page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব
লাইফস্টাইল

সিলেট এম সি কলেজে তিন বছর

১৯৬০ সাল থেকে সমগ্র পাকিস্তান জুড়ে তিন বছর মেয়াদী ডিগ্রি কোর্স চালু হয়েছিল। ১৯৫৯ সালে রচিত শরীফ শিক্ষা কমিশনের প্রস্তাব অনুসারে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের নির্দেশে এই নতুন নিয়ম চালু করা হয়।

প্রস্তাবিত এই শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষা খাতে সরকারি খরচকে অনুদান নয় বরং বিনিয়োগ হিসাবে বিবেচনা করার সুপারিশ ছিল। অনুদান আর বিনিয়োগের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে অনুদানের বিনিময়ে কোনো রিটার্ন চাওয়া হয় না কিংবা পাওয়া যায় না। কিন্তু বিনিয়োগ থেকে রিটার্ন পেতে হবে। অন্যথায় বিনিয়োগ করা হবে না।

শরীফ শিক্ষা কমিশনের প্রস্তাব অনুসারে মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের জন্যে ব্যাপক হারে স্কলারশিপ, পুস্তক ভাতা এবং শিক্ষা ভ্রমণের জন্যে আর্থিক বরাদ্দের কথা বলা হয়েছিল। ছাত্রদেরকে লেখাপড়ায় অধিক মনোযোগী করার উদ্দেশ্যে প্রচলিত নিয়ম অনুসারে দুই বছর বা তিন বছর পর একবারে পরীক্ষা দেওয়ার পরিবর্তে প্রতি বছর পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

শরীফ শিক্ষা কমিশনের একটি বিশেষ সুপারিশ আমার তদানীন্তন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমার কাছে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছিল। এই ব্যবস্থা অনুসারে কোনো ছাত্র পাস কোর্সে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম বছরের পরীক্ষায় যদি শতকরা ৬০ ভাগ নম্বর পায় তাহলে সেই ছাত্র ইচ্ছা করলে অনার্স কোর্সে ভর্তি হতে পারবে। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় আমার অপশনাল বিষয়ের মধ্যে ইকনমিকস না থাকায় খুব ভাল রেজাল্ট করা সত্ত্বেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি ইকনমিকসে ভর্তি হতে পারি নাই। আমি মনে করলাম এটা আমার জন্যে সুবর্ণ সুযোগ। আমি তখন ঢাকা কলেজে ইকনমিকস অপশনাল সাবজেক্ট নিয়ে ভর্তি হলাম।

ali ahmad rushdi png

বিভিন্ন কারণে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রদের কাছে শরীফ শিক্ষা কমিশনের সুপারিশসমূহ গ্রহণযোগ্য ছিল না। তিন বছর মেয়াদি ডিগ্রি পরীক্ষা চালু হওয়ার পর থেকেই এই ব্যবস্থা অপসারণের জন্যে ছাত্ররা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিল। তাদের এই আন্দোলনের প্রতি রাজনৈতিক নেতা, শ্রমিক নেতা, রিকশাঅলা ও অন্যান্য পেশার শ্রমিকদেরও সমর্থন ছিল।

আন্দোলনকারীরা পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র-জনতার মধ্যে এ বিশ্বাস জন্মাতে পেরেছিল যে তিন বছর মেয়াদি ডিগ্রি কোর্স একটি শিক্ষা সঙ্কোচন নীতি এবং এই নীতি বর্জন করা ছাড়া তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের অগ্রগতি কিছুতেই সম্ভব না।

শরীফ শিক্ষা কমিশনের অপরাপর সুপারিশের সাথে সাথে ছাত্রদের বেতন বৃদ্ধিরও একটি সুপারিশ ছিল। কমিশনের সকল প্রকার উন্নয়নমূলক সুপারিশকে মলিন করে দেবার জন্যে এই একটি সুপারিশই যথেষ্ট ছিল। ১৯৬২ সালের আগস্ট মাসের দিকে আন্দোলন চরম আকার ধারণ করে এবং আইয়ুব খানের নির্দেশে ঐ বছর সেপ্টেম্বর মাস থেকে শরীফ শিক্ষা কমিশনের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

তিন বছর মেয়াদি ডিগ্রি পরীক্ষার কার্যক্রম অনেকটা অপরিকল্পিত ভাবেই বন্ধ করা হয়। তিন বছরের মধ্যে ছাত্ররা মাত্র দুই বছর পড়াশোনা করেছে এবং নির্ধারিত তিনটি পরীক্ষার মধ্যে মাত্র দুইটি পরীক্ষা দিয়েছে। অর্থাৎ দুই তৃতীয়াংশ পরীক্ষার ভিত্তিতেই ডিগ্রি পাস। যাই হোক, আমার জন্যে এই পরিবর্তন ছিল একটি দারুণ দুঃসংবাদ। দুই বছর মেয়াদি ডিগ্রি কোর্স পুনঃপ্রবর্তনের ফলে দ্বিতীয় বছরে আমার অনার্স পড়ার সম্ভাবনা আর রইল না।

তদানীন্তন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন কলেজসমূহের মধ্যে একমাত্র এম সি কলেজ, সিলেট ও চিটাগাং কলেজে ইকনিমিকসে অনার্স চালু ছিল। দুই বছর মেয়াদি ডিগ্রি কোর্স আবার চালু হওয়ার ফলে আমার উচ্চশিক্ষার পথ বিনষ্ট হতে যাচ্ছে জানিয়ে উভয় কলেজের প্রিন্সিপাল বরাবর দরখাস্ত করলাম। ১০ দিনের মাথায়ই উভয় কলেজ থেকে অ্যাকসেপটেন্স লেটার পেলাম। আমি সিলেট এম সি কলেজে ভর্তি হব বলে মনস্থ করলাম এবং ঢাকা কলেজ থেকে টিসি নিয়ে সিলেট চলে গেলাম।

