page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

হুমায়ূন আহমেদ, অলিভার স্যাকস ও পর্যায় সারণী

কোলন ক্যান্সারের চিকিৎসা নেওয়ার সময় হুমায়ূন আহমেদ পত্রিকায় কলাম আকারে নিয়মিত কিছু লেখা লিখতেন। কলামের নাম ‘নিউইয়র্কের নীল আকাশে ঝকঝকে রোদ’। সম্ভবত এগুলি ছিল তার লেখকজীবনের সর্বশেষ নিদর্শন। পরে এই লেখাগুলো একই শিরোনামের একটি বইয়ে স্থান পায়।

নানান কারণে হুমায়ূন আহমেদের এই শেষ লেখাগুলো আমার খুব প্রিয়। লেখাগুলো আমাকে বিস্মিত করেছিল। আমি অবাক হয়েছিলাম এটা দেখে যে, মৃত্যু বা মৃত্যুর সম্ভাবনার সামনে দাঁড়িয়েও কী করে একজন লেখকের কলম একই রকম বিশুদ্ধ, সৃজনশীল আর কৌতুকময় থাকতে পারে।

shibbratalogo

 

এইসব কলামে বিচিত্র বিষয় নিয়ে লিখতেন হুমায়ূন আহমেদ। ছোটখাট দৈনন্দিন বিষয়। বেশিরভাগই স্মৃতিচারণ। তবে তার তখনকার শারীরিক অবস্থা সযত্নে পরিহার করার চেষ্টা করতেন। লেখা পড়ে বোঝার কোনো উপায় ছিল না ক্যান্সারের এক যন্ত্রণাদায়ক চিকিৎসার ভেতর দিয়ে যেতে হচ্ছে তাকে। আবার ওদিকে টাকাপয়সাও ফুরিয়ে আসছে। চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া অনিশ্চিত। আমি দেখেছি এইসব তলায়-টানা ‘মানডেন’ লড়াই থেকে লেখক হুমায়ূন নিজেকে এক অদ্ভুত উপায়ে সরিয়ে নিয়ে যেতে পারতেন। লেখার টেবিলে তিনি কেমন ‘সাবলাইম’ হয়ে উঠতেন।

হুমায়ূন আহমেদ (১৯৪৮ – ২০১২)

এগুলো ২০১২ সালের মাঝামাঝির কথা।

তিন বছর পর আমি প্রায় একই রকম আরেকঝাঁক লেখার মুখোমুখি হচ্ছি। এবার আমার প্রিয় আরেক লেখক মৃত্যুশয্যায়। একই রোগ। এবং সেই একই শহর—নিউ ইয়র্ক। সম্ভবত তিনি একই হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

লেখকের নাম অলিভার স্যাকস। ইনি একজন নিউরোলজিস্ট। অনুমান করছি, ভদ্রলোক বাংলাদেশে খুব অপরিচিত নন। তার একটি বই ‘দ্য ম্যান হু মিসটুক হিজ ওয়াইফ ফর আ হ্যাট’ আমি দুয়েকজনের বুকশেলফে দেখেছি। স্নায়বিক বৈকল্যের কারণে আমাদের অবধারণের জগতে কী কী অদ্ভুত বদল ঘটে, জমিয়ে গল্পের আকারে সেগুলোর বিবরণ দেন স্যাকস। কালার ব্লাইন্ডদের জগৎ নিয়ে লেখেন। বধিরদের নিয়েও লেখেন।

তার ‘আ লেগ টু স্ট্যান্ড অন’ আমার পড়া সবচেয়ে অদ্ভুত বইগুলোর একটি। বইয়ের বিষয়বস্তু লেখকের একটি পা। দুর্ঘটনায় সেই পা প্যারালাইসিস হয়ে ছিল বেশ কিছুদিন। নিজেরই একটি অঙ্গ কী করে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি ‘বস্তুতে’ পরিণত হয়েছিল, সেই গল্প প্রায় দুশ পাতা জুড়ে।

গত ২৪ জুলাই স্যাকসের একটি লেখা ছাপা হয়েছে ইন্টারন্যাশনাল নিউ ইয়র্ক টাইমস ম্যাগাজিনে। আমি এখানে লেখাটির একটি অনুবাদ তুলে দিচ্ছি:

