page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

লকড ডোর ডেথ (১)

১.

৬ অগাস্ট, ২০১৪

বুধবার, দুপুর দুইটা।

ডি-এইচ-এল পার্সেল সার্ভিসের হলুদ লাল পিকআপ ভ্যান এসে থামলো কেনসিংটন গার্ডেনের ৫২ নাম্বার বাসার সামনে। ২২ বছরের বিল গেইন্সফোর্ড গাড়ি থেকে নামতে নামতে হাত দিয়ে ঘষে গ্রে রঙের ট্রাউজারের ভাঁজ ঠিক করে গাড়ির পেছনের দরজা খুলে ছোটমত একটা চারকোনা বাক্স আর একটা ক্লিপবোর্ডে আটকানো পেমেন্ট স্লিপ বের করে নিয়ে আসল। আজকে আর তাকে স্লিপে লেখা ঠিকানার সাথে বাড়ির ইটের দেয়ালে কালো বোর্ডে লটকানো ঠিকানা মেলাতে হলো না।

গত দু’দিন যাবৎ একই বাড়িতে আসছে সে। বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে গতকাল প্রায় আধাঘণ্টা কলিং বেল বাজিয়েছে। কেউ গেট খোলে নাই। জিনিসটা বেশ আশ্চর্য লাগলো বিলের কাছে। সে বেশ কয়েক বছর ধরে এই এলাকায় পার্সেল ডেলিভারি দেয়।

এটা উচ্চবিত্তদের এলাকা। এসব এলাকায় বাড়িতে মালিকরা না থাকলেও গেটে একজন বা দু’জন সিকিউরিটির লোক, বাসায় বাটলার, মেইড এবং বাগানের মালি থাকে। গত দু’দিনে এ বাড়িতে একটা মানুষও দেখে নাই সে।

‘দারোয়ান মালি সবাইকে নিয়ে হলিডে’তে গেছে নাকি সবাই’ ভেবে নিজের মনেই হেসে ফেলল সে।

উঁকি দিয়ে বিশাল মেইন গেটের পাশে গার্ড বসার ছোট খুপড়ি ঘরের দিকে তাকাল। গেটের বাইরে কলিং বেলের সুইচের ওপর ছোট একটা টিভি স্ক্রিন। তার পাশে কালো রঙের মোশন ডিটেক্টার ক্যামেরা বসানো, সঙ্গে স্পিকার এবং মাইক্রোফোন। বিল গেট ধরে ঝাঁকি দিল দু’বার, ‘কেউ আছে বাড়িতে? আমি পার্সেল নিয়ে এসেছি! কেউ আছে বাসায়?’

lock-2

উঁকি দিয়ে বিশাল মেইন গেটের পাশে গার্ড বসার ছোট খুপড়ি ঘরের দিকে তাকাল। অলঙ্করণ. নাদিয়া ইসলাম

গেটের ওই পাশে নুড়ি বিছানো ড্রাইভওয়ে। তাতে একটা ঝকঝকে ক্লাস-সি কালো রঙ্গের মার্সেডিজ বেন্জ দাঁড়িয়ে। আর তার ঠিক পেছনেই একটা ২০১৩ মডেলের সাদা বেন্টলে ফ্লাইয়িং স্পার আর ২০০৯ মডেলের ঘষঘষে স্লেট রঙ্গের বুগাটি ভেইরন, গ্রান্ড স্পোর্টস।

বিল নিজের অজান্তেই মৃদুস্বরে শিস বাজিয়ে উঠল। বুগাটির একটা চাকার জন্য সে নিজের একটা হাত বা পা কেটে দিতে রাজি। গাড়ির পেছনেই সাদা পাথরে তৈরি বিশাল বাড়িটার একাংশ দেখা যায়। টালির ছাদের একপাশ থেকে নেমে এসেছে পয়জন আইভি লতা, তার সামনে নগ্ন একটা নারীমূর্তি, পানি-টানি কিছু একটা ঢালছে কোমড়ের কলসি জাতীয় পাত্র থেকে। তার পায়ের কাছে তিন-চারজন পিঠে পাখা লাগানো মোটাসোটা পাথরের বাচ্চা। তারাও বসে আছে পানির ভেতর। তাদের মাঝখানে একটা ঝর্না দিয়ে পানি ছুটে যাচ্ছে উপরে। আবার নেমে আসছে নিচে।

বিল ট্রাউজার্সের পকেট থেকে ফোন বের করে সময় দেখল। আড়াইটা। আরো পাঁচটা বাসায় পার্সেল ডেলিভারি দিতে হবে তাকে। সেটের সাথে হেডফোন জুড়ে সে ফোন দিল কেনসিংটন লোকাল ডেপোতে। ধরল ম্যানেজার কেরেন হিগিংস।

—কেরি, ৫২ নাম্বারে তো কোনো রেসপন্স নাই!

—শোনো, ফালতু কথা বলার সময় নেই। ৫২ নাম্বার কোন্‌টা?

—কেনসিংটন গার্ডেন, ৮৬ নাম্বার রাস্তা। লেকের পাড়ের বাড়ি।

—তুমি সিকিউরিটির কাছে পিক-আপ নোটিস দিয়ে আসো। কাজ কি নতুন শিখছো নাকি?

—বলছি কী তোমাকে? দারোয়ান মালি কেউ নাই বাসায়!

—তুমি দরজার নিচ দিয়ে পিক-আপ নোটিস ফেলে ‌আসো!

