page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব
লাইফস্টাইল

সন্তান, সম্পর্ক এবং স্বার্থ

আমার মেয়ে হওয়ার পর প্রথমবার যখন তাকে নিয়ে দেশে যাচ্ছি, ছোট বাচ্চাসহ কাপলদেরকে প্লেনের সিটগুলোর একদম সামনের দিকে যেখানে বেবি বেসিনেট লাগানো যায় ওখানে বসতে দিয়েছে, আমাদেরকেও দিলো।

আমাদের পাশে বসা কাপলটার পিচ্চিটা দেখি খুবই কিউট।

এই ছোট্ট পিচ্চিটাকেই তারা হাতে চুড়ি পরিয়েছে, কানে দুল দিয়েছে, পায়ে নূপুর লাগিয়েছে। পিচ্চি নড়লেই তার গায়ের ছোট্ট ছোট্ট জুয়েলারিগুলাও ঝুন ঝুন করে বাজে, ভালই লাগে।

পাশেই বসা, এত লম্বা জার্নি, কথায় কথায় কথা হলো। তারা ইন্ডিয়ার কেরালা থেকে এসেছে অরিজিনালি। আমাদের মতই সিডনিতেই থাকে। তারাও তাদের বাচ্চাকে প্রথমবারের মত নিয়ে যাচ্ছে দেশে।

farjana mahbuba logo

আমার জামাই তাদের বেবিটাকে আদর করে বললো, “শী’জ রিয়েলি কিউট।”

কাপলটা হেসে জানালো, বেবিটা ‘শী’ না, ‘হি’!

বাচ্চাটা ছেলে!

আমাদের হতভম্ব চেহারা দেখে তারা ব্যাখ্যা করে বোঝালেন, যেহেতু বাচ্চাটা ছেলে, তাই দেশে অনেকের নজর লেগে যেতে পারে। মানুষের হিংসা থেকেই তো নজর লাগে। এজন্যে মেয়ে সাজিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তারা। মেয়ে হলে তো নজর দেয়ার কিছু নেই!

পৃথিবীতে চরম সুন্দর দু’তিনটা জিনিসের লিস্ট করলে আমি তারমধ্যে একটা বলবো ‘মাতৃত্ব’ (এবং পিতৃত্ব)। একটা মেয়ের জীবনে এরচে’ সুন্দর কিছু হতে পারে না।

কিন্তু এই দুর্লভ রকমের চরম সুন্দর মাতৃত্বই পৃথিবীর সবচে কুৎসিত বিষয় হয়ে দাঁড়ায় যখন মানুষের জীবনের এই একমাত্র স্বার্থহীন, পিওর ভালবাসার সম্পর্কটা (মা[বাবা] এবং সন্তান) দেয়া-নেয়া’র সম্পর্ক হয়ে দাঁড়ায়।

বিশেষ করে ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্টে (বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান), ইন জেনারেল, ছেলে সন্তানের প্রতি অবিশ্বাস্য রকমের যে মোহ কাজ করে পরিবারগুলোতে, তা প্রায় সময়ই এতই কুৎসিত আকার ধারণ করে যে সহ্য করা মুশকিল।
এবং এর পিছনে অন্যতম একটা কারণ হলো ঐ ছেলে সন্তান হওয়া বা না হওয়ার উপর ঐ মা’র নিজের জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কিছু ডিপেন্ড করা।

আমাদের সমাজের কনটেক্সটে ছেলে সন্তান ঐ মাকে তার শ্বশুড়বাড়িতে অনেকটা ‘বৈধতা’ দেয়ার মত। কারণ ছেলে সন্তান হওয়া মানে ঐ মা এখন ঐ “বংশের” অংশ হয়ে গেল। এই ছেলে তার শ্বশুড়বাড়ির বংশের কর্ণধার।
মেয়ে তো ‘বংশের’ বাতি জ্বালায় না, অতএব, মেয়ে হওয়া মানে ঐ মার জন্য এক ধরনের পরাজয়।

bond-5

মা ও মেয়ে

শুধু তাইই না, যেহেতু আমাদের সমাজে একটা মেয়ে জন্ম থেকে প্রথমে বাবা-ভাই, তারপর জামাইর উপর পরনির্ভরশীল, তাকে বাচতে হলে তার একটা ছেলে হতেই হবে। নাহলে জামাইর পরে তার দেখাশোনার ভার কে নিবে?