২.
সিলেট শহর থেকে তিন মাইল দূরে টিলাগড়ে প্রতিষ্ঠিত এম সি কলেজের প্রাকৃতিক শোভা ছিল (এবং এখনও) অবর্ণনীয়। এক কথায় প্রথম দৃষ্টিতেই প্রেমে পড়ার মতো।

একদিকে বেশ উঁচু একটি টিলার উপর শিক্ষকদের বিশ্রাম ও বসবার ঘর, প্রিন্সিপালের অফিস, অন্যদিকে একটি উঁচু পাহাড়ের উপর প্রিন্সিপালের বাসস্থান। পাহাড়টি এতই উঁচু যে পায়ে হেঁটে ওখানে ওঠা ও নামা ছিল রীতিমত কষ্টকর।

mc-college-51

প্রিন্সিপাল সাহেব বাসায় যাতায়াতের জন্যে গাড়ি ব্যবহার করতেন। গাড়ি চলার জন্যে পাহাড়টির চার দিক ঘুরে গাড়ি চলার পথ করে দেওয়া হয়েছে। নিচে কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন স্তরে আর্টস বিল্ডিং, সায়েন্স বিল্ডিং, লাইব্রেরি ভবন, কমন রুম ও অডিটরিয়াম। এই সব কয়টি স্থাপনাই বৃটিশ আমলে করা। অদূরে নব নির্মিত ইন্টামেডিয়েট বিল্ডিং এর কাজ তখনও চলছে। টিচার্স কমন রুম থেকে নিচ পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল সিঁড়িটি ছিল দেখার মতো।

কলেজ থেকে সামান্য দূরে ছাত্রদের হোস্টেল। পাহাড়বেষ্টিত এই সুন্দর একতলা হোস্টেলটির ছয়টি ব্লক ছিল। সব কয়টিই ছাত্রদের জন্যে। তখনও ছাত্রীদের জন্যে কোনো হোস্টেল ছিল না। হোস্টেলের মাঝখানেই ছিল বিরাট পুকুর। দুই দিকে শান বাঁধানো ঘাট। হোস্টেলে ঢুকবার পথেই বাম দিকে কমন রুম ও অডিটরিয়াম। হোস্টেলের সামনেই বেশ কিছু খালি জায়গা। তার পরে রাস্তা এবং রাস্তার পরেই কলেজের খেলার মাঠ। খেলার মাঠের পেভিলিয়নটি রাস্তার পাশেই। সেই পেভিলিয়নের এক পাশে বুড়ো মিয়ার চায়ের দোকান। ঐ নির্জন রাস্তার পাশে হোস্টেলের ছাত্ররাই ছিল বুড়ো মিয়ার একমাত্র ভরসা।

এই সময়ে এম সি কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন জনাব সলমান চৌধুরী। জাঁদরেল প্রিন্সিপাল হিসাবে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে বিখ্যাত ছিলেন তিনি। আমার ভর্তির আবেদন পেয়ে তিনি আমাকে ভর্তির সম্মতি দিয়েছিলেন বটে কিন্তু আমাকে দেখার পর যখন জানলেন ইন্টামেডিয়েট ক্লাসে আমার ইকনমিকস ছিল না তখন ভর্তির ব্যাপারে তিনি একটি শর্ত জুড়ে দিলেন। শর্তানুসারে প্রথম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষায় সব বিষয়ে আমাকে শতকরা ৫০ ভাগের উপরে নম্বর পেতে হবে। না পেলে আমাকে পাস কোর্সে ট্রান্সফার করা হবে।

আমি এই শর্ত মেনে নিয়েই ভর্তি হলাম।

১৯৬২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৬৫ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় তিন বছর আমি এম সি কলেজে যে সব শিক্ষকদের কাছে ইকনমিকস পড়েছি তাঁরা হচ্ছেন সর্ব জনাব ড. খলিলুর রহমান, এমদাদুল হক মজুমদার, শামসুর রহমান, টি হোসেন ও আনোয়ার হোসেন। এছাড়া যে সব শিক্ষকদের সান্নিধ্যে এসেছি তাঁরা হচ্ছেন প্রফেসর নোমান (ইংরেজি), প্রফেসর আলীম আলী (ইংরেজি), জনাব মোফাজ্জল করীম (ইংরেজি), প্রফেসর হাসনা বানু (বাংলা), জনাব তৈয়ুবুর রহামান (বাংলা), প্রফেসর হায়দার হোসেন (ইতিহাস), প্রফেসর আলা উদ্দিন আল-আজাদ (বাংলা), প্রফেসর আলী আহাম্মদ (রাষ্ট্রবিজ্ঞান), প্রফেসর খোরশেদ আলম (রাষ্ট্রবিজ্ঞান), প্রফেসর আব্দুল আজিজ (আরবি), প্রফেসর গোলাম রসূল (বোটানি) এবং আরও অনেকে।

mc-college-5

এম সি কলেজ হোস্টেল।

এই সব শিক্ষকদের অনেকেই পরবর্তী কালে আরো বড় বড় দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন এবং কোনো না কোনো পর্যায়ে আবার তাঁদের সান্নিধ্য পেয়ে ধন্য হতে পেরেছিলাম। আমার শিক্ষকদের মধ্যে প্রফেসর খলিলুর রহমান লাহোর স্টাফ কলেজের ডাইরেক্টর, ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাশ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং পরে ডাইরেক্টর অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন (ডি পি আই) হিসাবে অত্যন্ত দক্ষ ও নীতিবান প্রশাসক হিসাবে খ্যাতি লাভ করেন। প্রফেসর এমদাদুল হক মজুমদার বরিশাল বি এম কলেজ এবং জগন্নাথ কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। প্রফেসর শামসুর রহমান দৌলতপুর ডি এল কলেজ খুলনার প্রিন্সিপাল হিসাবে কাজ করেন। জনাব টি হোসেন ও তৈয়ুবুর রহামান সাহেব পাকিস্তান (পরে বাংলাদেশ) ট্যাক্সেশন সার্ভিসে যোগ দেন। আনোয়ার হোসেন সাহেব সহকারি ডি পি আই হয়ে ঢাকায় চলে আসেন।