—মেইন গেটই আটকানো কেরি! কী করবো? গেট টপকে ঢুকবো?

—যন্ত্রণা! বিদেশ-ফিদেশ গেছে মনে হয়। ওকে, শোনো, তুমি বাকিগুলি তাড়াতাড়ি ডেলিভারি দিয়ে পাঁচটার আগে অফিস ফেরত আসো। আজকে সর্টিং-এর ছেলেটা আসে নাই। হারামজাদাকে কালকে লাত্থি দিয়ে চাকরি থেকে বের করছি আমি! মশকরা প্রতিদিন! তোমাকে বস্তা বাঁধায় হাত দিতে হবে আজকে। আচ্ছা আমি ওই ৫২’র সেন্ডারকে ফোন দিচ্ছি—বাক্সে দেখো তো, ফোন নাম্বার আছে কিনা?

বিল হাতের বাক্স উল্টে দেখল, “হুঁ, আছে, লিডস থেকে জাস্টিন রিচার্ডসন বলে একজন পাঠিয়েছে। নাম্বার লেখো, ০৭৮৭৮******। লিখেছো?”

—হ্যাঁ, লিখছি। আচ্ছা, এক কাজ করো। তুমিই ফোন দাও। আমার ফোনে বেশি টাকা নাই। আসার পথে আমাকে ২০ টাকার একটা টপ-আপ করে দিও তো। পরে ওইটা আলাদা হিসাব করে নেবো।

—ওকে, রাখছি। টপ আপ করে টেক্সট করে জানাবো।

বিল গাড়িতে উঠে বসল। অগাস্ট মাসের দুপুর। বাতাস নাই, টেম্পারেচার ২২ ডিগ্রির উপরে। কেমন একটা চাপা বোঁটকা গন্ধ পুরা এলাকায়। গাড়িতে ঢুকে দরজা জানলা বন্ধ করে এক্সহস্ট ফ্যান ছাড়ল সে। সারা রাস্তায় একটা মানুষও হেঁটে যাচ্ছে না। এত বড়লোক একটা এলাকায় ময়লার এমন বাজে গন্ধ মানুষজন কীভাবে সহ্য করে ভাবলো সে ফোনের নাম্বার টিপতে টিপতে।

একবার বাজতেই ফোন ধরল মোটা গলার এক ভদ্রলোক।

—হ্যালো? কে বলছেন?

—স্যার, আমি ডি-এইচ-এল পার্সেল সার্ভিস থেকে বিল গেইন্সফোর্ড বলছি।

—হ্যাঁ, বলুন?

—স্যার, আপনি আমাদের স্পেশাল ডেলিভারি সার্ভিস দিয়ে গত রবিবার একটা আর্জেন্ট পার্সেল পাঠিয়েছিলেন কেনসিংটনের ৮৬ নাম্বার রোডের ৫২ নাম্বার বাসায়।

—হ্যাঁ, সেটা তো সোমবার পৌঁছানোর কথা ছিলো।

—জ্বি স্যার। সোমবার আমিই ডেলিভারি দিতে নিয়ে আসি। উনারা স্যার কেউ বাসায় নাই। কালকেও এসেছি, আজকেও আসলাম। কেউ নাই। দারোয়ানও নাই।

—সে রকম তো মোটেই হওয়ার কথা না, আশ্চর্য!  আমার সাথে সোমবার দুপুরেও কথা হয়েছে! ও তো বাসাতেই ছিল, আশ্চর্য! জরুরি পার্সেল, ও বার বার বলে দিয়েছে যাতে সোমবারই হাতে পায়!

—স্যার, আমি নিজে সোমবার দুপুর দু’টায় এসেছিলাম। কেউ নাই বাসায়। আমি কি আপনার অ্যাড্রেসে রিটার্ন করে দিব পার্সেল? আপনার তাতে কোনো খরচ নেই। আমাদের কোম্পানির রিটার্ন ডেলিভারি ফ্রি।

—শোনেন, কী নাম বললেল আপনার?

—জ্বি স্যার, আমার নাম বিল। বিল গেইন্সফোর্ড।

—বিল, আমি আপনাকে একটু পরে ফোন দিচ্ছি। আপনি বাসার সামনে?

—জ্বি।

—ওখানেই দাঁড়ান, প্লিজ। হয়তো ওরা হয়তো বেলের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে না। নষ্ট হয়ে আছে হয়তো। জিনিসটা ওর কাছে সোমবার পৌঁছানো খুব দরকার ছিল। আমি আপনাকে দুই মিনিট পরে ফোন করছি। বাসার বাকি লোকজন গেল কোথায়, আশ্চর্য!

—শিওর স্যার, আমি দাঁড়াচ্ছি।

বিল ফোন রেখে মাথা কাত করে বিশাল বাড়িটার দিকে তাকাল। হঠাৎ মনে হলো দোতলার জানলা দিয়ে কেউ তার দিকে তাকিয়ে আছে। গাড়ির জানলা খুলে মাথা বের করল বিল। নাহ, কাউকে দেখা যাচ্ছে না। জানালাগুলি আটকানো, ভারি পর্দা টানা।

মনে পড়লো, কিছুই খাওয়া হয় নি সারাদিন। কেরিকে টপ আপ করে দিয়ে ম্যাকডোনাল্ডসে যাবে, ভাবল। বিগ ম্যাক, লার্জ ফ্রাইস আর লার্জ কোক। বরফ ছাড়া। বরফ মেশানো কোক অসহ্য লাগে তার।

 

২.

