(পর্ব ১)

দৈনন্দিন জীবনে সময়

আশির দশকের একেবারে প্রথম দিকের কথা। আমি তখন অনেক ছোট, বয়স দশ কি এগারো হবে। আমাদের বাসায় একটা অ্যানালগ টেলিফোন ছিল। হয়ত অনেকেই দেখে থাকবেন ওই ধরনের টেলিফোন, ডায়াল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ফোন করতে হত। তখন ফোন করার মত আমার কেউ না থাকলেও এই টেলিফোনটার সাথে আমার এক ধরনের বিশেষ সখ্য ছিল। আর এর পিছনে একটি বড় কারণও ছিল, সেটি হল ডায়াল করে টেলিফোনে সময় শোনা।

আমি যে সময়ের কথা বলছি, ওই সময় টিএন্ডটি টেলিফোনে ১৪ ডায়াল করলেই সুমধুর নারীকণ্ঠে কেউ বলে উঠত, “যখন সংকেত শুনবেন, তখন সময় …টা বেজে …সেকেন্ড।“ আমার নেশা ছিল সুযোগ পেলেই লুকিয়ে লুকিয়ে ডায়াল ঘুরিয়ে সেই মাদকতাপূর্ণ নারীকণ্ঠ শোনা। আমার ভোলাভালা চেহারার জন্যে ব্যাপারটা কেউ টের না পেলেও ‌ওই বয়সেই কিন্তু আমি মহা পাকনা ছিলাম।

হাসান তারেক চৌধুরী

পরবর্তীতে নানুর কাছে শুনতে পেয়েছিয়াম, এমনকি আরও ছোট বয়সেই নাকি আমি বিয়ে করার জোর দাবি তুলেছিলাম! সে যাই হোক, আমার এই স্মৃতিচারণের উদ্দেশ্য কিন্তু এই গল্প না, আমি আসলে বলতে চাইছি সময় নিয়ে আমার চিন্তা ভাবনাগুলো কীভাবে নানা মাত্রা নিতে শুরু করল।

সেই বয়সে টেলিফোনে বলা ওই সময় এর আসলে কোনো অর্থই ছিল না আমার কাছে, অর্থটা বুঝি আরও অনেক পরে ক্লাস নাইনে ভূগোল পড়ার সময়ে। তখন সময় বলতে আমি বুঝতাম:

১. সকাল: মানে যে সময় মা বা নানু ধাক্কা দিয়ে ঘুম থেকে তুলতেন
২. স্কুলের সময়: এটা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়, দেরি হলে সাত্তার স্যার কান ধরিয়ে বেঞ্চের উপর দাঁড় করিয়ে রাখতেন
৩. টিফিন ব্রেক: মানে দুপুর বেলা খাবার সময়
৪. বিকেল: স্কুল ছুটি আর খেলার মাঠে যাওয়ার সময়
৫. সন্ধ্যা: হৃদয় বিদারক সময়, বাড়ি ফিরে পড়তে বসতে হবে
৬. রাত: ঘুমোতে যাবার সময়

তারপর ধীরে ধীরে বয়স যতই বাড়তে লাগল, জীবনের নানা রকম অভিজ্ঞতা থেকে সময় সম্পর্কে আমার ধারণাতেও নতুন নতুন তথ্য যোগ হতে শুরু করল।

একটু বড় হলে যখন রোজা রাখতে শুরু করলাম, ইফতারের দিকে লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে সূর্য ডোবার অপেক্ষায় বসে থাকতাম। জীবনে প্রথমবারের পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘোরার মাহাত্ম্য বুঝতে পারলাম। বুঝলাম সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত, চাঁদ, দিন-রাত্রির হিসেব আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে কীভাবে প্রভাবিত করে। জানলাম একটি সূর্যোদয় থেকে আরেকটি সূর্যোদয় হল আসলে ২৪ ঘণ্টা, মানে একটি পুরো দিনের সমান। এই সময়টাতে পৃথিবী নিজ অক্ষে বা নিজের চারিদিকে একবার ঘুরে আসে। ঈদের সময় আসতেই বুঝলাম চাঁদের উপর ভিত্তি করে চান্দ্র মাস গণনা করা হয়। একই সাথে বুঝতে পারলাম বছর গণনা হয় পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে একবার ঘুরে আসার উপর ভিত্তি করে। অর্থাৎ এই পর্যায়ে মোটামুটি একটা ধারণা পেয়ে গেলাম যে আমাদের দৈনন্দিন সময় আসলে আকাশে সূর্য আর চাঁদের গতিবিধির উপর নির্ভরশীল।

