page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব
লাইফস্টাইল

শার্লক হোমস

দূরসম্পর্কিত এক মামার বিয়ে। আমরা গ্রামে দাদুর বাড়ি চলে গেলাম বিয়ের তিন চারদিন আগে। দাদুর বাড়ি তখন গিজ গিজ করছে লোকে। সবাই যার যার বয়েসীদের সাথে ঘুরছে, খাচ্ছে, ঘুমাচ্ছে। আমার মা ঘুরছে বউদের সাথে, কাজ করছে, রান্নাবান্না করছে, হাসিঠাট্টা করছে। বাবা ঘুরতো তার বয়সী সারাক্ষণ-গুরুগম্ভীর-আলোচকদের সাথে। দিদিও তার বয়সী ছোকরীদের সাথে সারাক্ষণ হাহাহিহিতে ব্যস্ত। বিধবা বুড়ি সব একসাথে পান ছেঁচে খাচ্ছে।

আমরা ডজন ডজন বাচ্চা একসাথে নাশতা করতাম। ভাত খেতাম। বিকালে খই মুড়ি খেতাম। আমরা পিচ্চিরা বেশ একটা স্বাধীন দল তখন। কিচিরমিচির করে করেই দিন শেষ। বিয়ের ধুমধাম আমাদের কাছে একটা বেশ পোশাক পরা ছাড়া আর কিচ্ছু না।logo paromita

আমার দাদুর বিশাল বাড়ি। এক কোণায় থাকলে আরেক কোণার খবর পাওয়া যায় না। তার মধ্যে আবার তিন বিভাগ। ডাইনিং রুম, দুইটা রান্নাঘর (একটা মাটির চুলার, একটা গ্যাসের চুলার), আর স্টোর রুম এক বিভাগে। আরেক বিভাগে বিশাল বৈঠক ঘর আর দাদুর চেম্বার (হোমিওপ্যাথ) আর একটা শোবার রুম। দোতলায় সব অতিথিদের ঘুমাবার রুম। আরেক বিভাগে উপরে পূজার ঘর আর মামাদের ঘর। সে বিভাগের নিচের রুমগুলা স্টোর রুমের মতনই ব্যবহার করা হয়।

সুতরাং যত লোকই থাকুক, ওই বাড়িতে একটু না একটু খালি জায়গা তো পাওয়াই যায়। আমার দাদু খুবই অদ্ভুত মানুষ। সে প্রথমে এম.কম পাশ করে একটা ভাল কোম্পানির অ্যাকাউন্ট্যান্ট হিসাবে যোগ দেয়। ওই চাকরি করতেই করতেই আরেকটা মাস্টার্স করে। বিষয়, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি। এরপরে হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারি পড়া শুরু করে। সে পড়াশুনাও ভালমতনই করেছে। চাকরির পাশাপাশি সেই ডাক্তারির চর্চাও করত।

দাদু: নির্মল কান্তি দাশ - লেখক

দাদু: নির্মল কান্তি দাশ – লেখক

আমরা দাদুর ডাক্তারি পাত্তা দেই না। কিন্তু তার চেম্বারখানা আমার ভীষণ পছন্দ। সেখানে বিশাল সাইজের একটা ভিআইপি চেয়ার আছে, পুরাটাই পুরু ফোমে ঢাকা। আর তার বিশাল সাইজের বইয়ের তাকে রাজ্যের বই। বেশিরভাগ বই হোমিওপ্যাথ সম্পর্কিত। তার বাইরে ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কিত বই। বাচ্চাদের জন্য এর চেয়ে হতাশাজনক বইয়ের তাক পৃথিবীর কোথাও নাই। তবুও সকালবেলা নাস্তা খেয়ে আমি ওই চেয়ারে গিয়ে শুয়ে থাকতাম। আর ওষুধের শিশি থেকে দুচারটা বড়ি খেয়ে নিতাম। ওগুলা বেশ মিষ্টি ছিল। আর খেলেও কিছুই হত না। মাঝে মাঝে স্বাদে বৈচিত্র্য আনার জন্য দাদুর মত করেই পাউডারের সাথে দু এক ফোঁটা তরল ওষুধ মিলিয়ে খেয়ে ওখানে বসে থাকতাম। গলায় স্টেথোস্কোপ। সমবয়সীরা মাঝে মাঝে আসত। ওদের হার্টবিট চেক করে দুটা মিষ্টি বড়ি খাইয়ে দিতাম। বড়রা কেউ এসব টেরও পেত না।