৭ অগাস্ট, ২০১৪

বৃহস্পতিবার, সকাল সাড়ে দশটা।

জাস্টিন রিচার্ডসন পেশায় একজন ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার। সে আর তার সতেরো বছরের বিবাহিত স্ত্রী লুইস পামার রিচার্ডসন তিনমাস আগে সেপারেশানে গেছে। জাস্টিন চাচ্ছে যত দ্রুত সম্ভব ডিভোর্স ফাইনাল করতে। এই ঝামেলার মধ্যে সে আর একটা দিনও থাকতে চায় না। কিন্তু বাড়ি এবং সম্পত্তি নিয়ে লুইসের সাথে কিছুতেই তার উকিল সমঝোতায় আসতে পারছে না। তার উপর আছে তাদের এগার বছরের ছেলে বোডির কাস্টডি নিয়ে ঝামেলা।

গতকাল দুপুর থেকে জাস্টিন খুব টেনশানে আছে। সে একটানা এমিলিকে ফোন এবং টেক্সট করে যাচ্ছে, কিন্তু ওই পাশ থেকে কোনো রিপ্লাই নাই। এমিলি অ্যান্ডারসন তার পুরানো বন্ধু। স্কুল লাইফ থেকেই তাদের পরিচয়। হাই স্কুলে থাকতে এমিলির সাথে একটা প্রেম-প্রেম ব্যাপারও ছিল তার। কিন্তু কারো তরফ থেকেই ব্যাপারটা আর আগায় নাই, তাই নিয়ে তাদের মধ্যে হাসাহাসি হয় মাঝেমধ্যে। কলেজ শেষ করে এমিলি জাস্টিনের বেস্ট ফ্রেন্ড সিরিল কনরয় অ্যান্ডারসনকে বিয়ে করে। জাস্টিন বিয়ে করে এমিলির দূর সম্পর্কের কাজিন লুইস পামারকে।

গতকাল রাতে সে সিরিলকে ফোন দেয় কয়েকবার। তার ফোন বন্ধ। এরপর ফোন করে সিরিলের ভাই কিথ অ্যান্ডারসনকে। কিথ জানায় গত রোববার তার গার্লফ্রেন্ড এবং সে সিরিল, এমিলি ও এলার সাথে ডিনার করে। তখন পর্যন্তও ওরা বেড়াতে যাচ্ছে এমন আভাস দেয় নাই ওকে। বাসার কাজের লোকরাও সবাই ছিল তখনো। অন্ততঃ সে বাসার গেটকিপার, হাউসকিপার, মেইড এবং বাটলারকে দেখেছে। এলার জ্বর এসেছিল বলে এমিলি জানিয়েছিল, কিন্তু সেটা সিজন্যাল চেন্জের জন্য হচ্ছে বলেই সে ভাবছিল। এখন সবার বাচ্চারই এমন ভাইরাল ফ্লু হচ্ছে বলে সে শুনেছে।

জাস্টিন এরপর ফোনবুক ঘেঁটে ওদের বাড়ির মেইড এভি মুর‍্যের মোবাইল নাম্বারে ফোন দেয়। এভি জানায় সে ব্রিক লেনে তার বয়ফ্রেন্ডের বাড়িতে এসেছে। “আমি মিসেস অ্যান্ডারসনের কাছ থেকে তো আগেই ছুটি নিয়েছিলাম মিস্টার রিচার্ডসন! রোববার রাতেই আমি এখানে চলে এসেছি!”

—ওরা কি কেউ বেড়াতে যাবে এমন বলেছিল তোমাকে?

—না, তো! এলার তো সোমবারে স্কুল। আর মাত্র কয়েক সপ্তা আগেই তো ওরা মেক্সিকো থেকে ঘুরে এসেছে! আমি তো জানি না ওরা বেড়াতে যাচ্ছে!

—এমিলি কি তুমি বাদে অন্য কাউকে ছুটি দিয়েছে, জানো?

—না তো! এ সময় কারো ছুটিতে যাওয়ার কথা না, অন্ততঃ আমি জানি না। কেন, মিস্টার রিচার্ডসন, কী হয়েছে?

—কী হয়েছে জানি না। তবে ওরা কেউ বাড়িতে নাই মনে হচ্ছে। আচ্ছা, শোনো, তুমি কি একটু গিয়ে দেখে আসতে পারবে? তোমার কাছে বাড়ির চাবি আছে?

—আমি ছুটিতে যাওয়ার আগে চাবি বাড়িতে রেখে এসেছি, স্যার। আমার কাছে আর কোনো স্পেয়ার চাবি নাই! আর আমি আর জো কালকে একটা ফেস্টিভ্যালে যাচ্ছি গ্লাসটনবারি। তবে আপনি বললে আমি গিয়ে একবার দেখে আসতে পারি!

