page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

সুপারহিরোদের মারামারি—এবার নিজেদের মধ্যে

২০০৮ সাল থেকে শুরু হওয়ার পর মার্ভেল স্টুডিও এখন পর্যন্ত তাদের বারোটা মুভি দিয়ে ৯০০ কোটি ডলারেরও বেশি কামিয়ে ফেলেছে। কাজেই যখন তাদের নতুন মুভি দেখার সময় আসে, তখনই পুরনো মুভিগুলির বাঁধাধরা স্মৃতি মনে পড়তে থাকে আর মনে হতে থাকে—আবারো সেই একই যাত্রায় ঘুরে আসা কতটা আনন্দ দিতে পারে? কারণ বাড়তি অনুভূতি আর যা-ই আসুক না কেন, (দুয়েকটা বাদে) আনন্দের অভাবে কখনো পড়তে হয় নি। এবারও না।

civil-war-1মার্ভেল সিনেম্যাটিক ইউনিভার্সের সব ছবিতেই ভিলেনরা একাধারে সুপারহিরোদের কাছে মার খেয়ে এসেছে। কিন্তু এই অপার্থিব সব চরিত্রের মারামারিতে সাধারণ যেসব মানুষ প্রাণ হারিয়ে যাচ্ছে, তাদের নিয়ে কখনোই ঘেঁটে দেখা হয় নি। এইবার সেই এড়িয়ে যাওয়া অংশটুকু নিয়েই বানানো হয়েছে নতুন ছবিটির প্লট।

‘ক্যাপ্টেন আমেরিকা : সিভিল ওয়ার’ এর শুরুতেই আমেরিকার সেক্রেটারি অফ স্টেট থ্যাডিয়াস রস অ্যাভেন্জার্স গ্রুপের সবার সাথে একটি মিটিং এর ব্যবস্থা করেন। অ্যাভেন্জার্সের সব মিশনে বহু নিরীহ মানুষের হতাহতের ঘটনা ধীরে ধীরে গোটা বিশ্বের সরকারদের দুঃশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই আশঙ্কা দূর করতেই ১১৭টি দেশের সম্মতিতে তাদেরকে সোকোভিয়া অ্যাকর্ডস এর প্রস্তাব দেওয়া হয়, যে চুক্তি অনুসারে অ্যাভেন্জার্সের পরবর্তী সব মিশন জাতিসংঘের নজরদারিতে নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। ফলে আনুষঙ্গিক সব ঘটনার জন্য তাদেরকে জবাবদিহি করতে হবে জাতিসংঘের কাছে।

civil-war-4

ক্যাপ্টেন আমেরিকা সরকারের সাথে এরকম কোনো চুক্তি করতে নারাজ, তার যুক্তি—কোনো সরকারি সংঘই দুর্নীতি মুক্ত নয়। আর তাই তাদের তত্ত্বাবধানে থাকা মানে নিজের স্বাধীনতা তাদের হাতে তুলে দেওয়া। অন্যদিকে আয়রন ম্যান সরকারের এই প্রস্তাবকে যৌক্তিক মনে করছে। তার মতে—কোনও জবাবদিহি ছাড়া তাদের সুপারপাওয়ারের যথেচ্ছ ব্যবহার সন্ত্রাসীদের সাথে তাদের কোনো তফাৎ রাখে না।

movie-review-logo

ক্যাপ্টেন আমেরিকা আর আয়রন ম্যানের নিজস্ব চিন্তাধারার এই অমিল গোটা অ্যাভেন্জার্স দলে চিড় ধরিয়ে দেয়। খুব সহজেই তারা ভাগ হয়ে যায় দুই দলে।

এ রকম বিশাল বাজেটের একেকটি ছবি মুক্তি দেওয়া অনেকটা কোনো কোম্পানির নতুন পণ্য বাজারে ছাড়ার মত। বক্স অফিসে আয়ের হিসাবই এই ছবিগুলির সাফল্যের মুখ্য মানদণ্ড। কাজেই দর্শকদের খুশি রাখতে ছবিগুলিকে সবসময়ই পরিচিত ঢঙে বানাতে হয়।

civil-war-98

ছবির পরিচালক দুই ভাই জো এবং অ্যান্থনি রুসো

কিন্তু ‘ক্যাপ্টেন আমেরিকা : সিভিল ওয়ার’ এ যথেষ্ট ক্লিশে থাকার পরও কিছু কিছু সিদ্ধান্ত বেশ স্বস্তি দিয়েছে। টানেলের ভেতরে চেজ সিন, এশিয়া বা আফ্রিকার কোনো দেশের বাজারের ভেতর অ্যাকশন—এই বস্তাপচা দৃশ্যগুলি সুকৌশলে ধারণ করায় দৃষ্টিনন্দন হয়ে গেছে।

