page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব
লাইফস্টাইল

স্লিপ

বছর পাঁচেকের বেশি উত্তরা থাকবার পর আমি পাঁচ বছর আগের বউয়ের সঙ্গেই যে আদাবর চলে আসি, তার প্রধান, প্রায় একমাত্র কারণ আমার শ্বশুর-শাশুড়ি। তাঁরা আমাদের বলেন নি কাছেপিঠে আসতে। কিন্তু আসলে তাঁদের ও আমাদের সকলেরই মানসিক শান্তি ঘটবে বলে একটা আন্দাজ কাজ করছিল। সেটা ঠিকই ঘটেছে। আদাবর আসা, ঢাকার মধ্যকার পদমর্যাদা বিবেচনায়, পরিস্থিতির অবনয়ন হিসেবে দেখা চলে। তবে সেসব নিয়ে দুর্ভাবনা নয়, যেকোনো নতুন জায়গায় গেলে আমার ভাবনা হয় আশপাশের পরিষেবা সম্প্রদায়কে চিনে উঠবার বা যোগাযোগ ঘটাতে পারার ঝামেলা নিয়ে।

মধ্যবিত্ত চাকুরিজীবী হিসেবে একটা নতুন এলাকায় বাসায় নেয়া মানেই হলো আপনার নানান পরিষেবার লোককে নতুন করে খুঁজে বের করতে হবে। তাঁদের সঙ্গে কাজ চালানোর মতো একটা যোগাযোগ গড়ে তুলতে হবে। পানি সারাইয়ের মিস্ত্রি, বিদ্যুৎ সারাইয়ের মিস্ত্রি, কাঠের ভেঙে যাওয়া পুরান জিনিস মেরামতি করে দিতে পারেন এমন মিস্ত্রি এঁরা তো আছেনই। কখনো কখনো লেপ-বালিশের কারিগর চেনাও জরুরি হয়ে দাঁড়ায়। হাজার হলেও শীতকালে এই আলাপ করছি। এসব বর্গ ছাড়াও রয়েছেন মুদির দোকান যেখানে পাঁউরুটি-ডিম-বিস্কুট কিনতে পারা যায়। সেলফোনে বিল দিতে পারার ফ্লেক্সিমানব। সেটা ঠিক দোকান না হয়ে রাস্তার পাশে চেয়ারটেবিলও হতে পারে। সারাক্ষণ উচ্ছেদ হতে-থাকা সিগারেটের দোকান যেখান থেকে আসাযাওয়ার পথে সিগ্রেট কিনে ফেলা যায়। আর আছে লন্ড্রি বা কাপড় ধোলাই/ইস্ত্রি করবার দোকান।

manosh chy logo

লন্ড্রির দোকানে ধোলাই করা আরা ইস্ত্রি করার কাজের মধ্যে কোনটা কখন করা হবে সেটাও সুগভীর চিন্তার বিষয়। মানে সুচিন্তিত পরিকল্পনা করেই করতে হয়। এটা সাংসারিক বাজেটের প্রশ্ন। যেমন ধরা যাক, ইস্ত্রি করা হবে প্রায় যে কোনো জিনিস। কিন্তু ধোলাই হতে পারে শীতের শেষে জ্যাকেট কিংবা পুলওভার, খুব ঝামেলাজনক মাপের পর্দা, অসুতি শাড়ি ইত্যাদি। সারাংশ হলো, পাড়ার নানাবিধ পরিষেবাকেন্দ্রের মধ্যে লন্ড্রি অত্যন্ত নৈমিত্তিক একটা জায়গা। প্রতি সপ্তাহেই এক বা একাধিকবার কিছু না কিছু ইস্ত্রি করতে সেখানে দেয়া হয়। রাতে বন্ধ হবার আগে, কিংবা পরের দিন সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরবার পথে সেগুলো নিয়ে আসা হয়। এই মোটামুটি ব্যবস্থা উত্তরা বা আদাবর নির্বিশেষে।

এই পাড়ায় আসবার পর আবিষ্কার করা গেল যে একদম খুব নিকটেই দুইটা লন্ড্রি আছে। এই দুইটার মধ্যে কদম হিসেব করলে অপেক্ষাকৃত কাছে যেটা সেটা যাতায়াতের পথে পড়ে না, পিছন দিকে। অন্যটা বাসা থেকে শহরের অন্য কোথাও যাবার জন্য যে পথে রিকশা খুঁজতে হয়, সেই পথে পড়ে। ফলে কয়েকটা মাত্র কদম বেশি হলেও এটাই সুবিধাজনক বাছাই। এদুটো বন্ধ থাকলে খানিক বেশি হেঁটে আরও কয়েকটার নাগাল পাবার জরিপও আমার করা হয়ে গেছিল। প্রথম দিনেই সুবিধাজনক লন্ড্রিতে কিছু কাপড় দেবার পর যখন স্লিপ চাইলাম, এর দোকানি মহিলা জানিয়ে দিলেন “স্লিপ লাগবে? আমি তো আপনাকে চিনা নিলাম। চাইলেই হবে।” আমার নিরাপত্তাহীন মনের খোঁজ তাঁকে আর জানাতে ইচ্ছে হলো না কিছুতেই। ফলে মনের মধ্যে শতেক মোচড়ামুচড়ি সমেতই আমি মুখে একটা কাজ-চালানো হাসি বজায় রেখে চলে এলাম।

