ঢাকা লিট ফেস্ট নামের একটি ফেস্টিভল হয়।  এইবার তো শুরু হইতেছে শীঘ্রই, ফেইসবুকে খবর পাইয়া তাদের ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখতে চাইলাম কাহিনি কী।

কাহিনি ইন্টারেস্টিং।

বাংলাদেশী স্পিকার হিসাবে যাদের রাখা হইছে তাদের মধ্যে চোখে পড়ল অনেক বড় মিডিয়ার সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের, বাংলা একাডেমিতে চাকরি করা লোকদের, প্রফেসর…। তারা তো এমনিতেই সুযোগ পাইতেছেন তাদের কথা বলার, ক্ষমতাধর মিডিয়া ঈগল তারা, পাদপ্রদীপের আলোতে বইসা সাহিত্য করেন, যেমন শুনছিলাম ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নাকি ল্যাম্পপোস্টের আলোতে বইসা পড়তেন। (শব্দার্থ: মিডিয়া মোঘলের ছোট ভার্সন মিডিয়া ঈগল)।


মুরাদুল ইসলাম


এই অবস্থায় তাদের আরও সুযোগ দেয়া কেন।

উত্তরে কেউ  নিশ্চয়ই বলে উঠবেন ম্যাথিউ’র নীতি—

For to every one who has will more be given, and he will have abundance; but from him who has not, even what he has will be taken away.
— Matthew 25:29

সাধারণ ক্ষেত্রে এতে সমস্যা থাকত না, কারণ এই তো আল্লার দুনিয়ার নিয়ম। 🙁

কিন্তু যেহেতু এই ফেস্টিভল হচ্ছে বেশ গুরুত্ব সহকারে, এবং বাংলা সাহিত্যরে বহিঃদরবারে তুলে ধরা এর একখান উদ্দেশ্য, এবং আয়োজকদের উদ্দেশ্য মহৎ বলে ধরে নিচ্ছি,  তাই বলা যায়, আয়োজকরা বাংলা সাহিত্যরেই প্রমোট করতে পারতেন, মিডিয়াবাজি বাদ দিয়া।

আমি অনলাইন কিছু খবরে পড়লাম এই সাহিত্য ফেস্টিভল বাইরের দুনিয়ায় বাংলা সাহিত্যকে পরিচিত করাইতেছে, এই করাচ্ছে, সেই করাচ্ছে, কী বিশাল ব্যাপার-সেপার। এসব দেখে ইচ্ছা হইল দেখি ঢাকা লিট ফেস্টের জনপ্রিয়তা বা  খ্যাতি কেমন বাইরের দুনিয়ায়।

এসইএমরাশ যারা বানাইছেন তাদের ধন্যবাদ। এই টুল অনেক উপকারি। এর দ্বারা দেখা যায় কোন ওয়েবসাইট কেমন ট্রাফিক পাইতেছে আমাদের ইন্টারনেট সমাজে। ঢাকা লিট ফেস্টের সাইট দেখলাম খুবই অল্প সার্চ এঞ্জিন ট্রাফিক পাচ্ছে। সার্চ এঞ্জিন ট্রাফিক মানে গুগলে নাম দিয়ে সার্চ করে কারা আসতেছেন।

এই সংখ্যা এই সাইটের জন্য মাত্র ১৬!

মানে অনলাইনে অত জনপ্রিয় হয় নাই ফেস্টিভল। তবে আমি বলতেছি না অনলাইনই সব। নিশ্চয়ই অফলাইনে অনেক কিছু হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমার তো সেই ডেটা সংগ্রহের সুযোগ নাই। আর ফেস্টিভল শুরু হইছে বেশিদিন তো হয় নাই, এসব জিনিস ছফা যেমন বলছিলেন বিপ্লব হইল কৃষ্ণের গরু চড়ানোর মত, তেমনই ধীর।

আরেকভাবে অনলাইনে জনপ্রিয়তা দেখা যায়, ব্যাকলিংকে গিয়ে রেফারিং ডোমেইন চেক করে। কোন কোন ভাল সাইটে নিউজ হইছে এটা দেখা। এখানেও তেমন ভাল কিছু দেখা গেল না। একটা আছে এলএরিভিউ অব বুকস। আমি ভাবছিলাম যাক একটা ভাল সাইট লন্ডন রিভিউ অব বুকসে প্রকাশ হইছে। গেলাম দেখতে সেখানে এই ফেস্টিভল নিয়া কী লেখা হইছে।

সেখানে ব্লগ সেকশনে আর্টিকেল ছাপাইছে তারা। এবং সাইটটি লন্ডন রিভিউ অব বুকস নয়, লস এঞ্জেলেস রিভিউ অব বুকস।  🙁

তিন আয়োজকের সাথে সাক্ষাৎকার। শিরোনাম একটু স্বাধীনতা নিয়া বাংলা করলে এমন হয়, “কেন টিলডা সুইন্টন বাংলাদেশে? হ্যাঁ দাদা, ঠিক ধরেছেন, অবশ্যই ঢাকা লিটফেস্টে!”