—হ্যাঁ, প্লিজ, তাই করো, যদি অসুবিধা না হয়! আমার নাম্বারটা সেভ করে রাখো, আমাকে কাল সকালে জানিও।

সকালে এভি টেক্সট করে জানায়, বাড়ির মেইনগেটই বন্ধ। ভিতরে সে কাউকে দেখে নি। তার গ্লাসটনবারি যাওয়ার তাড়া থাকায় সে অবশ্য বেশিক্ষণ অপেক্ষা করে নি বাইরে। জাস্টিন এরপর থেকে অ্যান্ডারসনদের বাড়িতে একটানা ফোন করে যাচ্ছে। কেউ ধরছে না।

ব্যাপারটা সত্যিই বেশ অদ্ভূত। ওদের বাড়িতে সবসময় কেউ না কেউ থাকে। এমিলি বা সিরিল বাইরে গেলেও বাটলার অ্যাডামস ফোন ধরে উত্তর দেয়। ওদের মেয়েও ফোন ধরে মাঝে মাঝে, খুব মৃদু লজ্জা লজ্জা গলায় “হ্যালো” বলেই রিসিভার রেখে দৌড় দিয়ে চলে যায়।

‘কেউ নাই বাসায়? নাকি কোনো এ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে?’—জাস্টিন খুব টেনশান নিয়ে আবার ফোন করে সিরিলকে। ফোন বন্ধ। ‘কী হল ওদের সবার?’ ভাবতে ভাবতে সে ফোন দেয় ওর ডিভোর্স লইয়ার ব্যারি এলউইনকে।

ব্যারি তাদের সবার কমন বন্ধু। তিন বছর আগে লন্ডনের সবচাইতে প্রেস্টিজাস ক্লাব ‘অ্যানাবেল’-এ একদিন তাসের আড্ডায় তাদের পরিচয়।

—ব্যারি, ফ্রি আছো?

—একটু ব্যস্ত, একটা মিটিং শুরু হচ্ছে। লুইসের সাথে কথা হয়েছে?

—না এর মধ্যে হয় নাই। আচ্ছা ওইটা নিয়ে না। আমি বেশি সময় নেব না। ঘটনা হচ্ছে, গতকাল থেকে এম আর সিরিল কাউকেই ফোনে পাচ্ছি না। বাসাতেও কেউ ফোন ধরছে না। একটা পার্সেল পাঠিয়েছিলাম, ওরা ফোন দিয়ে জানালো ওরা নাকি কেউ নাই বাসায়! খুবই আশ্চর্য লাগছে আমার!

—বেড়াতে গেছে নিশ্চয়! আচ্ছা আমি তোমাকে দু’ঘণ্টা পর ফোন দিচ্ছি। আমার মিটিং-এ ঢুকতে হবে।

—শোনো, ব্যাপারটা আর্জেন্ট। তুমি তো এল্‌ম্‌স রোডেই আছো, না?

—হুঁ, (এ্যাই, চার্লি, চার্লি, আমাকে ক্লেমেন্টের কেইস ফাইলটা একটু দিয়ে যাও তো!), হ্যাঁ, হ্যাঁ, এল্‌ম্‌স রোডেই আছি। কেন?

—তুমি মিটিং শেষে ওদের বাসায় একটা ঢুঁ মারতে পারবে?

—দেখি, আমি আজকে খুব ব্যস্ত। এটার পর আরো দু’টা মিটিং। কিন্তু তুমি এত টেনশান করছো কেন বলো তো? হয়তো নাম্বার নষ্ট হয়ে আছে!

—সবগুলি ফোন একসাথে নষ্ট? সিরিলের ফোন বন্ধ, এমের ফোনে রিং হচ্ছে, ধরছে না, বাসারটাতেও একই অবস্থা!

—দেখো গিয়ে ওরাও হয়তো তোমার আর লুইসের রাস্তায় আছে, ঝগড়াঝাঁটি মারামারি কাটাকাটি করছে, হয়তো আমার জন্য আরেকটা কেইস রেডি হচ্ছে, হা হা।

জাস্টিন বিরক্ত হয়ে ফোন রেখে দিল। ব্যারি কোনো কিছুই সিরিয়াসলি নেয় না। সে নিজেই লন্ডন চলে যাবে কিনা ভাবলো একবার। হাতঘড়ি দেখলো। এগারটা চল্লিশ বাজে। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের ইন্টারনাল ফ্লাইটে লিডস থেকে লন্ডন পৌঁছাতে এক ঘণ্টা বিশ মিনিট লাগে। এখান থেকে এয়ারপোর্ট যেতে চল্লিশ মিনিট, আর ওই দিকে হিথ্রো থেকে ট্যাক্সিতে কেনসিংটন গার্ডেন যেতে আধ ঘণ্টা থেকে পৌনে এক ঘণ্টা। অবশ্য টিউবে গেলে পঁচিশ মিনিটে পৌঁছে যাওয়া যাবে। হ্যাঁ, তাই করবে বলে ডিসিশান নিলো সে।

ফোন দিয়ে সেক্রেটারিকে বললো, আজকের মিটিং আর অ্যাপয়েন্টমেন্ট সব ক্যান্সেল করে লন্ডনের টিকেট বুক করতে। হয়তো আজকে রাতেই ফেরত আসতে পারবে সে। হয়তো আসলেই ঝগড়া করছে ওরা। হয়তো আসলেই টেনশানের কোনো কারণ নাই।

 

৩.

