page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব
লাইফস্টাইল

সুস্থ জীবনের জন্যে চাই মুক্ত বাতাস

ছোটবেলায় একবার নারায়ণগঞ্জে টানবাজারের ফুটপাত দিয়ে হাঁটছিলাম। পথে দেখি আমারই বয়সের এক বিহারি ছেলে রাস্তায় বিভিন্ন মেরামতের দোকান পেতে বসেছে। সেই সময় ফাউন্টেন পেনের প্রচলন হয়েছে মাত্র। আমার এক খালাত ভাইয়ের সৌজন্যে আমারও একটা ফাউন্টেন পেন ছিল। কিন্তু এটাতে কালি চোয়াতো যাতে করে বুক পকেটে দাগ পড়ে গিয়েছিল।

আমি আমার কলমটি এগিয়ে দিয়ে বললাম, এসকো ঠিক কর দোও গে?

ছেলেটি বললো, এক রুপেয়া লাগেগা।

আমি বললাম, চার আনে দোওঙ্গা।

ছেলেটি একটা কৌটা থেকে ছোট্ট একটা সুঁই বের করতে করতে বললো, এসকা দাম দো আনে। একই সাথে পকেট থেকে একটা মেচবক্স বের করতে করতে বললো, এসকা দাম দো আনে। সে একটা ম্যাচের কাঠি দিয়ে আগুন ধরালো এবং সুইটি ওই আগুনের ওপর ধরল। একটু ক্ষণের মধ্যেই সুইটি ফাউন্টেন পেনের ক্লিফের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল। ক্লিফের ছিদ্রটির দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললো, আব ইয়ে ড্রাই রাহেগা।

ali ahmad rushdi png

আমি আমার কথামতো ছেলেটিকে চার আনা দিতে গেলে সে টাকা নিলো না। বললো, ইয়ে ফ্রেস হাওয়া কা মোজেজা হ্যায় মেরা নাহি।

আমারই বয়সের এই বিহারি ছেলেটি অবস্থার চাপে পড়ে আমার চেয়ে অনেক বেশি শিখেছে এবং আমাকে শিখিয়েছে, ‘সুস্থ জীবনের জন্যে মুক্ত বাতাসের দরকার।’

পরবর্তীকালে এম. সি. কলেজে ছাত্র থাকাকালীন আমাদের অর্থনীতি বিভাগের প্রধান ড. খলিলুর রহমানের কাছেও এই একই কথা শুনেছিলাম, সুস্থ জীবনের জন্যে চাই মুক্ত বাতাস।

আগের লেখায় যেমনটা বলেছিলাম, তিনি থাকতেন সিলেট সার্কিট হাউসে আর আমরা থাকতাম সেখান থেকে চার মাইল দূরে কলেজ হোস্টেলে। অনেক সময় কলেজের অদূরে শিবগঞ্জ বাজারে আমরা রিক্সার অপেক্ষায় দাঁড়াতাম, শহরে যাবার জন্যে। স্যার ওই পথে যাবার সময় আমাদের কাউকে দেখলেই গাড়ি থামাতেন এবং সার্কিট হাউজে নিয়ে গিয়ে চা-কফি খাইয়ে গল্প করে তবে বিদায় দিতেন।

একদিন কথাপ্রসঙ্গে কথা উঠল ১৯৬১ সালে টেক্সাস ইউনিভার্সিটিতে তিনি যখন ছাত্র তখন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইউব খান আট দিনের সরকারী সফরে আমেরিকায় গিয়েছিলেন। সেই সময় আমেরিকা আর রাশিয়ার মধ্যে উচ্চমাত্রার স্নায়ুযুদ্ধ চলছে। কাজেই রাশিয়া ও আমেরিকা উভয়েই ছলে-বলে-কৌশলে বিভিন্ন দেশে নিজ নিজ প্রভাব বিস্তারের জন্যে মরীয়া হয়ে উঠছিল।

রাশিয়া ভিতরে ভিতরে মিশর, সিরিয়া, লিবিয়া, ইরাক, ইয়েমেন ও সোমালিয়ায় নানাবিধ বাণিজ্যিক, শিক্ষা সাংস্কৃতিক ও সামরিক চুক্তির মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি আরও জোরদার করছিল। আমেরিকা অন্যদিকে তুরস্ক, ইরান, পাকিস্তান এবং যুক্তরাজ্যসহ সেন্টো (CENTO) ও সিয়াটোর (SEATO) মত সামরিক জোট গঠন করে। এসব দুই পরাশক্তির স্নায়ুযুদ্ধে নতুন মাত্রা যোগ করে।