এই ‘খুব স্বাভাবিক’ সমাজ-বোধেরই অন্যতম একটা প্রকাশ হলো মেয়ের বিয়ের পর মেয়ের বাবা-মা কখনোই তার মেয়ের শ্বশুড়বাড়িতে গিয়ে এক/দু’দিনের বেশি থাকে না।

এমনকি কারো যদি ছেলে না থাকে, ধরে নিন তাদের একটা মেয়ে, সেই মেয়ে স্বচ্ছল এবং জামাই সন্তান নিয়ে একলা থাকে, মেয়ে যদি জানও দিয়ে ফেলে তারপরও ঐ বুড়ো বাবা-মা মেয়ের বাসায় গিয়ে পার্মানেন্টলি থাকবে না।

কারণ সমাজ তখন আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে বলবে, ঐ দেখো, ছি! ছি! শেষকালে মেয়ের ঘাড়ে বসে খাচ্ছে!

কিন্তু ছেলের ক্ষেত্রে পুরো উলটো।

কোনো কারণে ছেলে যদি দূরে থাকে বা বাবা-মাকে নিজের কাছে এনে রাখতে না পারে, তাহলেই সেরেছে, সমাজ তাকে প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয় সে একটা অক্ষম! অকর্মণ্য! অপদার্থ!

অতএব, একজন মার জন্য অন্ততঃ একটা ছেলে তো মাস্ট!

আব্বার (আমার শ্বশুরের কথা বলছি) সাথে আমার খুব আড্ডা জমে।

যখন দেশে থাকতাম, ভার্সিটিতে ক্লাস না থাকলে রাশভারি আব্বা নিজেই একেকদিন দুপুরে খাওয়ার পরে বা বিকেলে রুমে এসে বলতেন, “আসো মা, তোমার সাথে দুইটা কথা বলি।”

আব্বার অনেক প্রশ্ন।

কিন্তু কোনো এক বিচিত্র কারণে আব্বার কোনো মতের সাথেই আমার মত মিলে না।

কথা বলতে বলতে মসজিদে যাওয়ার সময় হয়ে এলে আব্বা উঠে যেতে যেতে সবসময় যা বলেন তা হলো: উম, তোমার অনেক কথার সাথেই আমার দ্বিমত আছে মা। তোবে তোমার কথায় চিন্তা করার অনেক কিছু আছে।

যতই দ্বিমত থাকুক, আমি বুঝতাম আব্বা আমার সাথে কথা বলে মজা পান।

কিন্তু শুধুমাত্র একবার তিনি খুব মন খারাপ করে উঠে গিয়েছিলেন। যেদিন আমি বলেছিলাম, আমি বংশ-প্রথায় বিশ্বাস করি না।

আব্বা খুব করে বোঝাতে চাইছিলেন বংশ কেন দরকার। এবং বংশের প্রভাব যে কতটা সত্যি।

কিন্তু আমি বোঝাতে চাইছিলাম এই বংশ-প্রথা একটা মেয়ের জীবনের জন্য কতটা ভয়ঙ্কর!

আর ইসলাম যতটুকু বুঝেছি তাতে ইসলাম বংশ-প্রথাকে শুধু ধ্বংসই করে দিতে চায় নি, এই গোত্রীয়-বংশীয় সমাজবোধ যেন সমাজে ফিরে আসতে না পারে তার জন্য রাসূল (সঃ) যা যা করা দরকার সব করেছেন।

সেই একবারই আব্বার খুব মন খারাপ হয়েছিল।

আমি তাই বংশ নিয়ে আব্বার সাথে আর কোনোদিন কথা তুলি নি। কথা উঠলেও এড়িয়ে গেছি।

আমি প্রায়ই ভাবতাম, হয়তো আব্বারা ট্র্যাডিশনাল মানুষ। সোজা কথায়, আগের জমানার মানুশ। বংশ এবং বংশীয় ধারণা, বোধগুলো উনাদের জীবনের সাথে এতটাই ওৎপ্রোতভাবে জড়ানো যে একে মুছে ফেলা সম্ভব না। কিন্তু অবাক না হয়ে পারি না, যখন দেখি আব্বাদের বয়সের মানুষেরাই না, আমাদের বয়সের মানুষদের মধ্যেও এসব ধারণা এখনো হাজার বছরের পুরানো বটগাছের শেকড়ের মতই শক্ত!

এক বান্ধবীর সাথে অনেক অনেক অনেক বছর পর ফেসবুকে দেখা।

প্রায় দশ বছর পর!

খুব উচ্ছাসের সাথে একজন আরেকজনকে বর্তমান অবস্থা জিজ্ঞেস করছি।

শুরুতেই দোস্ত জিজ্ঞেস করলো, বান্ধবী তোর বাচ্চা কয়টা?

