What, then, is time? If no one ask of me, I know; if I wish to explain to him who asks, I know not.
—Augustine of Hippo, ca. 400 CE

সময়ের ধাঁধা: তোমার সময়, আমার সময়

অফিসের একটা নিয়ম আমার খুব পছন্দ, আর সেটা হল ফ্লেক্সি টাইম। আমার মত ছন্নছাড়ার জন্য একটা দারুণ ব্যাপার। কেউ আবার এটা ভেবে বসবেন না যেন, এই ফ্লেক্সি মানে সেই ফ্লেক্সি, অর্থাৎ যেমন ইচ্ছে টেনে লম্বা-ছোট বা এদিক-ওদিক দুমড়ে মোচড়ানো যায়। এই ফ্লেক্সির অর্থ খুবই সাধারণ।

ধরা যাক, আপনার নিয়মিত অফিস সময় হল নয়টা-পাঁচটা, কিন্তু আপনার সুযোগ রয়েছে দুই ঘণ্টা আগে বা পিছে অফিসে উপস্থিত হওয়ার। অর্থাৎ আপনি যদি সকাল সাতটায় অফিসে হাজিরা দেন, তাহলে বিকেল চারটায় বাড়ি যেতে পারবেন, একই ভাবে যদি সকাল এগারটায় অফিসে আসেন তো সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত অফিস করতে হবে। আমার মত রাত জাগা মানুষের জন্য যে এটা কত বড় সুবিধা তা ভুক্তভোগী মাত্রেই জানেন।

হাসান তারেক চৌধুরী

যাই হোক, সেদিন এই ফ্লেক্সি টাইমের সুযোগ নিয়ে সন্ধ্যা সাতটায় অফিস থেকে বের হলাম, তারপর এক কাপ চা খাব ভেবে প্রতিদিনের মতই সামনের চায়ের দোকানে হানা দিলাম। কিন্তু সেই চা খেতে যাওয়াটাই যেন আমার কাল হল। সেই সময়টাই যেন বহুদিনের জন্য কেড়ে নিল আমার রাতের ঘুম। এমনকি আজও বয়ে বেড়াচ্ছি তার রেশ আর নেশা। হয়ত চমকে উঠে বলবেন কী এমন ঘটলো সেখানে! আমি বলব তেমন কিছুই না, শুধু একটা গানের কথা।

তাহলে বুঝিয়ে বলি একটু। দোকানে ঢুকতেই একটা গান ভেসে আসল কানে, ‘আয়নাবাজি’ নামে একটা জনপ্রিয় সিনেমার গান:

ধীরে ধীরে যাও না সময়
আরও ধীরে বও
আর একটুক্ষণ রও না সময়
একটু পরে যাও!

সিনেমাটা আমি বেশ কিছুদিন দেখেছি, গানটাও আমি তখনই প্রথম শুনি। কিন্তু এবারের শোনাটা যেন ছিল একটু ভিন্ন, উপলব্ধিটাও যেন অন্যরকম।

‘সময়’ শব্দটা কেন যেন বার বার মাথার ভেতরে নাড়া দিতে শুরু করল। মনে হল আরে সত্যিই তো, এমনটাই তো এদিন আমি পড়েছি একটা আর্টিকেলে! ওখানে একই রকম ভাবে বলেছিল, যে সময় একেকজনের কাছে একেক রকম গতিতে চলতে পারে, এমনকি থেমেও যেতে পারে, উল্টো দিকেও যেতে পারে। বিষয়টিকে জটিল গণিত আর বিজ্ঞানের বিষয় ভেবে তখন মাথায় নেই নি। তাছাড়া তখন মনে হত সময় আস্তে গেলেই আমার কী আসে যায়, আর দ্রুত গেলেই বা আমার কী। কিন্তু এই গানটা হঠাৎই সব চিন্তা এলোমেলো করে দিল। এই মেয়েটার গানে আমারও নিজের ইউনিভার্সিটি জীবনের কথা মনে পড়ে গেল। একই সাথে মনে পড়ে গেল আমার ইউনিভার্সিটি জীবনে বান্ধবীর (যিনি বর্তমানে আমার স্ত্রী) সাথে কাটানো সময়গুলোর কথাও। আমার মাথায় যেন বিদ্যুৎ চমকের মত উদয় হল, আশ্চর্য! এটা তো শুধু জটিল বিজ্ঞান না, কিছুটা হলেও যেন আমরা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনেও এটা অনুভব করি।

