সম্ভবত বাংলা ভাষাতে এমন শক্তিশালী বিজ্ঞান কল্পগল্প আর লেখা হয় নি।

আমার ধারণা বাংলাভাষাতে যত লেখক কল্পবিজ্ঞান লেখেন, তাদের মধ্যে একেবারে আলাদা হলেন শিবব্রত বর্মন ওরফে আমাদের শিবুদা। শিবুদার সঙ্গে আমার পরিচয় দুই দশকের বেশি। আমরা একসময় ‘ভোরের কাগজে’ কাজ করেছি। পরে শিবুদা টেলিভিশন করে এখন আবার ‘প্রথম আলো’তে ফিরে এসেছেন।

এবারের বইমেলার যে বইটি প্রথম আমি পড়েছি সেটি তার ‘বানিয়ালুলু’। ১১টি বিজ্ঞান কল্পকাহিনী। সম্ভবত বাংলা ভাষাতে এমন শক্তিশালী বিজ্ঞান কল্পগল্প আর লেখা হয় নি।

‘প্রতিদ্বন্দ্বী’র কথা ধরা যাক। সময় পরিব্রাজন নিয়ে বেশিরভাগ লোকের ধারণা মানুষের পক্ষে সময়ের অলিগলিতে ঘুরে বেড়ানো সম্ভব নয়। কারণ হিসাবে তারা খুব সাধারণ একটা যুক্তি দেন — আচ্ছা, আমি যদি অতীতে গিয়ে আমার বাবাকে মেরে ফেলি, তাহলে এখন আমি আসব কোথা থেকে?

এই জায়গাটাতেই লোকেরা ভুল করে। এখন হচ্ছে মাল্টিভার্সের ব্যাপার, বহু দুনিয়ার ব্যাপার। প্রত্যেক ঘটনা থেকে হাজার হাজার ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকে। এর থেকে একটা হয়ে আমরা সময়ের সামনের দিকে আসি (অথবা কে জানে সময়ের সামনে পেছন বলে আসলেই কিছু আছে কিনা?)। কিন্তু অন্যরকমও হতে পারে। স্মরণ করুণ — ‘ব্যাক টু দি ফিউচার’ – এর প্রথম পর্বের কথা। যেখানে নায়কের অতীতের বাবা-মার প্রেমের ব্যাপারটাই ছুটে যাচ্ছিল। ঠিক তখই আমাদের নায়ক প্রায় মুছে যাচ্ছিল। কাজে সে কায়দা করে তার বাবা-মার প্রেমের ব্যবস্থা করে, নিজেকে বাঁচানোর জন্য। যদি সেটা না হতো, তাহলে আসলে তেমন কিছুই হতো না। তখন তথাকথিত ‘বর্তমান’ সময়ে আমাদের নায়ককেই আমরা পেতাম না।

মানে দাঁড়ালো হাজার হাজার অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ চক্রের যেটাতে আমরা আছি সেটাই আমরা জানি। আমাদের সমান্তরালে হাজার হাজার আরও দুনিয়া আছে। সেগুলোর খবর তো আমরা জানি না। তবে, ভবিষ্যতে যাওয়াটা কিন্তু অতীতে গিয়ে বাবাকে মেরে ফেলার মতো জটিল নয়। কাজে, একটা লোক সহজে ভবিষ্যতে যেতে পারবে। যেমন আমি পারি। আমার টাইম মেশিনে আমি ভবিষ্যতে গিয়ে ফেরৎ আসতে পারি।