এইসব বিতলামি করতে করতে বইয়ের তাকটাও ঘাঁটতাম। ওই বয়সে ইসলামের ইতিহাস পড়তে কার ইচ্ছা করে? তবু কিছু তো পড়তে হবে! আমি হোমিওপ্যাথের বইগুলাই পড়তাম। সেগুলো খুব চমৎকার বাংলায় লেখা। এইসব বই ঘাঁটতে ঘাঁটতে একদিন সেখানে শার্লক হোমস সমগ্র পেয়ে গেলাম।

বেশ সুন্দর লাল মলাটের একটা মোটা বই। পড়তে পড়তে আমিও যেন লন্ডন থাকি তখন। মাঝে মাঝে ঠোঁটের কোণায় পাইপ রেখে চিন্তা করি। কে অনুবাদ করেছিল জানা নাই, চমৎকার না হলে অত ছোটবেলায় এত ভালো লাগার কোনো কারণ নাই।

খাওয়া ছাড়া সারাদিন ওই রুমে বসে বসে বই পড়তাম। কেউ কোন খোঁজও নিত না। মায়েরও সারাদিন দেখা নাই। শুধু রাতে এসে বলে যেত কোন রুমে কার সাথে কে কে ঘুমাবে। সব বাচ্চারা এক রুমেই ঘুমাবে। সাথে থাকবে কোন জাঁদরেল বুড়ি। এই এক ব্যবস্থা আমার খুবই অপছন্দ ছিল। একে তো বাবা মা ছাড়া ঘুমানো। তার ওপর আবার শয়তান বুড়িদেরকে আমাদের সাথে শোয়ানো। আমি ওরম থুরথুরি বুড়িদের দুই চোখে দেখতে পারতাম না।

বুড়িদেরকে ভালবাসতাম না আমি। ছবিতে আমি এক বুড়িকে অনিচ্ছাসত্ত্বে জড়িয়ে। আরেকপাশে আমার ছোটবোন ঈশিতা। - লেখক

বুড়িদেরকে ভালবাসতাম না আমি। ছবিতে আমি এক বুড়িকে অনিচ্ছাসত্ত্বে জড়িয়ে। আরেকপাশে আমার ছোটবোন ঈশিতা। – লেখক

কারণ বিধবা বুড়িগুলো সাদা থান পরত, ব্লাউজ পরত না। তার ওপর চুলগুলা কেমন জানি বয়কাট করে রাখত। তারও ওপর, সবার সামনে বিড়ি ফুঁকত। বাকিগুলা ঠিক আছে, কিন্তু ব্লাউজ না পড়ার কারণে, বিশেষ করে তার ওপর স্বচ্ছ সাদা কাপড় পরে ঢ্যাংঢ্যাং করে ঘুরে বেড়ানোর কারণে এদের সাথে আমি মিশতে চাইতাম না। আমার ধারণা ছিল এরা সব আসলে ডাইনি বুড়ি। এজন্যই ওদের বুকের গড়ন ওরকম ঝুলে ঝুলে পড়া। আর হায়া শরম বলেও তো ওদের কিছু নাই! সবাই নিশ্চয়ই জানে এরা মানুষ টাইপের ডাইনি কিন্তু ভয়ে কিছু বলে না।

বিয়ের দিন সাজগোজের রুমে মায়ের দেখা পেলাম। দেখামাত্রই জানিয়ে দিলাম আমি আর বুড়িদের সাথে ঘুমাব না। আমার ভাল লাগে না। আমার মার কপাল কুঁচকে গেল। কী ভাবল কে জানে! আমাকে অনেকবার জিজ্ঞাসা করল, কী সমস্যা ওদের সাথে?

আমি একসময় বলেই ফেললাম, ব্লাউজ পরে না কেন ওরা?

মা কী বুঝল জানি না। বলল, আচ্ছা যা ওদের সাথে ঘুমাতে হবে না। আজকে মনে হয় তোরা এ বাড়িতেই জায়গা পাবি না। অন্য বাড়িতে ঘুমাতে হবে।

আমি তার কথা অত পাত্তা দিলাম না। হই হই রই রই করে সময় চলে গেল। কখন যে ঘুমিয়ে গেলাম মনেও নাই।

ঘুম ভাঙল খুব ভোরে। ভোর মানে কি খুব একটা আলোই ফোটে নাই তখন। আমি চোখ খুলে দেখলাম একটা টলটলে পুকুর। কী যে সুন্দর সেই পুকুরটা! এত বছর পরেও খুব স্পষ্ট মনে পড়ে। পরিষ্কার পানি। পানির ওপরে দুএকটা কী লাল লাল ফুল ভাসছে।