এই পরিস্থিতিতে ১৯৬১ সালের ১১ জুলাই পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইউব খানকে জাঁকজমকপূর্ণ সম্বর্ধনা দিয়েছিল আমেরিকান যুক্তরাষ্ট্র। পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় অভ্যর্থনা পেয়েছিলেন আইউব খান। আমেরিকান কংগ্রেসের যৌথ সভায় ভাষণ দেবার মর্যাদা পেয়েছিলেন তিনি। জর্জ ওয়াশিংটনের বাড়িতে জ্যাকি কেনেডির আতিথেয়তায় রাষ্ট্রীয় ডিনার এবং টেক্সাসে ভাইস প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসনের রেঞ্চে রাষ্ট্রীয় বার্বাকিউ, সে এক এলাহি কাণ্ড।

State dinner in honor of President Mohammad Ayub Khan

আইউব খানের সম্মানে রাষ্ট্রীয় ডিনার পার্টি। বা থেকে প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি, আইউবকন্যা বেগম নাসির আওরংজেব, ফার্স্ট লেডি জ্যাকুলিন কেনেডি ও প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আইউব খান। মাউন্ট ভারনন, ভার্জিনিয়া। ১৯৬১।

স্যার বললেন, আসলে এটা ছিল আমেরিকা কত বড় আর কত শক্তিশালী তার একটা প্রদর্শনী। সারা পৃথিবীর রাষ্ট্রদূতদের উপস্থিতিতে জর্জ ওয়াশিংটনের আমলের আমেরিকান বিপ্লবী বাহিনীর অবিকল নকল একটা ছোট সেনাদল আইউব খানকে গার্ড অব অনার দিল। দুনিয়াবাসীকে দেখিয়ে দিল উপনিবেশ আমলে আমেরিকার চেয়ে হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী বৃটেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তারা জয়ী হয়েছিল। আর এখনও তাদের সেই সৌর্য বীর্য বিক্রম সবই আক্ষত আছে। সমরাস্ত্র ও বিত্ত বৈভবেরও কোনো অভাব নাই।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, আমেরিকান বিপ্লবের কারণ কী ছিল যে তারা তাদেরই স্বগোত্রীয়দের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিল?

রোযানক আইল্যান্ডে  প্রথম অবতরণ, ১৫৮৪

রোয়ানক আইল্যান্ডে প্রথম অবতরণ, জুলাই ১৫৮৪। ছবি. নর্থ ক্যারোলাইনা অফিস অব আর্কাইভস অ্যান্ড হিস্টরি।

roanok-2

স্যার ওয়াল্টার রেলি (১৫৫৪-১৬১৮)

তখন স্যার বলতে শুরু করলেন। আমেরিকান যুক্তরাষ্ট্র (United States of America) প্রথম থেকেই এত বড় দেশ ছিল না। একটি একটি করে কলোনি গড়ে উঠেছিল। প্রথম যে কলোনিটিতে বসবাস শুরু হয় তা ছিল নর্থ ক্যারোলাইনার রোয়ানক দ্বীপে ১৫৮৫ সালে। স্যার ওয়াল্টার রেলি তার নিজস্ব বাছাই করা লোকজন দিয়ে এই কলোনিটি স্থাপন করেন এবং রাণী প্রথম এ্রলিজাবেথের সম্মানার্থে এই নতুন কলোনির নাম দেন ভার্জিনিয়া।

তারপর ধীরে ধীরে আরও ১২ টি কলোনি স্থাপিত হয় তিন শতাব্দী ধরে। ব্রিটিশদের এই ১৩টি কলোনির প্রত্যেকটি সরাসরি ব্রিটেন থেকে শাসিত হতো।

প্রথম দিকে নবাগত ব্রিটিশদের স্থানীয় ইন্ডিয়ান, প্রতিদ্বন্দ্বী দখলদার ফ্রেঞ্চ কিংবা স্পেনিশদের সাথে যুদ্ধ করতে হয়েছিল।

ব্রিটেন ও কলোনিস্টদের মধ্যে বিভাজনের প্রধান কারণ ছিল কলোনির উদ্দেশ্য সম্পর্কে দুই দেশের লোকের সম্পূর্ণ ভিন্ন মতবাদ। বৃটিশরা মনে করতো আমেরিকার জমিজমা হচ্ছে কেবম মাত্র ব্রিটেনের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল যোগান দেওয়ার জন্য এবং আমেরিকানরা হচ্ছে ব্রিটিশ শিল্প-সামগ্রীর ভোক্তা মাত্র। ব্রিটিশদের এই মনোভাব আমেরিকার কলোনিগুলির শিল্পায়ন ও বাণিজ্য প্রসারের ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান বাধা-বিপত্তি সৃষ্টি করার মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছিল।

আমি বললাম, ব্রিটিশরা এই সময় নিশ্চয়ই মার্কেন্টালিজমে বিশ্বাসী ছিলেন?

