page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব
লাইফস্টাইল

লকড ডোর ডেথ (২)

(আগের পর্ব)

৪.

৮ অগাস্ট, ২০১৪

শুক্রবার, রাত পৌনে বারোটা।

ডি-সি-আই (সুপারইন্টেন্ডেন্টস, ডিটেকটিভ চিফ ইন্সপেকটার) ব্রায়ান কক্সের আজকে মেয়ের জন্মদিন। কেক কাটার ঠিক আগের মূহুর্তে ডি-এস (ডিটেকটিভ সার্জেন্ট) জিল হ্যারিসনের ফোন পায় সে, কেনসিংটন গার্ডেনে পসিবল হোমিসাইড, তাড়াতাড়ি যেতে হবে।

গাড়িতে ওঠার সময় সে দেখে মন খারাপ চেহারা নিয়ে স্ত্রী সিনডি পর্দা সরিয়ে জানালা দিয়ে মাথা বের করে হাত নাড়ছে। তার মাথার পেছনে জন্মদিনের ফেয়ারি লাইটের মাঝখানে লাল-নীল বানটিং আর বেলুন উড়ছে এদিক-সেদিক। বাসার ভেতর থেকে হৈ চৈ আর গানের শব্দ শোনা গেল কয়েক সেকেন্ডের জন্য।

সিনডি জানালা বন্ধ করে দিয়েছে। ইউনিফর্মের উপর নামের ভেলক্রো ব্যাজ ঠিক করতে করতে ব্রায়ানও ছোট্ট করে হাত নাড়ল। মেয়েকে অবশ্য কোথাও দেখতে পেল না সে। শেষবার কবে পারিবারিক কোনো উৎসব কোনো রকম ঝামেলা ছাড়া কাটিয়েছে ভাবল একবার। নাহ্‌ মনে পড়ছে না সেরকম কোনো দিন!

ব্রায়ান কক্স মেট্রপলিটান পোলিস সার্ভিস বা ‘মেট’ এর ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশান ডিপার্টমেন্ট (সি-আই-ডি) এর আন্ডারে কেনসিংটন অ্যান্ড চেলসি বরো অফ অপারেশনাল কমান্ড ইউনিটের হয়ে গ্রেড ওয়ান- ‘থ্রি-বাথ স্টার’ ডিটেকটিভ চিফ ইন্সপেকটার হিসাবে কাজ করছে বছর চারেক হল। খুন-জখম তার কাছে নতুন কিছু না। কিন্তু প্রতিবারই নতুন একটা মৃত্যুর খবরে তার মন খারাপ হয়। প্রতিবারই সে ভাবে সে নিজে মারা গেলে সিনডির কেমন লাগবে? মেয়ে জয় আর ছেলে টায়লার কতদিন তাদের বাবার কথা মনে রাখবে? তার ছোটবেলার বেস্ট ফ্রেন্ড স্পেনসার হাই স্কুলে পড়ার সময় একদিন ব্রাইটনে পানিতে ডুবে মারা গেল। ১৩ বছরের ব্রায়ান ভেবেছিল সে জীবনে আর কখনো স্বাভাবিক হতে পারবে না। কখনোই সে স্পেনসারকে ভুলতে পারবে না, কখনোই আর তার নতুন বন্ধু হবে না, কখনোই সে ব্রাইটন যেতে পারবে না। কিন্তু তার জীবনে অনেক ১৭ এপ্রিল, অনেক ব্রাইটন, অনেক নতুন বন্ধু এসে চলেও গিয়েছিল, তার আর স্পেনসারকে মনে পড়ে নাই। ভাবল, “মৃত্যু শুধু মৃতদের জন্যই, যারা বেঁচে থাকে তাদের কাছে সম্ভবতঃ মৃত্যু এবং মৃতরা কয়েকদিনের শূন্যস্থান তৈরি করা ছাড়া আর কোনো প্রভাবই ফেলে না!”

৫২ নাম্বার বাসার দরজার সামনে কেনি হ্যাকেট ততক্ষণে সবগুলি অটোম্যাটিক এবং ওয়াই-ফাই সিকিউরিটি সিস্টেম ডিসেবল করতে পেরেছে। তার পায়ের কাছে দরজা খোলার লক-পিক ‘কে-টুল’, হাতুড়ি, স্প্যানার, হাইড্রলিক র‍্যাম, স্প্রেডার-কাটার, লিভার, ক্রো-বার, ল্যাপটপ ও পেটমোটা একটা যন্ত্রপাতিবহুল সবুজ রঙের ব্যাগের পাশে বিশালদেহী একটা স্লেজ-হ্যামার পড়ে আছে। ব্রায়ান জানে, কেনি কোনোদিন স্লেজ হ্যামার দিয়ে দরজা ভাঙবে না, এটা তার ‘পলিসি’ এবং ‘ইগো’র মধ্যে পড়ে না, তবুও সে সব সময় এই জিনিস সাথে নিয়ে ঘোরে। কেন, কে জানে? ড্রাইভওয়ে ধরে আসতে আসতেই সে শুনতে পেল পি-সি (পোলিস কনস্টেবল) জেরার্ড ফিশম্যান হাত পা ও মাথা নাড়িয়ে অ্যালিসন গ্রান্ট ও কেনির সাথে সমানে তর্ক করছে দরজা খোলার মেকানিক্যাল আর এক্সপ্লোসিভ ব্রিচিং নিয়ে। “এখনো এরা দরজা খুলতে পারে নাই?” আশ্চর্য হয়ে ভাবতে ভাবতে সামনে এগোলো ব্রায়ান। ডি-এস জিল হ্যারিসনকে দেখা গেল বাসার পেছন থেকে ঘুরে আসতে।

—হাই ব্রায়ান!