প্রফেসর নোমান সাহেব প্রথমে এ ডি পি আই এবং পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার পদে নিয়োজিত ছিলেন। প্রফেসর আলীম আলী ঢাকা তীতুমীর কলেজের অধ্যক্ষ, প্রফেসর আলী আহাম্মদ, প্রফেসর আলা উদ্দিন আল-আজাদ, ও প্রফেসর খোরশেদ আলম ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ, প্রফেসর হাসনা বানু ইডেন গার্লস কলেজের অধ্যক্ষ, প্রফেসর গোলাম রসূল পাবনা এডয়ার্ড কলেজের অধ্যক্ষ এবং প্রফেসর আজিজ সাহেব ঢাকা আলীয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ নিযুক্ত হয়েছিলেন। জনাব মোফাজ্জল করীম সেন্ট্রাল সুপারিয়র সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে C.S.P. ক্যাডারে যোগ দেন। পরে তিনি বাংলাদেশ সরকারের সচীব এবং ইংল্যান্ডে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসাবে কাজ করেন।

এম সি কলেজে আমার সহপাঠীদের মধ্যে ছিল নজমুল ইসলাম চৌধুরী, রশীদ চৌধুরী, সিরাজুল ইসলাম, রিয়াজ উদ্দিন, সুনীতি, গীতা ও শ্যামলী। আমরা সবাই অনার্স পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করি এবং পরে গীতা, সুনীতি, শ্যামলী ও আমি শিক্ষকতা, রিয়াজ ও রশীদ ব্যাংকিং, নজমুল সিভিল সার্ভিস এবং সিরাজ ক্ষুদ্র শিল্প উন্নয়ন সংস্থার (BSIC) কাজে যোগদান করি।

৩.
অনার্স ক্লাসে ছাত্রের সংখ্যা কম হওয়ায় এবং ঢাকার মতো কোলাহলপূর্ণ বড় শহর না হওয়ায় আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল খুবই নিবিড় এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ। হোস্টেলে থাকতাম আমরা তিন জন—আমি, রশীদ ও রিয়াজ যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ব্লকে। অনার্সের ছাত্র ছিলাম বলে অন্যান্য ছাত্ররা আমাদেরকে কিছুটা শ্রদ্ধার চোখে দেখতো। ছুটির সময়ে আমরা তিন বন্ধুতে মিলে কমন রুমে ক্যারাম খেলতাম। অন্যরাও আমাদের সাথে খেলায় যোগ দিত। প্রত্যেক ব্লকে এক জন করে প্রিফেক্ট থাকত। তাঁদের কাজ ছিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ব্যাপারে হোস্টেল সুপারকে সাহায্য করা। আমাদের ব্লকের প্রিফেক্ট ছিল মুকতাদির ভাই এবং সুপার ছিলেন প্রফেসর গোলাম রসূল। বর্তমান শিক্ষা মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ আমার ব্লকমেট ছিলেন।

প্রত্যেক হোস্টেলেই যথারীতি চকিদার, বয় বাবুর্চি ছিল। চকিদার ও বাবুর্চিকে আমরা ডাকতাম চকিদার ভাই ও বাবুর্চি ভাই। তাঁরা আমাদের ডাকত মিঞা বলে। হোস্টেলে আমাদের সুইট কেস কিংবা দরজায় কখনো তালা দিতে হত না। যে তিন বছর আমি সেখানে ছিলাম কখনই কিছু চুরি যায় নি এবং অন্য কারো কিছু চুরি গেছে বলেও শুনি নি।

সিলেটের অন্যান্য স্থানের মতো হোস্টেলেও আতপ চালের ভাত রান্না হতো। সাধারণতঃ ভাতের মার ফেলা হত না। আমরা ভাত খেতাম তিন বেলা। দুপরের খাবারের সময় খুব বেশি তরকারী থাকত না, এটাকে বলা হত নাসতা। এম সি কলেজের আতপ চালের ভাত এতই ভাল লাগত যে আমি আর তা কোনো দিনই ছাড়তে পারি নি। আমার দেশের বাড়িতে সিদ্ধ চালের ভাত খাওয়া হয় কিন্তু আমি বাড়িতে গেলে মা আমার জন্য আতপ চালের ভাত করতেন। তিন বেলা ভাত খাওয়ার অভ্যাসটি অবশ্য রফত করতে পারি নি ।

৪.
এম সি কলেজ সিলেট ছিল আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ তিন বছর। এই সময় ছিল আমার জীবন গড়ার সময়। এই সময় ছিল জীবন উপভোগ করার সময়, জীবনকে ভালবাসার সময়। এম সি কলেজের বেশির ভাগ ছাত্রই আসতো ধনী পরিবার থেকে। অনেক ছাত্রের ভাই কিংবা আত্মীয় স্বজন ইংল্যান্ডে থাকতেন। প্রতি মাসে তাদের নামে অনেক টাকা আসত। এত টাকা খরচ করার মতো ব্যবস্থা কলেজ হোস্টেল কিংবা কলেজ প্রাঙনে ছিল না।

