page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

স্যার

শিক্ষকদের কান ধরানোমূলক শাস্তির উপর আমার কোন ক্ষোভ নাই। এমন না যে আমার টিচার আমাকে কখনো কান ধরান নাই।

কান ধরাইলে কানে সুড়সুড়ি লাগে, আর তাই আমার তখন খুবই হাসি পায়। এবং এই শাস্তি আমি খুবই পছন্দ করতাম। আমার আনন্দ হইত, আর আরো বেশি আনন্দ হইত যখন একজন আরেকজনের কান ধরে দাঁড়াইয়া থাকতাম।

তাই আমাকে সবচেয়ে বেশিদিন পড়াইছেন যে স্যার, মিঠু স্যার তিনি কিন্তু আমারে কখনো কান ধরাইতেন না। ধরাইতেন, নাক। এবং নাক ধরে দাঁড়ায়ে থাকা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে লজ্জাকর শাস্তি।

আমি স্যারের কাছে পড়া শুরু করছি ক্লাস ফোরে। এবং কলেজ লাইফ পর্যন্ত পড়ছি। স্যার পড়াইতেন ডিগ্রির ইংলিশ। আমি ডিগ্রি ক্লাশের সাথে ইংরেজি পড়া শুরু করি। আমার বোন ও তার বান্ধবীরা মিলে প্রথম স্যারের কাছে কলেজের ব্যাচে পড়া শুরু করে। আমি ওদের সাথেও পড়তাম। মানে সকাল থেকে যত এইচএসসি, ডিগ্রি ক্লাশের ইংরেজি ক্লাশ হইত, সব ক্লাশে আমি পড়তাম। এবং সবসময়ই সবার চেয়ে ভালো করতাম প্রাইমারি ক্লাশের আমিই।

logo paromita

আমি আসলে স্যারের বাসাতেই থাকতাম। সেখানে ঘুমাতাম। খাইতাম। নাচতাম। গান গাইতাম। স্যারের যখন বিয়ে হয় নাই, তখন তার রুমমেটদের নয়নের মণি ছিলাম আমি। আইসক্রিম, চকলেটের অভাব হইত না।

স্যার যখন বিয়ে করল, তখন আমার স্যারি, মানে স্যারের বউয়ের পিছে পিছে সারাদিন থাকতাম আমি। ঢাকার মেয়ে চট্টগ্রামের লোকদের ভাষাই তো বোঝে না। আমি ছিলাম তার এক নম্বর অ্যাসিস্ট্যান্ট। স্যারের চেয়েও বেশি আমার সাথেই ছিলো তার সংসার।

মুশকিল হইত আরেক জায়গায়। ভাইয়া আপুদের সাথে পড়ি। তাই ওরা যখন আমার কাছ থেকে দেখতে চায়, আমি তো আর না বলতে পারি না।

একদিন দেখাইতে গিয়ে স্যারের কাছে হাতেনাতে ধরা পড়ে গেলাম। তারপর স্যার আমাকে নাক ধরে দাঁড় করায়ে রাখলেন।

সবাই হাসল। আমার সজারুর মত খাড়া খাড়া চুল আরো খাড়া হয়ে গেল। নাকের ডগা অপমানে ফুলে গেল। আমার মান অপমান জ্ঞান তখন এত টনটনে যে চোখের কোণায় পানি চলে আসা সত্ত্বেও এক ফোটা পানিও আমি পড়তে দিলাম না। দৌড়ে বাসায় চলে আসলাম।

২.
এক সপ্তাহ ধরে পড়তে যাই না। আমার দিদি এসে বলে, স্যার যেতে বলছে। আমি মুখ বাঁকায়ে বলে দেই, উনাকে বলে দিও আমি আর যাবো না।

আমি সত্যি সত্যি যাই নাই। পাড়ায় পাড়ায় টো টো করার অভ্যাস ছিল। স্যারের বাসা যেদিকে ওদিকে ঘুরাঘুরি করাও বন্ধ করে দিলাম।

সাত দিন পর স্যার আমাদের বাসায় আসলেন। সাথে একটা অসম্ভব সুন্দর ছোট্ট আর রাগী চেহারার পুতুল বিড়াল। (আমাকে বিলাই ডাকত অনেকেই)।

স্যার, ওইটাই হইল আমার জীবনে পাওয়া সবচেয়ে সুন্দর উপহার। বাসা বদলের সময় যখন ওইটা হারায়ে গেল, আমি এত কষ্ট পাইছি, আর কোনো কিছু হারায়ে এত কষ্ট পাইছি বলে মনে পড়ে না।

paromita-h-6

পারমিতা হিম, এসএসসি পরীক্ষার্থী। ছবি. সাজ্জাদ হোসেন জামী ২০০৫

যাই হোক, স্যার এসে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কেন পড়তে যাই না! আমি চুপ করে থাকলাম। শেষে বললাম, আমার অপমান লাগছে তাই আমি আর যাব না। আপনি কান ধরাইতেন, নাক ধরে দাঁড় করায়ে রাখলেন কেন? আমাকে দেখে হাসলেন কেন?

