page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

রুম্পা আর আমি আর একটা দিন!

ছোটবেলায় স্কুলে যাবার দিন পর্যন্ত জানতাম না আমার বাড়ি, বাড়ির পাশের রাস্তা আর রাস্তার দুপাশে যে কয়টা বাড়ি আছে সেসব ছাড়াও পৃথিবীতে আর কিছু আছে। সবাই কত ঘটা করে প্রথম স্কুলে যাবার গল্প বলে, লেখে; আশ্চর্যজনক ভাবে আমার সেসব কিছু মনে নেই।

আমি প্রথম স্কুলে যাচ্ছি সেটা আমার কাছে মোটেই কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল না। বরং বাবা প্রতিদিন ন’টায় শার্ট-প্যান্ট গায়ে চড়িয়ে যেখানে যায়, দুপুরবেলা যেখান থেকে টিফিন পিরিয়ডে বাড়িতে খেতে আসে, পাঁচটায় যেখান থেকে বাড়ি ফিরে সেই জায়গাটা দেখার কৌতূহলটা বেশি ছিল।

bithy-1-a

কোপরা, রাজশাহী। ছবি. নাহিদ হোসেন

স্কুলে গিয়েছিলাম বেড়াতে যাবার মত । আর দশজনের মত কাঁধে নতুন ব্যাগ ছিল না, তাতে বইখাতা ছিল না, গায়ে স্কুল ড্রেস ছিল না। বাবার হাত ধরে স্কুলে যাবার সময় আমি অবাক হয়ে দেখছিলাম এত বাড়িঘর, এত রাস্তাঘাট; অথচ এতদিন আমি তার কিছুই জানতাম না!

bithi-haque-logo

ক্লাস ওয়ানের ক্লাসরুমে গিয়ে আরেকপ্রস্থ অবাক হলাম, সেখানে আমার বয়সী এত ছেলেমেয়ে যাদের আমি কখনো দেখিই নি! এরা কোথায় ছিল এতদিন? বাবা আমাকে একটা ফর্সা মত মেয়ের পাশে বসিয়ে রেখে অফিসরুমে চলে গেলেন। আমি ক্লাসরুমের চারপাশের দেয়ালে আঁকা ছবি দেখতে লাগলাম। এতদিন মা আমাকে বাড়িতে যা কিছু পড়িয়েছেন তার প্রায় সব কিছুই সেখানে আছে। কত রঙ দিয়ে বাড়িঘর আঁকা, জবা ফুলের পাতা আঁকা, স্কুলে যাওয়া বাচ্চাদের ছবি আঁকা। অনেকক্ষণ ঘাড় ঘুরিয়ে সেসব দেখে কিছুক্ষণ আগে তৈরি হওয়া সহপাঠীদের দিকে তাকিয়ে দেখলাম তাদের বেশিরভাগই আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তারা চাপাস্বরে বাবার নাম আর আমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে কী যেন বলছে। পাশে বসে থাকা মেয়েটি তর্জ্জনী দিয়ে গুঁতা মেরে জানতে চাইল, তুমি আজকে প্রথম স্কুলে এসেছ?

আমি একবার তার দিকে, আরেকবার দরজার দিকে তাকিয়ে ভয়ে ভয়ে উত্তর দিলাম ‘হ্যাঁ’। বলে রাখা ভাল, ছোটবেলায় অপরিচিত মানুষ দেখলেই আমার মনে হত, তারা আমাকে মারবে । সে ভয় থেকে আমি এক দৌড়ে ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে পাশের রুমে বাবাকে দেখেই জাপটে ধরে কান্না শুরু করলাম। বাবা আমাকে অনেক কষ্টে বোঝাতে সক্ষম হলেন, সেখানে সবাই আমার মত ভাল। কেউ আমাকে কিচ্ছু বলবে না, মারবে না।

তারপর আমার পাশে বসে থাকা মেয়েটি, যার নাম রুম্পা, আমরা পুরোটা সময় কুটুর কুটুর করে গল্প করেছি, বাদাম খেয়েছি, খাতায় ঘরবাড়ি এঁকেছি। তার বাড়িতে অনেক পুতুল আছে সে গল্প শুনে আমি তো তার পুতুল দেখার লোভে লোভাতুর।

bithy-f

বাবার সঙ্গে আমি। – লেখক

তারপর স্কুলছুটির ঘণ্টা পড়তেই কাউকে কিছু না বলে তার সাথে তার বাড়িতে চলে গেলাম। তার মা, ঠিক আমার মা’র মত করেই আমাকে আদর করল, আমার ক্ষুধা লেগেছে কিনা জানতে চাইল। তারপর আঁখের গুড় আর খই-এর বাটি দিয়ে আমাকে আর রুম্পাকে টিভির সামনে বসিয়ে দিল।