এবারের (২০১৮) ঢাকা লিট ফেস্টের অন্যতম আকর্ষণ নন্দিতা দাস, টিল্ডা সুইনটন ও মনীষা কৈরালা

টিল্ডা সুইনটন কে, এই জিনিসটা আমি নিজেই জানি না। গুগলে সার্চ দিতে আর আগ্রহ হয় নাই। আপনাদের আগ্রহ হইলে গুগলে সার্চ দিয়া দেখতে পারেন। কিন্তু এটা না জানলে ক্ষতি নাই বলেই আমার মনে হয়। কত সাহিত্য আর্ট সাহিত্যিক ও আর্টিস্টরে চিনি না, তাতে তো কিছু হইতেছে না। দিন যাচ্ছে। দুই চাইরদিন আগে একজন লেখকের নাম নতুন জানছিলাম, ড্যানিল খার্ম, রাশান অ্যাবসার্ডিস্ট লেখক। জীবদ্দশায় তেমন দাম পান নাই, মরার পরে একসময় গ্রেট হইয়া ওঠেন। লেখকদের ক্ষেত্রে এইটা হয়, পুনর্জীবন যেন। এই লেখক আবার পুশকিনের অ্যানেকডোট নিয়া একটা বই লেখছিলেন, সেখানে আছে, রাশান কবি পুশকিন পাথর দেখলেই দাঁড়াইয়া পড়তেন আর পাথর ছুঁড়তেন। মাঝে মাঝে তার মুখ রাগে লাল হইয়া যাইত, তখন হাত পা নাচাইয়া তিনি ধুমছে পাথর ছুড়তে থাকতেন। এইসব তথ্য আগে জানতাম না, তখন এইগুলা না জানার জন্য কোনো ক্ষতি হইছে বলে মনে হয় না।

ফেস্টিভল ও সাক্ষাৎকারে ফিরি।

এই সাক্ষাৎকারের লিংক পাইয়া আমি নিজেরই একটু প্রশংসা করলাম। এইভাবে রেফারিং ডোমেইন ধইরা খুঁজতে না গেলে এই সাক্ষাৎকারই হয়ত পাইতাম না। এটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকার সমস্ত ফেস্টিভলটার ধরন বোঝার জন্য।

দেখলাম লেখা আছে অনেক দেশ থেকে অংশগ্রহণকারীরা আসেন, এবং এটি একটি রিমার্কেবল জিনিস। আয়োজন যে বিশাল, পয়সা যে খরচ হচ্ছে অনেক এবং এমন জিনিস যে সচরাচর হয় না, এই ব্যপারে দুনিয়ার ফেস্টিভলদের সম্পর্কে কম জানলেও আমি একরকম নিঃসন্দেহ।

আয়োজকদের সম্পর্কে অল্প তথ্য দেই, সাক্ষাৎকার থেকে পাওয়া।

আয়োজক হলেন তিনজন:

সাদাফ সায্ — তিনি একজন কবি, উদ্যোক্তা, নারী অধিকার অ্যাকটিভিস্ট।

আহসান কবির — ইনি একজন লন্ডন ভিত্তিক কবি, এবং তার একটি পি আর এজেন্সি আছে।

কে আনিস আহমেদ — তিনি একজন লেখক। ওয়ালস্ট্রিট জর্নাল ও নিউ ইয়র্ক টাইমসে লিখে থাকেন হরহামেশাই। তিনি ইউল্যাব তথা ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসের প্রতিষ্ঠাতা। ডেনভার ভিত্তিক একটি অর্গানিক চা ব্র্যান্ড টিটুলিয়ার মালিক। তিনি ঢাকা ট্রিবিউন, বাংলা ট্রিবিউনের প্রকাশক। এই কারণেই এই পত্রিকাগুলা ও ইউল্যাব থেকে ব্যাকলিংক দেখতেছিলাম ঢাকালিটফেস্টের সাইটে। আমি কোনোদিন ইউনিভার্সিটি দিলে ঐ ইউনিভার্সিটির মিডিয়া পেইজ থেকে আমার সাইটরে লিংক করে রাখব। ডট এডু ব্যাকলিংক বেশ কাজের।

ঢাকা লিট ফেস্ট
কে আনিস আহমেদ

 

ঢাকা লিট ফেস্ট
সাদাফ সায্ 

 

ঢাকা লিট ফেস্ট
আহসান কবির

সাক্ষাৎকারের প্রথম প্রশ্নের উত্তরে কে আনিস আহমেদ যা বলেছেন তা এই ফেস্টিভলের চরিত্র বুঝতে আমাদের সাহায্য করবে। তিনি বলেছেন:

to showcase Bangladeshi writing and writers to the world. We always felt that despite a vibrant literary tradition, Bangladeshi literary culture had become too hidebound. Our writers were not reading outsiders enough, let alone being in touch with them. And the world too had not done enough to ask itself, Oh, let’s go see what’s happening in the world’s seventh most spoken language!

