‘লোগান’—সুপারহিরো সিনেমায় ভিন্নধর্মী সংযোজন

‘এক্স-মেন’ সিরিজের সিনেমাগুলি বলা যায় আমি বেশ শিশু অবস্থায় দেখেছিলাম। এত এত সুপারহিরো, তার ওপর কমিক বুকের সাথে পরিচিতি না থাকায় এই সিরিজের সাথে স্বচ্ছন্দ হতে কিছুটা সময় লাগে আমার।

সেই সময় আমি সবচাইতে উপভোগ করেছিলাম ‘এক্স-মেন অরিজিনস: দ্য উলভারিন’। তবে ইতিহাসের সবচেয়ে খাপছাড়া ও অন্যতম বাজে এই সুপারহিরো মুভি কীভাবে আমার প্রিয় হলো—তার কারণ সম্ভবত ‘উলভারিন’। তাছাড়া ‘প্রিক্যুয়েল’ কী জিনিস—তা বুঝতে পেরেছিলাম এই সিনেমা থেকেই। কোনো একটা চরিত্র নিয়ে একবার ধারণা দেওয়ার পরেও যে তার অতীতের কাহিনি বিশ্বাসযোগ্যভাবে প্রিক্যুয়েল হিসাবে দেখানো যায় সেটা জানলাম।

লোগান।

উলভারিনকে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ ছবি দেখার একটা বাসনাও অবশ্যই ছিল। কিন্তু ‘এক্স-মেন অরিজিনস: উলভারিন’ এর প্রায় প্রতি অনুষঙ্গেই নির্মাতারা ব্যর্থ ছিলেন। কাজেই আমার সেই মুভিকে পছন্দ করা নিতান্ত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে।

ক্যালিবান।

এক্স-মেন মূল সিরিজের পাশাপাশি উলভারিনের নিজের সিরিজও চলেছে। সেই সিরিজের দ্বিতীয় খণ্ড ‘দ্য উলভারিন’ বের হয় ২০১৩ সালে। জেমস ম্যানগোল্ডের পরিচালনায় ছবিটি অন্যান্য সুপারহিরো সিনেমার মাপে প্রায় সব দিক থেকেই পরিসরে বেশ ছোট ছিল। তাই পরিচালকের নিয়ন্ত্রণ ছিল বেশি। সেই জেমস ম্যানগোল্ডই আবার উলভারিন সিরিজের তৃতীয় ছবি নির্মাণে ফিরে এলেন। আর এইবারের ছবিতে তার নিয়ন্ত্রণ আরো বেশি স্পষ্ট।

ছবির নাম ‘লোগান’। নামটা যথাযথ। প্রত্যেক সুপারহিরোর অন্তত দুইটা নাম থাকে—একটা তার ব্যক্তিগত ও অন্যটা তার সুপারহিরো সত্তার। উলভারিনের প্রকৃত নাম জেমস হাওলেট ‘লোগান’। এই লোগান তার উলভারিন সত্তার বোঝা কাঁধে ঝুলিয়ে আক্ষরিক অর্থেই শত বছর ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রায় কোনো মানব সম্পর্কেই থিতু হতে না পেরে তার শেষ অবলম্বন হয়ে থাকে দুই হাতের ছয় নখর আর বিকৃত একটা দায়িত্ববোধ। তার দুইশ’ বছরের অতীত এতটাই বিস্তৃত ও বিচ্ছিন্ন যে সে সবের রোমন্থনে হতাশার চাইতে বিরক্তিই কাজ করে বেশি।

এই সিনেমায় কোনো স্প্যান্ডেক্স স্যুট কিংবা লেদার জ্যাকেট পরা ‘উলভারিন’ নাই। ভিলেনদের পরাভূত করে নিরীহ মানুষদের উদ্ধার করার পর আত্মগৌরবে চঞ্চল কোনো সুপারহিরো নাই। বরং আছে বিধ্বস্ত, বিরক্ত ও একেবারেই জরাগ্রস্ত ‘লোগান’।

ছবির সেটে পরিচালক জেমস ম্যানগোল্ড।

২০২৯ সালের এই পৃথিবীতে নতুন কোনো মিউট্যান্ট জন্ম নেয় নি আগের ২৫ বছরে। যারা টিকে ছিল তারাও বিলুপ্তির পথে। সেই হাতেগোনা কিছু মিউট্যান্টদের মাঝে একজন লোগান। আমেরিকার বর্ডার থেকে একদম কাছে মেক্সিকোর এক পরিত্যক্ত কারখানায় সে লুকিয়ে থাকে। সাথে থাকেন প্রফেসর চার্লস এক্সেভিয়ার ও ক্যালিবান।

