page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

‘সম্বন্ধ’

‘সম্বন্ধ’ কথাটি ইদানীং ব্যাকরণ বইয়ের বাইরে আর বিশেষ প্রয়োগ হয় না। বা মানুষজন করেন না। কাজ চালিয়ে নেন ‘সম্পর্ক’ কথাটি দিয়েই। সেই হিসেবে, অবশ্যই মানতে হবে, সম্বন্ধ বলতে সম্পর্কই বোঝায়। ব্যাকরণ বইয়েও যে অর্থে সম্বন্ধপদ প্রত্যয়টি প্রয়োগ করা হয়ে থাকে তাও আসলে সম্পর্ককারী হিসেবেই উদ্ভাসিত।

তবে সেই অর্থে নাগরিক বাংলায় সম্বন্ধ পদটি কম প্রয়োগকৃত হলেও বিস্তারিত গ্রামবাংলায় কথাটি বহুল প্রচারিত। এখানে ‘সম্বন্ধ’ কথাটি বিবাহ-ঘটকালি সংক্রান্ত বিষয়াদিতে প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। লক্ষণীয় যে কথাটি বিশেষ্য আর ক্রিয়া উভয় পদ হিসেবেই আকছার ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যেমন, যদি বলা হয় ‘সম্বন্ধ নিয়া আসছে’, তাহলে বুঝতে হবে সম্বন্ধ এখানে বিশেষ্য পদ আর তার অর্থ হলো ‘পয়গাম’ ধরনের, হিন্দি বা উর্দূতে। মানে হলো গিয়ে, ‘বিবাহের খোঁজ বা খবর’ আরও বিশিষ্টার্থে ‘বিবাহযোগ্য পাত্র বা পাত্রীর খোঁজ এবং সম্ভাব্য সম্পর্ক স্থাপনের আলাপচারিতার অপরপক্ষীয় উন্মুক্ত সুযোগ’। ইত্যাদি।

manoshchy logo 1

আবার যদি বলা হয় ‘সম্বন্ধ করতে যাচ্ছি’, তাহলে বক্তা এখানে ঘটকালি বা ঘটকদারি করতে যাচ্ছেন। অর্থাৎ, ঘটকগিরি বা অনুঘটকগিরি এখানে তাঁর সম্ভাব্য ক্রিয়া। আধুনিক বাংলা ভাষায় যেহেতু সকল ক্রিয়া প্রায় করাকরিতে পর্যবসিত তাই এরকমই চেহারা হবে এটার। এই ভাষায় করে-করে সেটা উল্লেখ করলেই ক্রিয়া হয়। এই ভাষায় সকল ক্রিয়াই যে করতে হয় সেটা একটু দুঃখজনক বটে, কিন্তু সে বিষয়ে আপাতত আমাদের কিছু করার নেই। অন্তত এই কাহিনীর ক্ষেত্রে। সম্বন্ধ  ক্রিয়াই।

নিচে যে কাহিনীটি বর্ণনা করছি তা কল্পকাহিনী নয়। একেবারেই আমার সামনে ঘটে-যাওয়া একটা সম্বন্ধ।

স্থান শ্যামলী সিনেমা হলের আশপাশের অনেকগুলো চারপেয়ে চা-সিগারেটের দোকানের একটি

কাল বিকাল-সন্ধ্যা, শেষ শীতভাগ, ১১ই ফ্রেব্রুয়ারি ২০১৫

পাত্রপাত্রী পাত্র ১: চারপেয়ে সেই দোকানের ২০-২২ বছরের দোকানি। (পুংলিঙ্গ)

পাত্র ২: প্রায় যেকোনো পথচারী মনে হওয়া, হঠাৎ আলাপ শুরু-করা, এক ৩০-৩৫ এর লোক। (পুংলিঙ্গ)

পাত্র ৩: আমি নিজে (পুংলিঙ্গ)

অন্যান্য: চারপাশে রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করা মানুষজন, রিকশাওয়ালা, ভিখিরি। নির্লিঙ্গপ্রায়

বিবাহযোগ্য পাত্র: পাত্র ১, সেই দোকানি। (পুংলিঙ্গ)

বিবাহযোগ্যা পাত্রী : উহ্য, তবে পাত্র ২ এর মস্তিষ্কে ক্রিয়াশীল। (স্ত্রীলিঙ্গ, অনুমান করা যায়)

