page contents
লাইফস্টাইল, সংস্কৃতি ও বিশ্ব
লাইফস্টাইল

“৪ থেকে ১০ বছর… আমি যে আজকে লেখক হয়েছি, ওই সময়টা খুব জরুরি ছিল।”—পাপড়ি রহমান

সাদ রহমান: আপনার কোনো বই আসলো এবার মেলাতে?

পাপড়ি রহমান: হ্যাঁ, আমার তিনটা বই আসছে।

সাদ: কী নাম?

পাপড়ি: একটার নাম ‘শহর কিংবা ঊনশহরের গল্প’। এটা একটা গল্পগ্রন্থ, এটা আমার সপ্তম গল্পগ্রন্থ। আর আমার আত্মজীবনী, প্রথমবার এলো, ওটার নাম ‘মায়াপারাবার’। আরেকটা গ্রন্থ আসছে ইউপিএল থেকে, সেটা আমি সম্পাদনা করেছি। আমার সঙ্গে যৌথভাবে আছেন নিয়াজ জামান।

সাদ: প্রথম গল্পগ্রন্থটা কত সালে বের হইছে?

পাপড়ি: সেটা বেরিয়েছিল ২০০০ সালে।

boimela-logo-2016

সাদ: ওইটা কি আপনার প্রথম বই ছিল?

পাপড়ি: হ্যাঁ।

সাদ: আপনার গল্পগ্রন্থের সাথে সাথে এবার একটা আত্মজীবনী বের হইল। আত্মজীবনীটা লিখলেন। সেটা সম্পর্কে একটু বলবেন?

পাপড়ি: আত্মজীবনীটা লিখলাম, আসলে এই বিষয়গুলো আমাকে খুব হন্ট করছিল। মনে হচ্ছিল, এটা আমার লেখা দরকার। আমি মনে করি যে, একটা সময় আমি গ্রামে ছিলাম তো, সেটা আমার শৈশব, শৈশব সময়টা। যেমন ৪ থেকে ১০ বছর বয়স পর্যন্ত। ১০ কি ৯, ৮ বছর পর্যন্ত। সেই সময়টা গ্রামে ছিলাম, তো গ্রামে আমার দাদি, মানে আমাদের বড় একটা বাড়ি, জয়েন্ট পরিবার, সবাই মিলে যে থাকা, সবকিছু মিলিয়ে আমার কাছে মনে হয়েছে যে, আমি যে আজকে লেখক হয়েছি, ওই সময়টা খুব জরুরি ছিল। যেমন আমি বললাম যে, আমাদের জয়েন্ট পরিবার ছিল, অনেক বড় একটা বাড়ি, তারপরে চাচিদের সঙ্গে, চাচিরা খুব মজা করে জীবনযাপন করত, আমার দাদি ছিল একটু অন্যরকম। আমার দাদি খুব সংসারি ছিল না, সে জঙ্গলে জঙ্গলে যেত, আমিও যেতাম। ওই বিষয়গুলো আমার কাছে মনে হয়েছে, আর কিছু ক্যারেক্টার।

সাদ: তো আপনে বললেন যে, আপনাকে খুব হন্ট করছিল। আত্মজীবনীটা লেখা উচিত, এমন মনে হচ্ছিল। কী জন্য হন্টটা করছিল? মানে আপনার কি মনে হচ্ছিল শেষ হয়ে আসছেন বা এরকম কিছু?

papri-book-1পাপড়ি: না না। সেরকম অবশ্য সেটাও হয়। আমি তো আসলে জানি না, আমি আসলে কালকেও মরে যেতে পারি বা এই মুহূর্তে মরে যেতে পারি। সেটা বিষয় না। আমার কাছে মনে হইছে, এই কথাগুলো আসলে বলা দরকার। যে আমার… যাদের আমি দেখেছি একটু অন্যরকম ক্যারেক্টার। যেমন আমার এক চাচা ছিলেন, একটু পাগলাটে ছিলেন, এবং উনি টাকা-পয়সা সব লুঙ্গির ভিতরে রাখতেন। লুঙ্গিটা ছিল উপরে। এবং আমরা দেখতাম যে এটা ফুলে আছে সবসময়। তো ওই চাচা ওইভাবে উনার সব টাকাপয়সা উনি লুঙ্গিতে বহন করে যেতেন। তারপরে আমার এক দাদি ছিলেন। একশো বছরের উপরে বেঁচেছেন। উনি এত জ্ঞানী ছিলেন। দেখছি কোনো ব্লাউজ পরছেন না। কিন্তু কন্টিনিউয়াস কাজ করে যাচ্ছেন। হ্যাঁ, যেমন বাঁশ দিয়ে কাজ করছেন, বেতের কাজ করছেন, আচার বানাচ্ছেন, আম কুড়োচ্ছেন। এরা কিন্তু নাই এখন। তা আমার কাছে মনে হইছে, এদের কথা তাহলে কে বলবে? কেউ তো বলবে না।

সাদ: আপনার আত্মজীবনীটা অনেকটা উপন্যাসধর্মীও বোধহয়?