আমার পর্যায় সারণী
নেচার আর সায়েন্স-এর মতো জার্নালগুলোর জন্য আমি প্রতি সপ্তাহে তৃষিত হয়ে থাকি, অনেকটা লোভীর মতো। হাতে পাওয়ামাত্র সবার আগে পড়তে শুরু করি ভৌত বিজ্ঞান সংক্রান্ত নিবন্ধগুলো—অথচ আমার পড়ার কথা জীববিদ্যা আর ওষুধবিদ্যার ওপর লেখা। ভৌত বিজ্ঞান আমার সেই বালক বয়সের প্রথম পুলক।

নেচার পত্রিকার সর্বশেষ সংখ্যায় নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী ফ্রাঙ্ক উইলকজেকের একটা লেখা এসেছে, খুবই শিহরনজাগানো লেখা। বিষয়বস্তু নিউট্রন আর প্রোটনের ভরের অতি নগণ্য পার্থক্য হিসাব করার নতুন কৌশল। এই নতুন গণনা জানাচ্ছে, নিউট্রন কণা প্রোটন কণার চেয়ে খুব সামান্য পরিমাণে ভারি—তাদের ভরের অনুপাত ৯৩৯.৫৬৫৬৩ থেকে ৯৩৮.২৭২৩১—যে কারো মনে হবে এ পার্থক্য অতি নগণ্য, কিন্তু এ ফারাকটুকু না থাকলে আজ আমরা যে মহাবিশ্ব দেখছি, এটা এই জায়গায় আসতোই না। ড. উইলকজেক বলছেন, এভাবে ভর গণনার সামর্থ্য “আমাদেরকে এমন এক ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে উৎসাহিত করছে, যখন নিউক্লিয়ার পদার্থবিদ্যা নিশ্চিতি আর বৈচিত্রের সেই তুরীয় পর্যায় ছোঁবে, আণবিক পদার্থবিদ্যা যেখানে আরো আগেই পৌঁছে গেছে।” সেই বিপ্লব আমার দেখে যাওয়া হবে না।

ফ্রান্সিক ক্রিক কেন যেন নিশ্চিত ছিলেন, মস্তিষ্ক কী করে চৈতন্যের জন্ম দেয়, মানুষ এই ‘কঠিন ধাঁধা’ ২০৩০ সালের মধ্যে সমাধান করে ফেলবে। “তুমি নিজে এটা দেখে যেতে পারবে,” আমার নিউরোসায়েন্টিস্ট বন্ধু রালফকে তিনি প্রায়ই বলতেন, “আর অলিভার তুমিও, যদি কিনা তুমি আমার বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারো।” ক্রিক প্রায় নব্বই বছর পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। শেষ দিন পর্যন্ত চৈতন্য নিয়ে গবেষণা করে গেছেন, ও নিয়েই আচ্ছন্ন ছিলেন। রালফ অকালে ৫২ বছর বয়সে মারা যায়। আমার বয়স এখন ৮২। অন্তিম রোগে আক্রান্ত। তবে স্বীকার করি, চৈতন্যের ওই ‘কঠিন ধাঁধা’র পিছু আমি ছুটি নি। বলতে কী, ওটাকে ধাঁধাই মনে করি নি কখনও; আমি বরং বিষণ্ন এটা ভেবে যে, ড. উইলকজেকের ভবিষ্যদ্বাণীর নতুন নিউক্লিয়ার ফিজিক্স দেখে যাওয়া হবে না আমার। দেখা হবে না পদার্থ আর জীববিদ্যার আরো হাজারটা মোড়ফেরানো আবিষ্কার।

