page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

‘অ্যানথ্রোপয়েড’—হিটলারের থার্ড ইন কমান্ডকে হত্যার সত্যি ঘটনা

হলিউড আর ইউরোপিয়ান দেশগুলিতে সিনেমার জন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ খুবই নিয়মিত একটা বিষয়। হলিউড আর ইউরোপিয়ান দেশগুলিতে প্রতি বছরই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে একাধিক সিনেমা তৈরি হয়। এই বছর, অর্থাৎ ২০১৬-তেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে বেশ কয়েকটা সিনেমা আছে। ব্রিটিশ সিনেমা অ্যানথ্রোপয়েড তার মধ্যে একটা।

অ্যানথ্রোপয়েড সিনেমায় বড় কোনো স্টার নাই, এই সিনেমার পরিচালকেরও আগে কোনো উল্লেখযোগ্য ছবি নাই।

নতুন সিনেমা, ৯ সেপ্টেম্বর রিলিজড হইছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার একটা গুরুত্বপূর্ণ সত্য ঘটনা এই সিনেমার কাহিনি। উপরের এই দুইটা কারণেঅ্যানথ্রোপয়েড দেখা শুরু করি। এই সিনেমা দেখার আগে এটার ট্রেলারও দেখি নাই।

১৯৩৮ সালের সেপ্টেম্বরে জার্মানির মিউনিখে হিটলারের সাথে ফ্রান্স, ইতালি ও গ্রেট ব্রিটেনের লিডারদের একটা কনফারেন্স হয়।

সেই কনফারেন্সে হিটলার হুমকি দেন জার্মানির প্রতিবেশী দেশ চেকোশ্লোভাকিয়াকে জার্মানির হাতে না তুলে দেওয়া হলে তিনি যুদ্ধ শুরু করবেন।

reinhard-heydrich

রাইনহার্ড হাইডরিক (১৯০৪-১৯৪২)

হিটলারের হুমকির কারণে কেউ আর চেকোশ্লোভাকিয়ার সাথে জোট গঠন করে না। শক্তিশালী জার্মানির বিরুদ্ধে কারো সহযোগিতা না পেয়ে নিজেদের আর্মি নামিয়ে নেয় তারা। কোনো যুদ্ধ ছাড়াই চেকোশ্লোভাকিয়া দখল করে নেয় জার্মানি।

এতে চেকোশ্লোভাকিয়ার প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ হিটলারের দখলে চলে আসে। চেকোশ্লোভাকিয়া দখলের পরবর্তী ফলাফল হিসেবে পরের বছর, ১৯৩৯ সালে জার্মানি পোল্যান্ড দখল করে। আর এতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পুরোদমে শুরু হয়।movie-review-logo

চেকোশ্লোভাকিয়ায় যাতে নাৎসি বিরোধী কোনো প্রতিরোধ গড়ে উঠতে না পারে সেজন্য হিটলার তার থার্ড ইন কমান্ড রাইনহার্ড হাইডরিককে চেকোশ্লোভাকিয়ার রাজধানী প্রাগে পাঠিয়ে দেন।

এই রাইনহার্ড হাইডরিক ছিলেন হলোকাস্ট বা ইউরোপের ইহুদিদের নির্বিচারে হত্যা করার প্রধান আর্কিটেক্ট। এইভাবে হত্যা করাকে হিটলারের নাৎসি বাহিনি নাম দিয়েছিল ইউরোপের ইহুদিদের জন্য ‘ফাইনাল সল্যুশন’।

হাইডরিকের নৃশংসতার জন্য তার নাম হয়েছিল দ্য বুচার অব প্রাগ—প্রাগের কসাই। হাইডরিকের সম্পর্কে হিটলার বলেছিলেন, ‘দ্য ম্যান উইদ দ্য আয়রন হার্ট’।

সিনেমার কাহিনি শুরু হয় ১৯৪১ সালে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। চেকোশ্লোভাকিয়া হাইডরিকের নিয়ন্ত্রণে আছে। চেকোশ্লোভাকিয়ার সরকার ব্রিটেনে নির্বাসিত। চেকোশ্লোভাকিয়া সরকারের দুইজন এজেন্ট জোসেফ ও ইয়ান গোপনে প্যারাসুট দিয়ে তাদের দেশে নামে।

অনেক ঝামেলা পার হয়ে তারা প্রাগে পৌঁছায়। সেখানে তারা চেকোশ্লোভাকিয়ান রেজিসট্যান্সের সাথে দেখা করে।