সবচেয়ে ভালো বিষয় পুকুরটার কোনো পাড় নাই। উঠানের পরেই ওরম টলটলে পানি। উঠানটায় আবার একটু ঘাস, একটু মাটি। আমার ঘুম ঘুম লাগে। আবার এ স্বপ্নটাও ভাল লাগে। আরেকটু ভাল করে দেখতে চাইলাম। পুকুরের ওইপাশে লাইন ধরে বেশ কয়েকটা কলাগাছ। কলাগাছ এমনিতেই সুন্দর। তার ওপর সেগুলোর ছায়া পানিতে পড়ে পুরো জায়গাটাকেই কেমন মায়া মায়া করে ফেলেছে!

আহ স্বপ্ন! আরেকটু ভালো করে দেখি! তাই চোখ বুজলাম। চোখ বুজে দেখি সর্বনাশ! কিছু তো দেখা যায় না! চোখ খুলে ভাল করে দেখলাম। একটা বেড়ার ঘরে শুয়ে আছি। খুব সুন্দর বেড়াগুলো। যে পুকুরটা দেখতে পাচ্ছিলাম আমি, আমার এই ঘর থেকে সেখানে যাওয়ার দরজাটা একদম আমার চোখের সামনে। আমি এতক্ষণ দরজা ডিঙিয়ে পুকুরটাই দেখছিলাম।

এবার আমি সতর্ক হয়ে গেলাম। আমি এখানে আসলাম কীভাবে? আমার মামার বাড়ি তো বেড়ার তৈরি না! ওটার আশেপাশেও কোনো বেড়ার বাড়ি নাই! নিশ্চয়ই আমাকে কিডন্যাপ করেছে কেউ। খুব আস্তে করে পাশ ফিরলাম। এমনভাবে ফিরলাম যেন ঘুমের মধ্যেই পাশ ফিরছি। আবছা আবছা চোখ খুলে দেখলাম ঘরে আর কেউ নাই। খুবই সাদামাটা ঘর। ওপাশে বেড়া ছিল আর এপাশে মাটি। মেঝেতে মাদুর বিছানো। ঘরটার দেয়ালে তাক অনেক। তাকে হারমোনিয়াম, তবলা একতারা এসব গুছিয়ে রাখা। আরেকটা দরজা আছে এদিকে। দেখে বোঝাই যাচ্ছে ওই দরজা দিয়ে অন্য আরেকটা রুম। তার মানে আমি সবচেয়ে কোণার রুমে বন্দি। যাতে আমাকে এ বাসায় খুঁজতে আসলেও পাওয়া না যায়।

কীভাবে এখানে আমাকে আনা হল বুঝলাম না। অজ্ঞান করে ফেলেছিল নিশ্চয়ই! যা সর্বনাশ হওয়ার তা তো হয়েই গেছে! আমি শুয়ে শুয়ে এখান থেকে কীভাবে পালাবো ভাবছি। আর ভান করছি গভীর ঘুমের। এমন সময় একটা লোক এসে ঢুকল ঘরে। লোকটার বয়স বাইশ কি তেইশ হবে। লুঙ্গি পরা। সে এসেই আমার পাশে শুয়ে পরল। আমি তো পুরাই চোখ মুখ টাইট করে বন্ধ করে রাখলাম। নিঃশ্বাস বন্ধ। সে কী যেন গুনগুন করছিল শুয়ে শুয়ে। একটা সময় লোকটা উঠেই পরল। আমার চোখ খুলে তাকানোর সাহস হল না। পুকুরের দিকটা থেকে হাঁসের প্যাকপ্যাকানির শব্দ শুনতে পেলাম।

তার মানে আরেকটু ফর্সা হয়ে গেছে বাইরে। আমার মা বাবা কি আমাকে খুঁজছে না? কী যে করি!