স্যার বললেন, ঠিক তাই। ব্রিটিশরা বরাবরই অর্থনীতির যে সূত্র অনুসরণ করলে ব্রিটিশ অর্থনীতির সমৃদ্ধি হবে সেটাই গ্রহণ করেছে। শিল্পবিপ্লবের আগে রপ্তানী বাণিজ্যে যখন তাদের তূলনামূলক প্রাধান্য (comparative advantage) ছিল না তখন তারা কলোনিগুলির জন্যে বিভিন্ন আইন ও প্রতিরোধ ব্যবস্থার সৃষ্টি করে ফ্রান্স, স্পেন ও হল্যান্ড থেকে আমদানি নিষিদ্ধ করে দেয়। কলোনিগুলি শুধু বৃটিশ পণ্য আমদানি করতে পারতো।

roanok-3

রোয়ানক আইল্যান্ডে প্রথম কলোনি। গত ৪০০ বছর ধরে রহস্য হয়ে আছে রোয়ানক আইল্যান্ডে কলোনি স্থাপনকারী ১২০ জন সেটলারের জীবনে কী ঘটেছিল।

মার্কেন্টালিজমের আসল উদ্দেশ্য ছিল বৃটিশ মার্চেন্টদেরকে বৃটিশ নৌবাহিনী ও রাজকীয় সহায়তা দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সফল করা, যার ফলে পৃথিবীর সব জায়গা থেকে স্বর্ণ এসে বৃটেনে জমা হয়। মার্চেন্টদের কাছ থেকে যে ট্যাক্স আদায় হতো তা দিয়ে নৌবাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি করা হতো এবং একটি তুখোড় নৌবাহিনী আছে বলেই ১৭৬৪ সালে গোলন্দাজদের কাছ থেকে নিউ আমস্টারডাম (New York) ছিনিয়ে নিতে পেরেছিল।

স্যার বলে চললেন। আবার যখন শিল্পবিপ্লবের ফলে বৃটিশ ইন্ডাস্ট্রিগুলি অপেক্ষাকৃত কম দামে উন্নত মানের কাপড় -চোপর, নানাবিধ ব্যবহারিক দ্রব্যাদী তৈরি করা শুরু করলো তখন তারা আবার অবাধ বাণিজ্যের জয়গান শুরু করলো। স্যার তখন ডেভিড রিকার্ডোর কম্পারেটিভ অ্যাডভান্টেজ থিওরি (Law of comparative advantage) সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির অর্থনৈতিক উপদেষ্টা নোবেল ল’রেট স্যামুয়েলসনের একটি মন্তব্য তুলে ধরলেন।

স্যামুয়েলসন বলেছিলেন অর্থনীতির থিওরিগুলির মধ্যে যদি বিউটি কন্টেস্ট হতো তাহলে কম্পারেটিভ অ্যাডভান্টেজ থিওরি প্রথম স্থান পেতো।

আমি বললাম, শুনেছি কোন অর্থনীতিবিদ নাকি বলেছেন কম্পারেটিভ অ্যাডভান্টেজ থিওরি মেনে চললে জার্মানি ও আমেরিকা কখনই শিল্পোন্নত দেশ হতে পারতো না।

স্যার বললেন, পরবর্তী কালে অর্থনীতিবিদরা রিকার্ডিয়ান থিওরিকে (Law of comparative advantage) আরও রিফাইন করেছেন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব দেশই যাতে সমান ভাবে লাভবান হতে পারে সে জন্যে বেশ কিছু পূর্বশর্ত আরোপ করে দেন।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে দেখা যাচ্ছে এই যে ব্রিটিশরা কলোনিগুলির অর্থনৈতিক স্বার্থের দিকে না তাকিয়ে কেবল মাত্র নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির ফিকির-ফন্দি করছিল সেটাই আমেরিকানদের বিপ্লবের কারণ?

স্যার বললেন, অনেক কলোনিস্ট যারা মাতৃভূমিতে ধর্মীয় ও সামাজিক নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচবার জন্যে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে তিন হাজার মাইল দূরের এই দেশে বসবাস শুরু করেছে তারা কিছুতেই সহ্য করতে পারছিল না এখনও ব্রিটিশরা তাদের শিল্প ও বাণিজ্য ক্ষেত্রে তথা তাদের অর্থনৈতিক উন্নতির ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করুক। ব্রিটিশ কলোনিগুলির মধ্যে যেগুলি অপেক্ষাকৃত শিল্পোন্নত ছিল (বিশেষ করে নিউ ইংল্যান্ড) তাদের রপ্তানির ওপর ট্যাক্স বসানোর ফলে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ফলে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে এখানেই প্রথম অন্দোলন গড়ে ওঠে।

১৭৬৩ সালে ব্রিটিশ সরকার সিদ্ধান্ত নিল যে তখনকার কলোনিগুলিকে আর পশ্চিম দিকে বাড়তে দেওয়া হবে না। পশ্চিম দিকে ইন্ডিয়ানদের জন্য নতুন কলোনি করা হবে। উদ্দেশ্য ছিল এই নতুন কলোনিতে বৃটেনে তৈরি দ্রব্যসামগ্রীর জন্য নতুন মার্কেট সৃষ্টি হবে এবং ব্রিটিশ নৌবাহিনীর জন্যে কাঠ সাপ্লাইয়ের পথ সুগম হবে।

