page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

অংক আতঙ্ক

murad hai 2014

৩২ ছিল আমার আতঙ্কের নাম্বার, ৩৩ স্বস্তির, ৩৫ নিরাপত্তার। ক্লাস নাইন-টেন-এর অংকে আমার পাওয়া নাম্বারের কথা বলছি।

৬০ কিংবা ৮০ মানে লেটার মার্ক—এসব ছিল রীতিমত ফ্যান্টাসি। অন্য সব বিষয়ে আমি চলে যাওয়ার মত নাম্বার পেলেও অংক ছিল আমার দুঃস্বপ্ন। বীজগণিত কিছুটা পারলেও পাটিগণিত কোনভাবেই আমার মাথায় ঢুকতে চাইত না। রীতিমত বেঈমানি করে বসত আমার সাথে। সরল অংক টানতে টানতে খাতার পাতা শেষ হয়ে যেত। চলতি নিয়ম, ঐকিক নিয়মের আসন্ন পয়সার ভেজাল পুরা মাথাই বিগড়ায়ে দিত আমার।

murad hai logo

প্রাইভেট পড়ার কোন নিয়ম আমাদের বাসায় ছিল না। নিজে যেমনে পারো করো। বড় ভাইদের কাছে গেলে ওদের ধমক আর মাইরের চোটে নিজে যা একটু পারতাম, সেটাও ভুলে যেতাম। ক্যাডেট কলেজে পড়া ভাইয়ের মাইরের চোটে ইংরাজি ভালো পারি কিন্তু ঢাকা কলেজের তুখোড় ছাত্র মেঝো ভাইয়ের মাইর খেয়েও অংক কোনোদিন আমার মাথায় ঢুকে নাই, আমার কী দোষ !

এত কাঁচা ছিলাম অংকে তবুও হাইস্কুলের মালেক স্যার কেন জানি না আমাকে খুব আদর করত। ক্লাসের পরীক্ষাগুলিতে ফেল করলেও হাসিমুখে বলত তুই অনেক বড় হবি। কী মুসিবত! স্যার কি আমারে নিয়া ইয়ার্কি মারতেছে নাকি এমন মনে হত।

ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগে সায়েন্সের ছেলে বন্ধু কামাল আমাকে অংক বুঝাতে আসত বাসায়। কিন্তু দেখা যেত অংক করার চেয়ে আমরা মতিঝিল কলোনির মেয়েদের নিয়ে গল্প করেই সময় শেষ করে ফেলতাম। আমি আর্টস-এর ছাত্র হলেও ক্লাসের সেরা ছাত্র সায়েন্স-এর খোকন ছিল আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। আমি অংক পারি না, লাড্ডু পাই কিন্তু তবুও আমাদের বন্ধুত্ব গভীর।

খোকনের সাথে অংক নিয়ে না, স্ট্যাম্প কালেকশন নিয়েই যত কথা। পরীক্ষার সময় সায়েন্স আর আর্টস-এর ছেলেদের সিট আলাদা হয়ে যেত। খোকন ইচ্ছা থাকলেও খাতা দেখাতে পারত না।

বাসায় নাকি গোটা ফজলি আম একাই খায়, তার উপর ৫৫৫ সিগারেটের যত প্যাকেট নিয়ে স্কুলে আসে সাইদ। সেও আর্টস-এর ছাত্র, অবাক হয়ে দেখি অংক খুব ভালো পারে। একদিকে ওদের বাসায় গিয়ে ফজলি আম খাওয়ার লোভ, অন্যদিকে ওর পাশে বসে ওর খাতা দেখে অংক করার ধান্ধায় খুব দ্রুত সাইদের সাথে খাতির করে ফেললাম। সাইদের বাসায় গিয়ে ফজলি আম ঠিকই খেয়েছি অনেক।

muradhie3

খোকন, কামাল, মিলু ও বিদ্যুৎ। পিছনে লেখক।

 

ম্যাট্রিক পরীক্ষার সময় একসাথে ফর্ম ফিল আপ করে পাশাপাশি পরীক্ষার সিটও পেলাম আমি আর সাইদ। কিন্তু পরীক্ষার সময় বেটা ঠিকমত আমাকে খাতা দেখায় নাই। নিজে বেসিক না জানলে অংক তো আর কারো খাতা একটু দেখে করা যায় না। বীজগণিত, সরল অংক, আর আসন্ন পয়সার ঐকিক নিয়ম দিয়ে কোন রকমে ৩৫ নম্বরের কারেক্ট আনসার করে খাতা জমা দিয়ে চলে এলাম। ৩৫ নম্বরের কারেক্ট আনসার করেছি বললেও ঐকিক নিয়মের ওই কচুর আসন্ন পয়সার হিসাব নিয়ে মনে মনে সন্দেহ ছিল। ঐটা ঠিক হলে পাশ করব, আর ভুল হলেই ফেল।