ক্লাস নাইনে উঠতেই আবশ্যক বিষয় ভূগোল হিসেবে নিতে হল। আর তখনই ভাল করে অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ আর এর সাথে সময়ের যোগাযোগটাও বুঝতে শিখলাম। বন্ধুদের বোকা বানানোর জন্য একটা দারুণ আইডিয়া আমার মাথায় আসল। নতুন কাউকে পেলেই আমি প্রশ্ন করতাম, “আচ্ছা, আমি যদি তোমাকে জিজ্ঞেস করি কয়টা বাজে, তুমি কি ঠিক ঠিক উত্তর দিতে পারবে?”

আমার সাদাসিধা চেহারার কারণেই বা প্রশ্নটার আপাত সারল্যের কারণেই হোক, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ওরা তাচ্ছিল্যের সাথে হেসে হাতের ঘড়িটা দেখে সময়টা জানিয়ে দিত। আর আমিও সেই মোক্ষম সুযোগে বেশ একটা সক্রেটিস ভাব নিয়ে বলতাম, “উত্তর পুরোপুরি সঠিক না।“

বেশির ভাগ বন্ধুই মজা করে বলত, “যা ভাগ এখান থেকে।“ কিন্তু ওদেরই আবার কেউ কেউ মজা করেই বলত, “তা সক্রেটিস সাহেব, তুমিই বলে দাও, এখন সময় ক’টা বাজে।“

আমিও তখন বেশ গাম্ভীর্যের উত্তর দিতাম, “সঠিক উত্তর হবে এখন ঢাকার স্থানীয় সময়…, অন্য কোনো জায়গা যেমন, লন্ডন, টোকিও, নিউইয়র্ক ইত্যাদি স্থানে ভিন্ন জায়গায় সময়টা ভিন্ন হবে।“

ওরা প্রতিবাদ করতে উদ্যত হলেও সাথে সাথেই থমকে যেত। আরে তাই তো! আমরা সবাই জানি, ঢাকায় যখন দিন নিউইয়র্কে তখন রাত। ব্যাপারটা আমাকে এতই আকর্ষণ করল যে, ভূগোলের মত একটা বিটকেলে সাবজেক্টকে রীতিমত ভালবেসে ফেললাম।

সময়ের সাথে স্থানের এই সম্পর্কটা আমি আরো বেশ কিছুদিন উপভোগ করেছিলাম। কিন্তু তখন ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারি নি যে আসলেই সময়ের সাথে স্থানের সম্পর্ক এতটা অবিচ্ছেদ্য। পরবর্তীতে যখন থিওরি অফ রিলেটিভিটি নিয়ে পড়তে শুরু করি তখন বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে প্রথম জানতে পারি আসলে আলাদা ভাবে সময় বা স্থান বলে কিছু নেই। সময় আর স্থান একে অপরের সাথে যুক্ত, যাকে বলা হয় স্পেস-টাইম। আর তখনই এটাও জানতে পারলাম যে, আমরা যেমন ভাবি যে সময় বয়ে যাচ্ছে, সেই কথাটা আসলে পুরোপুরি সত্যি না। বরং আমরাই আসলে সময় আর স্থান, যাকে আধুনিক পদার্থবিদ্যার ভাষায় স্পেস-টাইম বলা হয়, এর মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলেছি। শুধু তাই না, এই সময়ের সংকোচন প্রসারণও সম্ভব, এমনকি গতির উপর নির্ভর করে সময় থেমেও যেতে পারে। ব্যাপারটা এতটাই চমকপ্রদ আর অবিশ্বাস্য ছিল যে আমি অনেক দিন ভাল করে ঘুমাতে পারি নি। পরে জানতে পারি আমি তো কোন ছাড়, আইনস্টাইন যখন প্রথম এই তত্ত্ব প্রকাশ করেন, তখন সব রকম প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও পৃথিবীর অধিকাংশ বিজ্ঞানী এটা মেনে নিতে নারাজ ছিলেন। কারণ আর কিছু নয়, সময়ের এই নতুন ধারণা আমাদের দৃশ্যমান জগৎ বা অভিজ্ঞতার একেবারেই বিপরীত।