আমি আমার ইন্টামেডিয়েট পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে দুইটি স্কলারশিপে প্রতি মাসে ১৫০ টাকার মতো পেতাম। এই টাকা এক জন ছাত্রের জন্যে যা দরকার তার চেয়ে বেশিই ছিল তবে যাদের লন্ডনি গার্জেন আছে তাদের সাথে পাল্লা দেবার মতো যথেষ্ট ছিল না। এটা আমার জন্যে ভালই ছিল, লেখাপড়ায় মনোযোগ দেবার জন্যে আমার হাতে প্রচুর সময় ছিল।

লেখাপড়ায় ভাল করছি বলে আমি ছাত্র ও শিক্ষকদের সুনজরে ছিলাম। ড. খলিলুর রহমান, এমদাদুল হক মজুমদার, সামসুর রহমান প্রমুখ আমাকে অপরিমেয় সাহায্য, সহায়তা ও সাহস যোগাতে লাগলেন।

মজুমদার সাহেব ইকনমিকসের জটিল বিষয়সমূহের উপর এক প্যারা কিংবা এক পৃষ্ঠার সহজ সরল ভাষায় নোট করে দিতে লাগলেন এবং বলতেন এই সব বিষয়ের তাত্ত্বিক বিবরণ বিস্তারিত জানার জন্যে তোমাদের আরও বই পড়তে হবে কিন্তু জিনিসটা কী তা জানার জন্যে আমার নোটই যথেষ্ট। ইকনমিকসের জটিল বিষয়গুলো বুঝবার জন্যে স্যারের এসব নোট যে কী অপরিসীম উপকারে লেগেছিল তা বোঝাবার ভাষা আমার নাই।

স্যার বলতেন কোনো জটিল বিষয়কে ভয় পেলে তা আরও জটিল আকার ধারণ করে। আর যদি মনে করো অন্য দশ জনে পারলে আমি কেন পারবো না তাহলে দেখবে তা সহজ হয়ে গেছে। মজুমদার স্যারের এ বক্তব্য যে কত সত্য আমিই তার প্রমাণ। শুধু অনার্স ক্লাসেই নয় পরবর্তী কালেও বার বার এর প্রমাণ পেয়েছি। ১৯৬৯ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বারের মতো যখন Econometrics পড়া শুরু করি, তখন প্রথমে ভয় পেয়ে গেলেও পরে মজুমদার স্যারের কথা স্মরণ করে যখন বার বার অনুশীলন করতে থাকি তখন দেখা গেল অন্য সবার মতো আমার কাছেও ইকনমিট্রিকস আর দুর্বোধ্য নয়।

মজুমদার স্যারের এই সদুপদেশ পরবর্তী কালে আমি আমার ছাত্রদের কাছেও পেশ করেছি এবং আমার ছাত্ররাও আমার মতোই এর সততা প্রমাণ করেছে। আমার মনে হয় মজুমদার স্যারের এই চিরন্তন সত্যটির সাথে আরেকটি ব্যাপার জড়িত আছে, তা হচ্ছে শিক্ষক কীভাবে এই সত্যটি ছাত্রের কাছে পৌঁছাচ্ছে। শিক্ষকের আন্তরিকতা, সৌহার্দ্য এবং ছাত্রের প্রতি মমত্ববোধই এই সত্য বাণীর মর্মার্থ ছাত্রের হৃদয়ে পৌঁছাতে সক্ষম।

প্রফেসর মজুমদার সিলেট শহরে বাড়ি ভাড়া করে সপরিবারে থাকতেন। তিনি এবং ম্যাডাম (যিনি চৌমুহানী কলেজের অধ্যক্ষ তোফাজ্জল হোসেন সাহেবের কন্যা ছিলেন) অত্যন্ত ভদ্র ও অতিথিপরায়ণ ছিলেন। বিভিন্ন উপলক্ষ্যে ওনার বাসায় খাওয়া দাওয়ার দাওয়াত পেতাম।

ড. খলিলুর রহমান থাকতেন সিলেট সার্কিট হাউজে। ওনার একটি ফিয়াট গাড়ি ছিল। তিনি নিজেই ড্রাইভ করতেন এবং যাতায়াতের সময় যে কোনো ছাত্র বা শিক্ষককে পেলেই লিফট দিতেন। শহরের পথে রাস্তার পাশে পেলেই তিনি গাড়ি থামাতেন এবং গাড়ি থেকে নেমে দরজা খুলে বলতেন চলো। তার পর সার্কিট হাউজে নিয়ে গিয়ে চা কফি খাইয়ে গল্প করে তবে বিদায় দিতেন। তিনি এক সময় পশ্চিম গাঁও কলেজের ছাত্র ছিলেন এবং পরে কিছু দিন সেখানে শিক্ষকও ছিলেন। সেই সুবাদে আমার সাথে সতীর্থের মতো একটা বিশেষ সম্পর্কও গড়ে উঠেছিল। একদিন কথা প্রসঙ্গে ছাত্র রাজনীতির কথা উঠলো। তিনি বললেন, যে সব ছাত্ররা রাজনীতি নিয়ে বেশি মাতামাতি করে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় তারা ওখানেই পড়ে থাকে। প্রকৃত নেতা হবার জন্যে দেশ, সমাজ, অর্থনীতি, ইতিহাস সম্পর্কে জানা দরকার এবং সেক্রিফাইস করার মতো ক্ষমতা থাকা দরকার। তোমার নিজেরই যদি কিছু না থাকে তবে দান করবে কী, ত্যাগই বা করবে কী?

আমি বললাম, ছাত্ররা রাজনীতি না করলে দেশে রাজনীতিবিদ আসবে কোত্থেকে?