জোসেফ ও ইয়ান তাদের জানায় লন্ডন থেকে চেকোশ্লোভাকিয়ান সরকার তাদের দুজনকে একটা মিশনে পাঠিয়েছে। রাইনহার্ড হাইডরিককে হত্যা করতে হবে।

লোকাল রেজিস্ট্যান্সের প্রধান ল্যাডিস্ল্যাভ এতে আপত্তি করে—হাইডরিককে হত্যা করার চেষ্টা করলে জার্মান বাহিনি চেকোশ্লোভাকিয়াকেই পৃথিবীর ম্যাপ থেকে মুছে ফেলবে। লোকাল রেজিস্ট্যান্স যার পরামর্শে চলে, সেই হ্যাজস্কি তাদের দুজনকে সাপোর্ট করে এবং এই মিশনে সাহায্য করতে থাকে।

anthropoid-289

হ্যাজস্কি তাদেরকে স্থানীয় একটা ফ্যামিলিতে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দেয়।

হাইডরিককে কীভাবে হত্যা করা হবে সেই পরিকল্পনা শুরু করে জোসেফ ও ইয়ান। জোসেফই মূলত নেতৃত্ব দেয়। হাইডরিককে হত্যা করার এই অপারেশনের নাম—অপারেশন অ্যানথ্রোপয়েড। হাইডরিক কীভাবে চলাচল করে, কখন সে আর্মড এসকর্ট নিয়ে বের হয়, কখন সাধারণভাবে বের হয় এইসব কিছুর প্যাটার্ন বের করার চেষ্টা করতে থাকে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের এই সত্যি ঘটনা—অপারেশন অ্যানথ্রোপয়েড নিয়েই এই সিনেমা।

তারা কি রাইনহার্ড হাইডরিককে হত্যা করতে পারে? এটা বললে কি স্পয়লার হয়ে যাবে?—না, তা হবে না। কারণ এই প্রশ্নের উত্তর ইতিহাসেই আছে—আর এই সিনেমার কাহিনি সেই ইতিহাসের কথাই বলছে।

তারা রাইনহার্ড হাইডরিককে হত্যা করতে পারে।

পুরা সিনেমা দুই ঘণ্টার। সিনেমার টাইম যখন এক ঘণ্টাতে তখন তারা অপারেশন অ্যানথ্রোপয়েড এক্সিকিউট করে—অর্থাৎ হাইডরিককে আক্রমণ করে।

অ্যানথ্রোপয়েড  সিনেমাতে গল্প বলার ধরন অনেকটাই হলিউডের ছবির মত। তবে হলিউডের সিনেমার চেয়ে ড্রামা কম।

অপারেশন অ্যানথ্রোপয়েড থেকেই সিনেমা ইন্টারেস্টিং হয়ে ওঠে। থ্রিল জমে ওঠে।

প্ল্যান অনুযায়ী অপারেশন অ্যানথ্রোপয়েড এক্সিকিউট করতে পারে না তারা। জোসেফের স্টেনগান ঠিক সময় মত কাজ করে না। হাইডরিক আহত হয়। জোসেফ, ইয়ান এবং এই অপারেশনে অংশ নেওয়া বাকি দুই-একজন সেখান থেকে পালিয়ে আসতে পারে।

হাইডরিককে আক্রমণ করার পরেই নাৎসি বাহিনি আরো ব্রুটাল হয়ে উঠে। এমার্জেন্সি ঘোষণা করে। পুরা প্রাগ বন্ধ করে দেয়, কেউ প্রাগে ঢুকতেও পারবে না, কেউ প্রাগ থেকে বের হতেও পারবে না।

anthropoid-29

হাইডরিক হাসপাতালে মারা যায়। যারা অপারেশন অ্যানথ্রোপয়েড পরিচালনা করেছে, যারা তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছে তাদের খুঁজে বের করতে মারাত্মক বেপরোয়া হয়ে ওঠে নাৎসি বাহিনি। নির্বিচারে চেক নাগরিকদের হত্যা করতে থাকে তারা।

সিনেমাতে অপারেশন অ্যানথ্রোপয়েডের পরের পরের কাহিনি হলো চেকোস্লোভাকিয়ান এজেন্টদের সারভাইভ করার চেষ্টা এবং নাৎসি বাহিনীর অত্যাচার। সিনেমার এই এক ঘণ্টা ইন্টারেস্টিং, থ্রিলিং।