এই সিদ্ধান্ত কলোনিবাসীদের কাছে মোটেই সুখবর ছিল না। কারণ এতে তাদের আরও সম্প্রসারণ রুদ্ধ হয়ে যাবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার কমে যাবে। ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মধ্যে সাত বছর ব্যাপী (১৭৫৬-৬৩) যুদ্ধের খরচ উসুল করার উপায় নিয়ে ব্রিটিশ ও আমেরিকান কলোনির মধ‍্যে তখন বিবাদ ছিল। ব্রিটিশরা মনে করলো অ্যাংলো-ফ্রেন্চ যুদ্ধে কলোনিবাসীরা যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধ করে কিংবা আর্থিক দায়িত্ব বহন করে কোনো ভাবেই তাদের পূর্ণ দায়িত্ব পালন করে নি।

যুদ্ধের অব্যবহিত পরেই দেখা গেল উত্তর আমেরিকার যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থিত সেনাবাহিনীর জন্য ব্রটিশ রাজকোষের একটা বিরাট অংশ (শতকরা প্রায় চার ভাগ) খরচ হচ্ছে। এই বিশাল খরচ এবং সেই সঙ্গে ফরাসিদের হটিয়ে দিতে সমর্থ হওয়ায় ব্রিটিশরা কলোনিগুলির প্রতি নতুন করে মনযোগ দেওয়া শুরু করলো।

১৭৫৬ সালে পূর্বাঞ্চলীয় ব্রিটিশ কলোনিগুলির মাঝখানে কানাডা, মিশিসিপি ও অহিও ভেলি ফ্রান্সের অধিকারে ছিল। অ্যাংলো-ফ্রেন্চ যুদ্ধে ফ্রান্সের পরাজয়ের ফলে ব্রিটিশরা এ ব্যাপারে অনেকটা নিশ্চিত হলো যে এখন (১৭৬৩ সাল) আর মুরগির খামারে শিয়ালের আস্তানার মতো ফ্রান্সের কাছে কলোনি হারাবার ভয় থাকলো না। অন্যদিকে কলোনিবাসীরা নিশ্চিত হলো যে এখন আর ফরাসীদের ভয়ে ব্রিটিশদের কাছে নতজানু থাকার প্রয়োজন রইল না।

১৭৬৫ সালে প্রবর্তিত স্ট্যাম্প ডিউটিও কলোনিতে নতুন টেনশনের সৃষ্টি করেছিল। সরকারী কাগজপত্র দলিল দস্তাবেজের ওপর এই ট্যাক্স বসানো হয়েছিল। যেসব কারণে কলোনিবাসীদের কাছে এই ট্যাক্স অপ্রিয় ছিল তা হচ্ছে:
এক. আমেরিকানরা ঠিকই বুঝতে পেরেছিল যে এই অর্থ দিয়ে তাদের পশ্চিম দিকে সম্প্রসারণ রহিত করা হবে;
দুই. স্ট্যাম্প ডিউটি ছিল আমেরিকানদের ওপর ব্রিটিশদের প্রথম প্রত্যক্ষ ট্যাক্স যা আংশিক বা সম্পূর্ণ রূপে অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না।

তিন. এই ট্যাক্স বসানোর ফলে আমেরিকার যে সব কলোনিতে আইনসভা ছিল তাদের আইনগত অবস্থান কী—এই ইস্যুটি আবার নতুন করে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়ালো। ব্রিটিশদের কাছে কলোনির আইনসভাগুলি ওয়েস্টমিনিস্টার আইনসভার অধীনস্থ ছিল। অন্যদিকে কলোনিগুলিতে একটা নতুন থিওরির জন্ম হলো। তাদের মতে কলোনির আইনসভাগুলির ওপর ওয়েস্টমিনিস্টার আইনসভার সাম্রাজ্য সংক্রান্ত ইস্যুগুলির ওপর নিয়ন্ত্রণ আছে কিন্তু কলোনিগুলিতে ট্যাক্স বসাবার অধিকার নাই।

এই সব বিতর্কের ফলশ্রুতিতে আমেরিকায় রায়ট হয় এবং লন্ডনে লর্ড গ্রিনভিল সরকারের পতন ঘটে। লর্ড রকিংহামের নতুন সরকার ১৭৬৬ সালে স্ট্যাম্প ডিউটি রহিত করে দেন কিন্তু ব্রিটিশ কলোনিগুলির ওপর ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সর্বময় ক্ষমতা ও কতৃত্ব পুনঃ ব্যক্ত করে আইন পাশ করেন।

