগুলোর মূল রূপ হল রম্‌ যার অর্থ সুন্দর, প্রীতিকর ইত্যাদি। সেখান থেকে সুন্দর, প্রীতিকর নারী ও পুরুষকে যথাক্রমে রমণী এবং রমণ বলার চল শুরু হয়েছিল। স্বামী স্ত্রী অর্থেও রমণ রমণী (এবং রমা মানেও স্ত্রী; রমা নামও হয়েছে)-এর ব্যবহার ছিল। কিন্তু কালক্রমে রমণ কথাটির নতুন ব্যঞ্জনা এল যৌনসম্ভোগ—এবং নতুন ভাষায় রমণী তার আগের ব্যঞ্জনা নিয়ে জায়গা পেল; কিন্তু রমণের পুরানো ব্যঞ্জনাটি হারিয়ে গেল;  জায়গা পেল রমণের অর্বাচীন ব্যঞ্জনাটি। আর নতুন ভাষাভাষীরা দুয়ে দুয়ে চার মিলাল—বলল, রমণযোগ্য বলে নারীকে রমণী বলা হয়েছে। পুরুষও যে রমণযোগ্য সে বিবেচনা তখনও সমাজে চাউর হয় নি। আবার সেই সামাজিক বাস্তবতা, সমাজে আধিপত্যশীল দৃষ্টিভঙ্গিই ওইরূপ সংযোগ নির্মাণ ও নির্ধারণ করে দেয়ার পক্ষে ছিল, এবং আছে। এমত ইতিহাস বিকৃতির কালে বলে রাখা ভাল, রমনা পার্ক কিন্তু রমণীয় তথা সুন্দর, প্রীতিকর পরিবেশওয়ালা জায়গা হিসাবেই নামটা পেয়েছিল।

আধুনিক ভাষাবিদ্যার বণ্টিত রূপতত্ত্ব বলে, আসলে আমাদের মনে অখণ্ড শব্দকোষ (লেক্সিকন) বলে কিছু নেই যেখানে শব্দ তৈরি হয় এবং তা অর্থসহ  জমা থাকে। শব্দ তৈরি হয় বাক্যতত্ত্বে। সে বাবদে বলা যায়, বাক্যে ব্যবহৃত পদকে তুলে নিয়েই বরং আমরা অভিধান (ডিকশনারি) বানাই। অর্থাৎ আমরা যেমন জানি বাক্যে ব্যবহৃত শব্দকে পদ বলে—বিষয়টি তেমন নয়, বরং উল্টো। আমাদের বাক্য বা রায়, ডিসকৌর্স বা বয়ান/জবান থেকেই পদার্থ তৈরি হয়, যা আমরা অভিধানে টুকে রাখি শব্দার্থসহ। মানুষের মনে শব্দকোষ কিংবা অভিধান না থাকলেও এনসাইক্লোপিডিয়া আছে বণ্টিত রূপতত্ত্ব মতে।

এনসাইক্লোপিডিয়ায় জমা থাকে ইডিয়ম বা বাগধারা। উদাহরণ যেমন, ছেলেটির বাবা পটল তুলেছে আর ছেলেটির বাবা আলু তুলেছে এই দুই বাক্যের একটিতে সব্জি (আলুকে সব্জি ধরে) তোলার ব্যাপার নেই। কারণ তোলা ক্রিয়াটি মারা যাওয়া বোঝায় যদি এর প্রতিবেশে পটল থাকে কর্ম হিসেবে। এই  ইডিওসিনকৃটিক শর্তটা আমাদের এনসাইক্লোপিডিয়ায় রক্ষিত আছে। আলুর জন্য তা নেই। ফলে অর্থের ওইরূপ তারতম্য।  আমি  বণ্টিত রূপতত্ত্বে এনসাইক্লোপিডিয়া আরও কী ভূমিকা সেদিকে যাব না; শুধু এ বাবদে বলব আমাদের ব্যবহৃত বাক্য বা বক্তব্য থেকে আমাদের শিশুরা শেখে। কাকতালীয়ভাবে কিনা জানি না এনসাইক্লোপিডিয়ায় ব্যুৎপত্তিই একই কথা বলে: ইন-সাইকল-পেড-এইয়া—যার অর্থ চক্রের ভেতর শিশুর শিক্ষা। আমাদের সমাজ হল সেই চক্র বা প্রতিবেশ যেখানে আমরা শিশুকে শিক্ষা দিই নারী কেবল ঘরে থাকবে—তারা হল রমণযোগ্য। ফলে মহিলা আর রমণী শব্দগুলোর ইতিহাস বিকৃত হবে বৈকি।

About Author

আহমেদ শামীম
আহমেদ শামীম

টেক্সাস ইউনিভার্সিটির (অস্টিন) এশিয়ান স্টাডিজ বিভাগে বাংলা পড়াচ্ছেন। পাশাপাশি সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগে পিএইচডির অংশ হিসেবে রাজশাহীর কডা ভাষার ব্যাকরণ বর্ণনার কাজ করছেন। তার আগে, ভাষাতত্ত্ব পড়িয়েছেন নিউইয়র্কের লাগুয়ারডিয়া কমিউনিটি কলেজে, ঢাকায় ব্র্যাক এবং ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ে। ভাষাবিদ্যায় আসার আগে তিনি ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে, এবং পড়িয়েছেন স্ট্যামফোর্ড, ইন্ডিপেন্ডেন্ট এবং নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাংলা ভাষা ও ভাষাতত্ত্ব নিয়ে বেশ কিছু পত্র পত্রিকায় এবং জার্নালে তার লেখা প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৩ সনে প্রকাশিত প্রবন্ধ সংকলন 'বাঙলা কথা' একমাত্র গ্রন্থ ।