page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

রূপপুর বিদ্যুৎ প্রকল্পের পারমাণবিক ঝুঁকি পর্যালোচনা

“প্রথমে মানুষ পরমাণুকে টুকরা করেছে, এখন মানুষকে টুকরা করে পরমাণু।”

বাংলাদেশে দুটা বিশাল বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হওয়ার পথে। একটা বাগেরহাটে সুন্দরবন সংলগ্ন রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং অন্যটা ঈশ্বরদীতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প। রামপাল প্রকল্পটার বিরুদ্ধে বিরাট গণআন্দোলন গড়ে উঠেছে। জাতীয় সম্পদ রক্ষা জাতীয় কমিটি, সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী রাস্তায় নেমেছে।

দেশের নানা পথের বুদ্ধিজীবীরা এই প্রকল্পের ভয়াবহতা সম্পর্কে একমত হয়েছেন। এমন কোনো বিশেষজ্ঞ নেই যে এই প্রকল্পের ক্ষতির ব্যাপকতা নিয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও এই প্রকল্পের ক্ষতির কথা স্বীকার করেছেন। এটা হতেই পারে না যে দেশের প্রধানমন্ত্রী, যিনি পরিবেশ রক্ষায় তার অবদানের জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছেন, তিনি সুন্দরবনের ওপর রামপালের কয়লা বিদ্যুতের ক্ষতির প্রভাব সম্পর্কে অবগত নন। অবশ্যই তিনি অবগত।

ahmed-shamim-logo

দেশের শিল্প খাতের উন্নয়ন এবং ভারতের সঙ্গে দ্বি-দেশীয় সম্পর্ক উন্নয়ন এসব রক্ষা করতে গিয়ে দেশের সরকার যে সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে ফেলেছে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরকার প্রধানের একটা ভূমিকা থাকলেও, ব্যক্তি হিসাবে শেখ হাসিনা নিশ্চয় চাইবেন না সুন্দরবনের ক্ষতি হোক। হয়ত শাহবাগের মত গণআন্দোলন হলে, সেটার ওপর ভর করে একদিন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের সঙ্গে চুক্তিটি বাতিল করার জন্য মোদী সরকারের সঙ্গে আলোচনাও শুরু করবেন।

ওই আশা ব্যক্ত করার পাশাপাশি আর একটা পরামর্শও রাখতে চাই। রামপালের পর সরকার যেন রাশিয়ার সঙ্গে করা রূপপুর চুক্তিটাও বাতিলের কথা ভাবেন।

অবশ্য সেখানেও তার জনসমর্থনের প্রয়োজন পড়বে। নিচু স্বরে হলেও মাঠে রূপপুর প্রকল্পটির বিরুদ্ধে কিছু সংগঠন রাস্তায় নেমেছে। ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই রামপাল প্রকল্প বিরোধী জনস্রোতও রূপপুরের প্রকল্পের বিরুদ্ধে নামবে। তারই অংশ হিসাবে, এই লেখায়, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি কী কী কারণে স্থাপন করা উচিত নয় তা তুলে ধরছি। সরকার ও জনগণ সবাই মিলে বিষয়গুলো নিয়ে খোঁজখবর নিবেন আশা করি।

চেরোনোবিল দুর্ঘটনার পর ফেলে যাওয়া পরিত্যক্ত বাড়ি, ৩০ বছর পরে।

চেরোনোবিল দুর্ঘটনার পর ফেলে যাওয়া পরিত্যক্ত বাড়ি, ৩০ বছর পরে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প প্রসঙ্গে জার্মান ডাক্তার গেরহার্ড উলেনব্রুকের উপরোক্ত প্রবচনটা মনে পড়ে গেল। “প্রথমে মানুষ পরমাণুকে টুকরা করেছে, এখন মানুষকে টুকরা করে পরমাণু।”

কেন মনে পড়ল কথাটা? মনে পড়ল এ কারণে যে, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে, পারমাণবিক রিয়াক্টরে পরমাণুর নিউক্লিয়াস টুকরা করা হয় তাপশক্তি উৎপাদনের জন্য। সেখান থেকেই নিউক্লিয়ার পাওয়ার কথাটার উৎপত্তি। সেই তাপ দিয়ে পানি গরম করা হয়, সেই গরম পানি থেকে বাষ্প তৈরি করা হয়। সেই বাষ্প দিয়ে টারবাইন ঘোরানো হয়। টারবাইন ঘুরলে ইলেকট্রনের প্রবাহ তৈরি হয় যাকে আমরা ইলেক্ট্রিসিটি বা বিদ্যুৎ বলি। কিন্তু এই পরমাণু ভাঙার প্রক্রিয়ায় তেজষ্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। সেখানেই যত বিপদ।