অর্থ সংগ্রহের পরবর্তী চেষ্টা ছিল ১৭৬৭ সালের রেভিন্যু অ্যাক্ট। এই আইনের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসন কর্তারা নতুন ট্যাক্স আদায় করার ক্ষমতা পায়। ট্যাক্সের এই টাকা কলোনিগুলির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার কাজে ব্যয় করা হবে বলে দাবি করা হয়। তাছাড়া রাজকার্য সম্পন্ন করার জন্য কলোনিয়াল পার্লামেন্টারি বাজেটের ওপর যাতে নির্ভর করতে না হয় সে জন্যে গবর্ণরদেরকে আরও অধিক অর্থ বরাদ্দের দরকার ছিল। নতুন এই ট্যাক্সের টাকা সেই কাজেও ব্যয় করা হবে বলে ঘোষণা করা হয়।

প্রত্যক্ষ ট্যাক্সের যুক্তিতে স্ট্যাম্প ডিউটির বিরোধিতার পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটিশ সরকার আশা করেছিল রেভিন্যু অ্যাক্টের ক্ষেত্রে বিরোধিতা কমে আসবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয় নি। এক্ষেত্রে বরং বিরোধিতা এসেছে আটলান্টিকের দুই পাড় থেকে।

বৃটেনে যে সব মার্চেন্টরা আমেরিকায় রপ্তানি করতো তাদের পণ্যের ওপর এখন ট্যাক্স দিতে হবে এবং আটলান্টিকের অপর পাড়ে গিয়ে আমেরিকানদের বয়কটের মোকাবেলা করতে হবে। অন্যদিকে রেভিন্যু অ্যাক্টের ফলে আমেরিকানদের মনে দারুণ সন্দেহের জন্ম নেয়। কারণ এই রাজস্বের টাকা দিয়ে বৃটিশ ঘাটি ও তাদের ক্ষমতা আরও পাকাপোক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছিল।

কলোনিবাসীরা সাধারণ ভাবে রেভিন্যু অ্যাক্টকে মনে করেছে পার্লামেন্টকে এড়িয়ে একটা তড়িঘড়ি করে পাস করা আইন। বোস্টন থেকে স্যামুয়েল অ্যাডামস এক জোটে এই আইনের বিরোধিতা করার জন্যে দেশবাসীর কাছে আবেদন জানান।

প্রথম দিকে এই আবেদনের কোনো সাড়া না পাওয়া গেলেও ব্রিটিশ কলোনি সংক্রান্ত মন্ত্রী লর্ড হিলসবরো যখন মাসাচুসেটস আইনসভাকে সাসস্পেন্ড করেন এবং গবর্ণরদেরকে ওই চিঠি অগ্রাহ্য করার নির্দেশ দেন তখন সারা দেশে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। জর্জ ওয়াশিংটনসহ সমস্ত কলোনিবাসীরা এখন মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে থাকে যে ব্রিটিশরা সব কলোনিতেই তাদের সর্বাত্মক নিয়ন্ত্রণ কায়েম করার জন্যে উঠে-পড়ে লেগেছে।

এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটিশদের অধিকৃত ১৩টি কলোনিতে একযোগে ব্রিটিশ দ্রব্যসামগ্রী বয়কট করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

আমদানি বন্ধ হওয়ার ফলে আমেরিকান বন্দরগুলিতে বিশেষ করে বোস্টনে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায় এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটিস সরকার বস্টন বন্দরে সৈন্য মোতায়েন করতে বাধ্য হয়। এই সময়ে লন্ডনে লর্ড নর্থ ক্ষমতায় আসেন (১৭৭০ সালে)।

নতুন সরকার একমাত্র চা ছাড়া আর সব জিনিসের ওপর থেকে ডিউটি রহিত করে দেয়। চায়ের ওপর ডিউটি বজায় রাখার কারণ প্রথমতঃ ব্রিটিশ একাধিপত্বের প্রতীক হিসাবে এবং দ্বিতীয়তঃ চা শুল্ক থেকে ব্রিটিশ আয় ছিল বছরে প্রায় ১১০০০ পাউন্ড।

এই সময় কলোনিগুলিতে আমদানি বন্ধের প্রচেষ্টা অনেকটা কমে আসছিল কারণ মূল্যস্ফীতি ও আনুষঙ্গিক অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা বেড়েই চলছিল। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনকারীরা এতে প্রমাদ গুনলো।

১৭৭০ সালের ৫ মার্চ স্বাধীনতাকামী কিছু লোক বোস্টন কাস্টমস হাউজে পাহাড়ারত ব্রিটিশ সোলজারদের ওপর আক্রমণ চালায় যাতে একজন সৈন্য মারা যায়। পাল্টা গুলিতে কমপক্ষে পাঁচজন আক্রমণকারী মারা যায়। সাধারণভাবে অন্যান্য কলোনির লোকেরা এই আক্রমণকে উগ্রবাদীদের কাণ্ড মনে করার ফলে উত্তেজনা আর বেশিদূর গড়ায় নি।