—হ্যালো ডিটেকটিভ! কতক্ষণ হলো এসেছো? কী অবস্থা এদিকে?

জিল স্ট্যাব ভেস্টের দুইদিকে দুই হাত ঢুকিয়ে পা ফাঁক করে সোজা হয়ে দাঁড়াল। ঘাড় কাত করে পি-সিদের দিকে ইঙ্গিত করে বলল, “আমাদের ‘বেবি’ ববিরা এখনো দরজা ভাঙায় ব্যস্ত! ভেতর থেকে আটকানো সব!”

ব্রায়ান পি-সিদের ‘হাই’ বলে নিজেই পা বাড়ালো আশপাশটা দেখতে, “পেছনের দরজা দেখেছো? সামনের দরজায় সিকিউরিটি কড়া থাকবে জানা কথা!”

—আমি নিজেই দেখলাম। কেনি বলল, পেছনের অ্যালুমিনাম ট্রিপল ট্র্যাক না কী জানি একটার ফাইবারগ্লাসের প্যাটিওর দরজাও ইলেক্ট্রনিক্যালি সিকিউরড আর বুলেটপ্রুফ। সবগুলি জানালায় লোহার গ্রিল। এটা একটা ফোরটিন্থ সেঞ্চুরি বাড়ি, আই মিন ‘ম্যানশন’ ব্রায়ান! এগারো ইঞ্চি চওড়া পাথরের দেয়াল!

—আই সি! ওদের সামনের দরজায় ব্যালিস্টিক ব্রিচ করতে বলো। অ্যাম্বুলেন্স আর ফায়ার সার্ভিসে খবর দাও! আমাকে বাকি আপডেট বলো। প্রথম থেকে শুনি কী হয়েছে!

জিল পি-ডি-এ হাতে নিয়ে ব্রায়ানকে জাস্টিন রিচার্ডসনের এমিলি, সিরিল এবং এলা অ্যান্ডারসনকে নিয়ে সন্দেহর কথা জানালো। খুন হয়ে যাওয়া কুকুরগুলির দিকে ইঙ্গিত করে বলল, “তুমি কী সন্দেহ করছো বলো তো?”

ব্রায়ান নিজের কোমড়ে ডিউটি বেল্টে ঝোলানো হিয়াট স্পিডকাফে আঙুল বোলাতে বোলাতে অন্যমনস্ক হয়ে বলল, “জানি না ডিটেকটিভ! তবে খুব অদ্ভূত একটা ফিলিং হচ্ছে আমার, হান্চ বলছে, কিডন্যাপিং বা খুন!”

—আমার অবশ্য সেটা মনে হয় না। সময় নিয়ে কুকুরের গলা কাটা মানে হচ্ছে শব্দ না করে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা। সেটা চুরি বা ডাকাতির ঘটনায় ঘটে। খুনে না।

—আনলেস সেটা ঠাণ্ডা মাথায় খুন! কিন্তু ট্রাংকুলাইজারড ডার্টের বদলে গলা কাটলো কেন বলো তো? ডার্ট গান তো এখন রাস্তাঘাটে পাওয়া যায়! এখানে ছবি তোলা হয়েছে?

—হুম, বেশ অদ্ভুত! হ্যাঁ, অ্যালিসন রেকর্ড করছে সবকিছু।

বাসার সামনে অ্যালিসন এবং জেরার্ড বড় সাইজের একটা ব্যাটারিং র‍্যাম দিয়ে মেইন দরজা ভাঙার চেষ্টা করছে এখন। কেনি উত্তেজিত ভঙ্গিতে এগিয়ে আসলো ব্রায়ানের সামনে, মাথার ওপর থেকে হুডিটা সরে গেছে তার। দাঁতমুখ খিঁচিয়ে বলল, “মেইট, আয়্যাম লুজিং দ্যা ফাকিং প্লট! আমাদের ব্রিলিয়ান্ট স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড যদি এইসব ‘ডজি’ হাতুড়ি বাঁটালি ছেনি দিয়েই দরজা ভাঙবে, তাহলে আমাকে রেখেছো কার চেহারা দেখতে? ইউ গাইজ আর আ বান্চ অফ ফাকিং ওয়্যাংকারস!’

ব্রায়ান একটু পিছিয়ে গিয়ে দুই হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গি করল। জিল এগিয়ে এলো ব্রায়ানকে রক্ষা করতে, “কেনি, কেন্‌, মেইট, কাম ডাউন! এটা এখন সময় বাঁচানোর বিষয়! তোমার কাজকে আমরা সম্মান করি, জানো নিশ্চয়? ডোন্ট টেইক দ্যা পিস আউট অফ আওয়ার পি-সি নাও!”

