page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

রিভাইসড লাঞ্চমেনু

লাঞ্চ বিষয়ক নিচের হিসেবখানা আসলে বছর দুই আগে আমার বানানো। বাজেটকালীন পত্রিকা নিমন্ত্রণের উত্তরে আমি একটা রচনা দিয়েছিলাম। সেখানে রিকশাওয়ালাদের, বিশেষত ঢাকা শহরের রিকশাওয়ালাদের, লাঞ্চ বিষয়ে আমি মনোনিবেশ করেছিলাম। নিচের চার অনুচ্ছেদ প্রায় অবিকলই সেই রচনায় ছিল।

একটা গোল বনরুটি ২ টাকা, একটা কলা ২ টাকা, একটা চা ২ টাকা। মোটামুটি এই ছিল ২০০৪-এ, আমার ঢাকা ছাড়বার সময়কালে (রিকশাওয়ালার লাঞ্চের) হিসেব। এখন চাইলে আপনি বনরুটি ছোট না বড়, গোল নাকি ওভ্যাল; কলা চাঁপা নাকি সাগর, পাকা নাকি আধকাঁচা, হাইব্রিড নাকি দেশি, মুন্সিগঞ্জের নাকি নরসিংদীর; চা দুধওয়ালা নাকি লেবুওয়ালা, গরুর দুধ নাকি প্ল্যাস্টিকের দুধ—এসব প্রশ্ন করতেই পারেন। আর কে না জানে যে বাজেট কিংবা অর্থশাস্ত্রীয় হিসেব-নিকেশ সূক্ষ্ম হওয়াই কাম্য। তবে এই ৬টাকার লাঞ্চের হিসেবটা মোটামুটি একটা মানানসই ব্যাপার ছিল ২০০৪-এর শেষের দিকে।

manosh chy logo

ঘুরতে গিয়ে আমি ২৭ নম্বর ধানমণ্ডির রাস্তা থেকে একটা পাক খেয়ে মোহাম্মদপুর বাজারে এসে যে টাকাটা রিকশাওয়ালাকে দিতাম তাতে সে দুই লাঞ্চের একটা ব্যবস্থা করতে পারত। আগের হিসেবে, ২০০৪-এর। ২০০৭-এ এসে আমি সেই অতিথিশালায় থাকলাম। অনেক দিন। মাঝেমধ্যেই আমার বিনোদনের অবধারিত সফর ছিল ২৭ নম্বর পাক খেয়ে এসে মোহাম্মদপুর বাজার। রিকশাওয়ালা যে টাকা দাবি করে আমি তা দিতেও চেষ্টা করি।

গোল বা ধ্যাবড়া বনরুটি তখন ৪ টাকা, ক’দিনের মধ্যেই ৬ টাকা (এখন ৮ টাকা ও মাপে অন্তত ৩০ভাগ ছোট); কলা ৪ টাকা, ক’দিনের মধ্যেই ৬ টাকা (এখন ক্ষেত্রবিশেষে ৮ টাকা, কাঁচাপ্রায়); চা ৩ টাকা, ক’দিনের মধ্যেই ৪ টাকা (এখন ৬টাকা)। ৩ বছরের ব্যবধানেই রিক্সাওয়ালার লাঞ্চ দুইগুণে গিয়ে ঠেকেছে। আর জরুরি অবস্থার মধ্যেই, ২০০৭ সালে, সেটা ২.৫ গুণ, আর এই ক’বছরে ৪ বা ৪.৫ গুণে গিয়ে ঠেকেছে।

আমার ওই একই রিকশা সফরে আর দুই লাঞ্চের যোগান রিকশাওয়ালাটির হয় না। বাজেটের আকার যদি ৫ বছরে দ্বিগুণ হয়ে থাকে, রিকশাওয়ালার লাঞ্চও ৫ বছরে অর্ধেক হবার পথে। জ্বি, বনরুটি-কলা-চায়ের কথাই হচ্ছে।