সে বছর গ্রীষ্মের শেষে নিউ ইয়র্কের আমাদানি প্রতিরোধ উঠিয়ে নেওয়া হয় এবং খুব শীঘ্রই অন্যান্য কলোনিগুলিও একই পথ অনুসরণ করে। ফলে একমাত্র চায়ের ওপর ট্যাক্স ছাড়া বিরোধের আর কোনো কারণ বাকি ছিল না।

পরবর্তী তিন বছর মোটামুটি শান্তই ছিল আমেরিকার কলোনিগুলি। কিন্তু বৃটেন থেকে তিন হাজার মাইল দূরে অবস্থিত কলোনিতে কখন কী ঘটবে আগে-ভাগে তার কিছুই বলার উপায় ছিল না।

১৭৭০ সালের দিকে ভারতবর্ষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পাই তাদের ব্যবসায়ে লোকসান দিচ্ছিল। বর্ণনাভেদে এই লোকসানের দুই ধরনের কারণ ছিল।

এক. ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছিল। ফলে প্রকৃত শেয়ার হোল্ডারদেরকে লাভ না দিয়ে কর্মচারীরা নিজেদের মধ্যে চুরির মাল ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়ে যেতো।

দুই. কোম্পানি তাদের চিরাচরিত ব্যবসা ছেড়ে ব্রিটিশ সরকারের এজেন্ট হিসাবে রাজ্য শাসন কাজে হাত দিয়েছিল। ফলে ব্যবসায়ে লোকসান দিচ্ছিল।

যে কোনো কারণেই হোক লোকসানের কারণে ব্রিটিশ রাজকোষের আয় কমে যাচ্ছিল। এমতাবস্থায় বৃটেনের প্রধান মন্ত্রী লর্ড নর্থ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আর্থিক দুরবস্থা কমানোর উদ্দেশ্যে তাদের উদ্বৃত্ত চা সরাসরি আমেরিকায় রপ্তানি করার ব্যবস্থা করে দেন।

ইতিপূর্বে কোম্পানিকে তাদের চা বৃটেনে রপ্তানি করতে হত এবং প্রতি পাউন্ড চায়ের ওপর এক শিলিং করে ডিউটি দিতে হতো। এই চা তখন ব্রিটিশ রপ্তানীকারকের মাধ্যমে আমেরিকায় রপ্তানি করা হতো এবং সেখানে আবার প্রতি পাউন্ড চায়ের ওপর তিন পেন্স করে ডিউটি দিতে হতো।

লর্ড নর্থের নতুন ব্যবস্থার ফলে কোম্পানিকে বৃটেনে চা পাঠাবার দরকার ছিল না। ফলে প্রতি পাউন্ডে রপ্তানি কর বাবদ এক শিলিং সাশ্রয় হতে পারতো।

বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের আগ্রাসী নেতারা দেখলো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চা নামতে দিলে আমদানীকৃত চায়ের দাম অর্ধেকে নেমে আসবে এবং মানুষজনকে তা কিনতে যতই বারণ করা হউক তা শোনানো যাবে না। কাজেই এই চা বন্দরে নামার আগেই বাধা দিতে হবে।

১৭৭৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর বোস্টনে একদল আগ্রাসী নেতা রেড ইন্ডিয়ান জওয়ানদের মতো সেজে কোম্পানির জাহাজে উঠে হাজার হাজার পাউন্ড চা পানিতে ফেলে দেয়। এই ঘটনা ইতিহাসের পাতায় বোস্টন টি পার্টি হিসাবে পরিচিত। ব্রিটিশ রাজ আর কলোনিগুলির সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটা ছিল এক যুগসন্ধিক্ষণ।

tea-party-1

বোস্টনে রেড ইন্ডিয়ান জওয়ান সেজে কোম্পানির জাহাজ থেকে হাজার হাজার পাউন্ড চা পানিতে ফেলে দেয়া হয়। ১৬ ডিসেম্বর ১৭৭৩।

ব্রিটিশ রাজ কীভাবে বোস্টন পার্টির জবাব দেয় তা ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল। ব্রিটিশরা কিছুটা নম্র ব্যবহার করলে হয়তবা সাময়িক যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল তা এমনিতেই প্রশমিত হয়ে যেত। কিন্তু লর্ড নর্থ সামরিক হস্তক্ষেপের পথ বেছে নিয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন ১৭৭০ সালে বোস্টন কাস্টমস হাউজে আক্রমণের মতো এবারও টি পার্টির লোকদেরকে মানুষ উগ্রবাদী গণ্য করে থামিয়ে দেবে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটে নি।

১৭৭৪ সালে ব্রিটিশ সরকার আমেরিকানদের শায়েস্তা করার জন্যে বেশ কিছু নতুন আইন প্রবর্তন করেন। এগুলিকে এক নামে ‘কোয়ার্সিভ বা ইনটলারেবল’ অ্যাক্ট বলা হয়। বোস্টন টি পার্টিতে পানিতে ফেলে দেওয়া সমস্ত চায়ের পুরা দাম না পাওয়া পর্যন্ত বোস্টন বন্ধ করে দেওয়া হলো। বোস্টন বন্দরের ভিতরে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ব্যারাক স্থাপনের জন্য বোস্টনকে বাধ্য করা হলো। গবর্ণরকে ক্ষমতা দেওয়া হলো যে কোনো বিচার্য বিষয় লন্ডনে পাঠানোর জন্য। তদুপরি কলোনিগুলির শাসনতন্ত্র পরিবর্তন করা শুরু করেছিল ব্রিটিশ সরকার।