সাদাকালো টিভির সামনে বসে আমি আর রুম্পা একে অপরের গায়ে খই ছুড়ে, বালিশ ছুড়ে, পুতুলের চুল বেঁধে, পুতুলের ঘর সাজিয়ে একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম। দুপুরে রুম্পার মা আমাদের দু’জনকে খাইয়ে পাশে নিয়ে গল্প শোনালেন। রুম্পা অপরিচিত অনেক মানুষের ছবিওয়ালা একটা বড় অ্যালবাম বের করে সেখান থেকে ছবি দেখাল।

ওদিকে তখন আমার খোঁজে ঢি ঢি পড়ে গেছে। মা তো কেঁদে কেটে বাবাকে দোষ দিয়ে, কপালের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করে, স্কুলে যাওয়ার নিকুচি করেছি বলে গ্রামের প্রত্যেকটা বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিরুনি তল্লাশি চালালেন। আমাকে খুঁজে পেলে কালো মুরগি সদকা দেবেন, ফকির খাওয়াবেন মানত করলেন। বাড়িতে রান্নাবান্না বন্ধ করে আমার এক বছর বয়সী ছোট ভাইকে নিয়ে পাশের গ্রামের নানু বাড়িতে গিয়ে উঠলেন। মা’র এক চাচাতো বোন বাবার স্কুলে পড়তেন, সেখানেই মা শুনলেন আমি একটা মেয়ের সঙ্গে হাত ধরে গল্প করতে করতে তার সঙ্গে হেঁটে যাচ্ছিলাম।

জীবনে প্রথমবার এমন আনন্দে একটা দিন কাটাচ্ছিলাম। আমি কাউকে কিছু না জানিয়ে একদিনের কয়েক ঘণ্টার পরিচয়ে সম্পূর্ণ নতুন একটা বাড়িতে এসে অবলীলায় মিশে গেছি সেটা আমার বাড়ির লোকের কল্পনাতীত ।

বিকেলবেলা হঠাৎ করে কোথা থেকে মা আর খালামনি এসে হাজির। মা তো চোখমুখ লাল করে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে প্রায় কাঁদো কাঁদো স্বরে একটা ধমক দিলেন। যে আমি কখনো বাড়ির মেইন গেট পেরিয়ে রাস্তায় নামি নি সে আমি কাউকে কিছু না জানিয়ে কোথাও যেতে পারি না।সুতরাং ছেলেধরা আমাকে নিয়ে গেছে এমন চিন্তা করে বাড়ির লোকজন এবং নিজেকে দোষ দিতে থাকা বাবা পর্যন্ত সব বাদ দিয়ে হন্যে হয়ে পুরো এলাকা আমাকে খুঁজেছেন।

bithy-1-c

বাঙ্গাবাড়ী থেকে শিবরামপুর সড়ক। ছবি. নাহিদ হোসেন

রুম্পার সঙ্গে সেদিনই আমার প্রথম এবং শেষ দেখা। পরদিন থেকে রুম্পা আর ওই স্কুলে কখনো আসে নি। আমি পাঁচ বছর সেই স্কুলে পড়েছি কিন্তু রুম্পার হদিস জানতে পারি নি। রূপকথার মত রুম্পা এসেছিল, সেখানে বিস্তৃতি ছিল না । আমি বড় হয়েছি, চেহারা বদলেছে, সময় বদলেছে কিন্তু রুম্পা এখনো ক্লাস ওয়ানে পড়া ছোট্টটিই রয়ে গেছে, যেমন হয়ত আমিও রয়ে গেছি তার কাছে!

About Author

বিথী হক
বিথী হক

ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার এবং স্ক্রিপ্ট রাইটার । আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ (এআইইউবি) এর প্রিন্ট এন্ড ইলেক্ট্রনিক জার্নালিজম বিভাগ থেকে অনার্স শেষ করে এখনো কোথাও থিতু হইনি । অনলাইন পোর্টাল এটিএন টাইমস এবং ইনডিপেনডেন্ট টিভিতে কাজ করেছি । বেড়ে ওঠা রাজশাহী শহর এবং মফস্বল এলাকা মিলিয়ে ।