page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

অা লিটারারি ইনসটলেশন বাই হে ফেস্টিভাল

salahus56

আবারো বাংলাদেশী বড় লোকদের সাহিত্য সম্মেলন শুরু হইবে। মূলত ইংরেজী ভাষার এই সাহিত্য সম্মেলন নিয়া প্রথম বারে খুব, দ্বিতীয়বারে কম আর তৃতীয়বারে তেমন প্রতিবাদ হইতেছে না দেখা গেল।

বড় লোকেরা শান্ত স্বভাবের হন। তারা জানেন উত্তেজনা দিনে দিনে মিইয়ে আসে। তারা তাদের কাজটা করে গেলেই চলবে। প্রতিবাদকারী বিনে যেহেতেু বাদবাকি সব তাদের পক্ষেই আছেন। সমস্ত রকম প্রিভিলেজ পাওয়ার পরও কী সাহিত্য তারা উৎপাদন করেন সে বিষয়ে কিন্তু সমাজ তেমন বুঝে উঠতে পারে না।

salahuddins1

গত দুইবারে পারে নাই, এবারেও পারবে না। বড় লোকের কারবার হিসাবেই এই সাহিত্য চর্চা থাইকা যাবে। তাদের না-বুঝতে পারা দিয়ে বড় লোকেরা আমাদের আরো ছোট লোক কইরা রাখেন আর কি!

তাদের কোনো আয়োজনে আমি যাই নাই। এবারও যাব কিনা জানি না। শ্রেণীঘেন্না অন্তত বড় লোকদের বিষয়ে আমার নাই। ছোট লোকদের বিষয়ে কিছু থাকলেও থাকতে পারে। ছোট লোকের পাতে খাইতে আমার যেমন আপত্তি আছে বড় লোকের পাতে খাইতে তেমতি আগ্রহও তো আছে। ফলে ওই দিকে না-যাওয়ার কারণ লিটারারি আগ্রহ না-পাওয়া। আমি চাইছি, তাও পাই নাই। বরং আমার না-যাওয়া তাদের একটা সমালোচনা হিসাবে হাজির রাখার কথা মনে হইল। এতে দশের কিছু লাভ ঘটতে পারে।

তাদের আয়োজন সূচি আমি পড়ে দেখছি প্রতিবারে। শুনছি লোকেদের কাছে যারা গেছেন দেখতে। পুরা আয়োজনটা তারা একটা ইনসটলেশন হিসাবে সাজান বইলা আমার মনে হইল। ইনসটলেশন দেখার সৌভাগ্য কয়েকবারই হইছে। নীরব, শীতল, ভদ্র এবং বিশেষ বিশেষ আলোকক্ষেপণ কাজে লাগায়ে ইনসটলেশন হাজির হয়। প্রাত্যহিক চোখে দেখা জিনিস দিয়ে বানানো এসব আর্টওয়ার্ক দেখতে তো ভালোই লাগে। সব মিলায়ে-ঝিলায়ে কিছু একটা ‘মেসেজ’ পাওয়া যায়। মনে হয় বাহ! ভালোই তো।

অ্যান্ড্রু মিলার ও অন্যরা। হে ফেস্টিভাল, ঢাকা ২০১১

অ্যান্ড্রু মিলার ও অন্যরা। হে ফেস্টিভাল, ঢাকা ২০১১

এই হে-ওয়ালারা তাদের আয়োজন এমন কইরা সাজায় শুনছি। এখানে-সেখানে গুচ্ছে-গুচ্ছে কবিতা, গদ্য, আর্ট, লেঙ্গুয়েজ ঘুরে ঘুরে দেখা। শ্রোতার চাইতে বক্তার সংখ্যা বেশি। যার যা মন চায় সে সেটা শুনল। ইচ্ছা হইল তো গেল গা। নিও লিবারাল একটা ফ্লেভার সব জায়গায় তারা দিয়া রাখতে চায়। কোথাও তোমার বাধা নাই। আসলা, বসলা, গেলা গিয়া। যে বুঝার সে বুঝল। যে বুঝল না তো বুঝল না। বুঝলে তুমি সমঝদার হইলা না বুঝলে বেকুব। জোর করার কোনো ব্যাপার তারা মনে হয় রাখেন না। সব আপসে আপ হইলে আর জোরের দরকার কী!