বললাম, একটা।

সাথে সাথে প্রশ্ন, ছেলে না মেয়ে?

একটু থমকে গেলেও বললাম, মেয়ে।

আমি তাকে আর কিছু বলার আগেই দোস্ত দেখি তার ছেলের ছবি এটাচ করে দিয়ে লিখলো, দেখ, এইটা আমার ছেলে!

প্রায় আধাঘণ্টা ধরে কথাবার্তার প্রায় অনেকটুকু জুড়েই তার ছেলের গল্প। বুঝলাম, এক ছেলে নিয়ে বান্ধবীর সুখের সংসার।

যা হোক, বললাম, পরে কথা হবে নে। যাই।

দোস্ত বললো, দাঁড়া! দাঁড়া! তুই তো তোর দুলাভাইকেই দেখলি না! একটা ফ্যামিলি ছবি পাঠাই।

ফ্যামিলি ছবি এটাচ হয়ে এলো।

অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ছবিতে ফুটফুটে মেয়ে তিনটা কে?

দোস্ত বললো, আমার তিন বড় মেয়ে।

দোস্তকে অনেক ছোটবেলা থেকেই চিনি।

তার পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ডও খুব ভাল করেই জানি। জানি তার নিজের পরিবারে তার এক চাচা বউর দুই মেয়ে হওয়ার পর আরেকটা বিয়ে করেছে শুধুমাত্র বউর ছেলে না হওয়ার অপরাধে।

কাউকে আমাকে বলে দিতে হলো না, কেন দোস্ত এত বছর পর কথায় শুধু তার ছেলের গল্প জুড়ে দিচ্ছিল বার বার! কেন দোস্ত আধাঘণ্টার আলাপে একবারও তার মেয়েদের কথা বলতে খেয়াল করল না! তিন মেয়ের পর এই এক ‘যাদু’ ছেলেটা তার জীবনের জন্য কতটা ভয়ংকর রকম প্রেসাস!

সেদিন আরেকজনের কথা শুনলাম, উনার চার মেয়ের পর এক ছেলে। সেই ছেলেকে ছেলের বয়স প্রায় পাঁচ বছর হওয়া পর্যন্ত, অর্থাৎ স্কুলে যাওয়া শুরু করা পর্যন্ত কোথাও নিতেন না। বাইরের কোনো মানুষ বাসায় আসলে ছেলেকে সামনে আনতেন না।
এবং খুব ‘বিশ্বাসযোগ্য’ কাহিনীও শুনলাম, ছেলেকে বাইরের মানুষ দেখলেই ছেলের নজর লেগে যায়! ছেলে অসুস্থ হয়ে পরে!

আগেরকালের ক্লাসিক বইগুলোতে ‘অসূর্যস্পর্শা’ মেয়েদের কাহিনী পড়েছি। ঐ ভাবির ‘অসূর্যস্পর্শা’ সেই ছেলের কাহিনী শুনে ভাবছিলাম, চার মেয়ের পর এক ছেলে যদি পরিবার আর সমাজের কাছে বৈধতা এনে দিতে পারে, সে ছেলেকে অমন একটু-আধটু মানুষের নজর এড়িয়ে রাখলে দোষ দেখতে নেই!

আমার মেয়েটা পেটে আসার পর আমি জানতাম আশেপাশের অনেকেই খুব চায় আমার একটা ছেলে হোক। কিন্তু কেউ মুখ ফুটে আমাকে সরাসরি বলার সাহস করে না। কিন্তু তিনজন মানুষকে, তাদেরকে আমার নিজের বুঝতে চাওয়ার অংশ হিসেবে, জিজ্ঞেস করেছিলাম তারা আমার কী সন্তান হোক চায়।

তাদের মধ্যে একজন উত্তর দিয়েছিলেন, ছেলে হোক বা মেয়ে, প্রথম সন্তান তো প্রথম সন্তানই!

দ্বিতীয় বাচ্চা পেটে আসার পর আমি আর কাউকেই জিজ্ঞেস করি নি।

কারণ আমাকে কাউকে বলে দিতে হবে না যে, প্রথম সন্তান তো প্রথম সন্তানই বলার অর্থ হলো প্রথম সন্তান মেয়ে হলে সমস্যা নেই। কিন্তু দ্বিতীয়টা ‘অন্ততঃ’ ছেলে হোক।

প্রথম সন্তান হওয়ার আগ পর্যন্ত, পরিচিত কারো এমন বাপের জন্মের সাহস হয় নি আমাকে বলে ‘ছেলে হোক এই দোয়া করি’, একমাত্র আমার দাদি ছাড়া! ফোনের মধ্যে দাদি চাটগাইয়্যা ভাষায় বলেই বসেছিলেন, ও নাতি, আল্লাহ তোরে উগ্যা ফোয়া (ছেলে) দিবার লাই দোয়া গরিদ্দি!