৮ অগাস্ট, ২০১৪

শুক্রবার, সন্ধ্যা সাতটা।

৫২ নাম্বার বাড়ির মেইনগেটটা এখন হাঁ করে খোলা। একটা নীল হলুদ ব্যাটেনবার্গ মার্কিং ওয়ালা পোলিসের রেসপন্স কার ফোর্ড ফিয়েস্তাকে পার্ক করা হয়েছে গেটের ঠিক বাইরেই।

কালো কাঠের নকশা করা বিশাল মেইনডোরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে পোলিস কনস্টেবল জেরার্ড ফিশম্যান এবং অ্যালিসন গ্রান্ট। তাদের সাথে আছে একমাথা বেণি করা, শরীরভর্তি ট্যাটু এবং পিয়ার্সিং-ওয়ালা কেনি হ্যাকেট।

কেনি একজন প্রাক্তন চোর এবং হ্যাকার, তবে বছর দশেক হলো সে পোলিসের বিশ্বস্ত ইনফর্মার হিসাবে কাজ করছে। আন্ডারগ্রাউন্ডে সে পরিচিত তালার যাদুকর হিসাবে। তালার গায়ে একটা আঁচড়ও না ফেলে সে যে কোনো ধরনের তালা খোলায় সিদ্ধহস্ত। শুধু দরজার তালাই না, ব্যাংঙ্কের সেইফ বা মেকানিক্যাল, টাইম এবং ইলেক্ট্রিক্যাল কম্বিনেশান লক সহ ভল্ট আর আটকানো যে কোনো জিনিসের প্রতি তার প্রচুর আগ্রহ।

সার্চ ওয়ারেন্ট ছাড়া পোলিসের ক্ষমতা নাই অনুমতির তোয়াক্কা না করে মানুষের বাড়িতে হুটহাট ঢুকে পড়ার, এমনকি যদি তাদের খুঁজেও না পাওয়া যায়। ওয়ারেন্ট তৈরি করতে সময় লাগবে, আর তা ছাড়া সে রকম কোনো যুক্তিযুক্ত কারণও নাই ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের ওয়ারেন্ট ইস্যু করার। কিছু বিশেষ সময় পোলিস ওয়ারেন্ট ছাড়া মানুষের বাড়িতে ঢুকতে পারে, কিন্তু সে রকম কোনো কারণও এখানে ঘটে নি। এখানে কোনো মানুষ মারা গেছে বলে জানা যায় নাই, এখানে কোনো ক্রিমিনাল লুকিয়ে আছে বলেও রিপোর্ট করে নি কেউ, এ বাড়ির কাউকে অ্যারেস্ট করা হয় নাই, বাড়িতে অবৈধ কিছু আছে বলেও কেউ শোনে নাই।

‘দু’জন মানুষকে দু’দিন ধরে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না’—আইনের ভাষায় তেমন কোনো কারণ নাই তাদের বাসায় বিনা অনুমতিতে ঢুকে পড়ার। তবে আজকে সকালে জাস্টিন রিচার্ডসন এবং সিরিল অ্যান্ডারসনের ভাই কিথ অ্যান্ডারসনের কথায় এক্সেজেন্ট সারকামস্টানসাসের আন্ডারে তারা সিনিয়রদের পরামর্শে ওয়ারেন্ট ছাড়াই এখানে ঢুকবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জাস্টিন এবং কিথ দু’জনেই সন্দেহ করছে বাসার ভেতরে হয়তো কোনো অ্যাক্সিডেন্ট ঘটে গেছে। তাড়াতাড়ি ঢুকে যদি এখনো তাদের বাঁচানো যায়!

গতকাল দুপুরবেলা জাস্টিন রিচার্ডসন লন্ডনে এসে মেইটগেট টপকে বাসার দরজা ধাক্কাধাক্কি করে কাউকে না পেয়ে সিরিল এবং এমিলির নিকট আত্মীয় ও বন্ধুদের ফোন করে মেট্রোপলিটান পোলিস সার্ভিসের লোকাল ব্রান্চে রিপোর্ট করে। প্রাথমিক দফায় ফিশম্যান এবং গ্রান্ট এসে বাইরে থেকে বাড়ির চারদিক দেখে যায়।

তখনো সবকিছু ভেতর থেকে বন্ধ। তারা আশেপাশের প্রতিবেশিদের বাড়িতে খোঁজ নেয়, কেউ তাদের কোনো তথ্য দিতে পারে না। শুধু উল্টা পাশের বাড়ির এলিজাবেথ হ্যামেলডন জানায়, সে দু’দিন আগে মর্নিং ওয়াকে বের হলে ৫২ নাম্বার থেকে বিচ্ছিরি একটা গন্ধ পেয়েছে। তবে সে ঠিক নিশ্চিত না গন্ধটা ওই বাড়ি থেকেই আসছে কিনা।

পড়ুন: নাদিয়া ইসলামের ধারাবাহিক উপন্যাস ‘রকি রোড সানডে’, সাহিত্য ডটকমে

কেনি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে প্রেমিকার গালে আদর করার মত ডিসপোজেবল গ্লাভ পরা হাত দিয়ে দরজার ফ্রেম ধরে দাঁত বের করে বিভিন্ন জায়গায় টোকা দিয়ে কান ঠেকিয়ে শুনে নিজের মনে বলে, ‘৮০ মিলিমিটার ফাকিং সলিড টিম্বার! বাহ্‌! ডেডবোল্ট—বাহ্‌ বাহ্‌—থ্রোবোল্ট, হুম! ইলেভেন-লিভার মরটিস লক, বাহ্‌ অ্যামে-ফাকিং-জিং! আর কী আছে তোমার দেখি? অটোম্যাটিক ড্রেডলকিং রিম, হুম—মাল্টি লকিং হ্যান্ডেল—ওয়াই-ফাই কানেক্টেড স্মার্ট ডোর লক, আবার মাদারফাকিং মোশন আর হিট ডিটেকশান সেন্সর পর্যন্ত, সাব্বাশ, আর কী চাই? সোনাপাখি আমার দেখি কুইকসেট কিভোও লাগিয়েছো, বাহ্‌ বাহ্‌ বাহ্‌—সুন্দর সুন্দর সুন্দর! তুমি হচ্ছো ফাকিং স্মার্ট লকের ফাকিং গোল্ড স্ট্যান্ডার্ডের বাপ! দরজার তলায় ওটা আবার কী? ব্লু-টুথ ব্যারিয়ার? হাহা, জিসাস ফাকিং ক্রাইস্ট! অনেকদিন পর একটা ভালো দিন পাওয়া গেলো আজকে! বাহ্‌ বাহ্‌ বাহ্‌ কার মুখ দেখে ঘুম থেকে উঠেছিলাম আমি হা হা?’