কয়েক সপ্তাহ আগে এক মফস্বলে গিয়েছিলাম। শহরের আলো থেকে বহু দূরে। রাতের বেলা দেখি সারা আকাশ ‘পাউডারের মতো নক্ষত্রে ছেয়ে আছে’ (কবি মিল্টনের শব্দবন্ধ); ভেবে দেখলাম, এমন নক্ষত্রখচিত আকাশ কেবল উঁচু আর শুকনো মালভূমিতেই দেখা সম্ভব, যেমন চিলির আতাকামা (যেখানে দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী কয়েকটি দূরবীন রাখা আছে)। জগতের বৈভবের ছবি দেখে ধাঁই করে মনে এলো, আমার আয়ু কী ভীষণরকম ফুরিয়ে এসেছে। আকাশমণ্ডলের অপার সৌন্দর্য, এর অবিনশ্বরতার অনুভূতির সঙ্গে মিশে আছে আমার নিজের নশ্বর জীবনের, মৃত্যুর অনুভূতি, একটি থেকে আরেকটি কিছুতেই আলাদা করার যো নেই।

বন্ধু কেট আর অ্যালেনকে বললাম, “মরার দিন এমন আকাশ আরেকবার দেখে মরতে চাই।”

“আমরা হুইলচেয়ারে ঠেলে তোমাকে বাইরের উঠানে এনে রাখবো,” তারা বললো।

ফেব্রুয়ারি মাসে এক লেখায় জানিয়ে দিয়েছিলাম আমার মেটাস্টাটিক ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার কথা, সেই থেকে ভালোবাসা আর হৃদয়ের উষ্ণতা জানিয়ে হাজার হাজার চিঠি আসছে, আমার মন ভরে যাচ্ছে এইসব চিঠিতে, মনে হচ্ছে (এত কিছুর পরেও) সম্ভবত একটা উত্তম জীবন আমি কাটিয়েছি, লোকের কাজে লেগেছি। আমার মন প্রসন্নতা আর কৃতজ্ঞতায় ভরে আছে—তবু থিকথিকে তারায় ভরা ওই রাতের আকাশের মতো আরো কিছুই কখনও আমাকে অত নাড়া দেয় নি।

সেই ছোটবেলা থেকে শোক সয়ে নিতে, প্রিয়জনের বিয়োগযন্ত্রণা থেকে পরিত্রাণ পেতে এমনসব বিষয়ের দিকে ঝুঁকেছি, যার সঙ্গে মানুষের যোগ নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে, ছয় বছর বয়সে যখন বাড়ি থেকে দূরে বোর্ডিং স্কুলে পাঠিয়ে দেওয়া হলো, গণিতের সংখ্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল আমার বন্ধুপরিজন। দশ বছর বয়সে যখন লন্ডনে ফিরি, আমার ছায়াসঙ্গী তখন মৌলিক পদার্থ আর পর্যায় সারণী। সেই থেকে জীবনে যখনই মন উচাটন হয়েছে, বুক ভার হয়ে এসেছে, আমি ফিরে গেছি ভৌত বিজ্ঞানের জগতে; হতে পারে সেই জগতে প্রাণের স্পন্দন নেই, তবে মৃত্যুও তো নেই সেখানে।

আর আজ যখন আমি রাস্তার সেই মোড়ে, যেখানে মৃত্যু আর কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়, বরং একটা সার্বক্ষণিক উপস্থিতি—একটা পাশ ঘেষে দাঁড়িয়ে থাকা উপস্থিতি—আমি সেই বালক বয়সের মতো আবারও ধাতু আর খনিজে চারপাশ ভরিয়ে ফেলছি; এদের গায়ে যে অনন্তের গন্ধ লেগে আছে। আমার লেখার টেবিলের এক কোণায় একটা বাহারি বাক্সে রাখা ‘এলিমেন্ট ৮১’, ইংল্যান্ড থেকে আমার এক বন্ধুর পাঠানো। সেটার গায়ে লেখা: ‘হ্যাপি থ্যালিয়াম বার্থডে।’ গত বছরের জুলাই মাসে আমার ৮১তম জন্মদিনের শুভেচ্ছা নিদর্শন। তার পাশে ‘এলিমেন্ট ৮২’ আমার সীসায় উৎসর্গীকৃত জীবনের স্মারক, এই মাসে (জুলাই) আমার সদ্যপেরোনো জন্মদিনে পাওয়া। আর এই যে একটা ছোট্ট সীসার ঝুড়িতে রাখা ‘এলিমেন্ট ৯০’, মানে থোরিয়াম; স্ফটিকে দানা বাঁধানো থোরিয়াম, হীরকখণ্ডের মতো অপরূপ এবং, অবশ্যই, তেজষ্ক্রীয়—এজন্যেই সীসার আবরণে বন্দি।