বিষয়টা বেশ ভাবানোর মতো। পরিচিত হয়ে গেলে স্লিপ বা রশিদ না-দেয়া বা না-চাওয়া বাংলাদেশে সাধারণ অনুশীলন। কিন্তু শুরুর দিনেই এরকম আচরণ বেশ ভাবানোর মতো। একথা ঠিকই যে এই মহিলার সঙ্গে আমার কাপড়গুলো গছানোর আগে খানিক সময় আগর-বাগর গল্প হলো, আমার যা আকছারই হয়। তাঁর দোকানেও আরও দু’তিন জন খদ্দের ছিলেন। তাঁদের দেনাপাওনা ঠিকঠাক বুঝিয়ে দিতে একটু সময় লাগল কর্মচারিদের। সেই সময়টা আমি এই মহিলার সঙ্গে গল্প করেই কাটালাম। তারপরও ওই কয়মিনিটের আলাপকে ঠিক পরিচয় সম্পন্ন হয়েছে ধরে নেয়া কঠিন। বিশেষত, আমি পয়লা দিনের খদ্দের বলে।

এই দোকানের মহিলাকে ব্যবস্থাপক বা ম্যানেজার বলা চলে। তিনি, হয়তো মধ্য তিরিশ, একটা ওড়না দিয়ে মাথা জড়িয়ে রাখেন অবগুণ্ঠনের মতো, একটা হাসিমাখা মুখ। তিনি বসেন যে টুল বা চেয়ারের মতো বস্তুটাতে তার ঠিক সামনেই সেলাইয়ের পা-চালানো একটা মেশিন। সেই মেশিনটাতে তিনি কাজ করেন। ঠিক কী কী সেলাই করেন তার তালিকা বলা এই কয় মাস পরেও আমার জন্য কঠিন। হয়তো তাঁর হাসিমুখের মধ্যে এমনকিছু আছে যে মুখ আর মেশিন ছাপিয়ে তাঁর বিস্তারিত কর্মকাণ্ড পর্যন্ত চোখ বা মনোযোগ কিছুই আমার যায় নি। তিনি লাগাতার কিছু না কিছু করেন।

মেশিনের কর্মকাণ্ডের বাইরে তাঁকে মাঝেমধ্যে অ্যাকাউন্ট্যান্টের ভূমিকায় দেখা যায়। অর্থাৎ আগত বা বিদায়ী খদ্দেরের টাকাপয়সার বিনিময় তাঁকে দেরাজ খুলে করতে দেখা যায়। এর বাইরে তাঁকে আয়রন হাতে করতে বা পোশাক ভাঁজ করতে কদাচিৎ দেখা গেছে বলে আমার স্মরণ হয় না। তিনি ইস্ত্রির দোকানের ব্যবস্থাপক হিসেবে একদমই নন-প্লেইং ক্যাপ্টেন। খুবই বিরল বিষয়টা। এমনকি এই দোকানে নানাবিধ মোবাইল নেটওয়ার্কে ফ্লেক্সিও করা হয়। বলাইবাহুল্য, আমার জন্য খুবই খুশির উপশাখা। সেই কাজটাতেও তাঁকে দেখা যায় না, ইস্ত্রির লোকজনই বাড়তি দায়িত্ব হিসেবে সেটা করে থাকেন।

বলছিলাম বিরল ব্যবস্থাপকের কথা। ঢাকা শহরের অগুনতি লন্ড্রিতে যাঁরা ব্যবস্থাপক তাঁরা খোদ নিজে লন্ড্রির কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রায় কোনো ব্যতিক্রম ছাড়া। লন্ড্রির কাজ বলতে ন্যূনতম ইস্ত্রি চালানোর কাজ আর স্লিপ লেখার কাজ। ধোলাই ও আনুষঙ্গিক কাজগুলোর বেলায় জব-ডেস্ক্রিপশন যদি ভিন্নও হয়, ব্যবস্থাপকের পক্ষে এটুকু করা একদম বিধিসম্মত ও প্রচলিত। শুধু লন্ড্রি কেন, পাড়ায় পাড়ায় (পুরুষ) চুল-কাটাই দোকান বা সেলুনেরও এরকম ব্যবস্থাপনা। খুব নিরীখ করে ভাবলে এমনকি বিদ্যুৎ-পরিষেবার দোকানগুলোতেও এমত চল। তবে ব্যবস্থাপক বলতে আবার এক বিশাল চেইনের সিইও ভেবে বসলে বিপদে পড়ব আমি। এখানে ব্যবস্থাপক বলতে ওই খুদে ব্রাঞ্চখানার ব্যবস্থাপক কাম ক্যাশিয়ার কাম অ্যাকাউন্ট্যান্ট বোঝাচ্ছি। এগুলোর মালিক কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা বস্তু। তা সে ভবনের মালিক হোন, বা দোকানের মালিক বা ভবনমালিক থেকে যিনি ভাড়াকারী।