অ্যালিসন নাকে এক হাত দিয়ে অধের্য্য হয়ে আরেক হাতে কপালের উপর থেকে চুল সরাতে সরাতে বললো, “কেনি, এত বাহ্‌ বাহ্‌ না করে বল যে দরজা না ভেঙে তাড়াতাড়ি ভেতরে ঢোকা যাবে কিনা! এরা পয়সাওয়ালা ক্ষমতাবান, এদের সাথে পরে ঝামেলায় জড়াতে চাই না!”

চারদিকে একটা অসহ্য রকমের বোঁটকা গন্ধ। অ্যালিসন টের পাচ্ছে বাজে কিছু একটা ঘটে গেছে এই বাসায়!

কেনি হ্যাকেট দরজার উপর থেকে চোখ না সরিয়ে বললো, “দুনিয়ার সব সিস্টেমকেই হ্যাক করা যায়, সোনা যাদু পাখি! দরজা ভাঙতে হবে না! তবে—সময় লাগবে, একটু সময় লাগবে, কিন্তু খোলা যাবে। কোনো কিছু না ভেঙেই এই মামনিকে খোলা যাবে!” এরপর সে হঠাৎই কোনো কারণ ছাড়া বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়লো, বললো, “কিন্তু তোমরা আমাকে এখন বিরক্ত করো না তো! আমাকে একটু একলা থাকতে দিবে ফর ফাক সেইক? পোলিসরা এত মাথামোটা হয় কীভাবে কে জানে!”

অ্যালিসন আর কেনিকে দরজার সামনে রেখে জেরার্ড পুরা কম্পাউন্ডটা ঘুরে দেখে আসলো একবার। ভেতরে ঢোকার আগে চারদিকে অন্ধকার ছিল, কিন্তু মেইন ড্রাইভওয়েতে পা দেওয়ার সাথে সাথে বিভিন্ন দিক থেকে অটোম্যাটিকভাবে আলো জ্বলে উঠেছে, বাসার ভেতর যদিও এখনো আগের মতই অন্ধকার।

বাসার পেছনে লনের একপাশে বিশাল বাগান আর সুইমিং পুল, পুলের পাশে চেয়ারে তোয়ালে আর সানস্ক্রিন লোশনের বোতল পড়ে আছে। বাগানের একদিকে কাচের সানরুম, তার পেছনে বিশাল একটা গাছের উপর বাচ্চাদের ট্রি-হাউজ আর তার নিচেই ট্রি-হাউজে ওঠার দড়ির সিঁড়ি আর দোলনা। কম্পাউন্ডের দেয়াল ঘেঁষে সাজানো ফ্লাওয়ার বেড, তাতে টিউলিপ, পপি, ফক্সগ্লোভ, জারবেরা, ক্রিসেনথিমাম, পেটুনিয়া, চাইনিজ প্যাগোডা প্রিমরোজ আর ল্যাভেন্ডারসহ আরো নানা রকম ফুল।

জেরার্ড তাকিয়ে দেখলো, প্রতিটা ঝোপ নিখুঁত ভাবে সমান করে ছাটা, সুইট অটাম ক্লেমেটিসের ঝোপ দিয়ে বানানো বিশাল ল্যাবেরিন্থের একটা পাতাও এদিক-ওদিক হয়ে নাই, বাগানের রাস্তার পাশে একটু পর পর বসানো পাথরের মূর্তির নিচে একটুও শ্যাওলা জমে নাই, চারদিকের টার্ফে একটা শুকনা পাতা পর্যন্ত পড়ে নাই, এমনকি ফ্লাওয়ার বেডের পাশে চাইনিজ কোই মাছওয়ালা পুকুরের পানি এত টলটলে পরিষ্কার, যেন মনে হয় গতকালকেই পুকুর কেটে নতুন পানি ঢালা হয়েছে এখানে। জেরার্ড নিজে বাগান করতে ভালোবাসে। সে জানে এরকম একটা বিশাল বাগানের পরিচর্যা করতে দু’জন মানুষের সপ্তাহে অন্ততঃ তিন দিন সময় ব্যয় হয়। মিস্টার রিচার্ডসন বলছে তিন দিন যাবৎ এদের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। গতকালকেও তো বাড়িতে কেউ ছিল না! তাহলে এসব পরিষ্কার করলো কে এই তিন দিন?