যেমনটা বলছিলাম, আগের নাতিদীর্ঘ চারটি অনুচ্ছেদ প্রায় অবিকল ২০১৩ সালের বাজেট-প্রাক্কালীন সময়ের কথিত রচনাটি থেকে তুলে দিয়েছি। ফলে রচনাটির ‘এখন’ হচ্ছে ২০১৩ সালের মাঝামাঝি। এই বিবরণীটির পর, নেহায়েৎ পাঠক জানেন যদিও, কিংবা পাঠকের কৌতূহল মেটাতেই যোগ করছি যে রিকশাওয়ালার এই ঘোরতর গার্হস্থ্য-অর্থনীতি পরিস্থিতির মধ্যে লাঞ্চমেনুতে অবধারিত কিছু বদল আনতে হয়েছে। সবচেয়ে লক্ষণীয় বদলটি হচ্ছে লাঞ্চ থেকে কলার অবলোপ। কলা আর চায়ের তুলনামূলক বিচারে অধিকাংশ রিকশাওয়ালা চা বেছে নিয়েছেন, কলার বদলে। চা আসক্তিও বটে, মূল ডিশের পর ভাল ডিসার্টও বটে; ঠিক মতো মেপেমুপে বনরুটি চুবাতে পারলে কলার ভূমিকার আংশিক বিকল্পও বটে। ফলে বিচিত্র নয় যে, চিন্তাশীল র‌্যাশনাল কনস্যুমার (অর্থশাস্ত্রানুযায়ী) হিসেবে রিকশাওয়ালা বর্গ তাদের ইউটিলিটি ম্যাক্সিমাইজ করা রপ্ত করে ফেলেছেন।

এই পুরা জিনিসটা আমার মাথায় আবার টোকা বা ঠোনা দিল কেন?

(উত্তরা থেকে) আদাবর নিবাস স্থানান্তরের পরে আমি টেকনিক্যাল/দারুসসালাম যাবার একটা সংক্ষিপ্ত পথ আবিষ্কার করে নিয়েছি। পথটি প্রকৃতই প্রচুর সাশ্রয়ী। সমস্যা বলতে একটাই। পথিমধ্যে এক নালা আছে যাতে বাঁশের সাঁকো লাগানো থাকলেও তা ভেঙে পড়েছে। নালাটি বিশেষ মনোরম নয়। অত্র অঞ্চলের সকল আবর্জনা এই নালায় প্রবহমান থাকে। সেই অর্থে এটা বৃহদাকার নর্দমা। চূড়ান্তবিচারে বিষ্ঠাস্রোতপ্রায়। কিন্তু সাঁকো ভাঙা থাকলেও এতে নেমে আমাদের পার হতে হয় না। একটা নৌকার ব্যবস্থা আছে। ওই স্রোতধারার উপর দিয়ে সারাবেলা নৌকাটি আসা যাওয়া করছে। ভাল ও নিরাপদ ব্যবস্থা। এই নালা বা নর্দমায় এমন গভীরতাও নেই যে সম্ভাব্য কোনো নৌকাডুবিতে প্রাণহানি ঘটতে পারে। তবে হয়তো আরোহী যাত্রীকুল ওই নালাস্রোতের পানি ও অদ্রবীভূত বস্তুরাজি গায়ে মাখতে না-চাইতে পারেন। যাহোক, শ্যামলীর তুলকালাম জ্যাম কখনো কখনো নিরানন্দময় লাগলে আমি ত্যারছা ওই পথে রওনা দিতে পারি। তাছাড়া আদাবর থেকে শ্যামলীর রিকশা পাওয়া সকালের অফিস-ঘণ্টায় অসাধ্যপ্রায় এক কাজ। পথসাশ্রয় বাদ দিলেও রিকশায় চাপা আমার এ পথে হয় না। ফলে হয়তো পথচলতি রিকশা লক্ষ্য করি আরও বেশি।

সেদিন, আসলে পরশুদিন, খুব ধীরগতিতে যে রিকশাটা আমার উল্টোদিক থেকে আমার পাশ দিয়ে গেল, একজন পুরুষ সওয়ার বসে, সেই রিকশার চালককে আমি এই সংলাপটা বলতে শুনলাম:
“জ্বি ভাই, কাইল থিকা আমি দুইবেলা খামু, দুইবেলাই খামু।”

