page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

সৌরভের মা এবং ভাবি সম্প্রদায়

সৌরভের মায়ের মেজাজ খুব খারাপ থাকত। সব সময় না, তবে প্রায়ই।

আমরা টের পাইতাম কারণ আমাদের রান্নাঘরের ঠিক দক্ষিণে একমাত্র জানালাটা দিয়া সৌরভের মায়ের গলার আওয়াজ আসত।

ঐখানে উনার রান্নাঘর। কিন্তু ভদ্রমহিলারে কোনো দিন দেখি নাই। ৩৯/১ বাঘমারা রোডের ‘কবির ভিলা’ নামের যে বাড়ির পাঁচতালায় আমরা থাকতাম তার পরের বাড়িটার পাঁচতালায় সৌরভের মা থাকতেন।

হয়ত এখনো থাকেন। উনার সঙ্গে পরিচয় হয় নাই কারণ উনার রান্নাঘরের জানলাটা আমাদের রান্নাঘরের জানলার থাইকা এক হাত তফাতে। উনার গলার স্বর শুনলেও উনারে দেখা যাইত না।

ganga-3-d

বাঘমারা বাসার এই রুমের জানলা দিয়া সৌরভের মায়ের বাসা দেখা যাইতো। – লেখক

প্রায়ই অফিস যাইবার সময় বাসার গেইট দিয়া বাইর হইতে গিয়া কোনো ভদ্রমহিলারে পাশের বিল্ডিং-এর দিকে যাইতে দেখলে মনে হইত, ইনিই কি সৌরভের মা?

উনার উচ্চস্বরে বলা কথাবার্তা থাইকা জানতে পারছিলাম যে উনার ছেলের নাম সৌরভ। উনি প্রায়ই রানতে রানতে সৌরভরে ডাকাডাকি কিংবা বকাবকি করতেন।

umme-farhana-logo

আমি কয়েকবার তন্ময়ের সঙ্গে ঝগড়াঝাটি কইরা ব্রাহ্মপল্লিতে আমার মায়ের বাসায় চইলা আসছি। তখন একা বাসায় তন্ময়ের একমাত্র সঙ্গী ছিল সৌরভের মায়ের গলার স্বর। তখন আমাদের টিভি ছিল না, বাসায় ব্রডব্যান্ডের লাইনও ছিল না। সৌরভের মায়েরে আমরা ভাবি কইয়া ডাকতাম।

ভাবি ডাকার কারণ হইল বাসা ভাড়া নিতে গিয়া দেখছিলাম বাড়িওয়ালার স্ত্রী আমারে নাম না জিগায়া ভাবি ডাকতেছেন। বিবাহিত মহিলাদেরে ভাবি ডাকার দস্তুর আগেই দেখছি মেয়েরে ইশকুলে ভর্তি করতে গিয়া। সেইখানে সকল বাচ্চার গার্জিয়ান পরস্পরেরে ভাবি সম্বোধন করেন।

আমি কারো লগে আলাপ হইলে নাম জিগাইতাম আর নাম ধইরা বা আপা কইয়া ডাকতাম। কিন্তু আর সকল গার্জিয়ানেরা একে অপরের নাম জানতেন না। একজন সম্পর্কে কথা কইতে গেলে আরেকজন কইতেন, ‘দীপিতার মা বৌদি’ কিংবা ‘অহনার মা ভাবি’।

এদের সকলেই যে হাউজ ওয়াইফ তা কিন্তু না। অহনার মা জিলা ইশকুলের টিচার। কিন্তু উনার নাম কেউ জানে না। সন্তানের ইশকুলে উনি শুধুই অহনার মা।

আমার মেয়ে প্রকৃতিরে চার বছর বয়সে ইশকুলে ভর্তি করাইছিলাম ২০১১-তে। তার আগের বছর আমি মাস্টার্স পাশ করছি। ভাবি ডাক শুনতে আমার অস্বস্তি হইত বইলাই আমি নাম ধইরা বা আপা কইয়া ডাকার চেষ্টা করছিলাম।

প্রকৃতির স্কুলের পিকনিকে ভাবীদের দুইজন, এদেরেও আমি নাম ধইরা ডাকতাম কারণ বামের জন আমার কাজিনের বন্ধু আর ডানের জন ওর জা। - লেখক

প্রকৃতির স্কুলের পিকনিকে ভাবীদের দুইজন, এদেরেও আমি নাম ধইরা ডাকতাম কারণ বামের জন আমার কাজিনের বন্ধু আর ডানের জন ওর জা। – লেখক