জেরার্ড বাগান রেখে প্যাটিও-তে গিয়ে দাঁড়ালো। বোঁটকা গন্ধটা এখন আরো তীব্র হচ্ছে। প্যাটিও’র উপর সোফাতে বালিশের পাশে উলটানো ‘ভোগ’ ম্যাগাজিন আর সানগ্লাস। টি-টেবিলের উপর বরফের পাত্র, প্লেটের উপর শুকানো লেবু আর কমলার খোসা, চিনির কিউব, ক্রিস্টালের ডিক্যান্টারে হুইস্কি, বিটারের বোতল আর দু’টা খালি লো-বল টাম্বলার। সে সন্দেহ করলো, এ বাসায় খুব গুরুতর কিছু একটা হয়ে গেছে। কোনো কিছুতে হাত না দিয়ে সে প্যাটিও’র পেছনে কাচের দরজা দিয়ে উঁকি দিলো ভেতরে। এই দরজা দিয়েই সম্ভবতঃ রান্নাঘরে ঢোকা যায়। দরজার ওইপাশে সাদা নেটের পর্দা ঝুলানো, তার ভেতর দিয়ে কিছুই দেখা যায় না। অন্ধকার। জানে বন্ধ, তারপরেও আবার সে টিস্যু দিয়ে দরজার হাতল ধরে ঘোরানোর চেষ্টা করলো শেষবারের মত। না, বন্ধই!

বাসার সামনের দরজায় কেনি আর অ্যালিসন তখনো দরজা খোলায় ব্যস্ত। জেরার্ড মেইন বিল্ডিং পাশ কাটিয়ে ছোট আরেকটা একতলা পাথরের বিল্ডিং-এর সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। অনুমান করলো, এখানেই হয়তো বাড়ির কাজের লোকেরা থাকে। এই ঘরটা থেকেই গন্ধটা আসছে। পকেট থেকে আরেকটা টিস্যু বের করে নাক চাপা দিয়ে ছোট একটা ডেক পাড় হয়ে সে দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। হাতলে চাপ দিতেই আশ্চর্যজনকভাবে মৃদু আওয়াজ করে দরজাটা খুলে গেল। ভক করে তীব্র গন্ধটা এসে লাগলো জেরার্ডের নাকে। কিছু একটা পচে আছে ভেতরে। ভেতরের আবছা অন্ধকার চোখে সয়ে আসলে মাটিতে কিছু পড়ে আছে কিনা দেখে কিছুটা দেয়াল ঘেঁষে সে ঘরের ভেতরে ঢুকলো। এটা একটা ক্রাইম সিন এ ব্যাপারে এখন মোটামুটি নিশ্চিত সে। এলোমেলোভাবে হেঁটে সে এভিডেন্স নষ্ট করতে চায় না।

সামনে একটু আগাতেই গন্ধের উৎসটার খোঁজ পাওয়া গেল। লিভিং কাম ডাইনিং কাম কিচেনের মত ঘরটার ঠিক মাঝখানে বড় একটা রাগের উপর এলোমেলোভাবে কতগুলি কুকুরের পচতে শুরু করা লাশ পড়ে আছে। বড় সাইজের কুকুর, সম্ভবতঃ ডোবারম্যান হবে। সবগুলির মাথাই কাটা। মাথাগুলিকে আলাদা করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে রাগের একপাশে। ছাই রঙ্গা রাগ আর কাঠের মেঝের উপর শুকনা রক্তের দাগ, সম্ভবতঃ মেঝের উপর এদের খুন করার পর ছেঁচড়ে রাগের উপর টেনে আনা হয়েছে। চারদিকে ভন ভন করছে বড় বড় আকারের মাছি। জেরার্ড পকেট থেকে ফোন বের করতে করতে চিৎকার দিয়ে অ্যালিসনকে ডাকলো। সিনিয়ারদের ফোন করতে হবে এখন। তারা যেমন ভাবছিল তার চাইতেও বড় কোনো কিছু একটা ঘটেছে এখানে।

lock-3

মাথাগুলিকে আলাদা করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে রাগের একপাশে। অলঙ্করণ. নাদিয়া ইসলাম

কেনি ততঃক্ষণে মেইন দরজার ফিজিক্যাল তালাগুলি খুলে ফেলেছে। কিন্তু অটোম্যাটিক সিকিউরিটি সিস্টেমের স্মার্ট ডোর লক এখনো এনাবেল হয়ে আছে। এগুলি মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পাঠানো সিগন্যাল অথবা এক ধরনের পাসওয়ার্ড প্রটেক্টেড কী-ফব দিয়ে খোলা যায়। সেই পাসওয়ার্ডগুলিও আবার নিজে নিজে ২৪ ঘণ্টা পর পর আপডেট হতে থাকে। সেই আপডেটেড পাসওয়ার্ড মোবাইল ফোনে প্রতিদিন টেক্সট আকারে আসে। ঘরে ঢুকে সিস্টেম ডিসেবল করার জন্য বাড়ির মালিককে সেই নাম্বার মেইন সিস্টেমে টাইপ করে ঢোকাতে হয়। মোবাইল ফোন বা কী-ফব বা দু’টার একটা হারিয়ে গেলে ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে অবশ্য স্মার্ট ডোর খোলা যায়। কিন্তু ফিঙ্গারপ্রিন্ট সে পাচ্ছে কোথায় এত তাড়াতাড়ি?

