page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

সিনেমার গরু গাছে চড়ে

(ডিরেক্টর, স্ক্রিপ্ট রাইটার, আর্টিস্ট, প্রডিউসার সকলের প্রতি সন্মান রেখে)

 

মিটিং – স্ক্রিপ্ট রাইটার, ডিরেক্টর, প্রডিউসার

প্রডিউসার ঘাপুস ঘুপুস করে চিকেনের রান খাচ্ছে আর স্ক্রিপ্ট ঘাটে।

প্রোডিউসার: নাম ‘কুট্টুস কাট্টুস প্রেম’ খারাপ না।

ডিরেক্টর: ছাতু ভাই, এমন বাড়ি দিব, সিনে সিনে টুইস্ট। জাতি বেক্কল হয়া যাবে। জাতি জানবে সিনেমা কাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী?

whomayun alik2

প্রডিউসার: বেশি বাড়ি দিয়েন না ফাইট্টা যাবে।

ডিরেক্টর: আর্‌রে বস, ফাটাইয়া দিমু মানে, দেখেন না খেলাটা। ডিরেক্টরদের জন্য সিনেমা বানানো টাফ হয়া যাবে।

প্রোডিউসার সালামত জং ছাতু ভাই টিস্যুতে মুখ মুছতে মুছতে স্ক্রিপ্ট রাইটারকে ইশারা করে। টিস্যুর হালকা সাদা টিস্যু লেগে থাকে।

স্ক্রিপ্ট রাইটার সারমর্ম বোঝায়। “কাহিনীর শুরুতেই মনে করেন টুইস্ট। শিপে যাচ্ছিল নায়িকা, আততায়ীর গুলিতে শেষ। নায়ক খুঁজতে থাকে কেন, কারা এই কাম করল। থ্রিল!”

প্রডিউসার: থ্রিল!? হায় হায় করসেন কী? নায়িকা পয়লাই মইরা যাইব। আমারে মাইরালান ভাই, কিছু একটা বাড়ি দিয়া আমারে মাইরালান। আরে ভাই বদলান বদলান। জিনিশটা এমনে দেন, “নায়ক নায়িকার শিপে পরিচয়। নায়িকা শ্যামাই মেয়েলি সমস্যা, একাকীত্ব এসব বিষণ্নতায় কাতর। নায়ক ঘর্ষণ খান ডিএসেলার দিয়ে শ্যামাইর দুর্লভ, মোহনীয় কিছু ছবি তোলে। শ্যামাই দেখে বিলা। তারপরে ছবি দেখে বিগলিত। ফেসবুক আদান-প্রদান। শ্যামাই দুষ্টলোকদের হাতে পড়লে নায়ক ঘর্ষণ বাঁচায়। নায়িকা নায়কের প্রেমে চিৎপটাং। কিন্তু শ্যামাইর পরিবার মানে না, ঘর্ষণ খান ফকিন্নির পুত।

স্ক্রিপ্ট রাইটার: এক্সিলেন্ট, পাইয়া গেছি।

হঠাৎ শিপ দুর্ঘটনায় পড়লে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তারা। শ্যামাই মেমোরি হারায়। পরিচয় হয় আরেক নায়ক জানবাজ তুফানের সাথে। দুজনের ইষ্টিকুলু চলতে থাকে। তুফান শ্যামাইরে ডাকে বিলাই, শ্যামাই তুফানরে দুষ্টামি করে ডাকে গণ্ডার। এদিকে নায়ক ঘর্ষণ ডিএসেলার নিয়ে দুইন্যা তামা তামা করে খুঁজতে থাকে শ্যামাইরে (হেগো আর কোনো কাম নাই, এটাই)। পরে যখন পায় তখন শ্যামাই জানবাজ গণ্ডারের কোলে। হায় হায়! কী অইল? এমন বেঈমানি করতে পারল। নারী জাতটাই বেঈমান। ঘর্ষণ খান বাংলা মদের বোতল নিয়া বসে। কইলজা পুড়ায় ফেলবে, এই কইলজা দিয়া আর কী হবে! ক্যাথা শিলাবে!