তবে বরাবরের মত এইবার কোনো ভিলেন পৃথিবী ধ্বংস করতে আসে নি। বরং সুপার হিরোদের নিজেদের মাঝে এই সংঘাতের প্রভাবক হিসাবে তাদের ব্যক্তিগত তাড়নাই কাজ করেছে বেশি। ফলে দর্শকের সহানুভূতি পাওয়াটাও হয়ে গেছে সুলভ।

civil-war-12 কিন্তু একটা ব্যাপার (নাকি সমস্যা?) এই ছবি দিয়ে স্পষ্ট হয়ে গেল, মার্ভেল সিনেম্যাটিক ইউনিভার্সের ছবিগুলি মিলে পুরোদমে একটা টিভি সিরিজ হয়ে গেছে। মানে আগের পর্বগুলি না দেখে নতুন পর্ব দেখাটা কঠিন হয়ে যাচ্ছে দিন দিন।

সব মুভি না দেখা থাকলে সিরিজের নতুন ছবি সম্পূর্ণ উপভোগ করা যেত না আরো আগে থেকেই, কিন্তু এইবার শুধু কাহিনী বুঝতেও আপনাকে আগের পর্বগুলি সম্পর্কে জানতে হবে। তাই চিত্রনাট্যের দিক থেকে একক ছবি হিসাবে ‘সিভিল ওয়ার’কে দেখার সুযোগ আর থাকছে না। কাজেই এই ঘাটতির উপজাত হিসেবে আসা অন্যান্য সমস্যাগুলিকেও প্রথাগতভাবে বিচার করার উপায় নেই।

civil-war-11যেমন এইখানে অ্যাভেন্জার্স দলে একেবারে নতুন দুইটি অন্তর্ভুক্তি দেখা গেছে। সেই দুইজন সুপারহিরোর নিজ নিজ গল্প নিয়ে পরে একক ছবি বের করা হবে। তার আগে এই ছবির প্লটে তাদের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু ছিল তা খুঁজতে যাওয়া অর্থহীন।

যেহেতু বাকি চরিত্রগুলি আমাদের পূর্বপরিচিত, তাই এই দুইজনকে নতুনভাবে দেখতেও আমরা বাধ্য। ফলে এই গল্পে তারা কতটুকু আগ্রহ জন্ম দিতে পারে—কেবল সেটিই তাদের ভালো লাগার মাপকাঠি। আর সেইদিক থেকে দেখলে, নির্মাতারা আমাদের আগ্রহ আর কৌতূহল জাগাতে ও ধরে রাখতে পুরো ছবি জুড়েই সমান দক্ষ ছিলেন।

বিশেষ করে অ্যাকশন দৃশ্যগুলির এডিটিং তাতে প্রভাব রেখেছে সবচাইতে বেশি। যখন যেদিক থেকে দেখানো দরকার, ক্যামেরা বারবার সেদিকেই গেছে বলে মনে হয়। এর জন্য একেবারে দূরের লং শট থেকে চরিত্রদের ক্লোজআপে নিয়ে আসা দৃশ্যগুলি কাজে দিয়েছে। অবশ্য চিত্রনাট্যের সরস সব সংলাপ অ্যাকশন দৃশ্যগুলি একঘেয়ে হতে দেয় নি।

ঠিক এইসব কারণেই বারোজন সুপারহিরো নিয়ে একটি এয়ারপোর্টে যে অ্যাকশন সেট-পিসের আয়োজন করা হয়েছে, সেটি হয়ত সুপারহিরো মুভির ইতিহাসে দর্শকদের মাঝে ছড়িয়ে থাকবে বহুদিন।

civil-war-8আবহ সঙ্গীতে হেনরি জ্যাকম্যান আবারও তার গুরু হানস জিমার এর ছোঁয়া রেখেছেন। ফলে নতুন কিছু একেবারেই না থাকলেও অ্যাকশনসহ সবরকম দৃশ্যেই মানিয়ে গেছে।