সে যাই হোক, এই বিষয়ে আরও পরে আলোচনা করা যাবে। আমি বরং আপাতত আগের প্রসঙ্গে ফিরে যাই। ভূগোল আর অন্যান্য কিছু সহায়ক পড়ার মাধ্যমে আমি প্রথমে জানতে পারি মানুষের মধ্যে সময়ের ধারণা কীভাবে ধীরে ধীরে পরিস্ফুটিত হতে থাকে।

অতি প্রাচীনকালে মানুষের সময় মাপার কোনো যন্ত্র ছিল না। তখন তারা সময়ের হিসেব রাখত আকাশে সূর্য ও চন্দ্রের অবস্থান দেখে আর দিনের হিসেব রাখত চন্দ্র-সূর্যের উদয় ও অস্তের উপর ভিত্তি করে। একেবারে প্রাচীন কালে ওটাই তাদের জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু যখন ধীরে ধীরে কৃষি ব্যবস্থার বিপ্লব ঘটতে শুরু করল, বিভিন্ন ঋতু ও বছরের হিসেব রাখাও জরুরি হয়ে পড়ল। মানুষ প্রয়োজনের তাগিদে শিখে গেল কীভাবে আকাশে নক্ষত্রমণ্ডলীর অবস্থান ও এর পটভূমিতে চন্দ্রের অবস্থানের উপর নির্ভর করে বিভিন্ন ঋতু ও বছরের হিসাব রাখা যায়।

প্রাচীন মিশরীয়রা আকাশে সপ্তর্ষিমণ্ডলের অবস্থান দেখে শুধু ঋতু ও বছরের হিসেব রাখার পদ্ধতি আবিষ্কার করে। শুধু তাই না, রাতে সময়ের হিসাবও তারা একই পদ্ধতিতে বের করতে জানত।

 

বিভিন্ন ঋতুতে ধ্রুবতারা সাপেক্ষে সপ্তর্ষিমণ্ডলের অবস্থান

সপ্তর্ষিমণ্ডলের দুটি নির্দেশক তারকা, পুলহ ও ক্রতুকে একটি সরল রেখা দিয়ে যোগ করে সামনের দিকে টেনে দিলে তা সবসময় ধ্রুবতারার মধ্য দিয়ে যাবে। সারা বছর ধরে এই আপেক্ষিক অবস্থানে থেকে দিনের নির্দিষ্ট সময় ও ঋতুভেদে আকাশে সপ্তর্ষিমণ্ডলের অবস্থান অনেকটা ঘড়ির কাটার মত করে ধ্রুবতারার চারিদিকে ঘুরতে থাকে, আর তা থেকেই প্রাচীন মিশরীয়রা ঋতু ও বছরের হিসেব করতে পারত। অনেকের মতে ঘড়ির কাটার ধারণাটা সম্ভবত এখান থেকে এসেছে।

 

সময় গণনার ইতিহাস ও ঘড়ির ইতিকথা

সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষ ব্যবসা আর অন্যান্য কাজে জড়িয়ে পড়তে শুরু করল, ফলে সময়ের হিসাব শুধু দিন-রাত্রি, ঋতু বা বছর গণনাতেই সীমাবদ্ধ থাকল না। প্রয়োজন হল আরও সূক্ষ্ম ভাবে সময়ের হিসেব রাখা। এরই ফলশ্রুতিতে একসময় তৈরি হল সময় পরিমাপ দণ্ডের, যার দ্বারা সূর্যের কিরণ ও দিনের বিভিন্ন সময়ে দণ্ডের ছায়ার দৈর্ঘ্যের উপর নির্ভর করে সময় নির্ণয় করা হত। আরও পরে ধীরে ধীরে উদ্ভব হল সূর্যঘড়ি বা সানডায়াল, বালুঘড়ি ও জলঘড়ি। এদের মধ্যে বালুঘড়ি আমাদের সবারই চেনা, জলঘড়িও অনেকটা একই রকম নীতির উপর ভিত্তি করে তৈরি।

অন্যদিকে আকাশে সূর্যের বিভিন্ন অবস্থানের উপর ভিত্তি করে তৈরি হল সূর্যঘড়ি। এটির মূল অংশ হল গোলাকার চাকতির উপর লম্বালম্বি ভাবে বসানো একটি নির্দেশক দণ্ড। চাকতিটির উপর নানা স্থানে বিভিন্ন রকম সময় নির্দেশক দাগ কাটা থাকে। আকাশে সূর্যের অবস্থানের কারণে নির্দেশক দণ্ডের ছায়া বিভিন্ন দাগের উপর পড়ে এবং এর মাধ্যমেই মানুষ সময় বুঝতে পারে।

