page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

সোনারঙের দিন (৩)

শুরুর পর্ব । আগের পর্ব

হেথা চিরশ্যামল বসুন্ধরা 

গান। কবিতা। গল্প। গোলাপ ফুল। চাঁপা ফুল। করবী। বেল, জুঁই, হাসনুহানা। গরমকালে লিচু আর কালোজাম। ঝাল নুন দিয়ে কাঁচা আম।

শীতের দুপুরে ইডেন গার্ডেন। বর্ষার রাতে ঘুমের ঘোরে ঝম ঝম করে নামা বৃষ্টির শব্দ। পুজোর ছুটি শুরু হল। মাঝরাতে ট্রেন থামল কোনো এক অজানা স্টেশনে। নিচু, চাপা গলায় চা-অলা প্ল্যাটফরমে ডাক দিয়ে যাচ্ছে, “চায়, চায়, গরম চায়।” তার মানে আর বাংলাদেশ নেই, বিহার। কিংবা হয়ত উত্তরপ্রদেশ। কাশী যাচ্ছি আমরা বাড়ির সবাই মিলে। সবাই মানে আমি, আমার বোন, আর বাবা মা।

ভাল লাগা সারা গায়ে মেখে জীবন কাটালাম। দুঃখও অনেক পেয়েছি। অনেক মৃত্যু। অনেক দারিদ্র্যযন্ত্রণা। অনেক অবিচার। অসম্মান। অনেক ব্যর্থতা। অনেক রক্তপাত। অনেক হিংসা। অনেক ঘৃণা।

অনেক জমানো কষ্ট বুকের ভেতর। প্রিয়জনকে চিরতরে হারানোর ভুলতে না-পারা বেদনা। যাদের এখন পাশে চেয়েছিলাম, যারা থাকতেই পারত, তাদের আর দেখতে পাই না। তারা আর কখনো আসবে না।

ঘুমের মধ্যে, স্বপ্নের মধ্যে তারা মাঝে মাঝে আসে। “বলে, আয় রে ছুটে, আয় রে ত্বরা, হেথা নাইকো মৃত্যু, নাইকো জরা।”

bangkim-2

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮ – ১৮৯৪)

রঙমহলে জহর রায় বঙ্কিমচন্দ্রের সুবর্ণগোলক নাটক করছেন। হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যাবার জোগাড়। ওঃ, কী হাসি! হা হা হি হি হো হো। এরকম হাসাতে পারে কেউ? রাশভারি কর্তা স্বর্গের সুবর্ণগোলক হাতে পেয়ে বাড়ির কাজের ঝিয়ের মতো ব্যবহার করছেন। আর, ঝি তার পার্সোনালিটি চেন্জ হয়ে কর্তার মত ভাবভঙ্গি।

হাসতে হাসতে সবাই হল থেকে বেরোচ্ছে। কেউ মুখ টিপে হাসছে। ছেলেরা হাসছে হো হো করে। চেনা অচেনা সবাই মিলেমিশে একাকার।

হাসির গল্প পড়ে, হাসির গান শুনে, হাসির সিনেমা, মজার নাটক দেখে যে রকম মজা হতো, তেমন বোধহয় আর কিছুতে হতো না।

একবার আমার কলেজের বন্ধু প্রতাপের সঙ্গে নিউ এম্পায়ার না কোন একটা সাহেবপাড়ার সিনেমাহলে দেখতে গেলাম ‘দা গ্রেট রেস’। জ্যাক লেমন, পিটার ফক, আর ন্যাটালি উড। হাসতে হাসতে পেট ফেটে যাবে যেন।

সেই কেক নিয়ে ছোঁড়াছুঁড়ি। হাস্যকর তলোয়ারের লড়াই। জ্যাক লেমনের ভুল রাস্তায় গাড়ি নিয়ে চলে যাওয়া। আর শেষকালে, আইফেল টাওয়ার ভেঙে পড়ে যাওয়া। আমরা সেই নিয়ে কতদিন যে তার পরেও হেসেছি!

sandesh-21ছোটবেলায়, কিশোর বয়েসে, দেব সাহিত্য কুটির বার করত বিখ্যাত সব বিদেশি গল্প উপন্যাসের বাংলা অনুবাদ। সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়, সুধীন্দ্রনাথ রাহা এদের করা সব কিশোর সংস্করণ। সেই বই নিয়ে কাড়াকাড়ি। আমার শৈশবের বন্ধু সুব্রত হয়ত কিনলো শেক্সপিয়ারের ট্র্যাজেডি। সুতরাং, আমাকে কিনতেই হবে শেক্সপিয়ারের কমেডি।