স্রেফ এই কথাটুকুই। এর আগে পরে আমি কিছুই শুনি নি। আমার যা স্বভাব তাতে দাঁড়িয়ে ধীরগতির ওই রিকশা থামিয়ে রিকশাওয়ালা ও সওয়ার দুজনকেই সওয়াল-জবাব নিরীহ মুখে করতে পারতাম। কিন্তু আমার তখন আর ইচ্ছে করল না। তবে দীর্ঘদিনের ঢাকার-রাস্তায়-হাঁটা থেকে আমি অনুমান করতে পারি রিকশার গতিতে বিরক্ত সওয়ার রিকশাওয়ালাকে ঠিক আগেই জিজ্ঞেস করেছিলেন: “ওই মিয়া খাও নাই দুপুরে?” বা এ জাতীয় কিছু। এটা বিশেষ অপ্রচলিত কোনো প্রশ্ন নয়। আমি হরহামেশাই কাছাকাছি কিছু বলতে শুনি। তুলনায় রিকশাওয়ালার উত্তরটাই বরং অভিনব। খুব একটা এরকম উত্তর দিতে শোনা যায় না।

খানা বা লাঞ্চ বিষয়ে প্রশ্নে রিকশাওয়ালা বিরক্ত হয়ে থাকতে পারেন। উত্তরটাও সেরকম হয়ে থাকতে পারে। তবে সেটা না হবার সম্ভাবনাও একটুও কম নয়। যেসব রিকশাওয়ালা দুপুর বেলা গ্যারেজের দিকে হুড়াহুড়ি করে রওনা দেন, তাঁরা সবাই ‘শিফট’ শেষ করতে যান। দুপুরে শেষ করা, এবং দুপুরে শুরু করা এই দুই দল রিকশাওয়ালার একাংশ গ্যারেজের আশপাশে একটা এজমালি রান্নার ব্যবস্থা করে থাকেন। কিংবা রান্না করার জন্য সমশ্রেণীর কোনো এক নারীকে তাঁরা রাজি করান। রিকশা জমাদান, রিকশা অধিগ্রহণ আর লাঞ্চ মোটামুটি কাছাকাছি সময়ে আর কাছাকাছি স্থানে এঁরা সারেন।

এই পদ্ধতির রান্না ব্যবস্থাপনার সুবিধা হলো বনরুটি-চায়ের বদলে অপেক্ষাকৃত সনাতনী ও বলদায়ী একটা খাবার ব্যবস্থা প্রায় বনরুটি-চায়ের বাজেটেই সারতে পারেন তারা। তবে লাঞ্চের মেনু কতখানি বলদান করে থাকে তা নিয়ে বৈজ্ঞানিক নিরীক্ষণের সুযোগ আছে। এখানে ‘বলদায়ী’ বলা হলো খোদ লাঞ্চখাদক রিকশাওয়ালারা তাকে বলদায়ী ভেবে থাকেন বলে বা তাঁদের ‘পারসেপশন’ অনুযায়ী। বোধহয় এটুকু এতক্ষণ সবাই আপনারা বুঝতে পারছেন যে এই বর্গের রিকশাওয়ালারা গ্যারেজেই রাতে ঘুমান, বা জায়গা না জুটলে ন্যূনতম ভাড়ায় কোনো একটা নিকটতম বাসার এক ঘরে জনা আষ্টেক থাকেন, পাটি পেতে। ফলে খুবই সম্ভাবনা আছে যে এই রিকশাওয়ালা সদ্য ঢাকাবাসী। আর তাঁর দুপুর আর রাত্রে যথাক্রমে লাঞ্চ ও ডিনার সেই গ্যারেজ বা গ্যারেজসংলগ্ন জায়গায় খাবার ব্যবস্থা পাকা হয়েছে সদ্যই । পরদিন থেকেই।

আদাবর, জা.বি, ১৮, ১৯ আগস্ট ২০১৫

About Author

মানস চৌধুরী
মানস চৌধুরী

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টারি করে নির্বাহ করি। গল্প, কলাম ইত্যাদি লিখি। সুযোগ পেলে পর্দায় অভিনয়ও করি।