পেরিওডিক টেবলের সামনে

থিওডর ডব্লিউ গ্রে’র বাড়িতে পেরিওডিক টেবিলের সামনে দীর্ঘদিনের এডিটর কেট এডগারের সঙ্গে অলিভার স্যাকস, হাতে পাইরোলাইটিক গ্রাফাইট। অলিভার স্যাকসের বই Uncle Tungsten: Memories of a Chemical Boyhood পড়ে এই টেবিল বানাতে উদ্বুদ্ধ হন থিওডর। অলিভার তা দেখতে এসেছেন। তারিখ নভেম্বর ১২, ২০০২।

এ বছরের শুরুতে, ক্যান্সার শরীরে বাসা বেঁধেছে, এটা শোনার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে, যকৃতের অর্ধেকটা মেটাস্টাসিসে ভরে যাওয়া সত্ত্বেও শারীরিকভাবে কিন্তু ভালোই বোধ করছিলাম। ফেব্রুয়ারিতে যকৃতের এই ক্যান্সারের চিকিৎসা শুরু হলো, হেপাটিক রক্তনালীতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দানা ঢুকিয়ে দেওয়া হলো ইনজেক্ট করে—এই প্রক্রিয়াটিকে বলে এমবোলাইজেশন। তখন কয়েক সপ্তাহ শারীরিক আর মানসিক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে উঠেছিলাম (এমবোলাইজেশনের মাধ্যমে মেটাস্টাসিস প্রায় পুরোটাই উচ্ছেদ করা গেছে)। আমাকে একেবারে ছুটি দিয়ে হলো না, তার বদলে বিরতি পেলাম। বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠ সময় কাটানোর, রোগী দেখার, লেখালেখি করার এবং মাতৃভূমি ইংল্যান্ড বেড়াতে যাওয়ার বিরতি। তখন আমাকে দেখে কারো পক্ষে বোঝা শক্ত ছিল আমি একটা টার্মিনাল কন্ডিশনে এসে ঠেকেছি। আমি নিজেও সেটা অনায়াসে ভুলে থাকতে পারছিলাম।

মে মাস পেরিয়ে যখন জুনে পড়লাম, এই তরতাজা ভাব তখন ফুরিয়ে যাচ্ছে। তবু ৮২তম জন্মদিন জাঁকজমক করেই পালন করেছি। (কবি অডেন বলেছিলেন, মানুষ যখন যে অবস্থাতে থাকুক না কেন, জন্মদিনটা সানন্দে পালন করতে হয়)। এখন বমি বমি লাগে, ক্ষুধা মরে গেছে, দিনে কাঁপুনি দিয়ে ঠাণ্ডা লাগে, রাতে ঘামে ভিজে সপসপ। আর সবকিছুর ওপরে এক চরাচরব্যাপী অবসাদ, কিছু করতে নিলেই হাঁপিয়ে উঠি। এর মধ্যেও প্রতিদিন সাঁতার চালিয়ে যাচ্ছি, খুব ধীরে হাত-পা ছুড়ি, তবু দম ফুরিয়ে আসে। আগে পাত্তা দিতাম না। তবে এখন আর নিজেকে ভুলিয়ে রাখতে পারি না যে, আমি অসুস্থ। জুলাই মাসের ৭ তারিখের সিটি স্ক্যান রিপোর্ট জানাচ্ছে, মেটাস্টাসিস শুধু যে যকৃতে ফিরে এসেছে তা-ই না, ওটা ডিঙিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে অন্যত্র।