তখন দামও ছিল জলের মতো শস্তা। এক টাকা চার আনা কি দেড় টাকা দিয়ে কেনা হয়ে গেল থ্রী মাস্কেটিয়ার্স, লাস্ট ডেজ অফ মোহিক্যান্স, কুয়ো ভাদিস—আর লে মিসারাবকে আমাদের দেব সাহিত্য কুটির বললো লা মিজারেবল। আমরাও তাই শিখে নিলাম। লা মিজারেবল। কিন্তু কী আনন্দ! টেমিং অফ দা শ্রু আর মিডসামার নাইটস ড্রিম পড়ে পড়ে মুখস্থ হয়ে গেল।

আর, ট্রেজার আইল্যান্ডট্রেজার আইল্যান্ড তো আমরা কয়েক বন্ধু মিলে নাটকই করে ফেলব ঠিক করলাম। শেষ পর্যন্ত কী যেন একটা কারণে আর হয়ে উঠল না।

তারপর ছিল শুকতারা আর সন্দেশ পত্রিকা। দুএকবার কিশোর ভারতীশুকতারাতে হাঁদাভোঁদা আর বাঁটুল দি গ্রেট। আর কিশোর ভারতীতে নন্টে ফন্টে। সন্দেশে লীলা মজুমদার, সত্যজিৎ রায় এঁদের সব আশ্চর্য গল্প। মাকু। পদিপিসির বর্মীবাক্স।

satyajit-22

“সত্যজিৎ রায়ের ঐন্দ্রজালিক সব গল্প।” ছবি. ২২ বছরের সত্যজিৎ রায়।

সত্যজিৎ রায়ের ঐন্দ্রজালিক সব গল্প। ফেলুদা। প্রফেসর শঙ্কু। বিদেশি গল্পের অনুবাদ। এছাড়া, মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুবাদে জুল ভার্নের আশ্চর্য দ্বীপ। ‘প্রফেসর শঙ্কু ও খোকা’ পড়ে গায়ে কাঁটা দিয়েছিল। কিংবা সেই যে গল্পটা যেখানে শঙ্কু মিশরে গেছেন, আর একজন ভয়ঙ্কর মিশরীয় লোক তাঁদের ফলো করছে। সেই যেখানে প্রাচীনকালের এক যন্ত্রে নির্বাক সিনেমা দেখা গেল। গল্পের চরিত্ররা সবাই স্তম্ভিত। আমরাও পড়তে পড়তে যেন চুম্বকের মতো হারিয়ে গেছি সে গল্পের মধ্যে।

ঘটিকাহিনিতে লিখেছি রবীন্দ্রনাথের হাসির নাটক খ্যাতির বিড়ম্বনার রিহার্সাল দেওয়ার কথা। দুকড়ি দত্ত আর কাঙালিচরণ। তারপর একটু বড় হয়ে পড়লাম ‘চিরকুমার সভা’। অবাক হয়ে গেলাম রবীন্দ্রনাথের সেরিব্রাল অথচ দমফাটা হাসির গল্প পড়ে।

আমাদের জীবনে আর কিছু না থাক, হাসি ছিল খুব। আমাদের কোনো লোভও ছিল না, আর অন্যদের বাড়ি গাড়ি টিভি ফ্রিজ ফোন দেখে জেলাসিও কখনো হয় নি। ওদের আছে, আছে। আমাদের নেই, নেই। ওরা থাক ওদের মতো। আমরা থাকি আমাদের মতো। কোনো ঝগড়া নেই, হিংসা নেই, দ্বেষ নেই। ওদের বাড়ি দুর্গাপুজো হয়। ওরা বড়োলোক। আমাদের বাড়ি মাসে একদিন, হয়ত প্রথম রবিবার বাবা মাইনে পাবার পর, মাংস রান্না হয়।

ওদের মেয়েরা অ্যামব্যাসাডর গাড়ি করে স্কুলে যায়। আমি আর আমার বন্ধুরা যাই ব্যাটারির গলির মধ্যে দিয়ে, অ্যাসিডের চোখজ্বালা করা গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে, হেঁটে। কোনো দিন ভাবি নি এতে আবার দুঃখের কিছু আছে। জোর করে দুঃখ আর অপ্রাপ্তি আর লোভ আর এসব রিপু আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয় নি কেউ।