ম্যাসাচুসেটস আইনসভার দুটি চেম্বার ছিল। নিম্ন পর্ষদে জনগণের ভোটে প্রতিনিধি নির্বাচিত হতো আর উচ্চ পর্ষদে সদস্যরা নির্বাচিত হতেন নিম্ন পর্ষদের সদস্যদের ভোটে। ব্রিটিশ সরকার তা বদলিয়ে উচ্চ পর্ষদের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক নির্বাচিত কাউন্সিলের ব্যবস্থা করলেন।

এই সমস্ত আইনের ফলে আমেরিকানরা আরও বেশি ক্ষেপে গেল। এই উত্তেজনা তখন আর ম্যাসাচুসেটসের মধ্যে সীমিত ছিল না। ব্রিটিশদের ১৩টি কলোনি আরো ঘনিষ্ঠ ভাবে স্বাধীনতার জন্য তৈরি হতে লাগলো।

১৭৭৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ফিলাডেলফিয়ায় প্রথম কন্টিনেন্টাল কংগ্রেসের বৈঠক শুরু হয়। এই বৈঠকের দাবি ছিল:

  • ব্রিটিশ সরকার ১৭৬৩ থেকে শুরু করে আমেরিকান কলোনি সম্পর্কে যত আইন পাস করেছে তা সব বাতিল ঘোষণা করতে হবে।

কংগ্রেস এই মর্মে একমত হয় যে এই দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত বৃটেন থেকে সমস্ত আমদানি এবং আমেরিকা থেকে বৃটেনের জন্য সমস্ত রপ্তানি বন্ধ থাকবে। কংগ্রেস আরো সিদ্ধান্ত নেয় দাবি না মানা পর্যন্ত বৃটেনকে কোনো রকম কর দেওয়া হবে না এবং ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর মোকাবেলা করার জন্য সকল প্রকার প্রস্তুতি নিতে হবে। তবে তারা স্বাধীনতা ঘোষণা থেকে বিরত থাকলো।

ব্রিটিশদের চোখে কংগ্রেস ছিল একটা বেআইনি সংগঠন যার সাথে মিটিং করাও বেআইনি। কাজেই সমঝোতার জন্যে আলোচনার দরজা বন্ধই রয়ে গেল। পরিণামে, আমেরিকানরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে নতুন আমেরিকান যুক্তরাষ্ট্র গঠনের জন্যে যুদ্ধ ঘোষণা করলো। ব্রিটিশরা আমেরিকান অর্থনীতিকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়ার জন্যে সমগ্র আমেরিকান পোর্ট বন্ধ করে দিল। ফলে আমেরিকান শহরগুলিতে আমদানি দ্রব্যের অভাবে মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছিল বটে কিন্তু শতকরা ৯০ ভাগ লোক কৃষিনির্ভর হওয়ার ফলে তথা শহর থেকে দূরে থাকতো বলে তাদের গায়ে এই মূল্যস্ফীতির উত্তাপ ততটা অনুভূত হয় নি।

১৭৭৫ সালের ঊনিশে এপ্রিল যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। ১৫ জুন জর্জ ওয়াশিংটনকে কন্টিনেন্টাল আর্মির সেনাপতি নিযুক্ত করা হয় এবং ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়।

battle-of-Lexington

ব্যাটল অব লেক্সিংটন অ্যান্ড কনকর্ড, ১৯ এপ্রিল ১৭৭৫। এটি নিতান্ত ছোট মাপের যুদ্ধ ছিল। কিন্তু আমেরিকান ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই যুদ্ধ। এ থেকেই আমেরিকান রেভ্যুলশনারি যুদ্ধের শুরু হয়।

যুদ্ধ ১৭৮৩ সাল পর্যন্ত চলে। ১৭৭৫ সালে আমেরিকার ১৩টি কলোনিতে মাত্র ১২ মিলিয়ন ডলারের স্বর্ণমুদ্রা ছিল। এই পরিমাণ টাকায় যুদ্ধ চালানো তো দূরের কথা দৈনন্দিন খরচও চলার কথা নয়। কিন্তু স্বাধীনতার মন্ত্র ‘জীবন, স্বাধীনতা ও স্বাচ্ছন্দ’ (life, liberty, and the pursuit of happiness) তাদেরকে এমন ভাবে উজ্জীবিত করেছিল যে পৃথিবীর কোনো শক্তিই তাদেরকে এই চেতনা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে নি। আমেরিকানরা আবারও প্রমাণ করলো, ‘সুস্থ জীবনের জন্যে চাই মুক্ত বাতাস’।

washington-1

জর্জ ওয়াশিংটন। প্রথমে আর্মি অফিসার ছিলেন। কলোনির যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। ৪ জুলাই ১৭৭৬ সালে স্বাধীনতার পরে আমেরিকার প্রথম প্রেসিডেন্ট হন তিনি।