হল থেকে বের হয়ে খোকন আমি কেমন করেছি সেটা পরীক্ষা করতে লাগলো। সব শুনে সিদ্ধান্ত দিয়ে ফেলল যে আমি পাশ করব। কিন্তু আমার মনের খুতখুতি রয়েই গেল। অংকে ফেল মানে পুরা পরীক্ষায় ফেল।

পরীক্ষার পর অফুরন্ত অবসর। দল বেঁধে ঘুরছি, ফিরছি, আড্ডা মারছি, সিনেমা দেখছি। কিন্তু মাথার ভিতর থেকে ফেল-এর চিন্তা আর দূর হয় না। ফেল করলে বাসায় কী দুরবস্থা হবে সেই দৃশ্য চোখের সামনে ভাসিয়ে তুলে নিজেই শিউরে উঠতে লাগলাম। খবর নিতে থাকি। বোর্ড অফিসে চলে যাই খোকন আর আমি ওর বাইসাইকেলে চেপে। জানার চেষ্টা করি কবে নাগাদ রেজাল্ট বের হতে পারে।

আমাদের বাসায় একটাই পত্রিকা রাখা হয়। দৈনিক ইত্তেফাক। পত্রিকা আসার পর বাবা সেটার প্রতিটা লাইন, দাঁড়ি কমা সেমিকোলন পর্যন্ত পড়ে সারাদিন লাগিয়ে। তার আগে সেটা কারো ধরার অনুমতি নাই। রেজাল্ট বের হবার সময় কাছাকাছি হতেই আমি নিজে প্রথমে পত্রিকা হাতে নিয়ে চেক করে দেখি রেজাল্ট বের হল কিনা। প্ল্যান হল, যেদিনের পত্রিকায় রেজাল্ট বের হবার খবর থাকবে, সেটা বেমালুম গায়েব করে দিতে হবে বাবার হাত থেকে।

খুব টেনশন নিয়ে দিন কাটাচ্ছি। নিজের পরিণতির চেহারা খালি চোখের সামনে ভাসতে লাগল।

একদিন সকালে খোকন বাসায় এসে হাজির। বলে আজ নাকি রেজাল্ট বের হবে। ওর সাইকেলে চড়ে দুই বন্ধু বকশিবাজারে বোর্ড অফিসে গিয়ে হাজির হলাম। পুরো এলাকা জুড়ে অনেক ভিড় ছেলেমেয়েদের। বুঝতে বাকি রইলো না যে রেজাল্ট বের হয়েছে।

অনেক ঠেলাঠেলি করে বোর্ড অফিসের দেয়ালের কাছে পৌঁছালাম। দেয়ালে রেজাল্ট লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। খোকন খুঁজতে গেল সায়েন্স-এর রেজাল্ট এক দিকে। আমি আর্টস-এর রেজাল্টের খোঁজে অন্য দিকে।

যত দোয়া দরুদ সুরা পারতাম অনর্গল পড়তে লাগলাম। কোনো দিন নামাজ ফাঁকি দিব না, সব রোজা রাখব—প্রমিজ করে ফেললাম। মনে মনে আল্লাহকে বলতে লাগলাম, দয়া করে এবারের মত ইজ্জত রক্ষা করো, নইলে মাইর একটাও মাটিতে পড়বে না।

ভয়ে ঠক ঠক করে কাঁপতে কাঁপতে রেজাল্ট লাগানো বোর্ডের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। মনে মনে ভাবছিলাম, যদিও পাশ করি তাহলে থার্ড ডিভিশনের বেশি কিছু আশা করা বোকামি হবে। তাই থার্ড ডিভিশনের রেজাল্ট শীটে নিজের রোল নাম্বার ২৫২ খোঁজা আরম্ভ করলাম।

শীটের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত খুঁজেও কোথাও নিজের রোল নাম্বার দেখলাম না। ভাবলাম, হয়ত তাড়াহুড়ায় চোখ এড়িয়ে গেছে। আবার প্রথম থেকে এক এক করে সব রোল নাম্বার চেক করা শুরু করলাম। খুঁজে পেলাম না আমার রোল নাম্বার। আতঙ্ক ভর করা শুরু করল। বার বার, হাজার বার চেক করেও নিজের রোল নাম্বার না পেয়ে বুঝে ফেললাম ফেল করেছি। ফ্যাল ফ্যাল করে রেজাল্ট শীটের দিকে তাকিয়ে রইলাম। বুক ভেঙে কান্না আসতে শুরু করল। কিন্তু চেপে রাখলাম। বুঝলাম সর্বনাশ হয়ে গেছে।