এমা কী এক বিষম আওয়াজ হঠাৎ! কানে লাগে এমন কর্কশ আর ঘ্যানঘ্যানে শব্দ। একটু পরই পুরুষ কণ্ঠের আআআআ… আমার তো মাথা নষ্ট হয়ে যাওয়ার অবস্থা। এক চোখ একটুখানি খুলে দেখলাম ওই লোকটা একটা তানপুরা নিয়ে আমার বিছানাতেই বসে আছে। চোখ বন্ধ করে ওটা বাজাচ্ছে আর আ…আ…আ… করছে। বড় আজব কিডন্যাপার! তবে এটা আমার ঘুম ভাঙানোর বুদ্ধিও তো হতে পারে। আমি চোখটা আরো টাইট করে বন্ধ করে ওপাশ ফিরে শুলাম।

আমার মনে তখন ভয়ের উত্তাল সাগর। ওরা কয়জন? কী করবে আমাকে? কিডনি বেচে দিবে? সৌদি আরব পাঠাবে? উটের জকি বানাবে? আমার আম্মা আমাকে খোজে না কেন? খুঁজলেও কেমনে জানবে আমি কোথায়? ওরা কি বেচে দিবে আমাকে?

ভাবতে আমার তন্দ্রামতন এসে গেল। আর সাথে সেই লোকের গলা সাধা তো আছেই। আবার যখন চোখ খুললাম, দেখি, একটা পাখি এসে বসল পুকুরের কাছে। উফফ কী সুন্দর একটা ঝলমলে সকাল। খুব স্নিগ্ধ বাতাস। আর কেমন একটা গন্ধ বাতাসে। সেই লোক গলা সেধেই চলেছে। আশ্চর্য! এখন আর ঘ্যানঘ্যানে মনে হচ্ছে না তানপুরার আওয়াজ। এমনকি লোকটা আআআআআ করে যা করছে সেটাকেও গানই মনে হচ্ছে। আশ্চর্য মায়ার সুর! কতক্ষণ ধরে শুনছিলাম কে জানে!

হঠাৎ এক মহিলা আমাকে চমকে দিয়ে বলল, ওর তো ঘুম ভেঙে গেছে তোর আওয়াজে! আমি ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসলাম। আমার মন থেকে তখনো সন্দেহ যায় নি।

মহিলার কপালে সিঁদুর, হাতে শাখা। মাত্রই স্নান করে এসেছে বোঝা যায়। হাতে একটা চায়ের কাপ।

লোকটাকে কাপটা দিতে দিতে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আহারে বেচারা আরো ঘুমাবা? লোকটাকে মুখ ঝামটাও দিল, আরে কী শুরু করলা বাচ্চাটা ঘুমাইতে পারতেছে না, ওর সামনে রেওয়াজ করতেছো!

বাচ্চাদের ভিড়

বাচ্চাদের ভিড় – লেখক

লোকটা চা খেতে খেতে বলল, কী তোমার ডিস্টার্ব হল খুব?

আমি বললাম, না,না, আমার তো খুব ভালো লাগছে! আরেকটু গান। আর এইটার নাম কি? বীণা?

সে বলল, এইটা তানপুরা। উচ্চাঙ্গসঙ্গীত তোমার ভালো লাগতেছে! বল কী! এই বয়সে তো এগুলা ভালো লাগার কথা না!

আমি বললাম, না আসলেই ভাল। শুনি।

লোকটা অনেকক্ষণ আমাকে তার উচ্চাঙ্গসঙ্গীত শোনাল। পুরোটা সময় জেগে ছিলাম না। তাকে আমি চিনতেও পারি নি। তবু এত ভাল লাগছিল যে চুপচাপ শুনছিলাম।

লোকটা খেয়াল করল, বলল, এটা রাগ ভৈরব।

আমি তাকে জিজ্ঞাসাই করে ফেললাম, আপনি কে?

সে বলল, আমি তোমার কচি মামা। তুমি তো ক্লাবে ঢুলীদের ওখানেই ঘুমিয়ে গেছ। তোমার মা বলল তোমাকে নিয়ে আসতে তাই নিয়ে আসলাম।

আমি মনে মনে ভাবলাম, আমার মামা তাহলে আমি চিনি না কেন?

মুখে জিজ্ঞাসা করলাম, আমি কীভাবে এখানে আসছি? আপনি কে?

আমার ভাবভঙ্গি দেখে উনি হেসে ফেললেন। বলল, শার্লক হোমস পড় সারাদিন, তাই না?

আমি তো অবাক হয়ে গেলাম! কে এই রহস্যময় ব্যক্তি? সে কীভাবে জানে এত গোপন কথা? তার মানে অনেক দিন ধরেই সে আমাকে ফলো করছে!