রোমান্স আর ইমোশানের চো… মানে চোটে পাবলিক গামছা আর বালতি নিয়া বসতে হবে।

প্রডিউসার: গুড। খাড়ান একটা ফোন সাইরা লই, হ্যালো… আপ্নে কিন্তু আছেন… আরে আপনার মাল দেখামু তো… আরে পার্টি হইব!

(ফোন রেখে) আচ্ছা, রোমান্টিক সিনে নায়ক-নায়িকার কাছে পাইন সয়াবিন তেল দেখাইতে হবে। ওদের সাথে চুক্তি।

ডিরেক্টর: নায়ক/নায়িকা সয়াবিন তেল দিয়া কী করবে? কোথায় ইউজ করবে?

প্রোডিউসার: জ্বালা! সেটা তো আপনার হেডেক। লোকেশান কই কই ফেলছেন?

ডিরেক্টর: বান্দরবনের জঙ্গল, কক্সবাজার। হেলিকপ্টারের শট আছে একটা।

প্রডিউসার: কী কন! বিদেশে কোথায়? আমি থাইল্যান্ড যাইতেছি ম্যাসাজ করতে, বডি ম্যাজ ম্যাজ করতেছে। ঐখানে সিন ফেলেন। গানের সিন। গান কয়টা?

ডিরেক্টর: গান… গান আছে। নায়িকা গুন গুন করে বাথরুমে গায়…।

প্রডিউসার: গুন গুন করে গায় মানে কী! ঐ বাথরুম থেকে পরে দেখান নায়িকা নায়কের কোলে পাতায়াতে জলকেলি করতেছে। বিদেশে কয়েকটা গান রাখেন। কয় ঘণ্টা হয়?

ডিরেক্টর: একটু বড় হয়ে গেছে। ১০৫ মিনিট।

প্রডিউসার: আপ্নে তো আমারে ডুবাইবেন। ১০৫ মিনিটের ছবি আমি বেচমু কেমনে?
মাইর লাগান মাইর লাগান।

ডিরেক্টর: কাকে? স্ক্রিপ্ট…।

প্রডিউসার: আরে সিনে বুসুম বাসুম মাইর ঢোকান। আমার এই ছবি ফাইট দিবে দাবাং-খ্যাত নায়ক জায়েদ খানের ‘ফাটা কষ্ট দি ফা-ক’-এর লগে। ওর ছবিরে উষ্টা দিয়া ল্যাং দিতে সেই লেভেলের অ্যাকশান লাগবে।

ডিরেক্টর: এখনকার স্টাইলে অ্যাকশান দিতে চাইলে একটু খরচ লাগবে। বাজেটটা…।

স্ক্রিপ্ট রাইটার: নায়িকার সিন করি!

প্রডিউসার: কর কর নায়িকারে কর বেশি কইরা।

স্ক্রিপ্ট রাইটার: দি আইডিয়া। নায়িকারে ধর্ষণ করি… মানে ধর্ষণ সিন করি। ক্লাসিকও হবে, পাবলিকও খাবে। পাবলিক তরকারিতে মসলা চায়।

প্রডিউসার: কর। সেন্সর খাইব? বুইঝা… এন্ডিং কী?

স্ক্রিপ্ট রাইটার (উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে): মনে করেন হেভি ট্রাজিক। দুজনেই মারা যায়। টাইটানিক দিয়া শুরু রোমিও জুলিয়েট দিয়া শেষ।

প্রোডিউসার: তোমরা ব্যাবসার ‘ব’ও বোঝো না, আইছো সিনেমা বানাইতে। আমারে তুইলা আছাড় মারো। এন্ডিংয়ে হিরো-হিরোইন মাইরা ফেললে, মিল না দিলে পাবলিক জুতাপেটা করব আমারে। বুঝছি আমারে ব্যাবসা করতে দিবা না। আরে নায়ক-নায়িকার বাপ-মা নাই? বোন-দুলাভাই নাই? ওগোরে মারো। নায়ক-নায়িকা ক্যামনে মরে, আজব!
স্ক্রিপ্ট রাইটার, ডিরেক্টর আলাপ করে।

স্ক্রিপ্ট রাইটার: হ, তাইলে একটা গ্যাটিস লই। নায়কের বোন। ওর উপর দিয়া সব যাক।

প্রোডিউসার: এট্টু কমেডি রাখছো?