এ গল্পে শিবুদা এরকম একটা লোকের কথা বলেছেন। কিন্তু পুরো ব্যাপারটা ভেঙে বলেন নাই। কিন্তু আমি কেমনে বুঝে ফেললাম? এটা ধরতে গিয়ে টের পেলাম এই গল্পটা আমার কেমন জানি চেনা চেনা। আমার খটকা আর যায় না। আমি ভাবলাম টাইম মেশিনে চড়ে আমার ধারণা সত্যি কিনা সেটা দেখে আসবো। এত সুন্দর গল্প। এত চমৎকার গাঁথুনি। পড়তে পড়তে আমি প্রায় প্রতিটি দৃশ্যই দেখতে পাচ্ছিলাম। এমনকি গল্পের কথক যে হালকা সবুজ রঙের পাঞ্জাবী পরেছেন। চুঘতাই-এর শার্টের রঙ। বাসার কাঠের টেবিলের একটা পায়া একটু ছোট, সেজন্য তার নিচে কাগজ দিয়ে সেটিকে সামলে রাখা হয়েছে। চুঘতাইকে দেখলাম ম ব্লা কলম দিয়ে লেখেন। তার ঘরের কোনার বারান্দাটাও আমি দেখে ফেললাম। এমনকি পুলিশ যখন লুধিয়ানির লেখার ঘরের দরজা ভাঙছে তখনও আমি সব পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেটকে দেখে ফেলেছি। তারপরই আমি বুঝতে পারলাম খটকাটা কোথায়। এ গল্পের সব কিছু কেন আমার এত জানা? আমি যা ভাবছি সেটাই কি সত্য? পড়া শেষ করেই তাই আমি আমার স্টাডিতে গিয়ে ঢুকলাম। আমাকে যেতে হবে ২০২২ সালে ২২ নভেম্বরে। ঠিকঠাক হাজির হয়ে গেলাম নিজের পড়ার ঘরে। দেখলাম একটা নতুন গল্প লিখে ভবিষ্যতের আমি ইজি চেয়ারে দোল খাচ্ছি। এখনকার আমি ধীরে ধীরে লেখার টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। যা ভেবেছি তাই। কম্পিউটারের পর্দায় যে গল্পটি দেখা যাচ্ছে সেটার নাম দূর থেকেও পড়া যাচ্ছে — প্রতিদ্বন্দ্বী।

কিংবা আর একটি গল্পের কথা বলা যাক। এই গল্পে দেখা যাচ্ছে একই লোক একই সময়ে একাধিক জায়গায় থাকেন। এটা কীভাবে সম্ভব? সম্ভব যদি আপনি অজস্র দুনিয়াকে ওয়ার্মহোল দিয়ে কানেক্ট করতে পারেন। এমনকি তখন একাধিক ঘটনা একসঙ্গে ঘটতে পারে। কিন্তু ওয়ার্মহোল দিয়ে যদি দুইটি দুনিয়া কানেক্ট হয় তাহলে তাদের ইন্টারফেস কী হবে। এটি কিন্তু একজন শিল্পীর একটা ক্যানভাস হতে পারে। ওপারেও একজন থাকতে পারেন। একজন এ পাড়ে আঁকছেন আর আর একজন অন্য পাড়ে আঁকছেন। যেমনটা শিবুদা লিখছেন দুই শিল্পীর গল্পে।

এই যে আমি নানা জায়গায় বক্তৃতা দিয়ে বেড়াই মানুষের সঙ্গে কুত্তা-বিলাই-এর পার্থক্য হলো বই। সেই আমিই তো এখন চিন্তিত যে কোটি কোটি পাতার উইকিপিয়াকে কেমন করে ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করা যাবে? কারণ আমাদের ফ্লোরে শুভ’র কম্পিউটারের মতো সব ডেটাই তো করাপ্ট হতে পারে। তাহলে সেটা কেমন করে রক্ষা করা যাবে? হুম, তখন আপনি ডিএনএ কম্পিউটার বানাতে পারেন বা ডিএনএ স্টোরেজ। সেগুলোকে প্রকৃতিতে রেখেও দিতে পারেন।

বাকি গল্পগুলো সম্পর্ক আমি আর না বলি। শিবুদার গল্পের শেষ লাইনটা হয় সবচেয়ে বেশি ডেনজারাস। আপনার মনে হবে — এ আমি কী পড়লাম। একাধিক সময়কে একসঙ্গে জোড়া দিয়ে একটা মহাজাগতিক বিভ্রম এর আগে এ দেশে কোনো  লেখক তৈরি করতে পেরেছেন কিনা আমার জানা নেই।

গল্পগুলোর বেশিরভাগই আগে কোনো পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। বই-এ যুক্ত করার সময় কিছু কাজ করার দরকার ছিল, সেটি ততটা যত্নে করা হয় নি। যেমন নামগল্পে “গত এপ্রিলে”-র থেকে যাওয়া। বোঝাই যাচ্ছে পত্রিকার পাতাতে এটি প্রাসঙ্গিক ছিল। “গত” শব্দটা বাদ দিলেই হয়তো ঠিক হতো।

বইটা প্রকাশ করেছে বাতিঘর। এবং এটি সম্ভবত এবছর যত সায়েন্স ফিকশন প্রকাশিত হয়েছে এবং হবে তার মধ্যে সবার সেরা।

বইমেলায় বাতিঘরের স্টল ১২১-১২২ নম্বর।