page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
লাইফস্টাইল

হ্যাপিনেস ইজ শুঁটকি মাছ

আমার আম্মার খুব প্রিয় লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় হওয়াতে আর আম্মা আব্বা দুইজনেই মুসলিম ইন্সিটিউট লাইব্রেরির আজীবন সদস্য হওয়াতে সিক্স সেভেনে পড়ার সময়েই মানিকের অনেক উপন্যাস আমাদের পড়া হইয়া গেছিল।

কোন এক অজ্ঞাত কারণে ‘দিবারাত্রির কাব্য’ বাদ পড়ছে। ‘দিবারাত্রির কাব্য’ যখন পড়ছি তখন আমার অনার্স পরীক্ষা চলতাছে কিংবা শেষ। চাইর বছর সাহিত্যের বিভাগে অমনোযোগী এবং অনিয়মিত ছাত্র হইবার সুবাদে সব কিছুর অল্প অল্প জ্ঞান মাথায় ঢুকছে। সেই উপন্যাসের শেষ অংশটা সুররিয়ালিস্টিক নাকি ম্যাজিক রিয়েলিস্টিক সেই প্রসঙ্গ তুলতে গিয়া ঝাড়িও খাইছি রফিক স্যারের কাছে।

উপন্যাসখানা আমার কেন জানি খুব পছন্দ হইছে। র‍্যাংকিং করতে দিলে ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’র পরেই হয়তো এরে আমি রাখবো, ‘পদ্মানদীর মাঝি’ বা ‘জননী’ আসবে দুই তিন নম্বরে, ‘চতুষ্কোণ’ আরো পরে।

কিন্তু এতে অন্যতম প্রধান চরিত্র মালতী বৌদির সেই সংলাপ আমার পছন্দ হয় নাই, যেইখানে উনি বলতেছেন, “সুখ হলো শুঁটকি মাছ, জিভকে ছোটলোক না করলে এর স্বাদ খোলে না।”

কলিকাতার লোকেদের শুঁটকি নিয়া নাক উঁচাপনা আছে সেইটা আমি জানতাম, তবে বাংলাদেশের মানুষদেরও যে আছে সেইটা সম্প্রতি জানতে পারছি।

umme-farhana-logo

আমার এক প্রাক্তন সহকর্মী শাফিন ওমরের বাড়ি বরিশাল, উনি কইতেছিলেন যে বরিশালের লোকেরা ভাবে শুঁটকি গরীবের খাদ্য।

উনাদের ওইখানে প্রচুর তাজা মাছ পাওয়া যায়, সকলেই টাটকা মাছ খাইতে পায়, কেউ শুঁটকি খায় না। এই কথা শুইন্না আমি বেশ অবাক হইছিলাম। দরকারের থাইকা বেশি যে কোনো কিছু থাকলে মানুষ সেইটা সংরক্ষণ করবে এইটাই স্বাভাবিক।

চট্টগ্রামের লোকেরা শুঁটকি খান, উনাদের ওইখানে কি মাছের অভাব?

যেই কারণে লোকে আমের আমসত্ত্ব বানায়, জলপাইয়ের আচার বয়ামে ভইরা রাইখা সারা বছর খায়, সেই একই কারণে কিছু মাছ শুঁটকি বানায়া রাখা যাইতেই পারে। এইখানে বড়লোকি গরীবির কী আছে? আরেক বরিশাইল্লা পোলা আরও আপত্তিকর কথা কইছিল, “শুঁটকি খাইলে পুটকি গরম হয়।”

‘ওয়াইড সারগাসো সী’ নামে একটা উপন্যাস আমাদের ছাত্রদের পাঠ্যসূচিতে আছে, সেইখানেও কইতেছিল তাজা মাছ না খাইতে পাওয়া লোকেরা ‘ড্রাই ফিশ’ খায়।

বরিশালের লোকের আর কলিকাতার মালতী বৌদির কথার মিল থাকলেও কিছু অমিলও আছে। ছোটলোক বলতে উনি শুধু গরীব বুঝাইছেন বইলা মনে হয় না। সুখের লগে দারিদ্রের সম্পর্ক সাধারণত বিপরীতানুপাতিক ভাবা হয়। ছোটলোক শব্দটা দিয়া হয়তো উনি রুচির স্থূলতা বুঝাইয়া থাকতে পারেন। শুটকি মাছ সাধারণত প্রচুর ঝাল আর মশল্লা দিয়া রান্ধা হয়, একটু তরকারি দিয়া অনেকগুলা ভাত খাওন যায়, তাই গরীবের লাইগ্গা উপযুক্ত খানা। সেই ঝাল আর মশল্লার কড়া স্বাদ হইলো সুখের স্বাদ, কারো জিব্বা বেশি সূক্ষ অনুভূতি সম্পন্ন হইলে সে সুখের স্বাদ পাইবে না বইলা উনি ভাবেন।

‘গয়নার বাক্স’ ছবিতে এক বাঙাল পেত্নী তার ভাইস্তার বউরে জিগায় “কী রানতাছস? শুঁটকি নাকি?”

