page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

সুপারহিরো ইমেজ ব্রেক করা মুভি — ‘ডেডপুল’

তাহলে এবার মুভি রিভিউতে লেগে পড়া যাক! কোন মুভি? আরে যেটার রিভিউ পড়ার জন্য এই পেজটার লিঙ্কে ক্লিক করেছেন, তাই না?

নিশ্চয়ই তাইই ধরে নেব, নয়ত ভেবে নিতে হয় অ্যালিসের মত আপনারাও কোনো ইন্টারনেট খরগোশ ধাওয়া করতে করতে হঠাৎ গর্তে পড়ে গিয়ে এই রিভিউর পেজে চলে এসেছেন। তাই কি? মনে তো হয় না।

যাকগে, যে কথাটা বলছিলাম সেটায় ফিরে আসা যাক, এই ফেব্রুয়ারি তে রিলিজ হওয়া ডেডপুল আর তার রিভিউ। সেই ছোটবেলায়, ঐ ক্লাস সেভেন এইট তখন মারভ্লের কমিক্স ছিলো সুপারহিরোইজমের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার একটা স্পেস, আর তারপর যখন সেই সমস্ত সুপারম্যান স্পাইডার ম্যান জাস্টিস লীগ ইত্যাদিরা পর্দায় আসতে শুরু করলো, তখন তো সোনে পে সোহাগা বললেও কম বলা হয়।

deadpool-poster

ছবির পোস্টার

তবে একটু বয়স বাড়লে বুঝতে শিখলাম, সবকটা সুপার হিরো জঁরের সমস্যা একটাই, বিভিন্ন রকম ভিলেন, আর বিভিন্ন রকম মশলা মাখানো ঘটনা থাকলেও কোথাও না কোথাও গল্পগুলো ভীষণই সাদামাটা।

একটা শহর থাকবে, সেই শহরে একজন সুপারহিরো থাকবে যার ভিড়ে মিশে থাকা রূপ কেউ চেনে না, একমাত্র কস্টিউম পরলে জনতা উল্লাস করে “হুই দেকো, হিরো এয়েচে”, একটা কী এক দল কিং পিন মার্কা ভিলেন থাকবে। কিছু ভাড়াটে গুণ্ডা যারা বেশ স্টান্টবাজি দেখাবে, দুম দাম গুলি টুলি ছোঁড়া হবে। কিন্তু ক্লু লেস সুন্দরী মেয়ে, যারা ভিলেন এবং হিরোর প্রেমিকা বা বান্ধবী। শহর ধ্বংসের একটা মস্ত মাস্টার প্ল্যান, শেষে একদল ভিলেনের সাথে হিরোর ঝারপিট, ভিলেন নিকেশ বা পলাতক, শহর বেঁচে গেল আর হিরোর জয়জয়কার। খুব সূক্ষ্ম ভাবে আলোর জয় আর অন্ধকারের পরাজয় সংক্রান্ত জ্ঞান আর চোখ ধাঁধানো মন খুশি করা প্রভাব নিয়ে সিনেমা শেষ, চলো এবার পপকর্ন খেতে খেতে বাড়ি।

ডেডপুলও এই গল্পের থেকে খুব আলাদা কিছু না, কিন্তু তবুও কোথায় যেন একটা তফাৎ হয়ে যাচ্ছে। বলা যেতে পারে, অন্য সুপারহিরো মুভিগুলো যেখানে একটা ম্যাক্রো ফোকাসে গল্প বলে, ডেডপুল ম্যাক্রোটাকে মাইক্রোর জায়গায় নিয়ে এসেছে। সোশ্যাল থেকে পারসোনাল স্পেস। কীভাবে? বলছি।

movie-review-logo

তার আগে এটা নিশ্চয়ই আর জানতে বাকি নেই যে খানিক অপ্রচলিত ঘরানার চরিত্র হলো ডেডপুল, যে প্রতিটা কাজে নিজেকে হাইলাইট করতে পছন্দ করে এবং তা অতি আহ্লাদের সাথে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তার সাথে একটি স্পয়েল্ট ব্র্যাট টিন এজারের মিল পাওয়া যায়, যাকে বিরক্ত লাগলেও অগ্রাহ্য করা যায় না। বরং অগ্রাহ্য করতে গেলে কোথায় যেন একটা বেঁধে। তার জীবনের দুজন মানুষ একমাত্র আপন—প্রেমিকা ভ্যানেসা আর বন্ধু উইজেল।