কেনির গলা নরম হল একটু আগের চাইতে, “ডোন্ট টক টশ, বেইব। আমাকে আগে বললেই আমি এত প্রেশাস সময় নষ্ট না করে তোমাদের হাতে আমার ফাকিং স্লেজ হ্যামার ধরিয়ে দিতাম! তোমরা পোলিসরা জানোটা কী বলো তো? তোমরা কি সূক্ষ্ম কোনো কাজ করতে পারো? তোমাদের সব কাজেই ম্যাচোগিরি, সব কাজে তোমাদের মোটামাথার মত মোটা পেশি না দেখাতে পারলে ভালো লাগে না, তাই না? আমি চললাম! ফোর্টনাইটের মধ্যে আমার রেজিগনেসান লেটার পাবে তোমরা!”

জিল একটু হাসলো, কেনির চাকরি ছাড়ার গল্প নতুন না। “আহ ডোন্ট বি চিকি, মেইট! ওরা দরজা খুলুক, যাও তুমি একটা ফ্যাগ-ব্রেইক নিয়ে এসো!” জিল জেরার্ড আর অ্যালিসনের দিকে ঘুরল, হাত ঘড়ি দেখল, রাত বারোটা বেজে গেছে, “কতক্ষণ লাগবে আর কনস্টেবল?”

—কেনির হিসাব মতে ভেতর থেকে প্রায় সাতটা তালা লাগানো। র‍্যাম দিয়ে খুব একটা সুবিধা হচ্ছে না! এক্সপ্লোসিভ চার্জ করব?

কেনি ঘাসের উপর দাঁড়িয়ে সিগারেটে আগুন ধরাতে ধরাতে বলল, “দেয়ার ইয নো ফাকিং ‘প্রায়’ সাত! ভেতর থেকে মোট সাতটা ফিজিক্যাল তালা লাগানো! দেয়ের আর লক সিলিন্ডার উইথ রেগুলার কি’জ, ইলেভেন লিভার মরটিস, ডেডলক, থ্রোবোল্ট- দুই ধরনের ডেডলক চেইন বোল্ট, রোলার ক্যাম অ্যান্ড প্যারট বিক হুক! মোট সাত! কাঠের দুই পাল্লার মাঝখানে কম্পোজিট স্টিলের ‘মেশ’ স্ক্রিন লাগানো!”

ব্রায়ান অ্যালিসনকে সরতে বলে নিজে হাত লাগালো র‍্যামে, “না, এক্সপ্লোসিভে প্রচুর সময় লাগবে। ভেতরের অবস্থা আমরা এখনও জানি না। তাছাড়া এই রাতে সমস্ত পাড়া প্রতিবেশিকে ঘুম থেকেও ওঠাতে চাই না আমি!”

ব্রায়ান আর জেরার্ড কিছুদূর পিছিয়ে এসে দুই হাতে ব্যাটারিং র‍্যাম ধরে গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে দরজার ঠিক মাঝখানে একটা ধাক্কা দিলো। কড়াৎ করে একটা শব্দ হলো। সামান্য চিড় ধরেছে দরজার গায়ে, আর কিছুই হয় নি তেমন। ভেতর থেকে এক দুইটা তালা আলগা হওয়ার মৃদু আওয়াজ শুনলো ওরা, কিন্তু দরজা এবং তালারা এখনো আগের জায়গাতে বহাল তবিয়তেই আছে! জেরার্ড মুখ দিয়ে ফশ করে বাতাস ছেড়ে বললো, “কেনি ঠিক কথাই বলেছে। এই জিনিস খুলতে আমাদের আসলেই চল্লিশ বছর পার হয়ে যাবে!”

সিগারেটের ছাই ফেলতে ফেলতে কেনি ওদের দুরাবস্থা দেখে হাসলো একটু। ব্রায়ান এবার কেনির ব্যাগ থেকে লাল রঙের একটা বড় সাইজের কুড়াল বের করে আনলো, তার জেদ চেপে গেছে, সামান্য একটা দরজাই তো এটা! খুলবে না মানে?

কোপ দিলো সে দরজার গায়ে সর্বশক্তিতে। মনে হলো সামান্য নড়ে উঠছে বিশাল দরজাটা। আরো কয়েকবার ঠিক একই জায়গায় গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে কুড়াল চালালো সে। শেষ পর্যন্ত ছোট সাইজের একটা গর্ত মত দেখা গেল দরজার গায়ে। কুড়ালটা মাটিতে উলটা করে রেখে তার উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে লম্বা লম্বা শ্বাস ফেলতে ফেলতে ব্রায়ান গর্তের ভেতর উঁকি দিয়ে দেখল একবার। অ্যালিসন বলল, “এদিক থেকে হাত ঢুকিয়ে এখন বোল্টগুলি খোলা যাবে মনে হয়!”

