page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব
লাইফস্টাইল

শিক্ষায় ভ্যাটগিরি বন্ধ করেন

দেশের দুর্নীতি-টুর্নীতির সমালোচনা করতে গিয়ে বলা হত, অদ্ভুত উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ। দেশ বলতে আমাদের বাংলাদেশ। তিনি চড়ে যাচ্ছিলেন অদ্ভুত বা উদ্ভট উটের পিঠে। কোথায় যাচ্ছেন তার জানা নেই। উটেরও জানা নেই। এই হল অবস্থা।

অদ্ভুত বা উদ্ভট উটের পিঠে দেশ চড়ে যাবার ধারণাটি কবি শামসুর রাহমানের কবিতা থেকে নেয়া। এরকম আরো অনেক কবিতার কিছু লাইন দেশের অবস্থা প্রকাশে অনেকে ব্যবহার করেন। যেমন নবারুণ চক্রবর্তীর এই মৃত্যু উপত্যকা আমাদের দেশ নয়। যাই হোক, কবিতার আলোচনা করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। উদ্দেশ্য অদ্ভুত উট এবং তার পিঠে দেশ।

muradul-islam-logo

তো একটি ধূসর বালুকা প্রান্তরে হেঁটে যাচ্ছিল অদ্ভুত এক উট আর তার পিঠে ছিলেন বাংলাদেশ। এই অবস্থা দেখে সবাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু হঠাৎ অদ্ভুত উট বাংলাদেশকে বলল, “দেশ আপনি পিঠ থেকে নামেন।”

দেশ জিজ্ঞেস করল, “হোয়াই?”

অদ্ভুত উট বলল, “আপনি আমার চেয়েও বেশি অদ্ভুত হয়ে গেছেন। আপনাকে এখন বলা যায় মহা অদ্ভুত। তাই আপনি পিঠ থেকে নামেন, আমি আপনার পিঠে চড়ব।”

এরপর উটের পিঠ থেকে নেমে গেল স্বদেশ। তার স্বদেশের পিঠে চড়ে বসল অদ্ভুত উট। অদ্ভুত উটকে পিঠে নিয়ে চলতে লেগেছে মহা অদ্ভুত স্বদেশ।

এবং এজন্যই হয়ত ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনে পুলিশ গুলি ছুঁড়ছে। এছাড়া আর কী কারণ থাকতে পারে নিরীহ ছাত্রছাত্রীদের গুলি করার পিছনে? এ যেন এক ডিস্টোপিয়ান ফিকশনের গল্প। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকার সাড়ে সাত পার্সেন্ট ভ্যাট বসিয়েছেন। এর বিরুদ্ধে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীরা আন্দোলন করছেন কিছুদিন ধরে। তাদের অনেকে স্মারকলিপি দিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীকে মা ডেকেছেন। কিন্তু ভ্যাট তুলে নেয়া হয় নি। গতকাল (৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৫) ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রীদের ভ্যাট বিরোধী আন্দোলনে পুলিশ গুলি ছুঁড়েছে। আহত হয়েছেন ত্রিশজন বলে জানা গেছে জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোর মাধ্যমে।

ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনে পুলিশের গুলি আমাদের জন্য এক বড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন হয়। সে বছর ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানের পুলিশও এদেশের ছাত্রদের আন্দোলনে গুলি করে ছিল। সেই একুশে ফেব্রুয়ারিকে দেখা হয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার অর্জনের অন্যতম বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে। আমাদের দেশে প্রতি বছর ঘটা করে পালন করা হয় একুশে ফেব্রুয়ারি। শহীদ মিনার ফুলে ফুলে ছেয়ে যায়। আমাদের দেশের লোকেরা যখন ভাষা আন্দোলনে ছাত্রদের উপরে পুলিশের গুলির অংশ পড়ে তখন তাদের মধ্যে পাকিস্তানি শাসকদের উপর ঘৃণার সৃষ্টি হয়। সরকার কী চায় সেই একই ধরনের ঘৃণার জন্ম হোক তাদের উপরও? যে সরকার নিজেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক ও বাহক মনে করে তাদের আমলে কেন ছাত্রছাত্রীদের উপর পুলিশের গুলি করার মত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী কাজ হবে?

muhit-128

সরকারের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত (জন্ম. ১৯৩৪)

প্রাইভেট ভার্সিটিগুলোতে এমনিতেই বেতন বেশি থাকে। এর মধ্যে আরো সাড়ে সাত পার্সেন্ট সরকারী ভ্যাট মেনে নিতে পারছেন না ছাত্রছাত্রীরা। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চহারে বেতন নেয়ার অনুপাতে ছাত্রছাত্রীদের পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা দেয়া হচ্ছে কি না সেটা ভালোমত তদারকি করা সরকারের দায়িত্ব ছিল।

কিন্তু সরকার সেটা কতটুকু করতে পেরেছে? ইউজিসি বিভিন্ন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়কে কিছুদিন পর পর ক্যাম্পাসের জন্য রেড এলার্ট দেয়, কিন্তু সেসব ইউনিভার্সিটি দেখা যায় ক্যাম্পাস ছাড়াই বহাল তবিয়তে কার্যকলাপ চালাতে থাকে। কয়েক বছর পর ইউজিসির রেড এলার্ট যেন নাই হয়ে যায়। অনেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় মোটা অংকের টাকা নিলেও ছাত্রছাত্রীদের ল্যাবসহ আরো অনেক সুবিধা দিতে পারছে না।