যেই পারমাণবিক চুল্লিতে পরমাণু টুকরার কাজ করা হয়, সেখানে দুর্ঘটনা ঘটলে আশেপাশের মানুষ মুহূর্তেই টুকরা টুকরা হয়ে যায়, পুড়ে যায়। প্ল্যান্টের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মানুষগুলোর পরবর্তী প্রজন্মগুলো বিবিধ ত্রুটি নিয়ে জন্মায়।

pripyata

প্রিপিয়েত শহরের একটি স্কুল, পরিত্যক্ত অবস্থায়।

এমন উদাহরণ সোভিয়েত রাশিয়াতেই আছে। ১৯৮৬ সালে ঘটা চেরনোবিল পারমাণবিক পাওয়ার প্ল্যাট বিস্ফোরণে মুহূর্তেই মারা যাওয়া মানুষের সংখ্যা বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে ৩১ থেকে ৫৬ জন। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হিসাবে হাজার হাজার মানুষ এই বিস্ফোরণের তেজষ্ক্রিয়তার কারণে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। ওই অঞ্চলে পালিত গরুর দুধ খেয়ে অনেক শিশু থাইরয়েড ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। এই তেজষ্ক্রিয়তার প্রভাব ইউরোপ পর্যন্ত ছড়িয়েছে।

এর আগে ১৯৫৭ সঙ্গে সেই সোভিয়েত রাশিয়াতেই একটা নিউক্লিয়ার ফুয়েল প্রসেসিং প্ল্যান্টে দুর্ঘটনা ঘটে। সোভিয়েত রাশিয়ার নীরব নীতির কারণে এই দুর্ঘটনার হতাহতের সংখ্যা সঠিক জানা যায় না। তবে ১৯৯২ সনে সোভিয়েত-উত্তর রাশিয়ান সরকারের গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৫৭ থেকে ১৯৯২ পর্যন্ত ওই দুর্ঘটনার জনিত কারণে মোট মৃতের সংখ্যা ৮০১৫-তে দাঁড়িয়েছিল।

মনে রাখতে হবে চেরনোবিলের দুর্ঘটনাও ঘটেছিল সোভিয়েত রাশিয়ায়, ক্ষতির প্রকৃত সংখ্যা তাই এখনও অজানা। এসব জেনে জাপান কিন্তু খুব আধুনিক প্রযুক্তির পারমাণবিক পাওয়ার প্ল্যান্ট বানিয়েছিল। কিন্তু ভূমিকম্প আর সুনামিতে তাদের ফুকুশিমা দাইইচি নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট দুর্ঘটনার শিকার হয় ২০১১ সালে। এসব বিচারে বিশেজ্ঞরা একমত যে, নিরাপদ নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট বলে কিছু নাই।

নিউক্লিয়ার ইনফরমেশন এবং রিসোর্স সার্ভিস কতগুলো তথ্য আমাদের জানাচ্ছেন, যা প্রস্তাবিত রূপপুরের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র সম্পর্কে আমাদের চিন্তাভাবনাকে পুনর্বিবেচনা করতে সাহায্য করবে। তাদের তথ্যগুলো সংক্ষেপে এমন: যে কোনো পারমাণবিক রিয়াক্টর এবং পারমাণবিক বর্জ্যের ভাগাড়ে যদি দুষ্কৃতিকারীরা বোমা জাতীয় কিছু চার্জ করে তাহলে তা কার্যত পারমাণবিক বোমার ধ্বংসই ঘটাবে।

chernobyl-2

চেরনোবিল দুর্ঘটনার পরে পরিত্যক্ত প্রিপিয়েত শহরে ফাঁকা অ্যাপার্টমেন্টের টপ ফ্লোরে টাইলস ফুঁড়ে বেড়ে উঠছে গাছ।

তাছাড়া পারমাণবিক বর্জ্য এমনিতেই তেজষ্ক্রিয়তা ছড়ায় যা ক্যান্সারসহ নানারকম রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটায়। আবার, জেনেটিক মিউটেশন ঘটানোয় ভূমিকা রাখে, ফলে আক্রান্ত অঞ্চলে নানা রকম শারীরিক ত্রুটি নিয়ে মানবশিশু জন্মাতে পারে।