জিল এগিয়ে গেল সামনে, বললো, “না, এখনো হাত ঢোকানোর মত বড় হয় নাই গর্ত! র‍্যাম চালাও আরো কয়েকবার। ভেতর থেকে ভারি ছিটকিনিগুলি খুলে গেলেই কাজ হয়ে যাবে বলে মনে হচ্ছে! কেনি, তোমার ইন্ডাস্ট্রিয়াল হেভি র‍্যাম আনা উচিৎ ছিল আজকে!”

জবাবে কেনি দূরে দাঁড়িয়ে শ্রাগ করল একটু। সে চলেই যাবে ভাবছিল, দরজার উপর এই শারীরিক অত্যাচার তার সহ্য হচ্ছিল না, কিন্তু কী এক অজানা আগ্রহ তাকে আটকে রেখেছে এতক্ষণ, ভাবছে, “কী আছে ভেতরে যে এত কড়াকড়ি?”

প্রায় চল্লিশ মিনিট দরজার উপর আক্ষরিক অর্থেই হাতুড়ি বাটালি কুড়াল চালানোর পরেও তেমন কোনো লাভ না হওয়ায় ফায়ার-আর্ম সার্টিফিকেট হোল্ডার স্মিথ বাকলিকে ফোন দিল ব্রায়ান। ব্রায়ান নিজে একজন এ-এফ-ও (অথোরাইজড ফায়ার-আর্ম অফিসার) হলেও সে বা মেট পোলিস সহ ব্রিটিশ বেশিরভাগ পোলিসদের কেউই ডিউটিতে আগ্নেয়াস্ত্র বহন করে না। কোনো কারণে আগ্নেয়াস্ত্র দরকার পড়লে তাদের স্পেশাল ফায়ার-আর্ম অফিসারদের তলব করতে হয়। বাকলি এলাকাতেই ছিল। সে এসে পৌঁছালে তার হেকলার অ্যান্ড কচ এম-পি-৫- ‘৯ মিলিমিটার’ সাবমেশিন গান দিয়ে দরজার উপর কয়েক দফায় গুলি চালিয়ে দরজার একাংশ ভাঙা সম্ভব হলো ওদের। আশেপাশের বাড়িগুলির কয়েকটা জানালায় আলো ও কৌতূহলী মুখ দেখা গেল, দুই একজন এমনকি চোখে ঘুম এবং জিজ্ঞাসা নিয়ে জড়ো হল মেইনগেটের কাছে। জেরার্ড দৌড়ে গেল তাদের পথ আটকাতে। প্রশ্ন করার জন্য কেনিকে পেলে কালকের পত্রিকায় গুজবের আর কোনো মা-বাপ থাকবে না, জানে!

lock-2-a

কেনির আগ্রহ অবশ্য এখন দরজার দিকে। গুলি ও কুড়ালের আঘাতে ভেতরের ছিটকিনিসহ দরজার একপাশের পাল্লা খুলে এসেছে হিন্জ থেকে, ফ্রেম থেকে ঝুলে আছে ডেডলকের চেইন বোল্ট। পায়ের কাছে দরজার ফ্রেমে কালো রঙের ব্লু-টুথ ব্যারিয়ার আলগা হয়ে উঠে এসেছে পাথরের মেঝে থেকে। ফ্রেমের চারদিকে এক ইঞ্চি পর পর বসানো মোশন আর হিট ডিটেকশান সেন্সরগুলি অকেজো হয়ে হালকা নীল আলো ছড়াচ্ছে চারদিকে।

অ্যাকটিভেটেড অবস্থায় তারা সবুজ হয়ে থাকে। এখন এদিক দিয়ে অনায়াসেই একজন একজন করে ঢোকা যাবে ভেতরে। “কীসের জন্য অপেক্ষা করছে ওরা?” ভাবলো কেনি। আর-এস-পি-সি-এ (রয়্যাল সোসায়েটি ফর প্রেভেনশান অভ ক্রুয়েলটি টু অ্যানিমেল), ফায়ার সার্ভিস আর অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছে গেছে ততক্ষণে ৫২ নাম্বারের সামনে। ব্রায়ান জেরার্ডকে ওদের ব্রিফিং করতে বলে কেনি আর অ্যালিসনকে বাইরে দাঁড়াতে বলল।

ভেতরে ঢুকবে সে আর জিল। কেনি ব্রায়ানের মাতব্বরি দেখে গাল দিয়ে উঠল মনে মনে, তবে জানে, এখানে ব্রায়ানের কথা অমান্য করা তার পক্ষে সম্ভব না। হাজার হলেও সেই এখানকার অফিসার ইন চার্জ। এই প্রথম পোলিসের চাকরি না করার জন্য মনে মনে একটু আফসোস করল সে।

 

৫.