আমরা এ রকমই ছিলাম। খুব ভাল ছিলাম। মহানন্দে ছিলাম। দিব্যি ছিলাম।

প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা গন্ধ, প্রত্যেকটা স্মৃতি আমাদের মত মানুষদের সারা শরীরে, সারা মনে লেগে আছে। এই স্মৃতিই আমাদের ভাল লাগার রহস্য। কেউ যদি জিজ্ঞেস করে, “কেন এত হেমন্ত হেমন্ত করিস? কী এত ভালো লাগে?” বা,কেউ যদি প্রশ্ন করে, “সবুজ রঙ কেন তোর এত প্রিয়? আমার তো গোলাপি বা বেগুনি রং বেশি ভাল লাগে। তোর কেন সবুজ?” তাহলে, হয়ত, মনের অনেক গভীরে ডুব দিয়ে খুঁজে বের করতে হবে, কোন স্মৃতির সঙ্গে সবুজ রঙ জড়িয়ে আছে। বা, কোন প্রিয় ঘটনার সঙ্গে, সবচেয়ে কোন প্রিয় মানুষগুলোর সঙ্গে, সবচেয়ে বেশি যে রাস্তাগুলো দিয়ে হেঁটে গেছি বছরের পর বছর, সেগুলোর সঙ্গে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান মিশে আছে। তাহলেই বুঝতে পারবে, কেন এত ভালো লাগে।

“এ পথে আমি যে গেছি বার বার
ভুলি নি তো একদিনও…”

স্মৃতির খাঁজে খাঁজে, ভাঁজে ভাঁজে, পরতে পরতে জমে আছে, লেগে আছে, জড়িয়ে আছে ভাল লাগার রহস্য। আর ভাল লাগার রহস্যের মধ্যেই মিশে আছে আমার ভালোবাসা।

kishor-bharotiসবুজ কলাপাতার সঙ্গে আমার পরিচয় বিয়েবাড়িতে। আমরা উত্তর কলকাতার ধূসরতার মধ্যে বড় হয়েছি। আমাদের পেয়ারাবাগান, গোয়াবাগান, মদের গলি, হাতিবাগান, শ্যামবাজার এসব জায়গায় সবুজ প্রায় ছিল না বললেই চলে। গাছপালা আমাদের হেদুয়া পার্কে যাও বা দু চারটে ছিল, তাও ছিল ধুলোয় ধূসরিত। স্কটিশ চার্চ স্কুলের প্রাইমারি সেকশনের বাড়ির একদিকে, যে দিকে হেডমাস্টার মশাইয়ের ব্যক্তিগত বাসস্থান ছিল, সে দিকে ছিল একটা বড় বোগেনভেলিয়ার গাছ।

তার লতাপাতা, আর তার অসংখ্য গোলাপি রঙের ফুল আমাদের স্কুলের একটা দিক ছেয়ে থাকত। আর ছিল সুব্রতদের বাড়ির একতলা থেকে তিনতলার দেওয়াল বেয়ে ওঠা একটা মাধবীলতার গাছ তার সবুজ পাতাগুলো আমাদের শহুরে চোখে পড়ত না বেশির ভাগ সময়েই।

মাঝে মাঝে হঠাৎ তাকিয়ে দেখতাম ওদের। আর ঝাঁকে ঝাঁকে ফুটে ওঠা লাল সাদা ফুলগুলোকে। ঘুড়ি ওড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে, বা ক্যারম বা দাবা খেলার ফাঁকে ফাঁকে মনে হত, আরে, এই গাছটা কেমন বড় হয়ে গেছে দেখেছিস?

ব্যাস, ওই পর্যন্তই।

সবুজ কলাপাতা বেন্চির ওপর পেতে দিয়ে যেত বিয়েবাড়ি বা পৈতেবাড়ির লোকেরা। যেদিকে দেখা যায়, সারি সারি সবুজ কলাপাতা সাজানো। তার ওপর একদিকে কোনায় একটা লাল মাটির গ্লাস। আর একটা লাল মাটির খুরি। গ্লাসে জল দিয়ে যেত লোকেরা সোনালি পেতলের গাড়ু থেকে। সবুজ পাতার সবুজ রঙ ঢেকে যেত সাদা রঙের ভাত, আর তারপর ডাল, মাছের ঝোল, আর মাংসতে। হালকা সবুজ পেঁপের চাটনি, সাদা রঙের রসগোল্লা, সাদা রঙের দই, লালচে বাদামি পাঁপড়ভাজা, আর শেষে সবুজ রঙের পান। ছোট ছিলাম, তখন খেতেও খুব ভালোবাসতাম বিয়েবাড়িতে। কেই বা না বাসে? আর আমাদের বাড়ি তো আমার মা’র রান্না লেগেই আছে। বন্ধুরা আসছে, খাচ্ছে কারণে অকারণে।