তেমন লাভ হয় নাই। ইশকুলের সামনে বাচ্চার জন্যে অপেক্ষা করা মহিলারা ভাবি ডাকেই স্বচ্ছন্দ আর এইটার অস্বাভাবিকতা নিয়াও কারো মনে কোনো প্রশ্ন নাই। উনাদের কাছে এইটা অস্বাভাবিকও না। ভাই দিয়া ভাবির লগে সম্পর্ক, যে ‘ভাই’রে কেউ চিনে না, চোখেও দেখে নাই সেই অদৃশ্য ভাইয়ের বউরে ভাবি ডাকার ব্যাপারটা যে অস্বাভাবিক হইতে পারে তা কারো মাথায় আসে নাই।

আমি নিজে তখন সিঙ্গেল মাদার ছিলাম বইলা হয়ত আমার মনে আসছিল। উনাদের “জানেন না তো ভাবি”, “আর বলবেন না ভাবি…”, “আরে ভাবি, আপনার ভাই তো কালকে…” ইত্যাদি দিয়া শুরু করা গল্পে আমি যোগ দিতে পারতাম না।

ভাই সংক্রান্ত আলাপ শুরু হইবার ভয়ে চুপ কইরা থাকতাম। “ভাই কী করেন ভাবি?” জিগাইলেই তো আমার জন্যে মুশকিল হইয়া যাইত।

বাড়ি ভাড়া করতে গেলে অবশ্যই একজন দৃশ্যমান ভাইয়ের অস্তিত্ব অবশ্যম্ভাবী। তাই ভাবি ডাক সেইখানে তেমন অস্বাভাবিক না। সৌরভের মায়ের লগে আমার পরিচয় থাকলে হয়ত উনারে আমি ভাবিই ডাকতাম, উনিও আমারে তাই ডাকতেন। এইজন্যেই উনি আমাদের নিকটতম ভাবি ছিলেন। বাড়িওয়ালা তিনতালায় থাকতেন, বাড়িওয়ালা ভাবির লগে মোলাকাত কম হইতি। সৌরভের মায়ের লগে সাক্ষাৎ না হইলেও উনার দৈনন্দিন জীবন আমরা জানতাম। শুধু রান্নাঘর না, আমাদের খাবার ঘরের দক্ষিণের জানলা খুললেও উনাদের বাসার জানলা দেখা যাইত। তাই আমরা পর্দা সবসময় টাইনা রাখতাম। কিন্তু কথাবার্তা শুনতে পাওয়া যাইতই। অবশ্য উনি টিভিতে বাংলা সিরিয়াল দেখেন না হিন্দী সিরিয়াল দেখেন সেইটা জানতাম না।

তবে ভাবি সম্প্রদায় মানেই সিরিয়াল দেখবেন এইটা ধইরা নেওয়াও এক পদের স্নবারি। অনেক কর্মজীবী মহিলারাও সিরিয়াল দেখেন, অনেক পুরুষেরাও দেখেন। কিন্তু আমরা যারা তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত নারী তারা ধইরাই নেই যে সিরিয়াল হইল হাউজওয়াইফ তথা ভাবিদের জন্যে বানানো জিনিস। আমার স্কুলের এক বান্ধবী ডাক্তার, সরকারি মেডিক্যালে চাকরি করেন, সামনে এফসিপিএস পরীক্ষা, তবু সন্ধ্যায় একটা সিরিয়াল খুব মনোযোগ দিয়া দেখেন।

ভাবিরা সকলে সিরিয়াল দেখেন এইটা যেমন সত্যি না, ভাবিরা সব সময় “হুইল ছাড়া আমাদের একদিনও কী চলে?” জাতীয় আলাপ করেন সেইটাও ঠিক না। উনারা অনেকে টিনেজার মেয়েদের মতন ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’ পালন করেন, অনেকের ব্যবসা আছে, শাড়িকাপড় কিন্যা ব্লক বাটিক করায়া বিক্রি করা জাতীয় ছোট বিজনেস।

শিল্পী আপা আর তার মেয়ে রায়া। - লেখক

শিল্পী আপা আর তার মেয়ে রায়া। – লেখক

তবে ভাবিরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেন সেইটা ঠিক। আমার মেয়ে প্রকৃতির স্কুলে প্রথম দিন যে ভদ্রমহিলার সঙ্গে আমার সখ্য হয় তার নাম শিল্পী। শিল্পী আপা একটা ফিশারি কলেজের শিক্ষক, উনার কলেজ শম্ভুগঞ্জে। একদিন উনার ক্লাস ছিল না। আমরা দুইজন হাঁটতে হাঁটতে অনেকদূর গেলাম। বাসায় গিয়া আসার সময় পাওয়া যাইত না, ইশকুল তখন আটটায় শুরু হইয়া দশটায় শেষ হইত। আমি একটা চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়াইয়া কইলাম, “আপা চলেন চা খাই”। উনি কইলেন, “তুমি খাও, আমি খাবো না। আমার শ্বশুরবাড়ির কেউ দেখলে আবার কথা হবে।” আমি আর একা একা চা খাইলাম না।