উত্তর থেকে বোঝা যাইতেছে , বাংলাদেশী লেখকদের শিক্ষিত করাও এর একটা অংশ, যেন তারা বাইরের লেখালেখি পড়েন। কিন্তু, এটা তো তারা আগে থেকেই করতেন, এর প্রমাণ আমরা দেখতে পাই। কবিতায়, গল্পে, উপন্যাসে বাইরের প্রভাবে ও অতি প্রভাবে।

বাংলা প্রথম সার্থক উপন্যাস থেকে শুরু কইরা , এখনকার তথাকথিত মৌলিক থ্রিলার, সবই তো বাইরের প্রভাব। বাইরে থেকে রাজনৈতিক সাহিত্যও অনেক এসেছে সমাজতন্ত্রের সুদিন ও সম্ভাবনার সময়কালে। রাশান বইয়ের অনুবাদ, ইত্যাদি নিশ্চয়ই আপনারা জানেন। আর এমনিতে অনুবাদ তো কম হয় না, ঐ বাংলাতেও হয়।

ভাষা বেরিয়ার হইলে, অনুবাদে ভরসা করতে হয় বাইরের সাহিত্য পড়তে। ভাষা না বুঝলে কেউ নিশ্চয়ই সরাসরি লেকচার শুইনা বুঝবে না, বা ফেস্টিভলে গিয়া লেকচার শুইনাই ঐ ভাষায় জ্ঞানী হইয়া যাবে, আর  গড় গড় করে ইংরাজি পুস্তিকা পড়া শুরু করবে এমনও নয়।

ভাষার বেরিয়ার দূর করতে ফেস্টিভলের চাইতে ইংরাজি শেখানোর ইন্সটিটিউট করা দরকারি। আর ইংরাজদের ও অন্য ভাষাভাষীদের বাংলা শেখাইতে হবে, অন্যথায় অনুবাদই অবলম্বন।

এখন তো পড়াও হইছে ইজি ইন্টারনেটের কল্যাণে। বড় লেখকদের সাথে যোগাযোগও প্রায় করা যায়। আমিই একবার এথিক্যাল একটা ব্যাপারে পিটার সিংগারের সাথে যোগাযোগ করতে পারলাম, আরেকবার নবজাতক হত্যাজনিত  আরেকটা বিষয় নিয়ে ড্যান আরিয়ালির সাথে। কয়েকবছর আগে একবার করেছিলাম মার্ক হ্যাডনের সাথে, তাও টুইটারে। আর কারো সাথে অবশ্য দরকার হয় নাই। অন্য লোকদের যেমন ইমেইল দেই বা টুইটারে ম্যানশন করা হয়, তেমন করলেই কাজ চলে।

মূল কথা, যোগাযোগ জিনিসটা অনেকটাই ইজি হয়ে গেছে।

আপনি চাইলে ইউটিউবে গিয়া জিজেকের লেকচার, চমস্কির কথাবার্তা, ফুকো-চমস্কির বিতর্ক, টেরি ঈগলটন, দেরিদা ইত্যাদি এবং সাহিত্য ও অন্যান্য ফিল্ডের জীবিত ও মৃত অনেক রথী-মহারথীদের শুনতে পারবেন, দেখতে পারবেন। অল্প ডেটা খরচ হবে। শান্তিতে, নিজের পছন্দমত সময়ে, খাইতে খাইতে বা হাগতে হাগতে, শুনতে পারেন। নিজের সুবিধামত হইলে জ্ঞান অর্জন সহজ হয়।

এইসব শোনার জন্য ফেস্টিভল তো লাগে না।

তবে, ফেস্টিভলে যদি অতি ভাল লেকচার ইত্যাদি হয়, এবং তা দেখতে লোকে যাইতে পারে। এগুলা ইউটিউবেও দেয়া যাইতে পারে। যেমন পাকিস্তানের মিউজিকের জন্য কোক স্টুডিও, তেমন বাংলাদেশের ক্ষেত্রে লিট স্টুডিও হইলে বেশ খ্যাতি হইত। দেশ ও বিদেশের লোকেরা শুনতেও পারতেন।