নাম ক্যাপ্টেন আমেরিকা হলেও, ছবিটি কোনোভাবেই ক্যাপ্টেন আমেরিকার নিজস্ব মুভি নয়। এমনকি মূল গল্প তাকে ঘিরেও গড়া হয় নি, বরং তার বন্ধু উইন্টার সোলজারকে শুরু থেকেই কাহিনীর কেন্দ্র মনে হয়েছে। হাল্ক, থর আর নিক ফিউরি বাদে বাকি সব গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রই আছে এখানে। ছবির মার্কেটিংও এমনভাবে করা হয়েছে যাতে সবাই অ্যাভেন্জার্সের তৃতীয় খণ্ড দেখার আশাতেই থাকে।

এত জন সুপারহিরোকে জনপ্রিয়তা আর গুরুত্বের মাপে সময় ভাগাভাগি করে দেওয়া পরিচালক অ্যান্থনি ও জো রুসো’র সবচেয়ে ভারি দায়িত্ব ছিল, আর তারা সেই চাপ সামলেছেন। এই দুই ভাই বিশাল এই মুভি সিরিজের এখন পর্যন্ত যে দুই ছবিতে পরিচালকের ভূমিকায় ছিলেন, দু’টিতেই তাদের নিজস্ব কিছু সূত্র রেখেছেন।


Captain America: Civil War Official Trailer

সুপারহিরোদের এই যজ্ঞ যতবারই মহাকাব্যিক রূপ নিতে যায়, ততবারই তারা একে টেনে এনে ব্যক্তিক আয়োজনে আটকে ফেলেন। ‘ক্যাপ্টেন আমেরিকা: উইন্টার সোলজার’-এ ক্যাপ্টেন আমেরিকার অতীত সেই গল্পের শেষ করেছিল। এখানেও কিছু চরিত্রের ফেলে আসা সাদামাটা জীবনের ঘটনা ছবির শেষ অংশটুকু তীব্র করেছে।

অবশ্য ক্যাপ্টেন আর আয়রন ম্যানের মতাদর্শের পার্থক্যটা তেমন শক্ত ভিত পায় না। আমেরিকার মিলিটারিতে জয়েন করা একজন নিয়মতান্ত্রিক ক্যাপ্টেন এর সরকারের বিরোধিতার বদলে তাদের পক্ষে থাকাটাই সুবিধাজনক মনে হয়। আবার আত্মদাম্ভিক ধনকুবের আয়রন ম্যানের সরকারের আনুগত্য না মানাই স্বাভাবিক হওয়ার কথা, অন্তত ‘আয়রন ম্যান’ ও ‘আয়রন ম্যান টু’ ছবি দু’টিতে সেইরকম ইঙ্গিতই ছিল।

civil-war-15

হয়ত তাদের নিজ নিজ অবস্থান নির্বাচনে আবেগ ছিল মূল চালক। কারণ এই ছবির শুরুতে এক নিহত যুবকের মায়ের কথায় আয়রন ম্যানের অনুশোচনা তার ব্যক্তিগত জীবনের সাথে মিশে তাকে প্রভাবিত করে থাকতে পারে। অন্য দিকে ক্যাপ্টেনের ছোটবেলার বন্ধু উইন্টার সোলজারের কারণে তার নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা যায়।

অনন্য, অনবদ্য—এই শব্দগুলি সুপারহিরো মুভির বেলায় একসাথে আর নেওয়া যায় না। যতক্ষণ পর্যন্ত নির্মাতারা ঝুঁকি নেওয়ার সাহস পাচ্ছেন না, ততক্ষণ অন্য সব বিশেষণ দিয়েই আমাদের কাজ চালাতে হবে। ‘ক্যাপ্টেন আমেরিকা: সিভিল ওয়ার’ অনেক বিশেষণ ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছে। সেই সুযোগগুলি নিতে পারলেই আপনার সময়টা ভালো যাওয়ার কথা।

About Author

আয়মান আসিব স্বাধীন
আয়মান আসিব স্বাধীন