সূর্যঘড়ি
সূর্যঘড়ি

সূর্যঘড়ির প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় বাইবেলে। আন্দাজ করা হয় খৃষ্টপূর্ব ৭০০ শতকের আশেপাশের সময়ে এর উদ্ভব হয়েছিল। তবে অনেকেই দাবি করেন ব্যাবিলন ও চায়নায় আরও আগে থেকেই এর প্রচলন ছিল। গ্রিকরা এর ব্যবহার শিখে মিশরীয়দের থেকে। তারপর আরবরাও এর উন্নতিতে বেশ কিছু অবদান রাখে। কিন্তু যেহেতু সূর্যের আলোর উপর নির্ভর করেই এই ঘড়ি, এই ঘড়ির একটা বড় দুর্বলতা রয়েই গেল, কারণ আকাশে মেঘ থাকলে এই ঘড়ি পুরোপুরি অকেজো হয়ে যায়। ফলে মানুষের প্রয়োজন পড়ল আরও উন্নত কিছুর, যা সূর্যের আলোর উপর নির্ভর করবে না।

এদিকে বিভিন্ন দেশের মধ্যে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য শুরু হতেই মানুষ অভিন্ন এককের সময় যন্ত্রের প্রয়োজন বোধ করল। কারণটা খুব সহজেই বোধগম্য, তখন একেক দেশে একেক অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন রকমের সময়ের একক ব্যবহার করা হত। নিচের চার্টটি দেখলেই সমস্যার ধরনটি বোঝা যায় সহজেই।

সভ্যতা/দেশ সময়ের একক বর্তমান তুলনা
ব্যবিলনিয়া সভ্যতা ১ দিন = ১২ বেরু

১ বেরু = ৩০ গেস

১ গেস = ৬০ গার

 

২ ঘণ্টা

৪ মিনিট

মিশরীয় সভ্যতা ১ দিন = ২৪ ঘণ্টা (wnwt)
ভারতীয় সভ্যতা ১ দিন = ৩০ মুহালা

১ মুহালা = ২ গাদি

১ গাদি = ৬০ পল

 

৪৮ মিনিট

২৪ মিনিট

চৈনিক সভ্যতা ১ দিন = ১২ শিচেন

১ শিচেন = ২ জিয়োশি

 

২ ঘণ্টা

আধুনিক সভ্যতা ১ দিন = ২৪ ঘণ্টা

১ ঘণ্টা = ৬০ মিনিট

১ মিনিট = ৬০ সেকেন্ড

 

জন হ্যারিসন (১৬৯৩-১৭৭৬)

এই সমস্যাটির সমাধান ও নির্ভুল ভাবে সময় পরিমাপের গুরুত্ব সময়ের সাথে সাথে উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে।

শেষ পর্যন্ত ১৭১৪ সালের ৮ জুলাই কুইন অ্যানি (গ্রেট বৃটেন) এ ব্যপারে একটি বড় পদক্ষেপ নেন। সাগরেও দীর্ঘ সময় ধরে সঠিক ভাবে সময় পরিমাপ ও দ্রাঘিমাংশ নির্ণয় করতে পারবে এমন একটি যন্ত্র সফল ভাবে তৈরি করার জন্য তার সরকার ২০,০০০ পাউন্ড পুরস্কার ঘোষণা করে। সেই সময়ের হিসেবে টাকার অংকটা ছিল রীতিমত বিশাল।

বিজ্ঞানী জন হ্যারিসন তার চতুর্থ চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত ১৭৫৯ সালে সফল ভাবে তার সময় নির্ণয় যন্ত্রটি তৈরি করতে সক্ষম হন, যান্ত্রিক সময় যন্ত্র তৈরির ইতিহাসে যা ছিল এক বিশাল পদক্ষেপ।

জন হ্যারিসনের ঘড়িটি যান্ত্রিক ভাবে সফল হলেও, সময় গণনার একটি সমস্যা কিন্তু রয়েই গেল। কারণ, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সময় গণনা করা হত স্থানীয় সময়ের উপর ভিত্তি করে। উনবিংশ শতকে আন্তঃরাষ্ট্রীয় যোগাযোগ ও বাণিজ্য বহু গুণে বৃদ্ধি পেতে থাকায় একটি সমন্বিত আন্তর্জাতিক সময়ের প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি প্রকট হয়ে উঠল।