ভয়ে আধামড়া বউ তোতলায়া জবাব দেয়, “আমরা শুঁটকি খাই না”, ভূত পিসিশাশুড়ি কয়, “ঘটিবাড়ির ছোটলোকের মাইয়া, শুঁটকি খাবি ক্যান?”

shutki-12

কলকাতায় শুঁটকি বিক্রয়।

কাউরে অপমান করতে চাইলে ছোটলোক খুব যুইতসই গালি। ছোটলোক সবসময় গরীবের সমার্থক নাও হইতে পারে। কলিকাতার সব মানুষ ত আর গরীব না। কিন্তু পূর্ববঙ্গের চরিত্রের মুখে অনায়াসে এই সংলাপ বসাইয়া দিছেন অপর্ণা সেন।

যে উপন্যাস থাইকা ছবিটা বানানো হইছে সেইটা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের লেখা। উনি বইতে এই কথা লিখছিলেন কি না তা জানি না, বইটা আমি পড়ি নাই। তবে নিজের এলাকার বাইরের লোকেদেরে ছোটলোক বা  গরীব কিংবা স্থূলরুচিসম্পন্ন বইলা মন্তব্য করার প্রবণতায় মালতী বৌদি আর শাফিন ওমর স্যার আর রাসমণি ঠাকুরণের মধ্যে তফাৎ নাই দেখলাম।

আমাদের জন্মের আগে যখন আপামর জনসাধারণের বাড়িতে ফ্রিজ থাকতো না, কোরবানির গরুর মাংসও হলুদ লবণ মাখাইয়া রইদে শুকাইয়া শুঁটকি বানায়া রাখার প্রচলন ছিল।আমার নানি-দাদিরা রাখতেন। বলাবাহুল্য, সেইটাও রান্ধার পরে অত্যন্ত উপাদেয় হয়।

শুঁটকিবিরোধী বাংলাদেশীরা এই খাদ্যরেও হয়তো গরীবের খাবার ভাবেন। উনাদের বড়লোক পূর্বপুরুষেরা হয়তো কোরবানির মাংস রাখতেন না, সকলই বিলাইয়া দিতেন।  

হুমায়ূন আহমেদের এক নাটকে নাকি কইতেছিল, “মমেনসিংয়ের লোকেরা খায় নাইল্যা পাতার শুঁটকি, এইডা কোনো খাওনের জিনিস হইল?”

নাটকটা আমি দেখি নাই, আমার খালাত বোন ঋতু একবার বাসায় শুকনা পাট শাক রান্ধা হইতেছিল সময় বলতেছিল। আমাদের বাসার প্রায় সবার এই রইদে শুকাইয়া কৌটায় ভইরা রাখা পাটশাক খুব প্রিয়, এইটা গরীবের খাবার না বড়লোকের তা আমরা কোনো দিন চিন্তা করি নাই।

শুঁটকিবিরোধী ব্যক্তিদের এথনোসেন্ট্রিজমের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ইউরোসেন্ট্রিজমও আমারে বেশ মজা দেয়। ফুলকপিরে আমাদের আরেক সহকর্মী ডাকতেছিলেন ‘শেয়ালের মগজ’।

আমি কইলাম, “ফুলকপি আমার খুব প্রিয়, এই নামটা আর বইলো না।”

উনি হাইসা কইলেন, “তাহলে উন্নত দেশের অনেক ভাল ভাল দামি খাবারের নাম শুনলে ত আপনি বমিই করে দেবেন।”  