স্যার বললেন, সাঁতার শিখতে গিয়ে যদি পানিতে ডুবে মরতে হয় তাহলে সেটা সাঁতার শেখা হলো? স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটির বছরগুলো লেখাপড়া অর্জনের জন্যে, রাজনীতি শিক্ষার জন্যে নয়। লেখাপড়া শেষ করে যার যত খুশি রাজনীতি করুক, বাধা তো নেই। লেখাপড়া শেষ না করেও যদি কেউ রাজনীতিতে ঢুকতে চায় তাতেও আপত্তি নাই। কিন্তু লেখাপড়া করবো না অথচ ছাত্র থাকবো এবং ছাত্র রাজনীতি করবো এই পন্থায় দেশের জন্যে কোনো মঙ্গল আসতে পারে না।

আমি স্যারের কথায় সায় জানালাম।

৫.
দ্বিতীয় বছর অনার্সে উঠে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালইয়ে অর্থনীতি বিভাগের তদানীন্তন চেয়ারম্যান প্রফেসর নূরুল ইসলাম সাহেবের সাথে দেখা করি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রান্সফার নিয়ে আসার জন্যে অনুরোধ জানাই। তিনি জানালেন যদি এম সি কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাকে ছেড়ে দিতে আপত্তি না করে তাহলে আমাকে ভর্তি করাতে ওনার কোনো আপত্তি নাই। আমি কথাটা ড. খলিলুর রহমানকে জানাই। তিনি জানতে চাইলেন কেন আমি এম সি কলেজ ছেড়ে যেতে চাই।

আমি বললাম, ভাল রেজাল্ট করার জন্যে।

তিনি বললেন, তুমি কি ফার্স্ট ক্লাস আশা করছো? যদি তা না হয় তাহলে একটা সেকেন্ড ক্লাস তুমি এখান থেকেও পাবে। এটা আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

অনার্স পরীক্ষার আগে আমার আর ঢাকায় যাওয়া হলো না।

সেই সময়ের অন্যান্য শিক্ষকদের মতো ড. খলিলুর রহমানও চক ডাস্টার নিয়ে ক্লাসে যেতেন। ব্যতিক্রম ছিল তিনি কখনোই ক্লাস শেষ করার পর ব্ল্যাক বোর্ড অপরিষ্কার রেখে ক্লাস থেকে বের হতেন না। তিনি বলতেন, আমরা এ পৃথিবীটাকে যেমন পেয়েছি তার চেয়ে একটু ভাল অবস্থায় রেখে যাওয়া আমাদের সবার কর্তব্য।

৬.
প্রথম যখন এম সি কলেজে আসি ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় আমার রেজাল্টের কথা শুনে দু এক জন ছাত্র ঈর্ষাপরায়ণ মন্তব্য করেছিল যে সহজ বিষয় নিয়ে পড়ার ফলে আমার পক্ষে ভাল  রেজাল্ট করা সম্ভব হয়েছে। তাদের মতো ইকনমিকস নিয়ে পরীক্ষা দিলে বোঝা যেত আসল ব্যাপার।

শুনে আমি বলতাম আমি তো কারও সাথে নিজেকে তুলনা করছি না। ভাবতাম ইন্টারমিডিয়েটে ইকনমিকস থাকলে এই বিষয়ে অনার্স পড়ার সুবিধা তো অবশ্যই আছে। কিন্তু ইন্টারমেডিয়েটে ইকনমিকস না থাকলে অনার্সে এসে নাকাল হতে হবে এমন তো কোনো কথা নয়। সায়েন্স গ্রুপ থেকে আগত ছাত্রছাত্রীরা তো ইকনমিকসে ভালই করে যাচ্ছে। বছর শেষে যখন সবার চেয়ে ভাল নম্বর পেয়ে দ্বিতীয় বর্ষ অনার্সে উঠলাম তখন আর সহজ বিষয়ের কথা ওঠে নাই। বরং ইকনমিকসের জন্যে যেটুকু ম্যাথ জানা দরকার এই সময়ের মধ্যে তা আয়ত্ত করে নেবার ফলে আর কোনো অসুবিধা পোহাতে হয় নি আমাকে।

প্রতি বছর আমাদের কলেজ থেকে প্রচুর ছাত্রছাত্রী দলে দলে পিকনিকে যেত তামাবিল বর্ডার থেকে অদূরে জাফলং। খাসিয়া পাহাড়ের পাদদেশে বিস্তৃত এলাকা নিয়ে প্রকৃতির লীলাভূমি এই জাফলং। উপরে খাসিয়া পাহাড়ে গাছের সাথে মেঘেরা কোলাকুলি করছে, চপলা বালিকার মতো চিরহরিত পত্রপল্লবের সাথে লুকোচুরি খেলছে আর নিচে ঝর্নার সুনির্মল পানির মধ্যে পাথরের উপরে বসে খাসিয়া মেয়েদের আনন্দময় গোসলের দৃশ্য সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের “ঝর্ণা! ঝর্ণা! সুন্দরী ঝর্ণা! / তরলিত-চন্দ্রিকা! সুন্দরী বর্ণা!” এবং নজরুলের “ওই জলকে চলেলো কার ঝিয়ারি”র দৃশ্যই মনে করিয়ে দেয়।

খাসিয়া পাহাড় থেকে ঝর্নার পানির সাথে নেমে আসা ছোট বড় পাথর পানির সাথে একই সমতলে স্থির হয়ে আছে। আকাশে মেঘের ফাঁকে ফাঁকে যখন সূর্যের আলো এসে পানি ও পাথরের সুসজ্জিত শয্যায় সোনালি আভা ছড়ায়, আর বাতাস সেই শয্যার উপর মৃদু শিহরন জাগায় তখন সেই শিহরন খাসিয়া বালিকা আর আগত কলেজ ছাত্রদের প্রাণ স্পর্শ করে না এ কথা হলফ করে কে বলতে পারবে? এম সি কলেজে থাকাকালীন তিন বছরে আমি কম পক্ষে দশ বার পিকনিক করার অছিলায় জাফলঙের অপূর্ব দৃশ্য উপভোগ করার সুযোগ নিয়েছিলাম।