স্যার তখন নিজের নাক ধরে আমাকে বললেন যে আর কোনোদিন আমাকে নাকে ধরাবেন না। এই শর্তে আমি আবার পড়তে যেতে নিমরাজি হলাম।

কিন্তু গেলাম না। মান সম্মান একটু কমে যাওয়ার পর আবার যাওয়া শুরু করলাম।

তার মানে এই না যে এতগুলা বছরে উনি আমাকে আর নাকে ধরান নাই। অসংখ্যবার ধরাইছেন।

আচার খেয়ে উনার খাটের চিপায় বিচি ফেলে ফেলে আবর্জনার স্তুপ করে ফেলছিলাম (আমি একা করি নাই)। সব কিছু—চিপস, চকলেট, পাখির ডিম সব কিছুর প্যাকেট ওখানে ফেলে দিতাম। স্যারের বুয়া যখন একদিন ঝাড়ু দিয়ে সব ময়লা বের করে দেখালেন, তখন স্যার আমাকে নাক ধরে দাড় করায়ে রাখলেন দরজার বাইরে।

এছাড়া, বিশৃংখলা সৃষ্টির অভিযোগে কত শাস্তি আমি পাইছি! কেরাত বেতের মাইরও খাইছি। এবং কতবার পালায়ে গেছি। অভিমান করে আসি নাই। স্যারকে ত্যাগ করছি। স্যার আবার বাসায় এসে বুঝায়ে সুঝায়ে অভিমান ভাঙ্গাইছে।

আবার বাসা থেকেও অনেকবার পালায়ে গেছি আমি। মা মারত, রাগ করে বাসা থেকে চলে যেতাম। কই আর যাব! ঘর থেকে দুই পা ফেলিয়া স্যারের বাসা, সেখানেই থেকে যেতাম। তিন চার দিন পর বাবা এসে বুঝায়ে সুঝায়ে নিয়ে যাইতেন আবার বাসায়।

৩.
নয় বছর স্যারের কাছে পড়ছি, কোনোদিন স্যার এক টাকা নেন নাই। আমি ছিলাম স্যারের সর্বকালের সর্বপ্রিয় স্টুডেন্ট। এবং স্যারের কোচিং-এর সব বিদায় অনুষ্ঠানের উপস্থাপক। নাচতামও আমি, গাইতামও আমি। কবিতাও পড়তাম। এগুলা আমার জীবনকে কত আগাইছে, আমার সমসাময়িক যে কোনো মেয়ের সাথে তুলনা করলেই বোঝা যায়।

স্যার, ভাবছিলাম কোনো একদিন এই সব স্মৃতি আমার বইয়ে লিখব। আজকে এখানেই লিখে ফেললাম। আপনার সাথে পরিচয়ের শুরুতে একটা শয়তানি করছিলাম। আজকে সবার সামনে সেটা স্বীকার করেই ফেলি।

mithu-ahmed-1

আমার স্যার মিঠু আহমেদ।—লেখক

আমার মহাসুন্দরী বোনের অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে তার কোচিং-এ গিয়ে বসে থাকতে হইত। আমি তখন ফোরে পড়ি। মিঠু স্যার একদিন কাকে যেন বাসার ঠিকানা দিচ্ছেন। কথায় কথায় শুনলাম, তার বাসা আমাদের এলাকাতেই। বাসার সামনে নীল গেইট আর একটা পেঁপে গাছ আছে।

আমার খুব টো টো করার অভ্যাস ছিল। পরদিন দুপুরে গলিতে ঘুরতে ঘুরতে স্যারের সেই পেঁপে গাছওয়ালা বাসা খুঁজে বের করে ফেললাম। গেইট খুলে ভেতরে গিয়ে দেখি বাসার দরজা বন্ধ। জানালা খোলা।

উকি দিয়ে দেখলাম, স্যার একটা নীল গেঞ্জি আর বার্মিজ লুঙ্গি পরে ঘুমাচ্ছেন। ঘরে একটা ওয়ারড্রব, একটা টেবিল, একটা খাট আর জুতা রাখার তাক। তারপর বাইরের পেঁপে গাছটা ভালো করে দেখলাম। ৪টা পেঁপে ধরে আছে।

পরদিন বিকালে কোচিং এ গিয়ে খুব ভাব নিয়ে স্যারকে বললাম,স্যার আপনাকে আমি স্বপ্নে দেখলাম কালকে। আপনি নীল গেঞ্জি আর বার্মিজ লুঙ্গি পরে ঘুমাচ্ছেন। আর আপনার রুমে একটা ওয়ারড্রব, একটা টেবিল। আর আপনার বাসার সামনে একটা পেঁপেগাছ, সেখানে চারটা পেঁপে।

স্যার হা হয়ে গেলেন! চিৎকার করে সবাইকে বললেন, আল্লাহ, আমার বাসা তো হুবহু এরকম! কী চমৎকার! কী অদ্ভুত!

আমার দিদি কিন্তু আমার শয়তানি ঠিকই বুঝল। কিন্তু আমার কাছে তার নানা গোপন কথা বন্ধক থাকায়, চোখের ইশারাতেই তাকে ব্ল্যাকমেইল করে ফেললাম আমি। সে একটা কথাও বলল না। স্যার আমাকে উনার ডিগ্রী ব্যাচে পড়তে বসায়ে দিলেন।

সেই শুরু!

স্যার, আমার সেই মিথ্যা কথার জন্য আমি আবার নাকে ধরতে রাজি আছি কিন্তু।

About Author

পারমিতা হিম
পারমিতা হিম

লেখক ও সাংবাদিক; এখন সময় টেলিভিশন, ঢাকা, বাংলাদেশে কর্মরত।