[অনু]ঘটক: পাত্র ২, পথচারীপ্রায় হঠাৎ কথা শুরু-করা সেই লোক

আমি, যেমনটা বলছিলাম, একটু আগেই পাশের একটা ঝালমুড়ির দোকান থেকে ১০ টাকা দিয়ে এক ঠোঙা ঝালমুড়ি সমেত এই দোকানির কাছে এসেছি। এখানে আমি আদামেশানো দুধ চা খাব, ঝালমুড়ি সহযোগে। কয়েক সপ্তাহ আগে আরেকদিন এই ২০-২২ বছরের চা-ওয়ালার দোকানে চা খেতে এসে আমি দেখলাম তিনি কনডেন্সড দুধ-চা বানান আর আদামেশানো রং-চা বানান। আমি ওইদিন অর্ডার দিয়ে আদামেশানো কনডেন্সড দুধ-চা খাই। সেদিনের পর যে ক’দিন এখানে আমি এসেছি, প্রতিদিনই তিনি আমাকে দেখেই এই বিশেষ চা বানাতে শুরু করেন। আমি চায়ে প্রথম চুমুক দিয়েছি কী দিই নি, এরই মধ্যে হন্তদন্ত এক লোক (পাত্র ২) এই দোকানির (পাত্র ১) সঙ্গে কথা শুরু করেন।

পাত্র ২: মামু বিয়া করবা না একটা? (হ্যাঁ, এটাই পয়লা বাক্য)

পাত্র ১: করুম। পাত্রী নাই। (চায়ের দিকেই মনোযোগ)

পাত্র ২: পাত্রী নাই আবার কী? এই দোকান কি তোমার?

পাত্র ১: আমার না কার দোকান? আমারই তো দোকান। (মনোযোগ বা মাথা সরে না)

পাত্র ২: তয় দেখি যে আরেকজনরে। (দৃঢ় কিন্তু কোনো উত্তেজনাহীন গলায়)

পাত্র ১: হ্যায় আমার ভাই লাগে। বড়ভাই। (পিছন দিকে থাকা পাত্র ২ তথা অনুঘটকের দিকে ঈষৎ ঘাড় বাঁকিয়ে)

পাত্র ২: বড়ভাই? আপন ভাই? (স্পষ্ট, ভণিতাহীন, সামান্য জোরাল গলায়)

পাত্র ১: আপন ভাই না তো… (একটু জোরাল গলায়) … হ আপন ভাই (নিরুচ্চার গলায়, চায়ের দিকে)

পাত্র ২: অই, তোমাগো দোকান কি নিজেদের? নাকি আউর কারো দোকানে বয়া বয়া… চালাইতেছ? (প্রায় সমাপনী গলায়, কিন্তু স্পষ্টভাবে)

পাত্র ১: ধুর মিয়া! (রাগহীন)… নিজেগো দোকান। (নিরুচ্চার গলায়)

এতক্ষণে ঘটনার দ্বিতীয় পাত্র ওরফে অনুঘটক বা ঘটক বা সম্বন্ধদার হাঁটা শুরু করে দিয়েছেন। হাঁটতে হাঁটতে:

পাত্র ২: কথা কইতেছি পরে।

আর পাত্র ১, এক্ষণে সুপাত্র, বা দোকানি একবারও ঘাড় ঘুরিয়ে না-দেখে দোকানের অন্য কাজে মন দিল। পাত্র ৩ তথা আমি চায়ের কাপ শেষ করে এই মিনিট খানেকের সংলাপ বিষয়ে একটিও কথা না বলে দাম মিটিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে-থাকা রিকশা ভাড়া করতে লাগলাম। আমি আরও একবার তাকিয়ে দেখলাম সুপাত্রকে। আশু বিবাহ-সম্ভাবনায় তাঁকে কিছুমাত্র বিচলিত, উৎসুক দেখাল না। একটু গর্বিত বা আত্মমগ্ন হলো কিনা বোঝার জন্য, পরে বুঝলাম, আমার আরও খানিকক্ষণ থাকা উচিত ছিল।

শ্যামলী, উত্তরা ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

About Author

মানস চৌধুরী
মানস চৌধুরী

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টারি করে নির্বাহ করি। গল্প, কলাম ইত্যাদি লিখি। সুযোগ পেলে পর্দায় অভিনয়ও করি।