কতক্ষণ ওভাবে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলাম মনে নাই। হুশ ফিরে এলো খোকনের ডাকে। বত্রিশ দাঁত বের করে বিশাল খুশি চেহারা নিয়ে দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে নিজের রেজাল্ট জানালো। স্টার মার্কসহ ফার্স্ট ডিভিশন, ছয় সাবজেক্টে লেটার পেয়েছে। তারপর আমাকে জিজ্ঞেস করলো, “তর খবর কী?”

বললাম খবর নাই, কোথাও আমার রোল নাম্বার নাই, মানে ফেল করেছি। বলেই কেঁদে ফেললাম।

আমাকে কিছু না বলে এবার খোকন নিজে খোঁজা শুরু করল আমার রোল নাম্বার। খোকন শুরু করলো সেকেন্ড ডিভিশনের লিস্ট থেকে। একটু পরেই চীৎকার দিয়ে উঠলো, “ওই বেটা, তুই তো সেকেন্ড ডিভিশন পাইছস।”

আমি ভেবেছি খোকন আমার সাথে ইয়ার্কি মারতেছে। পাত্তা দিলাম না। আমার কোনো এক্সপ্রেশন নাই দেখে আমাকে ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল সেকেন্ড ডিভিশনের লিস্টে আমার রোল নাম্বার। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারতেছিলাম না।

অনেকবার দেখার পর সত্যি বুঝলাম আমি পাশ করেছি।

তখন মনে হচ্ছিল আমার রোল নাম্বারটা যেন লিস্টের মাঝখানে নিওন বাতির মত জ্বল জ্বল করছে। দেখে পুরো বুক জুড়ে বিরাট স্বস্তি, শান্তি আর আনন্দের ফল্গুধারা বয়ে গেল।

খোকন বিরক্ত হয়ে বার বার বলতে লাগলো, কেন আমি থার্ড ডিভিশন পাব বলে ধরে নিলাম। শুধু অংকে আমি খারাপ করেছি। অন্য সব সাবজেক্টে আমি তো এভাব এভারেজ।

বন্ধুদের কাছে আশ্চর্যের বিষয় হল, আমি কেমন করে এত কাঁচা হওয়া সত্ত্বেও অংকে ৩৫-এর আনসার করে ৩৫ই পেলাম। এটা নাকি ওয়ার্ল্ড রেকর্ড। হিসাবে গরমিল হয়েই কেল্লা ফতে হয়ে যেত।

মার্ক শীট হাতে পাবার পর দেখি সর্বমোট ৫৫২ নম্বর পেয়েছি। আর ৪৮ নম্বর পেলে আর্টস থেকেই ফার্স্ট ডিভিশন হয়ে যেত। ওটা আমার প্রিয় বন্ধুদের বয়ান। আমি স্বপ্নেও অমন কথা ভাবি নাই। আমার আগাগোড়া টার্গেট ছিল সব কিছুতেই একটা সেকেন্ড ক্লাস পাওয়া, অতটুকুই আমার জন্য যথেষ্ট ছিল। তার বেশি একটুও নয়। কারণ আমি সারাক্ষণ বইয়ে মুখ গুজে থাকার বান্দা ছিলাম না কোনোদিন।

এখন আর কেউ ৩৩-এর মর্যাদা বোঝে না, ৩২-এর কষ্ট বোঝে না। কারণ এখন আর আমাদের সময়ের নিয়মে মার্কিং করা হয় না। যুগ পাল্টেছে, নিয়ম পাল্টেছে। এখন বলে জিপি এ, গোল্ডেন জিপি এ। পরে হয়ত দেখব সিলভার জিপি এ, প্লাটিনাম জিপি এ। যত যাই বদলাক না কেন, আমাদের কাছে ৩৩-এর মর্যাদা কখনো একটুও কমবে না।

২১/১১/২০১৪

Tagged with:

About Author

মুরাদ হাই
মুরাদ হাই

জন্ম হাতিয়ায়। ১৯৬০ সালের ৯ অক্টোবর। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। পড়তেন মার্কেটিং বিভাগে। থাকতেন সূর্যসেন হলে। ১৯৮৯ সালে পাড়ি জমান নিউইয়র্কে। সে অবধি সেখানেই আছেন। দুই ছেলে রেশাদ ও রায়ান ছাত্র, স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা স্কুলের শিক্ষিকা।