লোকটা হেসে হেসে বলল, সারাদিন তো দাদুর চেম্বারেই বসে থাকো। কে আসল, কে গেল খেয়ালই কর না! আমি তো কত গেছি তোমাদের বাসায়! আমাকে দেখোই নি তুমি? রাতে ক্লাবেই ঘুমায়ে গেছিলা। তোমার মা বলল তোমাকে আমাদের বাসায় নিয়ে আসতে। কত কষ্ট হইছে তোমাকে কোলে করে এই বাড়িতে আনতে।

ততক্ষণে ওই মহিলাও হাজির। সে এসে মিট মিট করে হাসল। বলল, কীরে ও কি চিনতে পারছে না তোকে?

লোকটা বলল, না, ও তো ভাবছে ওকে কিডন্যাপ করে আনছি। বলেই হা হা হা করে হাসতে লাগল।

দুজনের হাবভাবে আমার সন্দেহ আরো বেড়ে গেল। আমি বললাম, আমি বাসায় যাব।

মহিলা বলল, তা তো যাবেই। নাশতা করে নাও। হাতমুখ ধুয়ে নাও।

আমি বললাম, না ব্রাশ নাই। ব্রাশ না করে নাশতা খাই না।

মহিলা বলল, ছাই দিয়ে মেজে নাও। ওই যে বাইরে ওখানে আছে।

আমি সাথে সাথে বললাম, না।

সুতরাং ওই মুহূর্তেই আমাকে নিয়ে বের হয়ে গেল সেই তথাকথিত মামা। বাড়িটা আসলেই খুব সুন্দর। কিছুটা মাটি দিয়ে তৈরি আর কিছুটা বেড়ার। সামনে আরো একটা সুন্দর টলটলে পুকুর, সেটাতে আবার শাপলা ফুটে আছে।

পথের দুধারে যেদিকে দুচোখ যায় সবুজ ধান ক্ষেত, সবুজ পুকুর কিংবা ঘাস-ভরা গরু-চরা মাঠ। কিছুদূর পরপর বাঁকা ভঙ্গিতে খেজুর গাছ।

কিছুদূর যাওয়ার পরে দেখি একটামাত্র বাঁশের তৈরি সাঁকো। বেচারা গায়ক আমাকে কাঁধে নিয়ে সে সাকোঁ পার হল। আরো মিনিট বিশেক হাঁটার পর আমার দাদুর বাড়ির রাস্তা চিনতে পারলাম। গেইটের কাছাকাছি যাওয়া মাত্র একছুটে চলে গেলাম বাড়ির ভেতর। আপন মানুষদের দেখতে পেয়ে যেন হালে পানি পেলাম। কিন্তু কোথায় কী! সবাই ব্যস্ত নতুন বউ নিয়ে। এমনকি আমার নিজের রক্তের একমাত্র মাও আমার দিকে ফিরেও তাকালো না। দুপুর পর্যন্ত যখন কেউ আমার নাশতা খাওয়ার খোঁজও নিল না, বুক ফেটে কান্না পেল আমার। এর চাইতে তো ওই শান্ত স্নিগ্ধ বাসায় ওই গানটা শুনতাম! সেই ভালো ছিল! সেখানে কতই না খাতির ছিল আমার!

গায়ক কচি মামাকে আর কোনোদিন খুঁজে পাই নাই। উনি নাকি ইন্ডিয়া চলে গিয়েছিলেন গান শিখতে। উনাদের সেই সুন্দর বাসাটাও অনেকবার খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছিলাম। খেজুর গাছ পর্যন্ত পথটা চিনি। এরপর আর যাওয়া হয় নাই। তবে মাথায় ঢুকে গেছিল উচ্চাঙ্গসঙ্গীত। তখন আমরা শুনতাম ‘তু চিজ বারি হ্যা মাস্ত মাস্ত’ আর বাংলায় ‘এটা কি 2441139?’ বলিউড, অঞ্জন দত্ত, মাইলস, জেমস, হাসান এসবের বাইরে নতুন জগত তৈরি করে এই ঘ্যানঘ্যানে সঙ্গীত। এখনো। প্রিয় রাগ ভৈরব, ভূপালি আর মেঘমল্লার। বাসার লোকজন, বন্ধুবান্ধব, প্রেমিকেরা ভীষণ বিরক্ত হয়। এ আবার কী বিষম অত্যাচার!

ওই অপহৃত ভোরটা জীবনে না আসলে হয়ত সঙ্গীতের ধারণাই এরকম হত না।

About Author

পারমিতা হিম
পারমিতা হিম

লেখক ও সাংবাদিক; এখন সময় টেলিভিশন, ঢাকা, বাংলাদেশে কর্মরত।