‘উন্নত দেশের ভাল খাবারে’র নামের লিস্ট উনার থাইকা শুনি নাই, তবে ভ্রমণ কাহিনি পড়ার সুবাদে কিছু জানি। যেমন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখছিলেন কাঁচা ঝিনুকের খোল খুইলা তাতে লেবুর রস ছিটাইয়া খাওনের ফিরিস্তি। জাপানে লোকে সাপ ব্যাঙ শামুক অক্টোপাস সবই খায়। ফ্রান্সে কয়েকশ পদের পনির আর কয়েক হাজার পদের ওয়াইন পাওয়া যায় তার মধ্যে এক ধরনের পনির নাকি আছে যা রাইখা দিতে দিতে পোকা হইয়া যায়, মানুষের শবদেহে যে ব্যকটেরিয়া ধরে সেই একই ব্যকটেরিয়া পনিরের প্রোটিনটারে প্রায় পচাইয়া ফালাইলে পরে সেইটা খাওয়া হয়

সেইসকল উন্নত দেশের খাদ্য সাদা বা হলুদ চামড়ার লোকেরা খায় বইলা সেইগুলাতে কোনো ছোটলোকি নাই, খালি শুঁটকি বাংলাদেশের গরীব মানুষের খাদ্য দেইখা সেইটা পইচা গন্ধ উইঠ্যা গেছে গা। ব্যাপারটা বেশ মজার।

প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, আমার সেই  তরুণ সহকর্মীও শুঁটকি খান না, আর ‘গয়নার বাক্সে’র ডায়লগখানা উদ্ধৃত করাতে উনি প্রবল আপত্তি জানাইয়া তর্ক করতেছিলেন যে শুঁটকিই আসলে ছোটলোকের খাদ্য।

লেখাটা শুরু করবার সময় শিরোনাম দিছিলাম, ‘আমার ছোটলোক জিব্বা’। পরে ফেইসবুকে পোস্ট দেওনের  একটা প্রথা মনে পইড়া শিরোনাম পাল্টাইলাম। অনেকেই পোস্ট দেন, নিজের প্রিয় বস্তুর নাম দিয়া—‘হ্যাপিনেস ইজ অমক’ কিংবা ‘হ্যাপিনেস ইজ তমক’। আমিও এইভাবে লিখতে পারি নিশ্চয়ই।

নিজেরে ছোটলোকের বিপরীতে বড়লোক বা উন্নত রুচির লোক প্রমাণ করার জন্যে অবশ্য এইটা করি নাই। ‘ছোটলোক’ শব্দের আরেক অর্থ হইল ওয়ার্কিং ক্লাস। এইটারে অপমান হিসাবে নেওনের কিছু নাই, গালি মনে করার কারণও নাই। আমার পূর্বপুরুষেরা যেহেতু জমিদার ছিলেন না, তাঁরা অবশ্যই কোনো না কোনো ছোটলোকি কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, জমি চাষ করা  কিংবা দোকানদারি করা যাই হোক না কেন। দুই এক পুরুষে পড়ালেখা শিখ্যা সেই ইতিহাসরে মুইছ্যা দেওনের প্রবণতাও হাস্যকর।

আরো পড়ুন: মুভি রিভিউ – গয়নার বাক্স (২০১৩)

এই হ্যাপিনেস ইজ দিয়া লেখার চলটা আসছে মনে হয় হ্যাপি পেইজের ইলাস্ট্রেশনগুলা থাইকা। ওই পেইজে আপনার কাছে হ্যাপিনেস কী তা কইলে তারা সেইটা আঁইকা দিবে। হ্যাপি পেইজের ছবিতে দেখছি, হ্যাপিনেস ইজ এর পরে আজিব আজিব সব জিনিস বা অবস্থার উল্লেখ থাকে, যেমন “আ ফ্রি লান্চ”  কিংবা “নিউলি পলিশড নেইলস” অথবা “ওয়াকিং অ্যালোন”, এমনকি “আ কাপ অফ কফি” আর “মাই বেড”। সেই হিসাবে “হ্যাপিনেস ইজ শুঁটকি মাছ” ত রীতিমত সাহিত্যিক উদ্ধৃতি, মালতী বৌদির বক্তব্যের অন্তর্নিহিত সারকাজম বাদ দিলে আমগর মতন ছোটলোকেরা এক কথায় এই লাইনের লগে একমত হবেন বইলা আমার বিশ্বাস।  

About Author

উম্মে ফারহানা
উম্মে ফারহানা

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। ইংরেজি সাহিত্য পড়ান। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন ২০০৩ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত। জন্ম ময়মনসিংহ শহরে, ৬ অক্টোবর ১৯৮২। প্রকাশিত গল্পগ্রস্থ: দীপাবলি। shahitya.com-এ ধারাবাহিক উপন্যাস লিখছেন: লৌহিত্যের ধারে।