দরকার নাই তেমন। ‘কিছু একটা হইতেছে’—এইটা তারা বুঝাইতে চায়। সুদিন, স্মার্ট, সোভার কিছু একটা। কাউকে সে ছোঁবে না। তারা যেন বা বাইরে থেকে আসছেন ‘বাংলাদেশ’ বুঝতে। তাদের বাংলাদেশ বুঝার তরিকা হইল তন্ত্র-মন্ত্র, সুফি-সন্ন্যাস, লালন, হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্য, কবিতা, ইতিহাস—এসব। আড্ডা-উড্ডা দিয়া ফের গেলেন গিয়া যে যার ডেরায়। মনে একটা সুখস্মৃতি গুন গুন করবে। একটা বাংলা ভ্রমর গুঞ্জন তুলবে কানে কানে। আহা কী মিহি হেমন্তের বিকেল ছিল সেটা!

একটা গুলশান-বনানীর ফাস্টফুড শপের মতো কালচার আছে তাদের। একটু পোস্টমডার্নিটি কায়েমের ব্যস্ততা বেশ-ভুষায়, কথা বলায়। পাশের টেবিলে যেন নিজেদের শব্দ না-যায়, টুংটাঙের উচ্চতায় ছাড়াবে না আওয়াজ। অন্যের প্রাইভেসিতে নিজেরে আরোপ না-করার কায়দা রপ্ত করার মতো এটা ব্যাপার। এ জন্য গুচ্ছ, গুচ্ছ আড্ডা তারা একই সময়ে আয়োজনে রাখছেন। সাহিত্যরে এভাবে ব্যক্তিক কইরা তোলায় মনে হইতে পারে তারা খুব পোস্টমডার্নিটি বুঝেন আর কি। ছোট লোকেরা যদিও ভাবতে পারে আখের গোছানোর ফন্দি। যার ইংরেজি মনে হয়, প্রোমোশনাল অ্যাক্টিভিটিস! পলিটিক্যাল বায়াসনেস তাদের নাই। মৃদুমন্দ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাটা না রাখলে হয় না যদিও।

পরবাসীদের লিটারাররি মোলাকাতের একটা অনুষ্ঠান এই হে—এইটা ভাবলে গুনাহ হবে না মনে হয়। ডায়াস্পোরা নামে যা চলতেছে এখন। বেশির ভাগ অতিথি, লেখক দেখলাম তাদের এই বৈশিষ্ট্যওয়ালা। সিলেকটেড লিটারাচারও এই ঢঙের। কিছুটা নার্সিসিস্ট অভ্যাস আছে তাদের আয়োজনে। তো এইটার নাম হে ডায়াস্পোরা ফেস্টিভ্যাল রাখলে মোর অ্যাকুরেট হইত আর কি।

তাদের বাংলাদেশরে ‘ঋদ্ধ’ করার একটা ইচ্ছাও তো আছে। এইটা মনে হইল টেকনোলজিক্যাল লিটারেচার হাজিরের কারণে। গতবার নাকি তারা ‘ইলাস্ট্রেটেড নভেল’ দেখাইছিলেন। এবারও কিছু একটা হয়তো সায়েন্টিফিক দেখাবেন। এ দেশে তন্ত্র-মন্ত্রের লগে যথেষ্ট সায়েন্স মেশানির আগ্রহ কিন্তু আবার তাদের আছে। বিদেশীদের দিয়া শিক্ষিত কইরা তুলতে চান তারা এই দেশের সাহিত্যরে। এমনটাও কিন্তু আছে। দেশীর চাইতে বিদেশী আলেমদের সংখ্যা বেশি। তাদের গুরুত্ব বেশি, তারা বলবেনও বেশি। উপরন্তু ইংরেজীতে। তাদেরটা আমারা বুঝব, আমাদের লেখকদেরটা তারা বুঝলেন না। তাতে কী আসল বা গেল?

Like shamprotik on Facebook

আশির দশকের সাহিত্য পলিটিক্সে আটকে আছেন তারা। এইটুক তালুক তো ছাড়তেই হয়। নইলে নিজেদের আমদানি ঘটানির উপায় কী আর? ফলে ঔপনিবেশিক একটা কৌশল এইখানে তাদের আছে। যে কারণে বাংলা একাডেমীর আশ্রয় তাদের দরকার হয় খুব।

তাদের দেশীয় কিছু খাদেম আছেন। নিজেদের আসন বজায় রাখতে যারা ব্যস্ত থাকেন। তারা দেশী লিস্টি ধরায়া দেন, আর বড় লোকেরা বিদেশী। দুইয়ে মিলে স্বাধীন বাংলার সাহিত্য উৎসব হে। এবারও কি দেখতে যাওয়া হবে আমার?

About Author

সালাহ উদ্দিন শুভ্র
সালাহ উদ্দিন শুভ্র

লেখক, সাংবাদিক, সমালোচক ও ঔপন্যাসিক। 'নতুনধারা' পত্রিকায় প্রকাশিত উপন্যাস 'গায়ে গায়ে জ্বর'। ধারাবাহিক উপন্যাস 'নেশা' ছাপা হচ্ছে atnewsbd.com-এ।