মাথার উপর দু’টা ভিডিও ক্যামেরা, মোশন আর হিট ডিটেক্টারের সবুজ আলো এখনো জ্বলছে। কেনির কোলের উপর একটা সাদা রঙের ল্যাপটপ। সে হেডসেটে কারো সাথে কথা বলতে বলতে খুব দ্রুতবেগে কি-বোর্ডে কিছু একটা টাইপ করে যাচ্ছে। বুঝতে পারছে খুব ভোগাবে তাকে আজকে এই জিনিস। শুধুমাত্র ‘একটা’ ইন্টারনেট এবং সিকিউরিটি প্রোভাইডার দিয়ে দরজা আটকানো থাকলে হয়তো এত ঝামেলা হতো না। কিন্তু এখানে একইসাথে তিনটা প্রোভাইডারের তিনটা কাস্টমাইজড ওয়াই-ফাই সিগন্যাল কাজ করছে। সে এতক্ষণে একটা সিগন্যালকে অন্যগুলি থেকে আলাদা করে জ্যাম করতে পেরেছে। বাকি প্রোভাইডারদের কাছে খবর চলে যাওয়ার আগে এবং চারদিকে তীক্ষ্ণ শব্দে অ্যালার্ম বেজে ওঠার আগেই তাকে বাকি দু’টা সিগন্যাল জ্যাম করতে হবে। কিন্তু ভিডিও ক্যামেরায় তাকে কেউ দেখছে না তো? যদিও জানে, সে পোলিসের সাথে পোলিসের হয়েই কাজ করছে এবং সিকিউরিটি প্রোভাইডিং কোম্পানি বা মালিক পক্ষের কেউ তাকে ক্যামেরায় দেখলে কোনো সমস্যা নাই, তাও সে ক্যামেরা থেকে মুখ আড়াল করে বসে মাথার উপরের হুডিটা টেনে নামিয়ে আনলো। ভাবছে, পোলিসের সাথে কাজ না করে অন্য দিক থেকে এই কাজ করতে পারলে অন্য রকম একটা শারীরিক এবং মানসিক উত্তেজনা আসতো তার। ভাবছে, কী এমন মহার্ঘ্য বস্তু আছে এই বাড়িতে যে এত কড়াকড়ি রকমের সিকিউরিটি?

অ্যালিসনকে এমন সময় কিছু একটা চিৎকার করে বলতে বলতে বাড়ির পেছন থেকে দৌড়ে আসতে দেখা গেল। তার পেছন পেছন জেরার্ড আসছে। হাঁপাচ্ছে সে; কেন, কে জানে? কেনি মাথা থেকে হেডসেটটা খুললো।

—কেনি, রাখো, রাখো, দরজা খুলতে হবে না!

কেনি অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে মাথা নাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো, “কী বলছো? খুলতে হবে না মানে? কেন? খুলতে হবে না কেন?’

—ব্রায়ানকে ফোন দিয়েছি। ও আসছে। বললো, প্রোভাইডারদের ফোন করে বলতে সিস্টেম ডিসেবল করার জন্য! এখানে সিরিয়াস কিছু একটা হয়েছে, বুঝলে? তোমাকে সিস্টেম ডিসেবল করতে হবে না! এটা মিসিং পারসন কেস না, এটা একটা ক্রাইম সিন! তুমি ফিজিক্যাল তালাগুলি খুলেছো তো? তাতেই চলবে!

কেনি সশব্দে হেডসেট মাথা থেকে মেঝেতে নামিয়ে বললো, “আর ইউ ফাকিং কিডিং মি? কী পেয়েছো তোমরা পেছনে?”

“তুমি আসো, এসে দেখে যাও!” জেরার্ড পেছন থেকে উত্তেজিত গলায় বলে উঠলো।

—আমার তার দরকার হবে না। তোমাদের রক্ত ফক্ত দেখে আমার উত্তেজনা হয় না! শোনো, প্রোভাইডার খুঁজে বের করতে তোমাদের যেই সময় লাগবে, তার আগেই এই মাদারফাকিং সিগন্যাল জ্যাম করে ফেলতে পারবো আমি। তোমাদের মাথামোটা ডিকহেড ব্রায়ান কি সিকিউরিটি কোম্পানির নাম জানিয়েছে তোমাদের?

—না, না ব্রায়ান খোঁজ নিচ্ছে বললো।

—ওই ছাগলটা খোঁজ নিতে নিতে আরো চল্লিশ বছর পাড় করে ফেলবে। আমাকে আমার মত কাজ করতে দাও। আর ও নিশ্চয় এখন সার্চ ওয়ারেন্ট জোগাড় করবে, তাই না? এখন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে যাও, হ্যান্ ত্যান্ আরো কী সব কাহিনি আছে না তোমাদের?

—না না, ওয়ারেন্ট তো লাগবেই না, এক্সেজেন্ট সারকামস্টানসাস-ফানসাসেরও দরকার নাই, এখন এটা সেকশান ১৭ পেইস এ্যাক্ট (পোলিস অ্যান্ড ক্রিমিনাল এভিডেন্স অ্যাক্ট ১৯৮৪) এর আন্ডারে পড়ছে, বুঝতে পারছো?

‘ওহ্‌ নাইস!’ কেনি মুখ দিয়ে একটু সুরুৎ শব্দ করে বললো, “কাহিনি তাহলে ভালোই সিরিয়াস, হুঁ?”

(কিস্তি ২)

আরো পড়ুন: তানভীর আহম্মদ চৌধুরীর উপন্যাস অল ঘোড়া কন্ট্রোল

About Author

নাদিয়া ইসলাম
নাদিয়া ইসলাম

ফ্যাশন ডিজাইনার। লন্ডন সাউথ ব্যাংক ইউনিভার্সিটির ফরেনসিক সাইন্স থেকে পাশ করে এখন রিসার্চ সায়েন্টিস্ট হিসাবে কাজ করেন। ২০০৭ থেকে ইংল্যান্ডে আছেন। এর আগে বাংলাদেশে বসবাস করেছেন। জন্ম লিবিয়ার সির্তে। মিছুরাতায় থাকতেন। ১১ বছর বয়সে লিবিয়া ত্যাগ করেন।