যুদ্ধের জন্য যে ৬৬ মিলিয়ন ডলারের মতো (সোনা ও রুপার পরিমাণে) খরচ হয়েছিল তা মিটানোর জন্য কংগ্রেস মোটামুটি যেসব পদ্ধতি ব্যবহার করেছিল তা হচ্ছে:

  • কারেন্সি নোট ছাপানো।
  • সেনাবাহিনীকে নগদ বেতন না দিয়ে ভবিষ্যতে দেওয়া হবে এই নিয়ম চালু করা।
  • ১৭৮০ সাল থেকে নগদ ট্যাক্স আদায় না করে খাবার দ্রব্য কিংবা প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদীর মাধ্যমে ট্যাক্স আদায়ের ব্যবস্থা করা।
  • ফরাসিদের কাছ থেকে গোলাগুলি ও আর্থিক সাহায্য গ্রহণ করা।

১৭৮২ সালে আমেরিকান ফিন্যান্স মিনিস্টার মরিস ফ্রান্স থেকে লোন নিয়ে ব্যাংক অব নর্থ আমেরিকা প্রতিষ্ঠা করেন এবং তার যোগ্য ব্যবস্থাপনায় আমেরিকার অর্থনীতি ধীরে ধীরে মজবুত হতে থাকে।

১৭৮৭ সালে আমেরিকান যুক্তরাষ্ট্রের শাসনতন্ত্র পাস করা হয় এবং ১৩টি কলোনির সমষ্টিকে একটি অখণ্ড দেশ হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

আমি স্যারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এই যে আমেরিকান যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে স্বাধীন হলো আবার প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের পক্ষে যুদ্ধ করলো, মার্শাল প্ল্যানের আওতায় ইউরোপে অর্থনৈতিক পূণর্বাসন করলো সাধারণ দৃষ্টিতে দেখলে এগুলি তো সঙ্গতিপূর্ণ মনে হয় না।

স্যার বললেন, তোমার এই লিস্টের সাথে আরও যোগ করতে পারো নেপোলিয়নের সময় ব্রিটিশ ফরাসিদের যুদ্ধ, ফ্রাঙ্কো-রাশিয়ান যুদ্ধ আবার বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ব্রিটিশ-ফরাসি-রাশিয়ান একই কাতারে জার্মানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। আপাত দৃষ্টিতে অচিন্তনীয় মনে হতে পারে, কিন্ত রাজনীতিতে চিরস্থায়ী বন্ধু কিংবা চিরস্থায়ী শত্রু বলে কিছু নাই। সবকিছুই নির্ভর করে বর্তমান অবস্থার ওপর।

এমন কি অর্থনীতিতেও যে অর্থ ও সম্পদ তুমি একবার ব্যয় করে ফেলেছো তা আর তুমি দ্বিতীয়বার ব্যয় করতে পারো না। বিশ বছর আগে যদি তুমি একটি দোতালা বাড়ি করে থাকো এখন সেই বাড়ি ভেঙে ছয়তালা ফ্ল্যাটবাড়ি বানানো কি যৌক্তিক? তোমার বিশ বছরের স্মৃতিমাখা অতি যত্নে গড়া দোতালাটি ভাঙবে কিনা তা নির্ভর করে তোমার বর্তমান অবস্থা, বাজারদর ও পরিবেশের ওপর।

About Author

আলী আহমাদ রুশদী
আলী আহমাদ রুশদী

ড. আলী আহমাদ রুশদীর কর্মজীবন শুরু হয়েছিল ১৯৬৬ সালে কুমিল্লার নওয়াব ফয়জুন্নেসা কলেজে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা কলেজে কিছুদিন শিক্ষকতা করেছেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে করোটিয়ার সাদত কলেজে বেশ কয়েক বছর অধ্যক্ষ হিসাবে কাজ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে সহযোগী-অধ্যাপক ছিলেন বহুদিন। ১৯৮৯ সাল থেকে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী। মেলবোর্নে অবস্থিত Australian Competition and Consumers Commission এ অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসাবে কাজ করেছেন প্রায় ১৫ বছর। সেখান থেকে অবসর গ্রহণের পরে ঢাকার AIUB ও নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটিতে কিছুদিন অধ্যাপনা করেছেন। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে UNDP, ILO, World Bank ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের কাজে গবেষণা করেছেন। বর্তমানে মেলবোর্নে অবসর জীবন যাপনের ফাঁকে তাঁর সময় কাটে অর্থনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ের উপর লেখালেখি করে।