ক’দিনের ঘোরাঘুরি, জামাকাপড় দেয়াদেয়িতে আমি বুঝলাম যে অদৃশ্য মালিকের অন্তত তিনখানা লন্ড্রি এই আশপাশেই রয়েছে। একটা তো এটা যেখানে এই হাসিমুখ সেলাইমেশিনওয়ালি ব্যবস্থাপক মহিলা, যিনি নিজে ইস্ত্রির কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। আরেকটি সেটি যেটা কাছে হলেও আমার উল্টোপথে পড়ে। আরো একটা আছে বাজারের দিকে। এই বোঝাবুঝিটা সহজ হয়েছিল কারণ প্রায় প্রতিদিনই ইস্ত্রিওয়ালারা ভিন্ন ভিন্ন হয়ে পড়েন। তাঁদের কুশল জানতে মহিলাকে জিজ্ঞেস করাতে জানতে পারি ওঁরা সেদিন অন্য ব্রাঞ্চে। এভাবেই জানা হয়ে যায়। কিন্তু মহিলা স্লিপ কখনো দেন না। আসলে পরের দিনগুলোতে আমিও আর চাই না। বরং তিনি নিজেই আলাপ শুরু করেন কবে আমার বউকে রাস্তায় দেখেছেন। বা কবে আমার বউ নিজে এসে কাপড় দিয়ে গেছেন। তাঁর সঙ্গে গল্পও করেছেন। আমার বউ তাঁর সঙ্গে যে গল্প করেছেন তার মধ্যেও তিনি বউয়ের মহত্ত্বের সন্ধান পেয়ে সেই বার্তাও জানিয়েছেন। আমি তাঁকে ব্যাখ্যা করলাম গালগল্প করার মধ্যে বিশেষ কোনো মহত্ত্ব থাকবার কথা নয়। তিনি তাতে যে হাসি দিলেন তার থেকে তাঁকে বিশেষ গ্রহণ করলেন মনে হলো না।

গতকাল, বৃহস্পতিবার, ২৮ জানুয়ারি, ২টা শাড়ি তাঁর দোকানে নিয়ে গেলাম ইস্ত্রির জন্য। সেলাই মেশিন ছেড়ে তিনি এসে গ্রহণ করলেন। দোকানে কোনো প্রকৃত ইস্ত্রিওয়ালা তখন নেই। আমি কালই প্রথম স্লিপের জন্য গাঁইগুঁই করলাম। আসলে আমি নিজে ক’দিন পিঠে একটা ছোটখাট কাঁটাছেড়ার কারণে নড়তে-চড়তে বিশেষ আরাম পাচ্ছি না। এই শাড়ি নিতে আমি নাও আসতে পারি এরকম একটা সম্ভাবনা ছিল বলেই আমি নাছোড়বান্দা। তিনি দেরাজ খুলে শান্তভাবেই স্লিপ বের করলেন। শান্ত ধীর ভাবে তিনি স্লিপ লিখলেন। আমার হাতে দিলেন। পরিচ্ছন্ন বোধগম্য হস্তাক্ষর। অক্ষর বলতে সংখ্যাই মূলত। স্লিপে তো আইটেম টাইপ করাই থাকে লন্ড্রিতে। স্লিপটা নিয়ে আমি ফিরতে যাচ্ছি যখন, তখন তিনি আরও সুন্দর করে হেসে বললেন:
“তেমন লেখাপড়া তো শিখিনি। আপনাদের মতো মানুষজনকে হাতের লেখা দেখাতে লজ্জা পাই।”

স্লিপ না দিতে চাইবার এরকম একটা কারণ আমি ঘুণাক্ষরেও এই কয় মাস ভাবি নি।

আদাবর, ২৮-২৯ জানুয়ারি ২০১৬

About Author

মানস চৌধুরী
মানস চৌধুরী

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টারি করে নির্বাহ করি। গল্প, কলাম ইত্যাদি লিখি। সুযোগ পেলে পর্দায় অভিনয়ও করি।