পাপড়ি: আমার কাছে সেটা… আমি জানি না ঠিক। সেটা পাঠক বলতে পারবে। আমার মনে হয় যে, হ্যাঁ, উপন্যাসের হয়তো কিছু ফ্লেভার পাওয়া যেতে পারে। যে, আমি ধরেন, ক্যারেক্টারগুলো, সব তো আর লেখা সম্ভব হয় নি। যেগুলো আমার মেমরিতেও সবকিছু নাই। আর যেগুলি মেমরিতে ছিল, বা একটু সন্দেহ ছিলে যে এটা ঠিক কিনা। এখন আম্মা, বাবা, চাচি-ফুফুরা বেঁচে আছেন। আমি আবার এটা, মানে শিওর হওয়ার জন্য তাদের সাথে কথা বলেছি। যে ঘটনাটা কি ওরকম ছিল? অনেকটা আবছা স্মৃতি ছিল, আমার মনে হলো যে এটা লিখে ফেলা দরকার। কারণ সময় যাচ্ছে, আমি ভুলে যাব।

সাদ: দাদির সঙ্গে জঙ্গলের একটা কী যেন একটা ব্যাপার ছিল, ওই ব্যাপারটা একটু খুলে বলেন।

papri-book-2পাপড়ি: হ্যাঁ, আমার দাদি আসলে সংসারি ছিলেন, কিন্তু সংসারবৈরাগী যাকে বলে। আমার দাদিকে আমি কিচেনে খুব কম যেতে দেখেছি। দাদি ওই কোন গাছের আম একটা পাড়লো, পেকে গেল, সুপাড়ির কালার কেমন হলো, তারপরে কোথায় কোন… মানে বাচ্চা দিল কবুতর। বা মুরগির বাচ্চার ডিমগুলো কী রকম। আমার দাদি সবসময় তাই করতো। দাদির হাতে একটা লম্বা বাঁশ ছিল, সে বাঁশটাকে আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় বলে খুটা, সঙ্গে একটা নেট লাগানো ছিলো আম পাড়ার জন্য আর কি। আমার দাদিকে দেখতাম যে চলে যাচ্ছে, জঙ্গলের ভিতরে। আমাকে নিয়ে যাচ্ছে। ওখানে, আমাদের ওখানে বলে ঢ্যাপা শাঁক। আসলে ফার্ন এক ধরনের। ওগুলো তুলতো আমার দাদি। আমিও তুলতাম সঙ্গে সঙ্গে। আমার দাদি প্রতিটা গাছের নাম বলত। ওই ধরনের। একটা আমগাছের নাম দিয়েছিলো সে, টিয়াটুটি আমগাছ। তারপরে একটা দলকচরা আমগাছ। কবরখানার আমগাছ। এবং দাদির হাতে লাগানো একসঙ্গে তিনটা গাছ, কাঁচামিঠে আম, একটা কালো রঙের আম হতো, মানে কালচে শেড। একটা সাদাটে। কাঠাল গাছ এবং জাম্বুরা গাছ। চারটা গাছ একসঙ্গে ছিল। অদ্ভুত! ওই দাদির সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে ঘুরে আমার কাছে মনে হয়েছে…। নেচারের কাছে যাওয়া আর কি। আমি দাদির কাছেই গাছপালার নাম সব শিখেছি। ফুলের নাম শিখেছি বা জীবন যে একটু অন্যরকম, শুধুমাত্র যে, নারী তো আমি, কিন্তু সংসারের ভিতরে ঢুকতে হবে বা রান্না করতে হবে, বা সংসার গুছিয়ে রাখতে হবে, আমার দাদি বোধহয় সেরকম ছিল না। আমিও অনেকটা ওরকমই আর কি।

সাদ: আপনার পরবর্তী আত্মজীবনী, আরো কয়েকটা পর্ব আসবে। এগুলা কি সামনের বইমেলাতে বইমেলাতে, নাকি মাঝে মাঝে?

পাপড়ি: আমি জানি না। কারণ এটা তো আমি অনেক বছর থেকে লিখছিলাম। ৩/৪ বছর হয়ে গেছে। যে আমি শুরু করেছিলাম, বিভিন্ন জায়গায় এটা, পোর্টালগুলোতে যাচ্ছিল। বা অন্য ম্যাগাজিনগুলোতে যাচ্ছিল। তো আমার এবার মনে হলো যে শেষ করে ফেলা দরকার। আসলে সময়টা হলো আমার ৪ থেকে ৮ বছরের মধ্যে যেই ঘটনাগুলো। তারপরে আমি আফটার লিবারেশন চলে যাই আপনার সিলেটে। শহরে যখন গেলাম, শহরের সঙ্গে আমার পরিচয় হলো। এবং আমি যে গ্রামে সব ফেলে গেলাম, আমার পালা মুরগি, আমার, কী বলে, আমার শাঁকের বাগান। এগুলো আমাকে খুব কষ্ট দিয়েছে যে এই মুরগিটার কী হবে? এবং শিয়াল তো ধরে নিয়েই যেত। আমার কাছে মনে হয় যে, একটু অন্যরকম একটা গ্রন্থ এটা হবে। এখনো বলতে পারি না, পাঠক বলবে। আর তার পরবর্তী জীবনের বিষয়গুলো আমার এখনো লিখতে ইচ্ছে করছে না। কখনো করবে কিনা, যদি করে, তাহলে হয়তো আমি সেটা করবো।

বাংলা একাডেমি বইমেলা, ৬/২/২০১৬

ইউটিউব ভিডিও

About Author

সাদ রহমান
সাদ রহমান

জন্ম. ঢাকা, ১৯৯৬। কবিতার বই: 'কাক তুমি কৃষ্ণ গো' (২০১৬)।