জন হ্যারিসনের এইচ ১ মেরিন ক্রনোমিটার (১৭৩৫)
জন হ্যারিসনের এইচ ৪ মেরিন ক্রনোমিটার (১৭৫৯)

জানা যায়, অ্যালেকজান্ডার গ্রাহাম বেল যখন তার আবিষ্কৃত টেলিফোন দিয়ে তার প্রথম কলটি করতে যাবেন, তখন তিনিও এই সমস্যাটি উপলব্ধি করলেন। কারণ পৃথিবীর একপ্রান্তে যখন দিন, অন্যপ্রান্তে তখন রাত। মজার ব্যাপার হল, এই সমস্যাটি থেকেই কিন্তু আসলে ‘হ্যালো’ শব্দটির উদ্ভব। তিনি সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না, কী বলে সম্বোধন করা সঠিক হবে। তার নিজের সময় অনুযায়ী ‘গুড মর্নিং’, নাকি অন্য প্রান্তের সময় অনুযায়ী গুড ‘আফটারনুন’। তাই তিনি সম্বোধনের জন্যে বেছে নিলেন ‘Ahoy-Hoy’ শব্দটি (ইউরোপে নাবিকেরা পরস্পরকে ডাকতে এই শব্দমালা ব্যবহার করতো)। পরবর্তীতে টমাস এডিসন ‘Hello’ শব্দটি ব্যবহার শুরু করেন।

এদিকে বৃটিশ সম্রাজ্যের একটি মূল ভিত্তি ছিল সমুদ্র বাণিজ্য। ফলে সমুদ্রে নাবিকদের অবস্থান ঠিক রাখতে ও সঠিক দ্রাঘিমাংশ নির্ণয় করতে একটি নির্দিষ্ট দ্রাঘিমাংশকে নির্দেশক হিসাবে ব্যবহার করাটা জরুরি হয়ে দাঁড়াল। তাই তারা গ্রিনিচ শহরের রাজকীয় মানমন্দিরের মধ্য দিয়ে অতিক্রান্ত দ্রাঘিমা রেখাকেই মূল দ্রাঘিমাংশ নির্দেশক হিসেবে বেছে নেয় (পরবর্তীতে ১৮৮৪ সালে যা আন্তর্জাতিক ভাবে ‘শূন্য দ্রাঘিমা’ হিসেবে গ্রহণ করা হয়)। ইতিমধ্যে ১৮৪৭ সাল নাগাদ যুক্তরাজ্যের রেলপথ গ্রিনিচ মান সময়কেই তাদের ট্রেন সিডিউলের স্টান্ডার্ড সময় হিসাবে ব্যবহার করতে শুরু করে। তাই এটি পরবর্তীতে রেলওয়ে টাইম হিসাবে পরিচিতি পায়। ১৮৫৮ সাল নাগাদ গ্রিনিচ সময় যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রীয় সময় হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। ১৯২৯ সাল নাগাদ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশই গ্রিনিচ সময়কে আন্তর্জাতিক মান সময় হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে।

পৃথিবীর প্রথম আনবিক ঘড়ি (১৯৫৫)

গত শতকের ৫০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে যান্ত্রিক সময় গণনার জগতে ঘটে যায় আরেকটি নতুন বিপ্লব, তৈরি হয় নতুন এক ধরনের ঘড়ি, যার নাম দেয়া হয় আনবিক ঘড়ি। ৯০ দশক নাগাদ সারা বিশ্বব্যাপী আনবিক ঘড়ির একটি নেটওয়ার্ক তৈরি কথা হয়। এই নেটওয়ার্কগুলোকে নিয়মিত সমন্বয়ের মাধ্যমে সারা বিশ্বে একটি সমন্বিত সময় ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে, যাকে আমরা কোরডিনেটেড ইউনিভার্সাল টাইম বা UTC হিসেবে জানি। পরমাণুর ভিতরে ইলেট্রনের বিকিরণের পরিমাপের উপর ভিত্তি করে আনবিক ঘড়ি সময় গণনা করে।