আমি কোনো কিছু বলার আগেই আম্মু তাড়াতাড়ি ফোনটা নিয়ে বলেছিলেন, থাক থাক! তোর দাদি বুড়া মানুষ, কিছু বলিস না।

অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, প্রথমবার যাদের সাহস হয় নি ‘ছেলে’ হওয়ার কথা বলে, তারাই এই দ্বিতীয়বার অবলীলায় বলে যাচ্ছে, দেখো, এবার কিন্তু ছেলে হবে মনে হচ্ছে!

আমি জানি, অনেকের এই বলাটা খুব স্বাভাবিক এই সেন্সে যে একটা মেয়ে হয়েছে, আরেকটা ছেলে হলে বরাবর হবে। একটা ছেলে একটা মেয়ে! সহজ সুন্দর ইক্যুয়েশান।

কিন্তু বাংলাদেশের মেয়ে আমি।

বাংলাদেশের সমাজকে পানিতে গুলে খেয়ে বড় হওয়া মেয়ে আমি।

বাংলাদেশের কনটেক্সটে ‘এবার ছেলে হবে মনে হচ্ছে’কে তাই আমি সহজভাবে নিতে পারি না।

বাংলাদেশের কনটেক্সটে একটা ছেলে হওয়ার কামনা শুধু ‘শুভকামনা’ই না, একটা ছেলে হওয়ার কামনার পিছনের সাবকনশাস এবং কনশাস মাইন্ড অনেক অনেক জটিল, অনেক কমপ্লিকেটেড, এবং অনেক কুৎসিত।

প্লেনের ঐ কাপলটার কথা আমার প্রায়ই ঘুরে ফিরে মনে হয়। দশবছর পর কথা হওয়া দোস্তর তার ছেলে নিয়ে উচ্ছাসের কথাও ভাবি। ঐ ভাবির অসূর্যস্পর্শা ছেলের কাহিনী তো আছেই। এরা কোনো রেয়ার কেইস না। এরা প্রত্যেকেই আমাদের সমাজের কনটেক্সটে খুব স্বাভাবিক ঘটনা। আর এই স্বাভাবিক ঘটনাই ‘অস্বাভাবিক’ রকম কুৎসিত হয়ে প্রকাশ পায় সন্তানের সাথে মার (এবং বাবার) ব্যবহারে।

বিশেষ করে মার জীবন এবং ভবিষ্যৎ যেহেতু ছেলে-সন্তানের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, ঐ ছেলেকে খাবারের ভাল অংশটা তুলে রেখে খাওয়ানো থেকে শুরু করে, ছেলের ভাল পড়ালেখার খরচের জন্য জমি বেঁচে দেয়া থেকে শুরু করে, ছেলের জন্য করেন না এমন কিছু নাই। সমাজ বাবা-মাকে ধন্য ধন্য করে। তাদের ‘স্বার্থহীন’ আত্মত্যাগের মহিমা গায়। কেউই আর বলে না, এর বিনিময়ে ঐ সন্তানের জীবন আসলে বাবা-মা কিনে নেয়। বাংলাদেশের কনটেক্সটে ছেলে সন্তান হচ্ছে ইনভেস্টমেন্ট।
ছেলেকে আদর-যত্নে বড় করো, তার ক্যারিয়ার স্টাবলিশড করতে সোনা-গয়না-জমি যা লাগে সব বিক্রি করে হলেও, ধার করে হলেও তাকে ভাল সাবজেক্টে পড়াও, কারণ এরপর এই ছেলের ঘাড়ে চড়েই তোমার বুড়া বয়সের জীবন কাটবে।

কথাগুলো শুনতে খারাপ শোনায়, কিন্তু এটাই বাস্তবতা। এজন্যেই বাংলাদেশে বউ-শাশুড়িতে এত সম্পর্কের কাটাকাটি, ঠাণ্ডা যুদ্ধ। কারণ মা আর বউ দু’জনেই মেয়ে, আর দু’জনেই ডিপেন্ডেন্ট একটা ছেলের উপর। তাই দুই’জনেই চায় নিজ নিজ অধিকার দিয়ে নিজের এই ডিপেন্ডেন্সিকে সিকিউরড করতে। একজন বউ হিসেবে, আরেকজন মা হিসেবে।