৯ অগাস্ট, ২০১৪

শনিবার, রাত দু’টা ছেচল্লিশ।

বাসার ভেতর গাঢ় অন্ধকার। জিল দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ব্রায়ানকে কাভার করে পকেট থেকে ছোট্ট একটা এল-ই-ডি ফ্ল্যাশলাইট বের করে আনল। সুইচ টিপতেই তীব্র সাদা আলোর একটা রেখা অন্ধকারকে কেটে ঘুরে বেড়াল তিরিশ ফিট উঁচু অর্ধচন্দ্রাকৃতি এন্ট্রি লাজিয়ার চারদিকে। লাজিয়ার ছাদ থেকে পনেরো ফিট শিকলের মাথায় ঝুলে আছে আলবার্তো ব্রুনি টেডেস্কি কালেকশানের ভার্নিশ করা ইটালিয়ান গিল্ট ব্রোন্জ আর কাট গ্লাসের বিশালাকৃতি শ্যান্ডেলিয়ার। দেয়ালে নির্দিষ্ট দূরত্বে নির্দিষ্ট উচ্চতায় ঝুলে আছে একই কালেকশানের আঠারোটা রাশান অরমলুর ব্রোন্জ রঙা ফ্রেমে বাঁধানো আয়না। ব্রায়ান ঘরের ঠিক মাঝখানে গোল কালো কাঠের টেবিলে সাদা রঙের তাজা অর্কিড, জুলিয়েট গোলাপ আর লিলি অফ দ্যা ভ্যালি ফুলসহ সোনালি-ব্রোন্জ রঙের মিং ডাইন্যাস্টির চাইনিজ পোর্সেলিনের ফুলদানি পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেল সামনে, টেবিলের ঐপাশে দুই নগ্ন নারীমূর্তির মাঝখানে বিশালাকৃতি খোলা আর্চ দিয়ে রক্তলাল কার্পেট-ঢাকা ফয়্যারের একাংশ দেখা যাচ্ছে। সে ওয়ালপেপার ঢাকা দেয়ালের একপাশে সুইচবোর্ডের উপর র‍্যানডমলি তিনটা সুইচ টিপল। আর সাথে সাথেই ছাদের মাথা থেকে স্কাইলাইটের ঢাকনা খুলে গিয়ে শ্যান্ডেলিয়ারের ছয়শ’ বাল্ব থেকে গোল ঘরটার চারদিকে হলুদ রঙের আলো আয়নায় আর কাচে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়ল দেয়ালের বিভিন্ন দিকে। ব্রায়ান গলা উঁচু করে বলল, “হ্যালো? কেউ আছে বাসায়? হ্যালো?”

কোথাও কোনো সাড়া শব্দ নাই। এমনকি ঘরের ভিতরের বাতাসও মৃত্যুর মত নিস্তব্ধ।

জিল তার ফ্ল্যাশলাইট বন্ধ করে পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে হাতের পয়েন্টার দিয়ে লিলি অফ দ্যা ভ্যালির গায়ে মৃদু খোঁচা দিল, “দেখো, এখনো তাজা!”

ব্রায়ান পেছনে ঘুরে ফুলদানির দিকে তাকালো, নিজের মনেই স্বগতোক্তির মত করে বলল, “যেই বাসায় বাচ্চা আছে, তারা এই ফুল এখানে রেখেছে কী কারণে? এটা বিষাক্ত না?”

—বিষাক্ত কিনা জানি না! কিন্তু কী ভীষণ সুন্দর, তাই না? আমাদের ডাচেস অফ কেমব্রিজের বিয়ের ফুল! এর আরেক নাম হচ্ছে ‘রিটার্ন অফ দ্যা হ্যাপিনেস’!

“রিটার্ন অফ দ্যা হ্যাপিনেস? হুম!” ব্রায়ান ফয়্যারের সামনে এগিয়ে গিয়ে বলল, “তুমি উপরতলাটা দেখো। আমি নিচতলা কাভার করছি। মনে হচ্ছে পি-সিদের ডাকতে হবে পুরা এলাকা কাভার করতে!”

জিল তার স্ট্যাব ভেস্টের সাথে ঝোলানো রেডিওতে পি-সিদের ডেকে দোতলায় ওঠার রাস্তা খুঁজতে লাগল।

বেডরুমগুলি দোতলাতেই থাকার কথা। ব্রায়ান ফয়্যার আর সেন্টার গ্যালারি পার হয়ে বাড়ির পেছন দিকে গ্রিট রুমে ঢুকল। ঘরের ঠিক মাঝখানে কালো রঙের গ্র্যান্ড পিয়ানোর উপর একটা ভাঁজ করা গানের খাতা আর একজোড়া রিম-লেস চশমা পড়ে আছে।

চারদিকের ছড়ানো ছিটানো সোফা, কাউচ আর ভেলভেটের ডিভান সবকিছু পরিপাটি করে গোছানো। একটু বেশিই পরিপাটি, ভাবলো ব্রায়ান। এগিয়ে গিয়ে কফি টেবিলের উপর হাতির দাঁতের দাবার বোর্ডের উপর পায়ের কাছে পান্না বসানো কালো-সাদা গুঁটিগুলির দিকে ঝুঁকলো।