এই নীতির উপর ভিত্তি করেই সিজিয়াম-১৩৩ পরমাণু ব্যবহার করে জার্মানির বন শহরে তৈরি হয় একটি আনবিক ঘড়ি। লোহার তৈরি একটি বাক্সে নানান রকম তার, পাইপ ও ডায়াল পরিবেষ্টিত অবস্থায় ৩ (তিন) মিটার লম্বা সাবমেরিন আকৃতির সিলিন্ডারের মত দেখতে এই ঘড়ি। এক সেকেন্ড বলতে বৈজ্ঞানিক সমাজে এখন আর এক দিনের ৮৬,৪০০ ভাগের এক ভাগ বোঝানো হয় না, বরং এক সেকেন্ড বলতে এখন ভাগ বোঝানো হয় বন শহরে রক্ষিত সেই সিজিয়াম ঘড়ির একটি সিজিয়াম অনুর ৯,১৯২,৬৩১,৭৭০ বিটের বা বিকিরণের সমান। সারা বিশ্বে যতগুলো এরকম সিজিয়াম ঘড়ির দ্বারা স্টান্ডার্ড সময় নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তার মধ্যে সবচেয়ে সূক্ষ্ম এবং নির্ভুল এই ঘড়িটি।

কিন্তু একটা সমস্যা এর পরেও রয়ে গেল, কারণ পৃথিবী নিজেই মাঝে মাঝে পুরোপুরি সঠিক ভাবে সময় মেনে চলতে ব্যর্থ হয়। মাঝে মাঝে পৃথিবীর ঘূর্ণন গতির সামান্য গড়বড়ের কারণে সময়ের অতি সামান্য হেরফের হয়ে যায়, ফলে পৃথিবীর এই সময়ের সাথে তাল মেলানোর জন্য এই নেটওয়ার্কের সময়ে মাঝে মাঝে এক সেকেন্ড সময় যোগ করে নিতে হয়। ইন্টারন্যাশনাল আর্থ রোটেশন ও রেফারেন্স সিস্টেম সার্ভিস (আইইআরএস) এর সুপারিশক্রমে ১৯৭২ সালে সর্বপ্রথম এরকম ‘লিপ সেকেন্ড’ যোগ করা হয়। এরপর থেকে ২০১৭ সালের ১লা জানুয়ারি পর্যন্ত মোট ২৭ বার এরকম ‘লিপ সেকেন্ড’ যোগ করা হয়েছে।

কিন্তু সূক্ষ্মতার প্রতিযোগিতা এমনই এক প্রতিযোগিতা যা কখনই শেষ হয় না। আণবিক ঘড়ি দিন দিন আরও সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর হতে লাগল। ২০১৫ সালের ২১ এপ্রিল যুক্তরাজ্যের কলরাডো ইউনিভার্সিটির জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর ল্যাবরেটরি অ্যাস্ট্রফিজিক্স বা জিলা (JILA) এর একদল বিজ্ঞানী এক বিস্ময়কর ঘোষণা দেন। তারা জানান যে এ যাবৎ কালের সূক্ষ্মতম আণবিক ঘড়ি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন তারা। কিন্তু বিস্ময়টা সেখানে নয়, বিস্ময়টা অন্য জায়গায়—ঘড়ির অকল্পনীয় সূক্ষ্মতায়! এই ঘড়ি নাকি আগামি ৫ বিলিয়ন বছর পর্যন্ত নির্ভুল সময় দিতে সক্ষম! এই সময়ে এই ঘড়িতে নাকি এক সেকেন্ড সময়েরও হেরফের হবে না!

সংখ্যাটা দেখে রীতিমত ভিমড়ি খাবার মত অবস্থা আমার। জানতে চান কেন?

কারণটা খুবই স্বাভাবিক, পৃথিবীর নিজের বয়সই এখনও ৫ বিলিয়ন বছর হয় নি! এই বয়সে পৌঁছতে তার আরো ৫০০ মিলিয়ন বছর সময় লাগবে, অর্থাৎ পৃথিবীর বর্তমান বয়স এখন মাত্র ৪.৫ বিলিয়ন বছর!

(পরের অংশ)

Facebook Comments
Hassan Tareque Chowdhury

লেখক, কবি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে প্রধান মানব সম্পদ কর্মকর্তা। প্যারাসাইকোলজি ও স্পেকুলেটিভ সাইন্স ফিকশনের সমন্বয়ে লেখা দুটি বই: ‘দ্বিখণ্ডিত’ ও ‘যুগল মানব’।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here