নব্বই বছর পার হয়ে যাওয়া প্রায় শয্যাশায়ী প্রফেসরের দেখাশোনা করে বাকি দুইজন। ওষুধপাতি জোগাড় করার জন্য লোগান লিমুজিনের ড্রাইভার হিসাবে চাকরি করে। তার হাড়ের অ্যাডাম্যান্টিয়াম ধীরে ধীরে তার ‘হিলিং পাওয়ার’কে নষ্ট করে দিচ্ছে। ফলে বার্ধক্যের আক্রমণে সেও অসুস্থ। আর চেহারায় সেই ছাপ পড়ায় কেউ সহজে তাকে উলভারিন বলে চিনতেও পারে না।

অবশ্য মেক্সিকান এক ভদ্রমহিলা উলভারিনকে খুঁজে বের করেন। ‘লৌরা’ নামের একটা বাচ্চা মেয়েকে লোগানের দায়িত্বে রেখে আততায়ীদের হাতে মারা যান তিনি। আর তারপর লৌরাকে—যে কিনা নিজেও একজন মিউট্যান্ট— সেই আততায়ীদের হাত থেকে বাঁচানোর কাজটা অনিচ্ছাসত্ত্বেও নিজের কাঁধে তুলে নিতে হয় লোগানকে। সফরসঙ্গী হয়ে থাকেন প্রফেসর চার্লস।

‘লোগান’ সিনেমার বর্ণনায় একটা কথা বলে নেওয়াটা আবশ্যক যে— সিনেমাটা অনন্য। অনন্য, কারণ, বিশাল একটা সুপারহিরো সিরিজের অংশ হবার পরেও ‘লোগান’ অন্য কোনো সুপারহিরো মুভির মত না একদমই। হলিউডের ইতিহাসে বিখ্যাত একটা সুপারহিরোকে নিয়ে এই রকম কোনো সিনেমা এর আগে বানানো হয় নাই। তবে ‘অনন্য’ মানেই ‘সেরা’ না। কিন্তু লোগানকে নিঃসন্দেহে সেরা সুপারহিরো সিনেমাগুলির মাঝে অন্যতম ধরে নেওয়া যায়।

সামগ্রিক আবহের দিক থেকে এই সিনেমার সাথে সাদৃশ্য আছে পরিচালক এম. নাইট শ্যামালানের ২০০০ সালের মুভি ‘আনব্রেকেবল’ এর। ‘আনব্রেকেবল’ জঁনরার দিক থেকে সুপারহিরো হলেও ছবিটার কাহিনি কোনো কমিক বুক অবলম্বনে না। তাই স্টুডিও’র চাপ ও ব্যবসায়িক সাফল্যের প্রত্যাশা থেকে পুরোপুরি মুক্ত ছিল সেই ছবি। ফলে সেই সিনেমা নিয়ে আর আলাপে যাচ্ছি না। বরং ‘লোগান’ কোন কোন দিক থেকে চমক দিয়েছে তাই বলি।

‘ডেডপুল’ (২০১৬) এর সাফল্যের ধারাবাহিকতায় লোগান ইচ্ছাকৃতভাবেই ‘আর-রেটেড’ ছিল। মানে প্রচুর ভায়োলেন্স ও গালিগালাজ থাকবে এতে। নির্মাতারা সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েছেন। সমালোচক ওডি হেন্ডারসন একবার বলেছিলেন, “টনি স্টার্ককে আমার সবসময় একজন আর-রেটেড চরিত্র বলে মনে হয়েছে। অথচ কম বয়সী দর্শকদেরকে খুশি রাখার জন্য সে আর তা হতে পারে না।” উলভারিন বা লোগানের ক্ষেত্রেও আমার মন্তব্য একই রকম। আমি চাইতাম, লোগান প্রতি দুই কথায় চারবার করে এফ-ওয়ার্ড ব্যবহার করুক, মারামারির সময় মাঝে মাঝেই তার হাতের নখর দিয়ে কারো মাথার খুলি ছিন্নভিন্ন করে দিক। এই সিনেমাতে সেই চাওয়াগুলিই পূর্ণ হয়েছে।