হাইডরিককে হত্যা করার দৃশ্য-অপারেশন অ্যানথ্রোপয়েড বেশ ভালোভাবে কাজ করছে। এই দৃশ্যে ড্রামা তৈরি হয়, তারপরেও যথেষ্ট সাধারণ।

গেস্টাপোদের অত্যাচারের দৃশ্যগুলিতে বোঝানো হয়েছে হিটলার বাহিনি নিজেদের ডমিনেশনের ব্যাপারে কতটা ভয়াবহ রকমের ডেসপারেট ছিল। গেস্টাপো বা জার্মান সিক্রেট স্টেট পুলিশের স্টাইলটাই হয়ত এরকম ছিল।

anthropoid-109

হাইডরিক মারা যাওয়ার পরের প্রাগের ওই জরুরি সিচুয়েশনে, বেপরোয়া নাৎসি বাহিনির হাত থেকে চেকোশ্লোভাকিয়ান এজেন্টদের সারভাইভ করার মধ্যেইঅ্যানথ্রোপয়েড সিনেমার আসল থ্রিল।

নাৎসি বাহিনির সাথে গোলাগুলির একটা লম্বা দৃশ্য আছে। এইটা ঐতিহাসিকভাবে সত্য যে চার্চের মধ্যে মাত্র কয়েকজন চেকোশ্লোভাকিয়ান এজেন্ট টানা ছয় ঘণ্টা নাৎসি বাহিনিকে প্রতিরোধ করে। ছয় ঘণ্টা নাৎসি বাহিনিকে তারা আটকে রাখে। এই কয়েকজন চেকোশ্লোভাকিয়ানদের একজনও লোকাল রেজিস্ট্যান্সের সদস্য না। এরা সবাই চেকোশ্লোভাকিয়ান মিলিটারির সদস্য ছিল।

শেষের দৃশ্য সুররিয়াল। সিনেমার কনক্লুশনের জন্যই এরকম সুররিয়াল দৃশ্য, তবে দুয়েকটা জিনিসের জন্য, খুবই ক্লিশে জিনিসের জন্য এই দৃশ্যটা খুবই ফ্রাস্টেটিং।

অ্যানথ্রোপয়েড সিনেমায় প্রায় সবার অভিনয়ই মোটামুটি। তবে কিলিয়ান মারফি জাস্ট টেরিফিক! অসাধারণ। কিলিয়ান মারফির জেশ্চার, ডায়লগ ছাড়া সিনগুলিতে এক্সপ্রেশন সবকিছু ওভার দ্য টপ। অ্যানথ্রোপয়েডের হিস্ট্রিকাল গুরুত্ব বাদ দিলে এই সিনেমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হল কিলিয়ান মারফির অভিনয়। কিলিয়ান মারফি আগে থেকেই ভালো অভিনয় করে। পিকি ব্লাইন্ডার্স টিভি সিরিজের পর সে আরো অসাধারণ হয়ে উঠতেছে।

অ্যানথ্রোপয়েডে প্রচুর ক্লিশে আছে। একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার যে সিনেমার কাহিনিতে কখনোই চেকোশ্লোভাকিয়ার বাইরের বিষয় আসে নাই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার অন্য কোনো প্রসঙ্গের কথা সিনেমায় উচ্চারণও করা হয় নাই।

এই ঘটনা, এই ফাইট, এই বীরত্ব, এই সাফারিং যে সম্পূর্ণই চেকোশ্লোভাকিয়ার ইতিহাস সেইটাই বলা হইছে।


Anthropoid Official Trailer

রাইনহার্ড হাইডরিককে হত্যার এই ঘটনা অনেক সিগনিফিক্যান্ট। হাইডরিকই সবচেয়ে টপ নাৎসি কর্মকর্তা যাকে যুদ্ধের সময়ে হত্যা করা সম্ভব হয়েছিল। ইউরোপের ১.৩ মিলিয়ন ইহুদি সহ দুই মিলিয়ন মানুষ হত্যার জন্য সরাসরি দায়ী রাইনহার্ড হাইডরিক।

অপারেশন অ্যানথ্রোপয়েডের পরে জার্মান বাহিনি চেকোশ্লোভাকিয়ার অনেক গ্রাম ধ্বংস করে দেয়, অসংখ্য সিভিলিয়ান হত্যা করে নির্বিচারে।