কিছু ক্ষেত্রে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে সার্টিফিকেট বিজনেস, নিম্নমানের শিক্ষা পদ্বতি ইত্যাদি বিভিন্ন অভিযোগ আছে জনমনে কিন্তু সেগুলো দেখভাল করার দায়িত্ব সরকারের। কারণ জনগণকে প্রতারনার হাত থেকে বাঁচানো সরকারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

stamford-u

স্টামফোর্ড ইউনিভারসিটি শান্তিনগর-বেইলি রোড-কাকড়াইল আটকে দিয়েছে। – ছবি. ১০/৯/২০১৫ Private University Students Alliance of Bangladesh – PUSAB

দেশে ঋণখেলাপির সংখ্যা এবং খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। বাংলাদেশে ঋণখেলাপি, অর্থ পাচারের মতো অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের কুপ্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মইনুল ইসলাম। তিনি বলেন, “৫০ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণের যে হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংক দিচ্ছে, প্রকৃত পরিমাণ এর চেয়ে অনেক বেশি। অবলোপন করা ঋণ আর মন্দ ঋণগুলোর সুদ-আসলসহ হিসাব করা হলে তার পরিমাণ হবে কমপক্ষে দুই লাখ কোটি টাকা।”

ঋণখেলাপিরা রাজনৈতিক এবং আরো বিভিন্ন ধরনের প্রভাব খাঁটিয়ে যেখানে এত টাকা মেরে দিচ্ছেন সেখানে টাকার জন্য শিক্ষার উপর কর বসানো কেন? এই খেলাপি ঋণের টাকাগুলো সংগ্রহ করলেই তো টাকার চাহিদা মিটে যায়। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে সাড়ে সাত পার্সেন্ট ভ্যাট দিয়ে যে টাকা পাওয়া যাবে এর চেয়ে খেলাপি ঋণের পরিমান বেশি হবে।

প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা মাঠে নামতে একরকম বাধ্য হয়েছেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এরকম ভ্যাটগিরি দেখাতে গেলে অনেক আগেই দেশ উত্তাল হয়ে যেত। এর কারণ পাবলিকে ছাত্র রাজনীতি আছে। ফলে ছাত্রছাত্রীরা সহজে সংঘটিত হতে পারেন। প্রাইভেটে কিছুটা দেরি হলেও ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের অধিকারের জন্য পথে নামতে পেরেছেন। আশা করা যায়, এতে সব প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের অধিকার সচেতনতা বাড়বে।

অনেক জায়গায় দেখলাম প্রাইভেট-পাবলিক বিতর্ক হচ্ছে। আন্দোলনকারীদের এই ফাঁদে পা দেয়া উচিত হবে না। প্রাইভেট-পাবলিক বিতর্ক একটা ফাও বিষয় এবং অবসর বিনোদনের জন্য তা কেউ করলে করতে পারেন অন্য কোনো সময়। এখন এরকম ফাও তর্ক করার কোনো মানে হয় না। যে অধিকার আদায়ের আন্দোলনে প্রাইভেটের ছাত্ররা নেমেছেন সেখানে দেশের সব ছাত্রছাত্রীদের সমর্থন প্রয়োজন। এবং শিক্ষা ব্যবস্থার উপর কর সাধারণত কোনো ছাত্রছাত্রীই মেনে নিবেন না। অনেকে বলতে পারেন প্রাইভেটের শিক্ষার্থীরা তো শিক্ষাকে পণ্য মেনে নিয়েই প্রাইভেটে ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে যে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের বিস্তার হচ্ছে তাতে সব শিক্ষাই পণ্য। সেটা প্রত্যক্ষভাবে যারা মানতে চান না তারা পরোক্ষভাবে মানেন। এবং সে জন্য প্রাইভেটের শিক্ষার্থীদের উপর অহেতুক ভ্যাটের বোঝা চাপানোর যৌক্তিকতা তৈরি হয় না। এটা অন্যায় হয়।

প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর সাড়ে সাত পার্সেন্ট ভ্যাট প্রত্যাহার করা হোক। কালের কণ্ঠে আব্দুল গাফ্‌ফার চৌধুরী একটা উপসম্পাদকীয় লিখেছিলেন ব্রিটেনের উচ্চশিক্ষা নিয়ে। লেখাটার শিরোনাম ছিল ‘উচ্চশিক্ষার জন্য সম্মান বিক্রি’। সেখানে তিনি লিখেছিলেন ব্রিটেনে উচ্চশিক্ষার ব্যয়ভার বহন করতে গিয়ে সেদেশের মধ্যবিত্ত ঘরের অনেক তরুণী বয়স্ক লোকদের মিস্ট্রেস হয়ে যাচ্ছে। বুড়া লোকদের শয্যাসঙ্গীনি হয়ে তারা পড়ালেখার খরচ সংগ্রহ করছে। এটা ভালো জিনিস না। এইরকম অবস্থা হওয়ার কারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অত্যধিক শিক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি।

শিক্ষাটাকে অন্তত ভ্যাটমুক্ত রাখেন। প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি যাতে নিজের মর্জিমতো বেতন না বাড়াতে পারে তাও দেখে রাখেন। মাননীয় সরকার।

আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, চাপাতিতন্ত্র, র‍্যাশনাল-মৌলবাদী প্রতিক্রিয়াশীলতার উদ্ভবের ফলে আমাদের দেশ একটি কমপ্লেক্স গোথাম সিটি হবার দিকে যাচ্ছে। এ অবস্থায় আমাদের একজন ব্যাটমানের দরকার, ভ্যাটম্যান নয়।

About Author

মুরাদুল ইসলাম
মুরাদুল ইসলাম

জন্ম. জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ, সিলেট। প্রকাশিত বই 'মার্চ করে চলে যাওয়া একদল কাঠবিড়ালী', 'গ্যাডফ্লাই', 'কাফকা ক্লাব', 'রাধারমন এবং কিছু বিভ্রান্তি' ইত্যাদি। ওয়েবসাইট: muradulislam.me