এই বাসায় একটা বাচ্চা থাকে, তার কোনো প্রমাণই কোথাও নাই। গ্রিট রুম থেকে পাথরের সিঁড়ি দিয়ে নেমে বলরুমে ঢোকা যায়। পুরা ঘরটাই এখন খালি। বাতি জ্বালানোর সাথে সাথে মসৃণ কালো ম্যাকাসার ইবোনি কাঠের মেঝেতে আলো রিফ্লেক্ট করে উঠল, জ্বল জ্বল করে উঠল ছাদ জুড়ে বসানো বিশাল আয়না। ব্রায়ান সাবধানে মেঝেতে পা ফেলল, যেন শব্দে কারো ঘুম ভেঙে যাবে! ঘরের একপাশের দেয়াল জুড়ে বিখ্যাত সব কনটেম্পোরারি এবং ক্ল্যাসিক পেইন্টিং, তার সামনে বিভিন্ন আকারের পাথরের মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে, কোনোটা স্কাল্পচার প্যাডেস্টালের উপর, কোনোটা সরাসরি মেঝেতে।

সে নাচের ফ্লোর পার হয়ে দেয়ালের ওইপাশে ঝোলানো অ্যান্টিকো সাতিফিচিয়ো ফ্লোরেনতিনোর ডিজাইন করা ব্রোকেড, দামাস্ক আর ইটালিয়ান ফ্লোরেনটিন কাপড়ের ভারি ট্যাপেস্ট্রির দিকে এগিয়ে গেল। পর্দার ওই পাশে পুরা দেয়াল জুড়ে পেছনের টেরাসের দিকে মুখ করা ফাইবার গ্লাসের দরজা। কিন্তু ভেতর বা বাইরে থেকে সেটা খোলার কোনো হাতল বা অটোম্যাটিক সিস্টেম পেল না সে। হঠাৎ চোখে পড়ল, পর্দার ঠিক নিচে কাপড়ের একটা পুতুল পড়ে আছে। ব্রায়ান পকেট থেকে পয়েন্টার বের করে হালকা খোঁচা দিয়ে পুতুলটা উলটে দেখল। বেশ পুরানো, সম্ভবতঃ কয়েক বছর বয়স হয়েছে এটার। বহু ব্যবহারে গালে কালচে দাগ পড়ে আছে, মাথাটাও ঘাড় থেকে ল্যাগব্যাগ করছে। “এখানে কেন এটা?” ভাবলো সে।

বলরুম থেকে বেরিয়ে বার কাউন্টার আর পশ্চিমের স্টেয়ার হল পার হয়ে সে লাইব্রেরিতে ঢুকল। এই ঘরটাও লাজিয়ার মত তিরিশ ফিট উঁচু। দেয়াল জুড়ে পঁচিশ হাজার বইয়ের আবলুস কাঠের আলমারি। আলমারির সামনে চাকা লাগানো মই এড়িয়ে সে রিডিং ডেস্কটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ডেস্কের উপর এলেমেলোভাবে কয়েকটা বই, গ্লেনকায়ার্ন হুইস্কি গ্লাসে আধ পেগ মত অবশিষ্ট গ্লেনফেডিচ জ্যানেট শিড রবার্টস রিজার্ভ আর এক তৃতীয়াংশ খালি হয়ে যাওয়া বোতল, দুইটা মোবাইল ফোন, জার্মান গোল্ডেনস্টোরের রাইটিং প্যাডে ‘এ’ ওয়াটারমার্ক আর এনগ্রেভ করা হ্যান্ডমেড একটা কাগজে আধ-লেখা চিঠি আর টিবালডি ফ্লোরেন্সের মুখ খোলা একটা ফাউন্টেন পেন। ডেস্কের সামনে জানালা দিয়ে বাড়ির সামনের ড্রাইভওয়েটা দেখা যায়। ব্রায়ান গলা বাড়িয়ে দেখল, ক্যামেরা হাতে ভেটেরনারি ফরেনসিক ইউনিট ভেতরে ঢুকছে। কুকুরগুলিকে নিয়ে যাবে ওরা।

—কিছু পেলে এখানে ডিটেকটিভ?

হঠাৎ গলার আওয়াজে চমকে উঠে পেছন ফিরলো ব্রায়ান। অন্য দিনের চাইতে আজকে সে একটু বেশি অন্যমনস্ক। জেরার্ড। “নাহ, কিছুই না। দেখে মনে হচ্ছে মাত্র কিছুক্ষণ আগেই ওরা এখানে ছিল, তাই না?”

—হ্যাঁ, আমি ব্রেকফাস্ট রুম, ফ্যামিলি রুম, ডাইনিং হল-টল সব দেখে আসলাম। সব খালি। কাজের লোকরা কই গেল?

—নিচতলাটা কি পুরাপুরি কাভার হয়েছে?

—না, গেস্ট বেডরুম, সার্ভিস হল, স্টোর রুম, কিচেন, রিয়ার ফয়্যার এইসব বাকি আছে। আমি অ্যালিসনকে গ্যারেজগুলি আর মোটর কোর্ট দেখতে বলেছি।

“আচ্ছা, তোমরা দেখো!” বলে ডেস্কের উপর টিস্যুর বাক্স থেকে একটা টিস্যু পেপার নিয়ে চিঠিটার একমাথা ধরে সাবধানে উঠাতেই ওপরতলা থেকে জিলের চিৎকার শুনতে পেল সে। খুবই আস্তে শোনাচ্ছে, তবে, জিলের গলা, সন্দেহ নাই। ব্রায়ান আর জেরার্ড দুইজন দুইজনের দিকে এক মূহুর্তের জন্য তাকিয়ে একই সাথে দৌড়ে লাইব্রেরি থেকে বের হল। রেডিওতে জিলের ফ্যাশফ্যাশে উত্তেজিত গলা শোনা গেল একটু পরেই, যেন কেউ তার গলা চেপে ধরেছে, “বি-১০৭, ডু ইউ কপি? বি-১০৭ ডু ইউ কপি?”