খাসিয়া পাহাড় থেকে বহমান প্রবাহের কল্যাণে নিম্নে বহুদূর বিস্তৃত সমতল ভূমিতে কমলা চাষের উপযোগী বাগানের সৃষ্টি হয়েছে। সে সব কমলা বাগানের অসংখ্য কমলা মাটিতে পড়ে আছে, কুঁড়িয়ে নেয়ার লোক নাই। প্রথম বার পিকনিকে যাবার পর আমাদের শিক্ষক-গাইড প্রফেসর হায়দার হোসেন আমাদের উদ্দেশ্যে বললেন ডারউইনের থিওরি অনুসারে মানুষ বানর থেকে জন্মেছে। আমরা বিশ্বাস করি আমরা হযরত আদমের (আঃ) সন্তান। আমাদের আচরণ দিয়ে প্রমাণ করতে হবে যে আমরা মানুষ, বানর নই।

আমরা জিজ্ঞেস করেছিলাম, গাছের নিচে যে সব কমলা পড়ে আছে সেগুলি কুঁড়িয়ে খাওয়া যাবে কিনা। তিনি বললেন, না। কারণ, চোরাচালানের সুবিধার্থে এই কমলাগুলো ইচ্ছা করেই বাগানের মালিকগণ নিচে ফেলে রেখেছে। যাতে ঢাকাগামী কমলার ট্রাক পুলিশ ধরলেই বলা যায় যে এই সব তাদের নিজ বাগানের কমলা।

১৯৩২ সালে ব্রিটিশ সরকারের বানানো ডাউকি সাসপেনশন ব্রিজ।

১৯৩২ সালে ব্রিটিশ সরকারের বানানো ডাউকি সাসপেনশন ব্রিজ।

জাফলঙের যে জায়গাটায় আমরা পিকনিক করতে যেতাম সেখান থেকে সামান্য দূরেই ছিল ইন্ডিয়ার বিখ্যাত ডাউকি ব্রিজ। ডাউকি নদীর উপরে ব্রিটিশ সরকার ১৯৩২ সালে এই অপরূপ সুন্দর ও অতি প্রয়োজনীয় ব্রিজটি তৈরি করে। বাংলাদেশের সাথে ইন্ডিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যাতায়াতের এটাই একমাত্র রাস্তা।

কলেজ হোস্টেল থেকে প্রায় চার মাইল দূরে সিলেট শহরের উপর হযরত শাহজালালের (রঃ) মাজার। মাজার সংলগ্ন মসজিদে প্রায়ই জুমার নামাজ আদায় করতে যেতাম এবং নামাজ শেষে মাজার জেয়ারত করতাম। অন্য দিকে হযরত শাহ পরাণের (রঃ)  মাজার ছিল আমাদের কলেজ থেকে তামাবিলের দিকে তিন চার মাইল দূরে। এই মাজারে দু একবার ছাড়া খুব একটা যাওয়া হয় নাই। সবাই মনে করত যে হযরত শাহ পরাণ (রঃ) খুব গরম মেজাজের পীর। কোনো বেয়াদবি সহ্য করেন না। কাজেই কখনো কোনো বেয়াদবি হয়ে যায় কিনা এ ব্যাপারে একটা ভয়ও ছিল। ১৯৬০ সালে বিখ্যাত চিত্রনায়ক রহমান হযরত শাহ পরাণের (রঃ) মাজার থেকে ফেরার পথে এম সি কলেজের সামনে ট্রাকের সঙ্গে ধাক্কা লাগার ফলে একটি পা হারান। হয়ত এটা নিতান্তই একটা দুর্ঘটনা কিন্তু সাধারণ মানুষের বিশ্বাস হযরত শাহ পরাণের (রঃ) নারাজ হওয়ার ফলেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছিল। কারণ খাদেমদের অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি মাজারের ভিতরে যাবার সময় পায়ের জুতা খোলেন নি।

৭.
১৯৬৩ সালে আমরা প্রফেসর হায়দার হোসেনের নেতৃত্বে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের বিশেষ বিশেষ শিক্ষা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান দেখার জন্যে বের হলাম।

আমাদের সফরে মোট ছাত্রসংখ্যা কত ছিল তা এই মুহূর্তে সঠিক মনে করতে পারছি না। তবে সর্বমোট সম্ভবত ১৫/১৬ জন হবে। ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও আমরা প্রায় সব কয়টি প্রথম শ্রেণীর কলেজ পরিদর্শন করি। তন্মধ্যে ঢাকা কলেজ, জগন্নাথ কলেজ, ভিক্টোরিয়া কলেজ কুমিল্লা, চট্টগ্রাম কলেজ, আনন্দমোহন কলেজ ময়মনসিংহ, রাজশাহী কলেজ, বি এম কলেজ বরিশাল, ডি এল কলেজ দৌলতপুর, এডওয়ার্ড কলেজ পাবনা, কারমাইকেল কলেজ রংপুর, আজিজুল হক কলেজ বগুড়া উল্লেখযোগ্য।

বগুড়ায় আমরা হায়দার হোসেন সাহেবের ভাই অ্যাডভোকেট আকবর হোসেন সাহেবের সৌজন্যে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের সেতার ও গান শুনে আপ্যায়িত হয়েছিলাম।

শিল্প কারখানার মধ্যে আমরা দেখেছিলাম ঢাকার নাবিস্কো বিস্কুট কোম্পানি, হরদেও গ্লাস ফ্যাক্টরি, তিব্বত সাবান, ঢাকেশ্বরী কটন মিলস, ঢাকা ম্যাচ ফ্যাক্টরি, যশোর চিনির কল, খুলনা নিউজ প্রিন্ট, ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানা ও ছাতক সিমেন্ট কারখানা। এছাড়াও আমরা দেখেছিলাম বগুড়ায় মহেশ্বর গড় ও ঢাকায় লালবাগের কিল্লা।