অফ টপিক, চিরকালই আমরা দুষ্টু মানুষজনের ওপর বেশি আকৃষ্ট হই।ভালো করে পড়ুন, দুষ্টু, দুর্বৃত্ত নয়। তো ডেডপুলও সেই ধরনের মানুষ বলা চলে। আর তার এই মুভিটাও ঠিক ওইরকম স্পয়েল্ট ব্র্যাট আকারে বলে, অগত্যা এই রিভিউটাও ঠিক তাই হবে। নো অফেন্স।

এতদূর পর্যন্ত পড়ে যারা ভাবেছেন, কিন্তু ডেডপুলটা কী নিয়ে, কীসের গল্প, কে ভিলেন—একটা আউটলাইন তো দেওয়াই যায়! তাদের বলি, ভদ্রমহোদয়, মহোদয়া, আপনি কি মনে করেন না আজ আপনাদের জন্য এক বিশেষ দিন? কারণ আমি ঠিক সেটাই বলতে থুড়ি লিখতে চলেছি এবার।

deadpoo-18

ওয়েডের লাস্ট স্টেজ ক্যান্সার প্রেমিকা ভ্যানেসার জীবনে এনে দেয় বিপর্যয়।

ওয়েড উইলসন, এক সময়কার ভাড়াটে গুণ্ডা যে কিনা সাত সপ্তাহে একচল্লিশ খানা হোমিসাইড খ্যাত, তার ধরা পড়ে লাস্ট স্টেজ ক্যান্সার। এই ঘটনা তার আর তার সুন্দরী (সত্যিই হট চিক) প্রেমিকার জীবনে এনে দেয় বিপর্যয়। স্বাভাবিক ব্যাপার, সবে জীবন শুরু হয়েছে, এখন যদি লাস্ট স্টেজ ক্যান্সার ধরা পড়ে!

এমন সময় হঠাৎ করে কোথা থেকে জানি একজন অদ্ভুত লোক এসে তাকে অফার দেয় তাদের এক্সপেরিমেন্টাল ল্যাবে জয়েন করার। কারণ তারা নাকি অপারেশান এক্সের মাধ্যমে মানুষকে সুপার পাওয়ার অ্যাবিলিটি দিতে পারে, এবং তারা ক্যান্সার সারাতেও সক্ষম (স্টকার অ্যালার্ট, অর্থাৎ উইলসনকে বেশ কিছুদিন ধরেই ফলো করা হচ্ছিল।) প্রসঙ্গত এই অপারেশান এক্সই উল্ভারিনকে তৈরি করেছিল, এখানেই হালকা করে উল্ভারিন আর ডেডপুলের সম্পর্কটা বোঝা যায়। তারপর উইলসন গিয়ে পড়ে অনুভূতিহীন এড স্কেইনার, থুড়ি অ্যাজাক্স, থুড়ি ফ্রান্সিসের হাতে। যাকে আরামসে ডক্টর ফ্রাঙ্কেনস্টাইন বলে চালানো যাক কারণ তার হাতেই বিভিন্ন রকম যন্ত্রণাকাতর এক্সপেরিমেন্ট ইত্যাদির মাধ্যমে ভয়ানক মিউটেশান হয় উইলসনের, মুখ আর শরীরের চামড়া গলে যায়।