এই সিনেমার আসল গুরুত্ব—এই সিনেমা ইতিহাসের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা ঘটনার কথা বলে। ইতিহাস কখনোই এভয়েড করার জিনিস না, ইতিহাস কখনোই ভুলে থাকার জিনিস না। ইতিহাস ও রকম বলেই আমাদের বর্তমান এ রকম। ইতিহাসের তাৎপর্য অনেক বলেই বিভিন্ন দিক থেকে ইতিহাস ম্যানিপুলেট করার চেষ্টা করা হয়।

anthropoid-1098দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী দেশগুলি সবসময় নিজেদের বীরত্ব আর নিজেদের রাজনৈতিক গুরুত্ব বলতে ব্যস্ত থাকে। চেকোশ্লোভাকিয়া যে যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গেছে তা যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ব্রিটেন, রাশিয়ার বক্তব্যে খুঁজে পাওয়া যায় না।

সিনেমা হিসেবে এটা অসাধারণ কিছু না হলেওঅ্যানথ্রোপয়েড চেকোশ্লোভাকিয়ার ত্যাগ আর যন্ত্রণার সেই ইতিহাস সামনে নিয়ে আসে। এই অপারেশন অ্যানথ্রোপয়েড শুধু চেকোশ্লোভাকিয়ার যন্ত্রণা ও বীরত্বের ইতিহাস। কয়েকজন চেকোশ্লোভাকিয়ান আর্মি যখন চার্চের ভিতরে টানা ছয় ঘণ্টা নাৎসি বাহিনিকে প্রতিরোধ করতে থাকে, জোসেফ বা কিলিয়ান মারফি যখন চার্চের নিচে চিন্তিতভাবে তাকায় তখন হাজার হাজার চেকোশ্লোভাকিয়ানকে নির্বিচারে হত্যা করার ব্যাকগ্রাউন্ড স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কয়েকজন চেকোশ্লোভাকিয়ান মিলিটারির সেই ডেডিকেশন আর ইমোশন পুরা চেকোশ্লোভাকিয়ান জাতিকে ধারণ করে।

বর্তমানে চেকোস্লোভাকিয়া আলাদা দুইটা দেশ। তখনকার সেই চেকোস্লোভাকিয়া ১৯৯৩ সালে চেক রিপাবলিক ও স্লোভাকিয়া—দুই দেশ হিসেবে বিভক্ত হয়ে পড়ে।

অ্যানথ্রোপয়েড সিনেমাটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যাপার সামনে নিয়ে আসে। ১৯৩৮ সালে হিটলারের হুমকির কারণে সম্মিলিত জোট চেকোস্লোভাকিয়াকে সে সময় সাহায্য করে নি, জোটে নেয় নি। এই অপারেশনের পরে, হাইডরিককে হত্যা করার পরে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল মিউনিখ চুক্তি বাতিল ঘোষণা করে, চেকোস্লোভাকিয়াকে সম্মিলিত জোটের শক্তিশালী অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

anthropoid-106

চার্চিল বা সম্মিলিত জোট আসলে চেকোস্লোভাকিয়াকে নিয়ে খুব স্বার্থপর জুয়া খেলেছিল।

পৃথিবীর রাজনৈতিক শক্তিগুলি বা দেশগুলি যখন নিজেদের রাজনৈতিক বক্তব্য প্রচার করে তখন ইতিহাসের খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলি সচেতনভাবে এভয়েড করে। যে ইতিহাস হয়ত অন্য আরেকটি জাতির অস্তিত্বের মতই গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭১ সাল নিয়ে ইন্ডিয়ার বলিউডে যখন কোনো ছবি হয় তখন মূল ১৯৭১ এর মূল ইতিহাস, অর্থাৎ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ খুবই সচেতনভাবে গুরুত্বহীন করে দেওয়া হয়। ইতিহাস নিয়ে এর থেকে জঘন্য ধরনের অন্যায় আর হয় না।

একই অন্যায় হয় যখন সম্মিলিত জোটের দেশগুলি চেকোস্লোভাকিয়াকে নিয়ে বাজে ধরনের জুয়া খেলার কথা সচেতনভাবে এভয়েড করে নিজেদের বীরত্ব প্রচার করে।

About Author

আশরাফুল আলম শাওন
আশরাফুল আলম শাওন

জন্ম টাঙ্গাইলে। পড়াশোনা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।