ভাবিদের অনেকে আবার লেখাপড়ার ব্যাপারে খুব সিরিয়াস। একদিন ইশকুল থাইকা ফিরা আসার সময় অটো রিকশায় এক মহিলা আমারে জিগাইলেন আমার বাচ্চা কোন ক্লাসে পড়ে। ক্লাস টু শুইনা কইলেন “ক্লাস টেস্টে কত পাইছে?”

আমি জিগাইলাম, “কবের ক্লাস টেস্ট?”

উনি আমার দিকে অত্যন্ত বিরক্ত হইয়া তাকাইয়া কইলেন, “বুধবারে যে ড্রইং ক্লাস টেস্ট হইল?”

আমি মেয়ের টেস্ট হইছে তা-ই জানি না, কত পাইছে কেমনে কমু?

উনি বিরক্তির চোটে আর কথাই কইলেন না। আমার মেয়েরে উনি চিনেন না, ইনফ্যাক্ট সে ছেলে না মেয়ে তাই জানেন না। কিন্তু ক্লাস টেস্টের নম্বর জানতে চাইলেন কী কারণে? নিজের বাচ্চার পাওয়া নম্বরের লগে তুলনা করার জন্যে নিশ্চয়ই।

আরেকজন ছিলেন যিনি আমারে হাতকাটা জামা না পরার উপদেশ দিছিলেন। ভালো বুইঝ্যাই দিছেন, আমার জামাকাপড় লইয়া কেউ আড়ালে নিন্দা করুক এইটা উনি চান নাই। এই মেয়েরেও আমি নাম ধইরা ডাকতাম, তার আর আমার এসএসসির বছর এক।

আমার ছাত্রজীবনের পোশাক হজম করা ভাবীদের জন্য কষ্টকর হইত। - লেখক

আমার ছাত্রজীবনের পোশাক হজম করা ভাবীদের জন্য কষ্টকর হইত। – লেখক

তবে ‘দীপিতার মা’ কিংবা ‘রোদসীর মা’য়ের নাম আমি এখনো জানি না। উনাদের ফোন নম্বর নেওয়ার সময়ও উনারা নিজের নাম বলেন না। নিজের বাচ্চার নাম বলেন।

এইটা কেন করেন তা আমি জিগাই নাই। হয়ত নামের দরকার ভাবি পরিচয়ের নিচে চাপা পইড়া গেছে। কিংবা অতটা জটিল কইরা উনারা ভাবেনও না। যেইভাবে পরিচিত হইলে সহজ হবে সেইভাবে পরিচিত হইতে চান।

আমার না দেখা ভাবি সৌরভের মায়ের মতন এই রোজ দেখা হওয়া নাম না জানা ভাবিদেরেও খুব আপন মনে হয়। কিন্তু বাইরে থাইকা উনাদের জীবনের কোনো জটিলতা বা সমস্যা আমি অনুমান করতে পারি না (নিজে থাইকা যতক্ষণ না জানাইতেছেন), বাইরে পরার শাড়ি বা জামা পরিহিত এই নারীদের ভেতরটা দেখতে পাই না।

সৌরভের মায়েরে দেখতে না পাইলেও উনার জীবনটা আমি দেখতে পাইতাম। উনার কী কারণে মেজাজ খারাপ তা জানতে পাইতাম। উনি কী মশলা দিয়া রানতেছেন তার গন্ধও পাইতাম। না দেখা সৌরভের মা সারাদিন বর্ণে না হইলেও গন্ধে ছন্দে গীতিতে বিরাজমান থাকতেন।

পড়ুন: উম্মে ফারহানা’র ধারাবাহিক উপন্যাস ‘লৌহিত্যের ধারে’—শুধু সাহিত্য ডটকমে।

About Author

উম্মে ফারহানা
উম্মে ফারহানা

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। ইংরেজি সাহিত্য পড়ান। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন ২০০৩ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত। জন্ম ময়মনসিংহ শহরে, ৬ অক্টোবর ১৯৮২। প্রকাশিত গল্পগ্রস্থ: দীপাবলি। shahitya.com-এ ধারাবাহিক উপন্যাস লিখছেন: লৌহিত্যের ধারে।