পারমাণবিক বর্জ্যের তেজষ্ক্রিয়তা নিষ্ক্রিয় করার পদ্ধতি এখন মানুষের অজানা। যত ভাবেই তা ঢেকে রাখা হোক, তেজষ্ক্রিয়তা ছড়ানোর সম্ভাবনা থেকেই যায়।

পরিবেশে তেজষ্ক্রিয় উপাদান ছড়িয়ে পড়লে খাদ্য শৃঙ্খলে তা ছড়িয়ে পড়ে, এবং মানুষসহ না প্রাণীর উপর প্রাণঘাতী প্রভাব পড়ে। একে তো পারমাণবিক বর্জ্য থেকে তেজষ্ক্রিয়তা পরিবেশে ছড়াতে থাকে, অন্যদিকে একে সরিয়ে অন্য কোথাও নেয়ার রিস্ক আরও বেশি।

দেখা গেছে, পারমাণবিক বর্জ্য নিয়ে ফেলা হয় আদিবাসীদের অঞ্চলে, তাদের প্রতিবাদকে রাষ্ট্র সহজেই দমিয়ে দিতে পারে তাই।

পারমাণবিক কেন্দ্রের প্রকৃত খরচ নিয়ে সব সময় একটা লুকোছাপা আছে, কেননা এটা সবচে খরুচে বিদ্যুৎ প্রকল্প। এর ব্যয়ভার বাড়তেই থাকে। আরেকটা বিষয় নিয়ে তালবাহানা হয়, সেটা হল, দুর্ঘটনা ছাড়াও নিউক্লিয়ার রিয়াক্টর পরিবেশে তেজস্ক্রিয়তা ছড়ায়। এই কারণে দেখা যায় প্রায়ই তেজষ্ক্রিয়তার মাত্রা বিষয়ক আইনগুলো বদলে দুর্বল করা হয়, যাতে কর্পোরেটগুলোর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া না যায়।

chernobyl-4

চেরনোবিলের আশেপাশের লোকজন উচ্চ মাত্রার তেজষ্ক্রিয় খাবার খাচ্ছে, পানি পান করছে।

দেখা গেছে নদীর উপকূলে যেসব পারমাণবিক রিয়াক্টর বসানো হয়, সেখান থেকে আসা তেজষ্ক্রিয়তা নদীর বিশেষ কিছু প্রাণীকে ব্যাপকভাবে আক্রান্ত করে। আবার, রিয়াক্টর ঠাণ্ডা করতে বিপুল পরিমাণ পানি লাগে; সেই পানির জোগান না থাকলে চুল্লি চলে না, বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় না, কিন্তু তাতে পুরো প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ভার বন্ধ হয় না।

সবশেষে যে ক্ষতিটির কথা বলা হয়, তা শারীরিক না হলেও কোনো অংশে কম না। এ ধরনের প্রকল্পের জন্য যে স্তরের জাতীয় নিরাপত্তা জরুরি হয়ে পড়ে তাতে জনগণ বাধ্য হয় তাদের গণতন্ত্র বিসর্জন দিয়ে নানারকম নিরাপত্তার আইনের নাগপাশে শৃঙ্খলিত হতে। রাষ্ট্র পর্যবসিত হয় একটি কর্পোরেশনে। জনগণের হাতে আর কোনো ক্ষমতাই থাকে না।

About Author

আহমেদ শামীম
আহমেদ শামীম

টেক্সাস ইউনিভার্সিটির (অস্টিন) এশিয়ান স্টাডিজ বিভাগে বাংলা পড়াচ্ছেন। পাশাপাশি সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগে পিএইচডির অংশ হিসেবে রাজশাহীর কডা ভাষার ব্যাকরণ বর্ণনার কাজ করছেন। তার আগে, ভাষাতত্ত্ব পড়িয়েছেন নিউইয়র্কের লাগুয়ারডিয়া কমিউনিটি কলেজে, ঢাকায় ব্র্যাক এবং ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ে। ভাষাবিদ্যায় আসার আগে তিনি ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে, এবং পড়িয়েছেন স্ট্যামফোর্ড, ইন্ডিপেন্ডেন্ট এবং নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাংলা ভাষা ও ভাষাতত্ত্ব নিয়ে বেশ কিছু পত্র পত্রিকায় এবং জার্নালে তার লেখা প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৩ সনে প্রকাশিত প্রবন্ধ সংকলন 'বাঙলা কথা' একমাত্র গ্রন্থ ।