এই শিক্ষা সফরটি আমার জীবনে অনেক পরিবর্তন এনে দিয়েছিল।

আমি বুঝতে পেরেছিলাম শিক্ষার ক্ষেত্র অনেক বিশাল। জানবার বিষয় অনেক এবং বহুবিধ। একজন শিক্ষিত ব্যক্তি যদি তার পাঠ্য বইয়ের বাইরে আর কিছু না জানে তাহলে বিদ্যালয় থেকে বাইরে পা দিলেই তিনি আর শিক্ষিত থাকবেন না। সেই যে মুর্খ মাঝি আর নৌকার পণ্ডিত আরোহীর গল্পে পণ্ডিতের পাণ্ডিত্য দিয়ে নৌকা ও জীবন কোনোটাই বাঁচানো সম্ভব হয় না তেমনি যে শিক্ষিত ব্যক্তি বইয়ের বাইরে কিছু জানতে ও বুঝতে চান না তিনি কখনোও জীবনের চ্যালেন্জ মোকাবেলা করতে পারবেন না। পরবর্তী কালে আলবার্ট আইনস্টাইনের একটি উদ্ধৃতি পড়েছিলাম— “Education is what left after one has forgotten everything he learnt in school.”

অনার্স কোর্সের দ্বিতীয় বর্ষ শেষ হওয়ার সাথে সাথে সাবসিডিয়ারি বিষয়ের পরীক্ষাও শেষ হয়ে গেল। তখন পাকিস্তান দ্বিতীয় পঞ্চ বার্ষিক পরিকল্পনার (Second Five Year Plan) চতুর্থ বছর। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের ক্ষমতা গ্রহণের পর মূলতঃ এটাই প্রথম উন্নয়ন পরিকল্পনা। সারা পাকিস্তানব্যাপী উন্নয়নের অগ্রগতি নিয়ে মানুষ তখন আলোচনা সমালোচনায় মুখর।

দ্বিতীয় পঞ্চ বার্ষিক পরিকল্পনার সাফল্যের ভিত্তিতে তৃতীয় পঞ্চ বার্ষিক পরিকল্পনা প্রস্তুত হবে কাজেই এই আলোচনা ও সমীক্ষা ছিল অত্যন্ত সময়োপযোগী। আমরা অনার্সের ছাত্র-ছাত্রীরা মিলে একটা অর্থনৈতিক মেলা (Economic Exhibition) করার প্রস্তাব দিলে বিভাগীয় শিক্ষকবৃন্দ এবং প্রিন্সিপাল সাহেব তা সাদরে গ্রহণ করলেন।

শিক্ষকদের সহযোগিতায় ও আমাদের পরিশ্রমে ১৬/১৭ দিনের মধ্যেই নানান চিত্র, চার্ট ও ফেস্টুনের মাধ্যমে আমরা দেশে অর্থনৈতিক অগ্রগতির একটা চিত্র তুলে ধরতে সমর্থ হলাম।

আমরা দেখালাম পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে উন্নয়ন বরাদ্দ ও উন্নয়ন সফলতার তারতম্য এবং দীর্ঘদিন অবহেলার ফলে পূর্ব পাকিস্তান কীভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় পিছিয়ে আছে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক অগ্রগতির হার বাড়া সত্ত্বেও কী করে দুই পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ছে।

কলেজের ছাত্র ও শিক্ষকরা আমাদের প্রদর্শনী দেখে খুবই চমৎকৃত হয়েছিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর আবু মাহমুদ এসেছিলেন আমাদের প্রদর্শনী দেখতে। তিনি বললেন, তোমরা যা করেছো তা ঠিকই আছে। তবে এই সব কথা মোটামুটি সবাই জানে। তোমাদের এ প্রদর্শনী ঢাকায় কোনো হেড লাইনের সৃষ্টি করবে না। তোমরা বরং সিলেটের অর্থনীতির উপর একটি প্রদর্শনী করতে পারতে। বিশেষ করে এখানকার বেত শিল্প, চা, কমলা লেবু, লন্ডন প্রবাসীদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, গ্যাস এ সবের উপর দারুণ চোখ ঝলসানো প্রদর্শনী করতে পারতে। দেশে বিদেশে তোমাদের সফলতার জয়গান হত।

প্রফেসার মাহমুদ বললেন, ইংলিশ চ্যানেলে সাঁতার কেটে লাস্ট হবার চেয়ে তোমার স্থানীয় পুকুর বা দীঘিতে সাঁতার কেটে প্রথম হওয়া অনেক গৌরবের।

আমদের অনার্স ফাইনাল পরীক্ষার আগেই ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পাঁয়তারা চলছিল। যুদ্ধের আগে বা পরে দুই পাকিস্তানের মধ্যে যতই উত্তেজনা থাকুক যুদ্ধের সময় সমগ্র পাকিস্তানব্যাপী এক অভাবনীয় একাত্মতার সৃস্টি হয়েছিল। বাঙালী সৈন্যরা পশ্চিম পাকিস্তানের কাসুর-বেদিয়ান ও খেমকেরান সেক্টরে ভারতীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে অপরিসীম বীরত্বের পরিচয় দিয়েছিল। এম সি কলেজের ঠিক পেছনেই কাপালিকের টিলা। সেখানে কাপালিকদের কোনো এক অধঃস্তন পুরুষ বিশ বাইশ বছরের এক যুবক বসবাস করতো। যুদ্ধ শুরু হবার কিছুদিন আগে এক রাতে বিমান আক্রমণের সময় ব্ল্যাক আউটের মহড়া চলছিল। দেখা গেল সেই কাপালিকের টিলায় কে বা কারা উপরের দিকে টর্চলাইটের আলো ছড়াচ্ছে। বাস! আর যায় কোথায়? হোস্টেলের সব ছাত্ররা বের হয়ে আসলো ইন্ডিয়ার গুপ্তচর ধরার জন্যে। সেই রাতে অবশ্য গুপ্তচরটিকে আর খুঁজে পাওয়া যায় নি।