আমার ইউনিভার্সিটি জীবনের সেই সব দিনগুলোতে একটা ঘটনা আমার জন্য ছিল খুবই নিয়মিত। তা হল পাবলিক লাইব্রেরির সিঁড়িতে বসে আমি অপেক্ষা করছি, বার বার ঘড়ি দেখছি আমার বান্ধবী কখন আসবে। আর আমার বান্ধবীর জন্যেও এমনই একটা নিয়মিত ঘটনা ছিল প্রতিদিন নিয়মিত তিরিশ পয়ত্রিশ মিনিট দেরি করে আসা।

সেই সময়টা যেন আমার কিছুতেই কাটতে চাইত না। মনে হত যেন তিরিশ পয়ত্রিশ মিনিট না, কয়েক ঘণ্টা ধরে ওখানে অপেক্ষা করছি। তার প্রতিদিনের অজুহাত ছিল একটাই, তার বাবা ড্রয়িং রুমে বসেছিল, তাই দেখে শুনে লুকিয়ে বাড়ি থেকে বের হতে হয়েছে।

এই একই কথা প্রতিদিন শুনতে শুনতে আমি রীতিমত বিরক্ত ছিলাম, এমন একটা স্বর্গীয় ব্যাপারে আমার হবু শ্বশুরমশায়ের এ কী অন্যায় আচরণ! এতে প্রায়ই আমি খুব রেগে যেতাম, আর তখন তার একটাই বক্তব্য ছিল, সেটা হল, “জানো আমি কত কষ্ট করে আসি! এই অল্প সময়টাও অপেক্ষা করতে পারো না?”

তার এই কথা শুনে আমি রীতিমত তবদা খেয়ে যেতাম, বলে কী! এটা অল্প সময়!

কিন্তু আরেকটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটত যখন আমরা বিদায় নিতাম। বিষয়টা তখন একেবারেই পাল্টে যেত যেন। সে ছিল ইউনিভার্সিটির বাসের ‘ক্ষণিকা’ রুটের যাত্রী। তাকে বাসে তুলে দিতে ইউনিভার্সিটির আইইআর বিল্ডিং এর পিছনে বাস ডিপোতে আমরা নিয়মিত অপেক্ষা করতাম। সিট দখলের জন্য প্রায়ই আমরা তিরিশ পয়ত্রিশ মিনিট আগে সেখানে চলে যেতাম। অনেকেই একই ভাবে সময়ের আগেই চলে আসত। সেই সময়টাতে আমাদের মনে হত যেন, এই তো মাত্রই আসলাম, আসতে আসতেই সময় শেষ হয়ে গেল! অথচ অন্যদের দেখতাম, বাস কেন ছাড়ছে না এই ভেবে ঠিক ওই সময়টিতেই আমাদের সামনে বার বার পায়চারি করছে।

তখন অবাক লাগলেও এটা নিয়ে তেমন কিছুই ভাবি নি, কিন্তু আজকে এই মেয়েটার গান যেন আমাকে সম্পূর্ণ অন্য রকম একটা বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়ে দিল। সত্যিই তো! সময় একেকজনের কাছে একেক রকম অবস্থায় সম্পূর্ণ অন্যরকম হতে পারে। হোক না সেটা তার মনে অথবা মস্তিষ্কে, কিন্তু ওটাও তো আমাদের কাছে এক ধরনের বাস্তবতা!

চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম যে আর কোথাও না গিয়ে সোজা বাসায় চলে যাব। বেশ কিছুদিন আগে নিউমার্কেটে রানা ভাইয়ের বুকশপ থেকে ‘সময়’ এর প্রকৃতি আর ধারণা নিয়ে লেখা কিছু বই কিনে রেখেছিলাম, পড়ব পড়ব করেও পড়া হয়ে ওঠে নি। ওগুলোর একটা হাতে নিতেই হবে।

যদিও আর দশটা মানুষের মতই অফিসে লেট হওয়ার আশঙ্কা আর ছুটির সময় এগিয়ে না এলে সময় নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না, তবুও অদ্ভুত ভাবে সময় নিয়ে বিচলিত হওয়ার ঘটনা আমার জীবনে অবশ্য এই প্রথম না। প্রথমবার এমন ঘটেছিল কৈশোরে। আমার বড় চাচা আমাদের সবাইকে বেড়াতে নিয়ে গিয়েছিলেন ঢাকার অদূরে ইশা খাঁর রাজধানী সোনারগাঁয়ে। পলেস্তারা খসে পড়া ইট সুড়কির সেই দেয়াল দেখে আমি চমকে গেলাম, অবাক হয়ে চাচাকে বললাম, “কত পুরানো বাড়ি! একশ বছর হবে নিশ্চয়ই?”

আমার ওই বার-তের বছর বয়সে একশ বছর চিন্তাটাই ছিল বিশাল ব্যাপার। কিন্তু চাচা হেসে বললেন, “একশ বছর না বাবা, এগুলো চার পাঁচশ বছরের পুরানো।”

সেই কিশোর বয়সে চার পাঁচশ বছর বিষয়টা আমার জন্য চিন্তা করা কঠিন ছিল। আমার খুব ভয় ভয় লাগতে শুরু করল। হঠাৎ মনে হল চার পাঁচশ বছর পরে আমি তো বেঁচে থাকব না! তখন পৃথিবীটা দেখতে কেমন হবে?

সময় নিয়ে কিছু উপলব্ধি

অনেক দিন পর এখনও যখন পিছন ফিরে তাকাই, ঠিক ওই অনুভূতিটাই আমাকে তাড়া করে। কিন্তু অন্য কোনো অনুভূতি বাদ দিয়ে কেন আমি সেদিন ভয় পেয়েছিলাম, সেটা নিয়েও অনেকবার ভেবেছি আমি। যতই ভেবেছি, ততই আমার কাছে যেন বিষয়টা কিছুটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অবচেতন মনে সময়ের অন্ততঃ কয়েকটি রূপ আমার কোমল হৃদয়কে নাড়া দিয়েছিল।

প্রথমতঃ আমি বুঝেছিলাম সময়ের সাথে সাথে ওই পলেস্তরা খসে পড়া ইটগুলোর মতই সব নষ্ট হয়ে যায়, ধ্বংস হয়ে যায়। বড় হয়ে এখন জানতে পেরেছি, জানি পদার্থ বিজ্ঞানের ভাষায় এটাকে এনট্রপি বলে। অর্থাৎ সময়ের সাথে সাথে যে কোনো বস্তুর বা আবদ্ধ সিস্টেমের মধ্যে বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধি পেতে থাকে। অন্য ভাবে বলা যায়, কোনো কিছুর পরিবর্তন দেখেই আমরা বুঝতে পারি সময় বয়ে যাচ্ছে।

সময়
সময়ের সাথে সাথে যে কোনো বস্তুর বা আবদ্ধ সিস্টেমের মধ্যে বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধি পেতে থাকে। অন্য ভাবে বলা যায়, কোনো কিছুর পরিবর্তন দেখেই আমরা বুঝতে পারি সময় বয়ে যাচ্ছে।

দ্বিতীয়তঃ সময়ের সাথে আমিও একদিন মারা যাব। অর্থাৎ আমরা যেটাকে এখন জৈবিক বা ব্যক্তিগত সময় বলে জানি। প্রতিটি প্রাণীরই জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট সময় আছে। তারপর কী আছে সে জানে না। তার এই না জানাটাই তার মনে তীব্র মৃত্যুভয় জাগিয়ে তোলে।

তৃতীয়তঃ আমি না থাকলেও এই ভাঙা দালানের মত পৃথিবীর সময় ঠিকই পার হয়ে যাবে। তখন পৃথিবীটা কেমন হবে? আমার মনে হয়েছিল, “আচ্ছা, আমার মত পৃথিবীরও কি একটা আলাদা সময় আছে? অথবা সৌরজগতের? ওগুলো কি ভিন্ন সময়?”