স্ক্রিপ্ট রাইটার: দিলদার মরার পর থেকে ইন্ডাস্ট্রিতে বিশাল শূন্যতা চলতেছে। দেখি দুই সিনে মীরাক্কেলের সবগুলারে ম্যানেজ করা যায় নাকি! কিন্তু ছাতু ভাই-ই, এই সিন এমন মজা করে লিখছি ছাতু ভাই, সিন ভাবি আর হাসি… হা হা হা। হাসতে হাসতে সারারাত আমি ঘুমাইতে পারি নাই… পাবলিক খুব মজা পাবে। এক সিনে কমেডিয়ান লুঙ্গি খুলে দৌড় মারে… হা হা হা… দেখেন এখনও হাসি থামাইতে পারতেছি না…

ডিরেক্টরের হাসি পায় না তারপরও হাসিতে যোগ দেয়।

প্রোডিউসার: দাও দাও। দুই সিনে পাবলিক যাতে হাসতে হাসতে প্যান্ট খুইলা যায়।

ডিরেক্টর: ছাতু ভাই, এত কিছু থাকবে আইটেম থাকবে না।

প্রোডিউসার (লাফ দিয়া): আররে আররে আররে মিয়া তুমি তো মাল। ঢাল ঢাল। আইটেম ছাড়া কেমনে! কারে নিবা?

স্ক্রিপ্ট রাইটার: ছাতু ভাই, আমার চেনা-জানা একটা মেয়ে ছিল। খুব ডেডিকেটেড, প্যাশনেট, এগ্রেসিভ, সিনসিয়ার, উদার দ্যা বোল্ড। চরিত্রের প্রয়োজনে যে কোনো কিছু করতে প্রস্তুত।

প্রোডিউসার: অ… তুমিও এই কাম! তোমরা মিয়া খাইতে দিলে শুইতে চাও…।

ডিরেক্টর: আররে কত মাইয়া লাইন দিয়া আছে। আমাদের চিন্তা করতে হবে কোয়ালিটি। ছাতু ভাই, ধামাকা কোনো নায়িকারে দিয়া করাই।

প্রোডিউসার মজা পায়া গেছে। আইস দিয়া… বিফ দিয়া… হালকা কোক দিয়া… টুং টাং।

প্রোডিউসার: কে?

ডিরেক্টর: শিনা উঁচা চৌহান।

প্রডিউসার: হ, যায়… কিন্তু…।

প্রডিউসার, স্ক্রিপ্ট রাইটার, ডিরেক্টর ঠ্যাং তুলে বসে, সবাই পছন্দমত একটা জায়গায় এসে একমত হতে পারে। ছবির খবর নাই, আইটেম সং নিয়া তাদের ছন্দময় আলোচনা, চুলচেরা গবেষণা চলতে থাকে… পরিবেশ ঘন, তামাল, জমজমাট, আনন্দময় হয়ে ওঠে!

প্রডিউসার: গান কারা দিয়া লেখাইবেন?

ডিরেক্টর: আররে বস আছে না মারসুখ ভাই, নাক্কি নাই! একটা গান দিছিল:

“আমার মরিচ কই ঢুকলোরে,
হারায়া গেল পাই না ক্যারে হুক্কা হুয়া হুক্কা হুয়া…
জ্বলে জ্বলে জ্বলে ক্যারে…!”

About Author

হুমায়ূন সাধু
হুমায়ূন সাধু