এখন আমাকে নতুন আরেক ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এটার নাম ইমমিউনোথেরাপি। গত সপ্তাহ থেকে সেটা শুরু হয়েছে। এটারও ঝক্কি কম না, তবে আশা করছি এর বরাতে আরো কয়েকটা মাস সময় পাবো। এই চিকিৎসা শুরুর আগে ভেবেছিলাম একটু মজা করে নেবো: চেয়েছিলাম নর্থ ক্যারোলাইনা ঘুরে আসতে, সেখানে ডিউক ইউনিভার্সিটিতে লেমুর গবেষণা কেন্দ্র আছে, চমৎকার। লেমুররা আমাদের সেই আদি পূর্বপুরুষের জ্ঞাতিভাই, যেখান থেকে প্রাইমেটদের যাত্রা শুরু। ভাবতে ভালোই লাগে, ৫ কোটি বছর আগে আমার নিজের পূর্বপুরুষরা গাছে গাছে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাদের চেহারা আজকের জমানার এই লেমুরদের কাছাকাছি। তাদের লাফানোর উদ্যম আর কৌতূহলী স্বভাব আমার ভালো লাগে।

আমার টেবিলে সীসার চৌহদ্দি পেরোলে বিসমুথের চৌহদ্দি: অস্ট্রেলিয়ায় প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া বিসমুথ; বলিভিয়ার খনি থেকে আনা লিমোজিন-আকৃতির দুটি বিসমুথের দণ্ড; গলন্ত বিসমুথ ধীরে ধীরে শীতল করে আভাময় স্ফটিকের রূপ দেওয়া হয়েছে, হোপি জাতিগোষ্ঠীর গ্রামের মতো স্তরীভূত; ইউক্লিডের জ্যামিতিক সৌকর্যের প্রতি আসক্ত যেন সিলিন্ডার আর গোলক আকৃতির বিসমুথের খণ্ড।

বিসমুথ হলো এলিমেন্ট ৮৩। আমি জানি ৮৩তম জন্মদিন দেখা হবে না আমার। তবু মনে মনে ভাবি আশপাশে এই ‘৮৩’-এর অবস্থানের মধ্যে কোথাও যেন একটা আশা জাগানিয়া কিছু, উদ্যম ফিরিয়ে আনার মতো কিছু আছে। বিসমুথের প্রতি কী এক স্নেহমাখা পক্ষপাত আছে আমার—কী নিরীহ ধূসর এক ধাতু, ধাতুপ্রেমীদের মনোযোগের বাইরে নিভৃত কোণে পড়ে থাকে। চিকিৎসক হিসেবে বঞ্চিত, অবহেলিতের প্রতি আমার স্নেহ দেখছি দেয়াল টপকে জড় জগতের দিকেও প্রসারিত হয়ে গেছে।

আমার পক্ষে কোনোদিনই পোলোনিয়াম (৮৪তম) জন্মদিন দেখা সম্ভব হবে না, তাতে আর সন্দেহ কী। আশপাশে পোলোনিয়াম ধাতু তার সুতীব্র, প্রাণঘাতী তেজষ্ক্রীয়তা নিয়ে বসে থাক, তাও আমি চাইবো না। তবে এই টেবিল—আমার এই পর্যায় সারণী টেবিলের আরেক প্রান্তে বসে আছে বেরিলিয়াম (এলিমেন্ট ৪) ধাতুর একটি টুকরো, যন্ত্রের সাহায্যে খুবই মোহনীয়ভাবে টুকরো করা। ওই ছোট্ট টুকরোটি আমাকে আমার শৈশবের কথা মনে করিয়ে দেয়, সারাক্ষণই জানিয়ে দেয় শিগগিরই শেষ হতে যাওয়া এই যাত্রা কবে, কোন দূর অতীতে শুরু হয়েছিল।

পুনশ্চ: হুমায়ূন আহমেদ যখন কলাম লিখছিলেন, তখন সম্ভবত তিনি মৃত্যুকে এতটা নিটকবর্তী দেখেন নি। চিকিৎসা শেষে সুস্থ্য হয়ে তিনি ফিরে আসবেন বলে তার ধারণা ছিল।

About Author

শিবব্রত বর্মন

কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক ও সাংবাদিক। জন্ম : ১৯৭৩, ডোমার, নীলফামারী। প্রকাশিত গ্রন্থ : ছায়াহীন; মিগুয়েল স্ট্রিট (অনুবাদ) ভি এস নাইপল; কদর্য এশীয় (অনুবাদ) সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ; পাইয়ের জীবন (অনুবাদ) আয়ান মার্টেল