আমার জন্মদিনে। আমার বোনের জন্মদিনে। ভাইফোঁটায় এসে খাচ্ছে আমার মামারা। আর আসছে আমার নানা রকম কাকা, কাকিমা, বাবারবন্ধুরা, আত্মীয়স্বজন। আমাদের বাড়িতে নিজেরা যা খেয়েছি, অন্যদেরও তাই খেতে দেখেছি। বিলাসিতা করার অবস্থা আমাদের ছিল না, কিন্তু কেউ খাবার সময়ে এসে না খেয়ে চলে যাবে, এ কখনো হয় নি।

বাঙালির বাড়িতে এই রকমই দস্তুর ছিল। দুই বাংলাতেই তাই ছিল।

সবুজের সমারোহ আর একটা জায়গায় ছিল। তা হল আমাদের মানিকতলা বাজার। যেখানে আমি ক্লাস সিক্স সেভেন থেকে চিরকাল দোকান বাজার করেছি। বাবা সেই ঊষা সেলাই মেশিন কারখানায় চাকরি পাবার পর থেকেই আমার ওপর পড়েছিল সংসারের যাবতীয় কাজ করার ভার। দোকান, বাজার, রেশন, কয়লা, কেরোসিন, কাঠ। কোথায় শস্তায় পাউরুটি পাওয়া যাচ্ছে যুদ্ধের বাজারে। কোথায় ধোঁয়াহীন কয়লা পাওয়া যাচ্ছে কম দামে। কখন রেশনের দোকানে লাইন সবচেয়ে কম। মানিকতলা বাজারে সর্ষের তেল পাওয়া যাচ্ছে না। চলে যাও হাতিবাগান বাজারে। শুনেছি সেখানে একটা দোকানে রেশনে তেল বিক্রি হচ্ছে। এক ঘণ্টা কি দেড় ঘণ্টা লাইন দিলেই সর্ষের তেল আর কেরোসিন তেল, দুটোই এক জায়গাতেই পাওয়া যাবে।

মানিকতলা বাজার ছিল অতএব আমার দৈনন্দিন বিচরণক্ষেত্র। এবং সবুজের সঙ্গে আমার শহর কলকাতার কিশোর ছেলের সেই প্রথম পরিচয়। সবুজ শাকসবজি—উচ্ছে পটল লাউ পেঁপে। কলমি শাক, পুঁই শাক। পালং শাক, পিড়িং শাক। সংসার বাবুর মা চেয়েছেন। নাঃ, সংসার বাবুর মা নয়। চেয়েছে আমার মা। আমাদের সামান্য সংসারের সামান্য চাহিদা। আর পিড়িং শাক সহজ পাঠেই শুধু পড়েছি। কাকে বলে কোনোদিন জানলাম না। কিন্তু, সবুজ রঙ কেন এত ভালো লাগে এখনো?

কে জানে, আমাদের বাঙালিদের চোখে সবুজ বোধহয় সবচেয়ে সুখ দেয়, শান্তি দেয়। তাই হয়ত। আর নয়ত সেই মানিকতলা বাজারে রোজ রোজ সবুজের সঙ্গে মেলামেশার স্মৃতি। হাতে নিয়ে চোখের সামনে সবুজকে পরখ করার সেই বহু পুরোনো অভ্যেস।

বাংলাদেশের বনে বনে, গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা আরো অনেক পরের। তখন আমি কলেজে। তারপর ইউনিভার্সিটিতে। বৃষ্টিভেজা দুপুরে আমরা কয়েকজন বন্ধু বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে বেরিয়ে আন্দুল মৌরিগ্রাম জনাই রোড, আর মোল্লার দৌড় এক্সকারশনে মুর্শিদাবাদ বহরমপুর কাশিমবাজার।

প্রতাপ, আমি, সনৎ, আর প্রণয়। সনৎ আর প্রণয় স্মৃতির মধ্যেই রয়ে গেছে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে। প্রতাপ কলকাতায় আছে দিব্যি ওর সংসারকে নিয়ে। ভালো থাকুক ওরা। সুখে থাকুক।

(স্থগিত)

About Author

সাম্প্রতিক ডেস্ক
সাম্প্রতিক ডেস্ক