deadpool-46

ছবির দৃশ্য

ওহ, এর মধ্যে আবার ফ্রান্সিস আর উইলসনের ইগো ক্ল্যাশ এই মিউটেশানের একটা অন্যতম কারণ হিসেবে ধরা যেতেই পারে। অ্যাজ অ্যা রিয়াকশান উইলসন হয়ে ওঠে ক্ষিপ্ত, কেই না হবে বলুন তো! এই মুভিতে আগে তাকে বেশ রায়ান রেনল্ডস মাফিক হ্যান্ডসাম লাগছিল, এখন তার মুখের অবস্থা এমন হয়েছে যেন মাতাল হয়ে কেউ রায়ান রেনল্ডসের মোমের পুতুল বানাতে গেছিল, ফিনিশ করতে ভুলে গেছে। এই মুখ নিয়ে তো ভ্যানেসা থুড়ি মোরেনা ব্যাকারিনের সঙ্গে জীবন কাটানো যাবে না আর! ব্যাস শুরু হয়ে যায় ব্যক্তিগত পরিসরে প্রতিশোধের খেলা, যেটা ক্লাইম্যাক্সে আসে যখন ফ্রান্সিস উইলসনকে সবক শেখাতে ভ্যানেসাকে অপহরণ করে বসে।

deadpoo-12

ছবির দৃশ্য

এই রে, আউটলাইন দিতে গিয়ে তো পুরো গল্পটাই প্রায় বলে দিলাম, তীক্ষ্ণ চোখ নিয়ে যে সমস্ত পাঠক আমার রিভিউর রিভিউ করছেন তারা বেশ কমপ্লেন করার এক খানা জব্বর পয়েন্ট পেয়ে গেছেন! প্রোটোকলের কী ভয়ানক দ্বিচারিতা! কিচ্ছু করার নেই, এই মুভিটাই যে ওইরকম, টিপিক্যাল সুপারহিরো মুভির ক্লিশে ইমেজে আটকে থাকলেও সেই ইমেজকে ভেঙে গড়ে নিজের মত করে আলাদা একটা অন্য ডাইমেনশনে নিয়ে গেছে বারবার! কাল্ট স্ট্যাটাস মনে হয় দেওয়াই যায়। ডেডপুল এমন একটা চরিত্র যে প্রতি মুহূর্তে দেখায় সে কিচ্ছু কেয়ার করে না, কিন্তু আসলে ভীষণ ভাবে কেয়ার করে। প্রতি মুহূর্তে যন্ত্রণাকে তুচ্ছ করে, আসলে যন্ত্রণাকে তুচ্ছ করে নিজের সীমানা ছাড়িয়ে বেরিয়ে আসতে চায়। সে সুপার, কিন্তু হিরো নয়। সাধারণ মানুষ, আপনি আমি সে।

deadpoo-25

ডেডপুল

তবু বলবো, সেভাবে দেখতে গেলে এটা একটা মাঝারি মানের ছবি, কিন্তু তাও দেখতে ইচ্ছে হয়। উঁহু, লুকিয়ে লাভ নেই, হয়ত নিন্দে করা অনেক মানুষই লুপে ডেডপুলের ট্রেলার দেখেছেন অনেকবারই।

অসম্ভব ভালো মার্কেটিং হয়েছিল এই ছবির, তেমন আশা অনুসারে সাড়া পাওয়া গেছে। আর মুভি শুরু হওয়ার এক ঘণ্টা পর্যন্ত ভালো লাগবে দেখতে, তারপর একটু ঢিমে হয়ে যাবে, ব্যক্তিগত ভাবে একদম শুরুর দৃশ্যগুলো রেকমেন্ড করবো আমি। আর কানেকশান উইথ অডিয়েন্স, ফোরথ ওয়াল ব্রেকিং এর বেশ ভালো উপস্থাপনা, চোখ সরাতে দেয় না।

টিম মিলার: পরিচালক

টিম মিলার: পরিচালক

সবচেয়ে ভালো লেগেছে এই ব্যাপারটা যে, ডেডপুল যেন সুপারহিরো মুভির বাস্তববাদী হওয়ার ক্লিশে ইমেজ নিয়ে মানুষের ক্লান্তি বুঝতে পেরে, সেই ক্লিশের চোখে চোখ রেখে, প্রবল আলিঙ্গনে অতর্কিতে পিঠে ছুরি চালিয়ে দিয়েছে!