কোনবার জানি ভি এস নাইপল আসছিলেন এই ফেস্টে, গতবার সম্ভবত। নাইপলরে আমার ভাল লাগে তার কথাবার্তার ধরনের জন্য, সাক্ষাৎকারে পড়ছি। স্ট্রেইট বলেন, এটা ভাল জিনিস।

তো, নাইপল আসলেন বাংলাদেশে। বাংলার মাটির সৌভাগ্য, এইজন্য আয়োজকরা অবশ্যই ধন্যবাদ পাইতে পারেন।

কিন্তু আউটকাম কী? আমাদের সাহিত্যের কী উন্নতি হইল এতে?

ভিজিবল কিছু জিনিস হইছে তা দেখছি, অনেকে নাইপলের সাথে ছবি তুলে ফেইসবুকে দিছেন। এটা আমার ভাল লেগেছে। কারণ সম্ভবত এটা তাদের সাহিত্য জীবনের সবচাইতে বড় কীর্তি হইয়াই থাকবে। কারো সাহিত্য জীবনের সবচাইতে বড় কীর্তি দেখা আনন্দিত হবার মত বিষয়ই।

আমাদের সাহিত্যের ব্যাপারে সমস্যা যদি কিছু থেকে থাকে, তা হইল এর জন্য অনুকূল কালচার আমাদের নাই। উপরে আয়োজক বলেছেন তারা কাজ করে যাচ্ছেন সংকীর্ণতা থেকে বাইর করতে, কিন্তু এইভাবে কেমনে সম্ভব?

আমাদের সাহিত্য কী হচ্ছে, কী আমরা করতেছি, কী করতেছেন আমাদের সাহিত্যের হাতি ঘোড়া জলহস্তী ও মিডিয়া মোগল-ঈগলেরা, এসব দিকে আমাদের ক্রিটিক্যালি দৃষ্টি দেয়া কি এখন দরকারি নয়?

প্রতি বইমেলায় ডায়রিয়া রোগীর গুয়ের মত অনেক অনেক বই বের হয়। এগুলার কয়টা নিয়া আমাদের মিডিয়াগুলাতে নিয়মিত আলোচনা হয়? অনলাইন অফলাইন মিলাইয়া মিডিয়া তো কম না, কেন তারা আলোচনা করে না বই নিয়া? বাইরের কান্ট্রিতে দেখেন, থ্রিলার ট্রিলার এগুলা নিয়াও পত্রিকায় লেখা হয়, আমাদের হয় না কেন?

এই কালচার কেন আমরা তৈরি করতে পারতেছি না, তা কি আমরা ভাবব না?

লিটফেস্ট তথা সাহিত্য উৎসব করার আগে কি প্রশ্ন করব না সাহিত্য কই?

যদি তা না করা যায়, তাইলে তো অবস্থার উন্নতির কোনো আশা নাই। বরং এইটি  আরেক আধিপত্যবাদী এলিটপনা হবে, সাহিত্য দলাদলির যে চল আছে তার এক বড় ভার্সন।

– – –

কভার. মঞ্চে অতিথি ভি এস নাইপলের সঙ্গে আয়োজকবৃন্দ, ঢাকা লিট ফেস্ট ২০১৬

Facebook Comments
মুরাদুল ইসলাম

মুরাদুল ইসলাম ছোটগল্প লেখেন, তিনি থ্রিলার উপন্যাসও লিখে থাকেন। তার কয়েকটি বই প্রকাশিত হয়েছে।

তিনি উইডেভস (weDevs.com)- এ বিজনেস এনালিস্ট হিসেবে মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি, বিজনেস রিসার্চ ও প্ল্যানিং বিষয়ে কাজ করে থাকেন।

তার সাইটে (https://muradulislam.me) তিনি প্রায় নিয়মিত ভাবে সাইকোলজি, সাহিত্য, দর্শন, ফিল্ম ও টেক বিষয়ে লেখা প্রকাশ করে থাকেন।

তিনি অনলাইনে কী লেখা পড়ছেন, কী বই পড়ছেন বা দেখা ভিডিও লেকচার ইত্যাদি নিয়ে একটি কিউরেটেড নিউজলেটার (https://www.getrevue.co/profile/murad) তার সাবস্ক্রাইবারদের পাঠান সপ্তাহ বা দুই সপ্তাহে একবার করে।

এছাড়া, ফিটনেস, নিউট্রিশন ও বডিবিল্ডিং ইত্যাদি নিয়ে তার লেখালেখি পাওয়া যাবে https://fitness.muradulislam.me সাইটে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here