এখন কিছুটা হলেও বুঝতে পারি, আমার ভাবনাগুলো যদিও নেহায়েৎ অপরিপক্ক ছিল, কিন্তু চিন্তাগুলোর গতিপ্রকৃতি হয়ত ঠিক দিকেই ছিল। তাই হয়ত বিষয়টার বিশালতা ধারণ করতে না পেরে, ওই শিশু মন বেশ ভয় পেয়ে গিয়েছিল। তবে সত্যি বলতে কী, সময় নিয়ে ভাবতে গেলে এখনও আমার কেমন যেন অস্থির বোধ হয়, অনেকটা ভয়ের অনুভূতি যেন চেপে বসে আমার উপর।

সে যাই হোক, আগের কথায় ফিরে যাই। সেদিন যে একটা বই হাতে নিলাম, তারপর আর সময় নিয়ে পড়া বন্ধ করতে পারলাম না। একের পর এক বই পড়তে লাগলাম। এক সময় মনে হল, সময় কি তা না বুঝতে পারলেও এর কিছু ধারণা হয়ত বুঝতে শুরু করেছি। আর কিছুটা যখন উপলব্ধি করতে পারছি, ভাবলাম, যতটুকুই পারি তা অন্যদের সাথে শেয়ার করি।

সময়ের ধারণা নিয়ে আইনস্টাইন যে মতবাদটি দেন সেটি ছিল রীতিমত অবিশ্বাস্য এক বৈজ্ঞানিক বিপ্লব।

তবে প্রথমেই বলে রাখছি, সময়ের ধারণা নিয়ে আইনস্টাইন যে মতবাদটি দেন সেটি ছিল রীতিমত অবিশ্বাস্য এক বৈজ্ঞানিক বিপ্লব। নতুন ধারণাটা এতটাই অবিশ্বাস্য যে, সেটাকে বিজ্ঞানের চেয়ে কল্পকাহিনি বলেই মনে হতে পারে।

কিন্তু তারপর থেকে যত বেশি বৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়েছে, সময় নিয়ে আইনস্টাইনের তত্ত্বকে সেগুলো আরও বেশি গভীর ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

তবে এই প্রসঙ্গে এটাও বলে রাখা ভাল যে, তারপর কোয়ান্টাম থিওরি আর স্ট্রিং থিওরির হাত ধরে বিপ্লবটা অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে গেলেও, তা কিন্তু এখনও অনেকটাই অসমাপ্ত রয়ে গিয়েছে। সময়ের পরিপূর্ণ স্বরূপ আজও কেউ পুরোপুরি ব্যখ্যা করতে পারে নি।

পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে প্রথমে আমি সময়ের দার্শনিক ও সাধারণ ধারণাগুলোর ঐতিহাসিক বিবর্তনগুলো তুলে ধরব, তারপর যতটা সম্ভব বোধগম্য ভাবে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাগুলোও ধীরে ধীরে বিস্তারিত ভাবে আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চেষ্টা করব।

(পরের অংশ)

Facebook Comments
Hassan Tareque Chowdhury

লেখক, কবি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে প্রধান মানব সম্পদ কর্মকর্তা। প্যারাসাইকোলজি ও স্পেকুলেটিভ সাইন্স ফিকশনের সমন্বয়ে লেখা দুটি বই: ‘দ্বিখণ্ডিত’ ও ‘যুগল মানব’।

1 COMMENT

  1. লেখাটা খুব সুন্দর, পড়ে ভালো লাগল। পরের অংশগুলির অপেক্ষায় থাকলাম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here