অনার্স পরীক্ষার ভাইবা নেবার জন্যে ঢাকা থেকে প্রফেসর আনিসুর রহমান এসেছিলেন। যতটুকু মনে পড়ে ভাইবা বোর্ডে তিনি তেমন কোনো প্রশ্নই করেন নি। আমরা কী কী বই পড়েছি, ভবিষ্যতে আমরা কী করতে চাই এ জাতীয় দু একটা প্রশ্ন মাত্র করে ছেড়ে দিয়েছিলেন।

একবার একটা মজার কাণ্ড ঘটেছিল এম সি কলেজ সংলগ্ন একটি পাহাড়ে। কিছু মড়া গাছ ছাড়া পাহড়টিতে তেমন বড় গাছ আর নাই। প্রায়ই দেখা যেত কিছু ছাগল এসে এখানে ঘাস খায়। এক দিন কলেজ থেকেই শুনতে পেলেম একটি ছাগল বিকট স্বরে চীৎকার করছে আর অন্য সব ছাগল দৌড়াদৌড়ি করছে। অবস্থা দেখার জন্যে ছাত্ররা এগিয়ে গেল, আমিও গেলাম। যে ছাগলটি চীৎকার করছে তার একটি পা মনে হচ্ছে কোনো গাছের গুড়ির মধ্যে আটকা পড়েছে । আরেকটু কাছে গেলেই বোঝা গেল ওটা গাছ নয়, মস্ত বড় একটা অজগর ছাগলের একটি পা মুখে পুড়ে নির্বিঘ্নে শুয়ে আছে আর ছাগলটি সর্বশক্তি দিয়ে চীৎকার করে যাচ্ছে। হতভম্বের ভাব কাটিয়ে উঠতেই সবাই দৌড় প্রিন্সিপালের অফিস পানে। প্রিন্সিপাল সাহেব ডি সি সাহেবকে খবর দিলেন। কিছুক্ষণ পরেই অজগর ধরার লোক নিয়ে সঙ্গে এক কন্টিনজেন্ট পুলিশসহ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আসলেন এবং সাপটিকে ধরলেন। ততক্ষণে ছাগলটি অজগরের পেটে। শুনেছি সাপটিকে ঢাকা চিড়িয়াখানায় চালান দেওয়া হয়েছিল।

এই সময়ে গবর্নর মোনায়েম খান সিলেট এসেছিলেন কোনো কারণে এবং এম সি কলেজের ছাত্রদের সাথে দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কলেজে গেলে ছাত্ররা তাঁকে ঢুকতে নাও দিতে পারে এই মনে করে প্রিন্সিপাল সাহেব কয়েকজন ছাত্রকে সার্কিট হাউজে গিয়ে তার সাথে দেখা করার ব্যবস্থা করেন। পাঁচ ছয় জনের একটি ছোট ছাত্র দল বাছাই করা হয়েছিল তন্মধ্যে আমিও ছিলাম। প্রিন্সিপাল সাহেবের ছেলে দলটির নেতৃত্বে ছিলেন। কলেজে আইনশৃঙ্খলার ব্যাপারে সরকারের মনোভাব তিনি জানালেন। তারপর এক ফাঁকে জিজ্ঞেস করলেন সকালে ঘুম থেকে উঠে তোমরা কী করো? আমরা কী জবাব দিব তা বুঝতে পারছিলাম না। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন নামাজ পড়ো? আমরা বললাম জ্বী। তিনি বললেন বাঃ খুব ভাল। তার পরে কী করো? আমরা বললাম ব্রেকফাস্ট করি? তিনি বললেন ব্রেকফাস্ট কেন? নাস্তা কেন করো না? আমরা বললাম জ্বী নাস্তা করি। তিনি খুশি হয়েছিলেন কিনা জানি না তবে হোস্টেলে ফিরে এসে আমরা প্রচুর হাসাহাসি করেছিলাম এই নিয়ে।

অনার্স পরীক্ষার পর পরই আমরা ঢাকায় এসে মাস্টার্স কোর্সে শর্ত সাপেক্ষে (provisionally) ভর্তি হয়ে যাই।

About Author

আলী আহমাদ রুশদী
আলী আহমাদ রুশদী

ড. আলী আহমাদ রুশদীর কর্মজীবন শুরু হয়েছিল ১৯৬৬ সালে কুমিল্লার নওয়াব ফয়জুন্নেসা কলেজে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা কলেজে কিছুদিন শিক্ষকতা করেছেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে করোটিয়ার সাদত কলেজে বেশ কয়েক বছর অধ্যক্ষ হিসাবে কাজ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে সহযোগী-অধ্যাপক ছিলেন বহুদিন। ১৯৮৯ সাল থেকে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী। মেলবোর্নে অবস্থিত Australian Competition and Consumers Commission এ অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসাবে কাজ করেছেন প্রায় ১৫ বছর। সেখান থেকে অবসর গ্রহণের পরে ঢাকার AIUB ও নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটিতে কিছুদিন অধ্যাপনা করেছেন। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে UNDP, ILO, World Bank ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের কাজে গবেষণা করেছেন। বর্তমানে মেলবোর্নে অবসর জীবন যাপনের ফাঁকে তাঁর সময় কাটে অর্থনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ের উপর লেখালেখি করে।