ভিক্টরের সাথে অনেক রকমের কথা হতো। একবার সে বলেছিল, মানুষের জীবনের অন্যতম ট্রাজেডি কী জানো? সন্তানের প্রতি মানুষের ‘স্বার্থপর’ ভালবাসা।

পশু-পাখি তাদের সন্তানকে মানুষের চে’ কম ভালবাসে না। ন্যাচরাল জিওগ্রাফি চ্যানেলগুলা দেখলে দেখবা, একটা ছোট মুরগিও তার বাচ্চাদেরকে রক্ষা করতে একটা বড় কুকুর বা শেয়ালের সামনে হুংকার তুলে দাঁড়ায়! ঠোঁকর দিতে চেষ্টা করে। কিন্তু পশু-পাখি মানুষের চে’ ওয়াইজ, মানুষের চে’ জ্ঞানী। কারণ এমন কোনো পশু-পাখি পাবা না, যে তার সন্তান থেকে বিনিময়ে কিছু চায়। যে কোনো পশুপাখি তার সন্তান নিজে নিজে সার্ভাইব করতে শেখা পর্যন্ত জান দিয়ে প্রটেক্ট করে। কিন্তু যেইই সন্তান সার্ভাইব করতে শিখে যায়, তাকে ছেড়ে দেয়। তাকে উড়তে দেয়। তাকে দুনিয়া এক্সপ্লোর করতে ছেড়ে দেয়। তাকে তার নিজের জীবনকে লীড করতে দিয়ে দেয়। তাকে নিজের মত করে বাঁচতে দেয়।

কিন্তু একমাত্র মানুষই হলো এমন প্রাণী, যে তার সন্তান ম্যাচিউরড হয়ে যাওয়ার পরও সন্তানের জীবনে অনবরত intervene করে যায়। সে কোন সাবজেক্টে পড়বে, সে কোন ক্যারিয়ারে যাবে, সে কাকে বিয়ে করবে, সে এমনকি কোথায় থাকবে-খাবে, কার সাথে মিশবে, সমাজে কীভাবে চলবে সবকিছুতে অনবরত নিজের মতামত চাপিয়ে দিয়ে যায়।

কাণ একমাত্র মানুষই তার সন্তানকে পালে বিনিময়ের জন্য। এই সন্তান তাকে সমাজে গ্রহণযোগ্যতা দেয়, স্ট্যাটাস দেয়। এজন্যেই দেখবা যাদের সন্তান হয় না, তাদেরকে সমাজ কিভাবে ট্রিট করে। বেচারাদের জীবনই পুরা মূল্যহীন হয়ে যায় সন্তান না হওয়া পর্যন্ত।

এরপর সেই সন্তান বড় হতে হতে সে বিনিময়ের বোঝা, চাহিদার বোঝা বাড়তেই থাকে… বাড়তেই থাকে… সন্তান যদি কোনো ক্ষেত্রে সেই চাহিদা মেটাতে না পারে, তাহলেই সেরেছে! বাবা-মা, পরিবার, সমাজ সবাই মিলে ঝাঁপিয়ে পরে তার উপর। বেচারা সন্তান!

মেয়ে যখনই জড়িয়ে ধরে বলে ‘মা, আই লাভ ইউ’, ‘আই লাভ ইউ টু’ বলতে গিয়ে প্রতিবারই মনে মনে নিজেকে জিজ্ঞেস করি, আমিও কি মেয়েকে শুধুই মানুষের মত ভালবাসি?

মনে মনে প্রতিবারই মেয়েকে বলি, আমি তোকে পশু-পাখির মতও ভালবাসতে চাই। মানুষ কী বলবে, বা সমাজ কী বলবে এসব ভেবে যেন আমি কখনো তোর জীবনে ইন্টারফেয়ার না করি। আমি নিজেও যেন কখনো তোর মুখাপেক্ষী না হই। তোর উপর নির্ভরশীল না হই। তুই যেন পাখির মত নিজে নিজে উড়তে পারিস। শুধু ক্লান্ত হলে এসে আমার কাছে রেস্ট নিস। এইভাবেই তখন জড়িয়ে ধরে বলিস, আই লাভ ইউ মা।

আমি যেন কখনোই এই ভালবাসাটুকুর চে’ বেশি কোনো বিনিময় তোর কাছে না চাই।

Tagged with:

About Author

ফারজানা মাহবুবা
ফারজানা মাহবুবা

শিক্ষিকা। প্রকাশিত বই: পলাতক জীবন; এক জোড়া চোখ; একটি যুদ্ধ চাই; যাযাবর নামা।