page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

সিজোফ্রেনিক বিকালগুলি

আমাদের ময়মনসিংহের বাসার লাগোয়া জামে মসজিদ। সামনে রাস্তা। রাস্তার ওপারে একটি বাড়ি, দেয়ালের ঘরে টিনের চাল।

সেই বাসায় ভাড়া থাকতেন এক ভদ্রমহিলা, আমরা ডাকতাম খালাম্মা। খালাম্মার স্বামী থাকতেন ঢাকায়, সরকারী একটি দপ্তরের কর্তাব্যক্তি, দ্বিতীয় বিয়ে করে সংসার সাজিয়েছিলেন। কালে-ভদ্রে প্রথম পক্ষের স্ত্রী-সন্তানদের দেখতে যেতেন। পাড়ার ছেলেরা হাঁ করে তাকিয়ে তার ঢাউস জীপগাড়ি দেখত। আমি তখন স্কুল পেরিয়ে কলেজের আঙিনায়।

shakils-house-2

আমাদের ময়মনসিংহের বাসা।—লেখক

খালাম্মার তিন ছেলের সবাই অবিবাহিত। বড়—ঝন্টু ভাই। তিনি বেকার ছিলেন, তার মধ্যে মেয়েলিপনা ছিল প্রচুর। পাড়ার ছেলেরা দুষ্টামি করে ডাকত ঝন্টু আপা। ছোট ছেলে কালন ভাই ছিলেন মিষ্টার ময়মনসিংহ—বডি বিল্ডার। বিএ পড়তেন।

মেজ ছেলে মোসাদ্দেক ভাই ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করে মেডিকেল হাসপাতালেই ডাক্তার ছিলেন। মোসাদ্দেক ভাই ছিলেন লিকলিকে লম্বা। অস্বাভাবিক দ্যুতিময় চোখ। সারাদিন হাতের আঙুলের ফাঁকে সিগারেট। অনেক সময় হাতের জলন্ত সিগারেট আঙুল স্পর্শ করত। না বললে বুঝতেন না।

তার শার্ট-প্যান্টের বিভিন্ন জায়গায় সিগারেট দিয়ে পুড়ে যাওয়ার দাগ। আসলে তিনি ছিলেন মানসিক রোগী। পাড়ার ছেলেরা তাকে নানাভাবে উত্যক্ত করত। কিন্তু কেন যেন আমাকে তিনি খুব আদর করতেন। তার হয়ত ধারণা ছিল, আমি খুব ভাল ছেলে, বড় হলে অনেক বড় হব!

mahbubul-h-shakil-logo1

মোসাদ্দেক ভাই মাঝে-মধ্যেই বিগড়ে যেতেন। খুব বাড়াবাড়ি করলে তাকে কোথায় যেন নিয়ে যাওয়া হতো। ফিরতেন দু-তিনমাস পর দিব্যি সুস্থ হয়ে। তার চাকরিটিও থাকত বহাল-তবিয়তে।

যখন সুস্থ থাকতেন তার সাথে আমার অনেক কথা হতো। আমরা দুজনে পাড়ার মেডিকেল হোস্টেলের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে গল্প করতাম। তিনি তার ছোটবেলার গল্প, ক্যাডেট কলেজ জীবনের গল্প শুনাতেন, নাকিগলায় আবৃত্তি করতেন। হোস্টেল ক্যান্টিনে নিয়ে যেতেন আমাকে, ডালপুরি, সমুচা আর চা খেতে। অসম বয়সের এই বন্ধুত্ব দেখে অনেকেই হাসাহাসি করত। বলত, “পাগলা ডাক্তার এই ছেলেটাকেও পাগল বানাবে।”

কোনো কোনো বিকালে মোসাদ্দেক ভাই গুন গুন করে গান ধরতেন—”বন্দী পাখির মতো মনটা কেঁদে মরে…/ স্বর্ণ-ঈগল মন আমার অসীম আকাশে ওড়ে না আর।”

তারপর, কোনো এক বিকালে মোসাদ্দেক ভাই আর আসতেন না। তাদের বাসায় যেতাম। খালাম্মা আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলতেন, “কাল রাত থেকেই বাড়াবাড়ি শুরু করেছিল। ওকে আবার পাঠিয়ে দিয়েছি বাবা।”

shakils-house-1

“মাঝে-মধ্যে ময়মনসিংহ যাই। আমার আর মোসাদ্দেক ভাইয়ের সেই রাস্তায় লোক চলাচল নেই, শ্যাওলা জমেছে।

কেন যেন আমার ভীষণ কষ্ট হতো। বিষণ্ন বিকালে আমি একা একা মেডিকেল হোস্টেলের রাস্তায় হাঁটতাম। বন্ধুরা দুষ্টামি করে বলত, ও তো দেখি পাগলা মোসাদ্দেক হয়ে যাচ্ছে।

কলেজ শেষ করে চলে আসি ঢাকায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে। সময় গড়িয়ে গেছে। মোসাদ্দেক ভাইরা চলে গেছেন ময়মনসিংহ ছেড়ে। টিনের চালের বাড়িটি এখন বহুতল ভবন। মোসাদ্দেক ভাই বেঁচে আছেন কিনা তাও জানি না।

আরো পড়ুন: মাহবুবুল হক শাকিলের শ্রুতিকথা: ‘যতটা জেনেছি, যতটুকু দেখেছি’

মাঝে-মধ্যে ময়মনসিংহ যাই। আমার আর মোসাদ্দেক ভাইয়ের সেই রাস্তায় লোক চলাচল নেই, শ্যাওলা জমেছে।

কোনো কোনো বিকালে আমি একাই সেখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। কান পাতি গান শোনবো বলে—”স্বর্ণ-ঈগল মন আমার অসীম আকাশে ওড়ে না আর।”

About Author

মাহবুবুল হক শাকিল
মাহবুবুল হক শাকিল

কবি, রাজনীতিবিদ, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী। প্রকাশিত কবিতার বই: খোরোখাতার পাতা থেকে (২০১৫), মন খারাপের গাড়ি (২০১৬)।