প্রফেসর চার্লস এক্সেভিয়ার ও উলভারিন।

অবশ্য প্রদর্শনীর ক্ষেত্রে আর-রেটিংয়ের যথেষ্ট ব্যবহার থাকলেও, চিত্রনাট্যে সেই সুযোগ নষ্ট করেছেন নির্মাতারা। মার্ভেলের অন্য অনেক ছবির মতই এই সিনেমার ভিলেনও প্রচণ্ড সাদামাটা। আর সুপারহিরো মুভির জগতে ভিন্নধর্মী হলেও সামগ্রিকভাবে ছবির প্লটে নতুনত্ব নাই। কিন্তু গল্পের অনেক অংশের সাথেই দর্শকরা নিজেদের আবেগ আর অভিজ্ঞতাকে সমান্তরালে আনতে পারবেন। পরিবারের মৃত্যুপথযাত্রী দাদা-দাদি-বাবা-মা’র দেখভালের দায়িত্ব আমাদের অনেককেই নিতে হয়েছে। আবার অভিভাবক হিসাবে শিশুদের খেয়ালিপনাকেও সহ্য করে সামলাতে হয়েছে অনেকের। লোগান, প্রফেসর চার্লস আর লৌরার পারস্পরিক সম্পর্কগুলিতে সেইসব অনুভূতির অতিরঞ্জিত প্রতিফলন পাওয়া যেতে পারে।

আবার যারা সিনেমা দেখেন প্রচুর—মানে ‘সিনেফাইল’ যারা— তারা এইখানে অদ্ভুত একটা সমীকরণ মেলাতে পারেন। পরিচালক কুয়েন্টিন ট্যারান্টিনো কখনো সুপারহিরো মুভি বানালে সেটা হয়ত এরকমই কিছু হত; শুধু হিউমার ও চমৎকার সংলাপ থাকত আরো অনেক বেশি। কুয়েন্টিনের বেশিরভাগ সিনেমার মতোই এই ছবিও ওয়েস্টার্ন জঁনরার আবহে তৈরি। চরিত্রদের মাঝে ‘আনফরগিভেন’ (১৯৯২) ও ‘দ্য শুটিস্ট’ (১৯৭৬) এর মত ক্লান্তি কাজ করে। তাছাড়া সাই-ফাই অ্যাকশনের জায়গাগুলিতে চলে আসে ‘টার্মিনেটর টু’ আর ‘ম্যাড ম্যাক্স’ এর ছায়া। অ্যাকশন দৃশ্যে সিজিআইয়ের ব্যবহার দৃষ্টিকটু না। বরং চোখ ধাঁধানো হাই-অ্যাংগেল শটের বদলে অ্যাকশন ধারণ করা হয়েছে লো-অ্যাংগেল মিডশটে, অনেকটা ‘বর্ন’ সিরিজের মত। মানে সুস্বাদু জগাখিচুড়ি। সেই সাথে ট্যারান্টিনো যেভাবে নিজের সিনেমায় ক্যারেক্টারদের দিয়ে সরাসরি অন্যান্য ছবি প্রসঙ্গে আলাপ করিয়ে নেন, এখানেও তেমনি গল্পের একটা মূল অংশজুড়ে কমিক বুক নিয়ে আলোচনা চলে।

আছে সিনেমার কথাও। ১৯৫৩ সালের ক্লাসিক ওয়েস্টার্ন ‘শেইন’ এর প্রসঙ্গ এতটা জোরালোভাবে আনা হয়েছে যে, গোটা মুভির গল্পটাকেই ‘শেইন’ এর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি বলে ধরে নেওয়া যায়। পরিচালক ম্যানগোল্ড এর আগেও ২০০৭ সালে আরেক ওয়েস্টার্ন ক্লাসিক ‘থ্রি টেন টু ইউমা’ রিমেক করেছিলেন। যা মূল ছবির নির্যাস ঠিকমত ধরে রাখে। তাই ওয়েস্টার্নের ক্ষেত্রে তার অনুরাগ প্রত্যাশিতই ছিল। আসলে শেইন দেখা থাকলে ‘লোগান’ এর কাহিনিতে একেবারে নতুন কিছু দিক থেকে আলো ফেলে দেখতে পারবেন আপনি।

‘ক্যাপ্টেন আমেরিকা: সিভিল ওয়ার’ এর রিভিউতে আমি বলেছিলাম, “অনন্য অনবদ্য—এই শব্দগুলি সুপারহিরো মুভির বেলায় একসাথে আর নেওয়া যায় না।” এইবারও নেওয়া গেল না। সিনেমার এক পর্যায়ে লোগান একটা এক্স-মেন কমিক বুক দেখিয়ে বলে, “এসব পুরাই বুলশিট!” বাদবাকি বেশিরভাগ সুপারহিরো মুভির চাইতে এই সিনেমাটা এতটাই আলাদা ছিল যে, লোগানের হাতে ওই কমিক বুকের জায়গায় হয়তো এক্স-মেনের আগের কোনো মুভির ডিভিডিও থাকতে পারত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here