—দিস ইজ বি-১০৭…।

—দোতলায় আসো এ-এস-এ-পি! সিঁড়ি দিয়ে উঠে হাতের ডান দিয়ে করিডোর ধরে হাতের বামের শেষ ঘরে। মাস্টার বেডরুম। ওভার!

—জে-২৫৬, তুমি ফিজিক্যালি ঠিক আছো? ওভার!

—পসেটিভ, ওভার!

ব্রায়ান ডেন পার হয়ে গ্রান্ড ফয়্যারের পাশ দিয়ে প্যাঁচানো সিঁড়ি ধরে দৌড়ে উঠতে উঠতে রেডিওতে মুখ লাগিয়ে বলল, “জে-২৫৬, প্যারামেডিক্স লাগবে? কেউ বেঁচে আছে? ওভার?” ব্রায়ানের পিছ পিছ দৌড়াচ্ছে কনস্টেবল জেরার্ড ফিশম্যান।

ওইপাশ থেকে জিলের গলা অদ্ভুত লাগল ব্রায়ানের কাছে, যেন ফোঁপাচ্ছে সে, “না, কেউ বেঁচে নাই। তোমরা আসো, ওভার!”

 

৬.

৯ অগাস্ট, ২০১৪

শনিবার, রাত তিনটা সাতাশ।

ডি-এস জিল হ্যারিসন দাঁড়িয়ে আছে মাস্টার বেডরুমের দরজায়।

২৪০০ স্কয়ার ফিটের ঘরটাকে ঘর না বলে ছোট সাইজের একটা রাজপ্রাসাদ বলে চালিয়ে দেওয়া যায়, ভাবল সে।

ঘরের দেওয়ালে মেডিটারেনিয়ান ঢঙের সোনালি বাদামি পেইজলির নকশা করা দামাস্ক সিল্কের ওয়ালপেপার, মাঝখানে পিংক আইভরি কাঠের কালচে বাদামি রঙের কিং সাইজ খাটের মাথায় সোনার কাজ করা। জিল হালকাভাবে হাত দিল বিছানার উপর। বিছানায় হালকা ও গাঢ় সোনালি রঙের বিভিন্ন আকারের সাটিন, ব্রোকেড ও ভেলভেটের বালিশ, সোনালি বাদামি ও কালোর বিভিন্ন শেডে ব্রোন্জের সিকুইন বসানো ডুভ্যে, সুতার কাজ করা কুইল্ট এবং ভেড়ার লোমের থ্রো, সব নিঁখুতভাবে গোছানো। দেবতা হারকিউলিসের ছবি খোদাই করা মার্বেল পাথরের চারটা গ্রিক কোরিনশিয়ান কলাম দাঁড়িয়ে আছে বিছানার দুইপাশে, তার পাশে বিস্কিট রঙ্গের দুই প্রস্থ সিল্কের পর্দার উপরের ভাগ ক্রিস্টাল আর মুক্তার টাই-ব্যাক দিয়ে বাঁধা। জিল গিয়ে দাঁড়ালো কলামের সামনে কাঠ ও কাচের বেডসাইড টেবিলের পাশে। ছাদের ফলস সিলিং থেকে টেবিলের উপর দুই পাশ থেকে ঝোলানো বিভিন্ন আকৃতির হলুদ কাচ বসানো নকশা করা কালো রঙ্গের মরোক্কান ল্যানটার্ন নিস্প্রভ সোনালি আলো ছড়াচ্ছে চারদিকে। দুইদিকের টেবিলেই একই রকম কিউপিডের মূর্তি, কাচের ভাস আর তাতে জীবন্ত ফুল, এখনো তাজা।

“নিশ্চয় এভাবে সব ফেলে রেখে বেড়াতে যায় নি ওরা!” ভাবল জিল। দেখল, বিছানার পায়ের কাছে বাঘের চামড়ার উপর চকচকে কী জানি একটা পড়ে আছে। নিচে ঝুঁকে জিনিসটা দেখল সে। সাদা সোনার চেইনের সাথে নীল রঙের হীরা বসানো ‘A’ লেখা ছোট্ট একটা লকেট। ছোট কোনো মানুষের গলার মাপে বানানো চেইন।