একটা মুভি জঁর, যা কিনা স্যাচুরেশানে পৌঁছে যাচ্ছিল আরেকটু হলে, তাকে মন্ত্রবলে দম নেওয়ার জায়গা করে দিল। এক্স ম্যান এর উপস্থিতি বেশি করে তা বুঝিয়ে দেয়। দুজন এক্স ম্যান মেম্বার, কলোসাস আর নেগাসোনিক বারবার চেষ্টা করে ডেডপুলকে সামলে মানবিকতা আর মিউটেশানের জায়গাটার সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে, টিপিক্যাল আলোর জয় অন্ধকারের পরাজয় মানসিকতা আর কি, শেষ পর্যন্ত তারা অবশ্য ডেডপুলকে প্রতিশোধ নিতেই সাহায্য করে।

কাস্টের কথা আর কীই বা বলবো, উল্লেখযোগ্য ডেডপুল বা রায়ান রেনল্ডস, গ্রিন ল্যান্টারন্সের অসাফল্যের পড়ে এ যেন তার বাউন্সিং ব্যাক। বাকিরাও আছে, কিন্তু রায়ান রেনল্ডস যেভাবে সবটুকু উজার করে এই মুভি টেনে নিয়ে গেছে, বাকিদের আরেকটু অংশগ্রহণ করতে দেখলে ভালো লাগত। পরিচালক টিম মিলারের সার্থক ডেবিউ ডিরেকশান এবং লেখকদ্বয় রেট রিহিস আর পল ওয়েরনিক, জোম্বিল্যান্ডের পর তাদের আরেকটা ইমেজ ভাঙা মুভি। অন্যান্য সুপারহিরো মুভির মত অসামান্য কম্পিউটারাইজড এফেক্ট এই মুভিতে নেই, কিন্তু আছে হৃদয়, সেন্স অফ হিউমার আর এক হাড় জ্বালানো মিউটেশান হয়ে যাওয়া প্রধান চরিত্র যে উল্ভারিনের এবং একই সাথে নিজের পিছনে লাগতেও দ্বিধা করে না।


ডেডপুল অফিসিয়াল ট্রেইলার (২০১৬)

অভিনন্দন, এতক্ষণ ধরে জিনা কারানো বা মোরেনা ব্যাকারিনের ছবি না দেখে এই রিভিউ পড়ার জন্য। আমরা প্রায় শেষ ভাগে চলে এসেছি, আসলে এমন একটা ছবি নিয়ে এই রিভিউ যার প্রধান চরিত্রেরই ভারবাল ডায়েরিয়া আছে। তাহলে আমি রিভিউয়ার আর কোন ছাড়! এই লাস্ট প্যারাগ্রাফে মনে হয় লিখতে হবে এটা একবার দেখা যায় না বারবার দেখা যায়। আমি ব্যক্তিগত ভাবে এই ব্যাপারটা অপছন্দ করি, তাই সম্পূর্ণ ভাবে পাঠকের ওপর ছেড়ে দিলাম। আমি কে আপনাদের সিদ্ধান্ত ঠিক করে দেওয়ার?

রেটিং এর কথা যদি বলেন, আমি পাঁচের মধ্যে দেব তিন। এর বেশি দিতে পারলাম না।

ব্যস, রিভিউ শেষ, আপনারা এবার ফিরে যান যা করছিলেন তাতে। আর যদি এটা পড়ে মনে হয় ডেডপুল দেখবো? দেখে ফেলুন, মন্দ লাগবে না।

About Author

শ্রেয়া ঠাকুর
শ্রেয়া ঠাকুর

প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোলে মাস্টার্স করার পর বর্তমানে ডেভেলপমেন্টাল স্টাডিজে মাস্টার্সের জন্য এন্ট্রান্স পরীক্ষার্থী। বাড়ি কোলকাতা থেকে কিছু কিলোমিটার দূরে, হুগলীতে। লেখালিখি একটা নেশার মত, বই পড়াও। এই দুটো ছাড়া আমার এক্সিস্টেন্স নেই। মূলত কবিতা এবং মুক্ত গদ্য লিখতে পছন্দ করি, এবং অনুবাদ করতে। অ্যাম্বিভার্ট হলেও ট্রাভেলিং এবং সোশ্যাল ওয়ার্ক ব্যতীত কোনো এক্সট্রোভার্ট চরিত্র নেই। ফোটোগ্রাফির ইকুইভোকাল শখ আছে।ওভার থিঙ্কার এবং সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাডিক্ট। :)