চেইন রেখে বিছানা থেকে উলটা ঘুরতেই তার চোখে পড়ল ফলস ওয়াল দিয়ে অর্ধেক ঢাকা দেড়শ’ ইন্চির স্মার্ট থ্রি-ডি টিভির দিকে। টিভিতে বাচ্চাদের সি-বি-বি-সি চ্যানেল মিউট অবস্থায় চলছে। নিজের মনেই সে নিজেকে জিজ্ঞাসা করলো, “কতদিন ধরে ছাড়া আছে টিভি? নিজে নিজে গরম হয়ে বন্ধ হয়ে যায় নি?” তারপর মার্বেলের ফায়ারপ্লেসের পাশে ড্রেসিং টেবিলের উপর গয়নার বাক্সের পাশে পড়ে থাকা রিমোট কনট্রোল নিয়ে বোতাম চেপে টিভি বন্ধ করতে গিয়েও কী মনে করে আবার জায়গামত সেটা রেখে দিল সে। “ফরেনসিকের লোকজন ঝামেলা করতে পারে,” হাসতে হাসতে ভাবল, “যদি সত্যিই এই বাসায় কিছু হয়ে গিয়ে থাকে।” তবে আগের চাইতে উৎকণ্ঠা অনেকটা কমে এসেছে তার। এই বাসায় চুরি বা ডাকাতি হয় নি বোঝা যাচ্ছে, গয়নার বাক্সের মুখ খোলা ডালার নিচ দিয়ে দামি পাথরের গয়নাতেও কারো হাত পড়ে নি সেটা স্পষ্ট, আর খুন-টুন হলে বাসা নিশ্চয় এরকম পরিপাটি করে গোছানো থাকত না।

কই, কোথাও তো এক ফোঁটা রক্তের দাগও নাই! যেন নিজেকে অনেকটা শুনিয়েই সে নিজের মনে বলে উঠলো, “বেড়াতেই গেছে, নিশ্চয় বেড়াতেই গেছে ওরা। বাসার লোকজনকে ছুটি দিয়ে গেছে। অথবা হয়ত কোনো বন্ধুবান্ধব অসুস্থ হয়ে পড়েছে, বা অ্যাক্সিডেন্ট করেছে, তাই কাউকে খবর দিয়ে যেতে পারে নি! হ্যাঁ, সেটাই হবে!”

বেডরুমের একপাশে মিস্টার এবং মিসেস অ্যান্ডারসনের প্রাইভেট লিভিং রুম ও বার কাউন্টার, এয়ারটাইট কাচের দরজা দিয়ে আটকানো। নিজের ব্যাখ্যায় খুশি জিল কয়েক ধাপ সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে হাতল ঘুরিয়ে দরজার গায়ে মৃদু চাপ দিল। আর সাথে সাথেই তীব্র একটা বীভৎস পঁচা গন্ধ এসে ধাক্কা দিল জিলের নাকে। দ্রুত দরজা ছেড়ে পিছিয়ে গিয়ে দুইহাতে নাক মুখ ধরে কোনোভাবে গলায় উঠে আসা বমি ঠেকাল সে।

তার দুই চোখ ভরে উঠেছে পানিতে। মাথা ঝাঁকিয়ে গন্ধটা যেন সরাতে চাইলো সে মাথা আর পেট থেকে। অদ্ভুত রকম তেলতেলে একটা গন্ধ। একহাতে নাক ধরে নিঃশ্বাস বন্ধ করে সামনে এগোলো সে কয়েক পা। বাজে কিছু একটা দেখার অপেক্ষায় খুব সাবধানে মেঝেতে পা ফেললো।

মেঝেতে পড়ে আছে লাশ দু’টা।

সে আর নিজের নিঃশ্বাস আটকে রাখতে পারল না। শ্বাস ছাড়তেই হুশ করে ঘরে আটকে থাকা গন্ধটা লাং এ ঢুকতেই আবার গলা দিয়ে বমি উঠে এল তার, বুঝল, এবার আর আটকে রাখা সম্ভব হবে না তার পক্ষে। সে দৌড়ে লিভিং রুম থেকে বের হয়ে বেডরুমের সাথে লাগোয়া বাথরুমে ঢুকে কমোডে মাথা নামিয়ে সারাদিনের সমস্ত খাবারের সাথে থুতু আর স্টমাক জুস বের করে দিল। নিজেকে সামলে বেডরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে একবার চিৎকার করল, ডিটেকটিভ কক্স? পি-সি গ্রান্ট, পি-সি ফিশম্যান, হ্যালো? ডিটেকটিভ কক্স? হ্যালো?

এরপর সুইচ টিপে রেডিওতে ফ্যাশফ্যাশে গলায় ডাকলো, বি-১০৭, ডু ইউ কপি? বি-১০৭ ডু ইউ কপি?

(চলবে)

আরো পড়ুন: নাদিয়া ইসলামের উপন্যাস ‘রকি রোড সানডে’—সাহিত্য ডটকম এ।

About Author

নাদিয়া ইসলাম
নাদিয়া ইসলাম

ফ্যাশন ডিজাইনার। লন্ডন সাউথ ব্যাংক ইউনিভার্সিটির ফরেনসিক সাইন্স থেকে পাশ করে এখন রিসার্চ সায়েন্টিস্ট হিসাবে কাজ করেন। ২০০৭ থেকে ইংল্যান্ডে আছেন। এর আগে বাংলাদেশে বসবাস করেছেন। জন্ম লিবিয়ার সির্তে। মিছুরাতায় থাকতেন। ১১ বছর বয়সে লিবিয়া ত্যাগ করেন।