page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

আইডেন্টিটি ক্রাইসিস

murad hie3

নিউইয়র্কে হাজার সংগঠন বাংলাদেশের। অবাক হবার কিছু নাই। এটাই সত্য। শুনলেই মনে হবে আমরা কত দেশপ্রেমিক। তাই দেশের এত সংগঠন এই শহরে। সারা দুনিয়ার সব দেশের ইমিগ্রান্টদের মিলিয়েও এত সমিতি নাই যা আছে একা আমাদের দেশের মানুষদের।

আনঅফিশিয়ালি দশ লাখ বাংলাদেশী আছে সারা আমেরিকায় । তার ভিতর পাঁচ লাখই বাস করে নিউইয়র্ক রাজ্যে। এই পরিসংখ্যান বেসরকারি সূত্রের । কারণ গুগল করলে সরকারি যে পরিসংখ্যান পাওয়া যাবে সেটা আইনসিদ্ধ ভাবে বাস করা বৈধ ইমিগ্র্যান্টদের ।

বলে রাখা ভালো, বিশেষ করে এই রাজ্যে কারো বৈধ কাগজপত্র না থাকলেও সরকারি সংস্থার মানুষেরা কাউকে খুঁজে বেড়ায় না। যদি না আমরা নিজেরাই ব্যক্তিগত আক্রোশের কারণে ইমিগ্রেশন পুলিশকে ফোন করে আঙুল তুলে দেখিয়ে দেই ।

murad hai 3 logo

পঁচিশ বছর আগে আমি যখন এই শহরে আসি, পরিচিত হই ‘বাংলাদেশ সোসাইটি’ নামের আমাদের দেশের প্রতিনিধিত্ব করা একমাত্র সংগঠনের সাথে। অন্য দেশের যেমন আছে তেমনি আমাদের দেশের নামের এই সংগঠনটি কিছু ভাল আর কর্মঠ মানুষের তত্ত্বাবধানে খুব ভাল কাজ করছিল।

মনে আছে আমার একটা সার্টিফিকেট দরকার হওয়ায় ফোন নম্বর যোগাড় করে যোগাযোগ করলে সমিতির ট্রেজারার (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে ডক্টরেট করছিলেন) নিজেই বাসায় এসে কাগজ পৌঁছে দিয়ে গিয়েছিলেন। খুব ভাল লেগেছিল।

তখন দেশী মানুষ খুবই কম দেখা যেত। পরিচয় না থাকলেও দেশ থেকে এসেছে শুনলে কেমন করে সাহায্য করা যায় সেটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যেত আমাদের প্রবাসী মানুষেরা। কিন্তু সবার প্রিয় সমিতি ছিল একটাই—‘বাংলাদেশ সোসাইটি’। একমাত্র বাংলা পত্রিকা ছিল—ঠিকানা

তখনকার দিনে এই দেশে আসতে পারা এখনকার মত এত সহজ ব্যাপার ছিল না। উচ্চশিক্ষা, চাকুরি সূত্রে ট্রেনিং, কিছু ইমিগ্র্যান্ট ভিসাপ্রাপ্ত ফার্মাসিস্টস, “শীপ জাম্পার “( বিভিন্ন দেশের পণ্যবাহী জাহাজে কর্মরত মানুষ নিউইয়র্ক বন্দরে জাহাজ ভিড়লে চুপিসারে নেমে যেত) এই ছিল আমাদের দেশ থেকে আসা মানুষের ক্যাটেগরি।

তখন মানুষের ভিতর অনেক বেশি দেশী ভাইয়ের প্রতি ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ ছিল।

আওয়ামী লীগ আর বিএনপির সমর্থক ছিল । কিন্তু আজকের মত বিভেদ আর হানাহানি ছিল না। আমার মনে আছে, একবার আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা নিউইয়র্ক সফরে এলে যথেষ্ঠ জনসমাগম দেখানোর জন্য আওয়ামী লীগের সমর্থকরা বিএনপির বন্ধুদেরও ওই সভায় নিয়ে হাজির করেছিল। মূল ব্যাপারটা ছিল বন্ধুদের সাহায্য করা, রাজনীতি নয়।

murad hie 5

নিউ ইয়র্ক ট্রাফিকে বাংলাদেশী

কোথাও কোনো ভাল চাকরির খবর এলে সবাই ফোন করে বলে দিত যেন কেউ বেকার থাকলে ওখানে পাঠিয়ে দেয়া হয়। খুব কম মানুষের গাড়ি ছিল। কোনো অনুষ্ঠানে যেতে কিংবা কারো বাসায় দাওয়াত থাকলে গাড়িওয়ালারা স্বেচ্ছায় বাকিদের বাসা থেকে তুলে আনা, গভীর রাতে পৌঁছে দেয়া এসব দায়িত্ব আনন্দের সাথে পালন করত।

লোকজন কম থাকায় দেশ থেকে কারো পরিচিত কেউ আসার খবর এলে এয়ারপোর্টে যাবার জন্য অনেকেই তৈরি হয়ে যেত। এই শহরের আদি বাসিন্দা এহসানুল হক মিলন (বিএনপির আমলে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী) ও ওনার স্ত্রী নাজমুন নাহার বেবীর বাসা ছিল বলা যায় বাঙালীদের ডাইনিং হল। রাত নাই দিন নাই ভাল খেতে ইচ্ছা করলেই ওনাদের বাসায় দল বেঁধে হাজির হতাম । হাসিমুখে মিলন ভাই নিজে রান্না করে খাওয়াতেন, গভীর রাত পর্যন্ত গল্প করে নিজেই সবাইকে গাড়ি দিয়ে বাসায় বাসায় পৌঁছে দিতেন সুদূর ব্রুকলিন থেকে কুইন্সে এসে। আরো ছিলেন হেলাল ভাই (সূর্যসেন হল সংসদের এজিএস ছিলেন, বর্তমানে কানেক্টিকাটে বসবাস করছেন) । মনে আছে দেশ থেকে আসার দুই দিন পর হেলাল ভাইয়ের বাসায় গিয়ে রাতে ফেরার সময় হঠাৎ অনেক ঠাণ্ডা পড়ে গিয়েছিল। হেলাল ভাই নিজের জ্যাকেট পরিয়ে দিয়েছিলেন আমাকে। যে কোন প্রয়োজনে হেলাল ভাইকে সব সময় পাশে পাওয়া যেত।

তখন ছিল না কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, নিজের গাড়ি-বাড়ি কিছুই। ছিল না অনেকেরই বৈধ কাগজপত্র। ছিল না অনেক বাংলা পত্রিকা, বাঙালী রেস্টুরেন্ট, অনেক বাঙালী গ্রোসারি। জ্যাকসন হাইটস তখন বাঙালী পাড়া ছিল না। ছিল ইন্ডিয়ান দোকানপাটে ভর্তি। জ্যামাইকাতে বাঙালী বসতি ছোট আকারে গড়ে উঠলেও ওখানেও কোনো বাঙালী দোকান ছিল না। গায়ানিজ দোকান আর পারসন্স বুলেভার্ডের ‘কাবুল” গ্রোসারি ছিল ভাল গরুর মাংস কেনার একমাত্র জায়গা। হালাল হারামের বাতাস তখনো লাগে নাই আমাদের গায়ে। বাঙালী পরিবেশ দেখার জন্য ট্রেনে করে আমরা চলে যেতাম সুদূর ব্রুকলিনের চার্চ ম্যাকডনাল্ডে। ওখানে গেলেই বাংলা কথা শোনা যেত, বাংলা গান শোনা যেত, দেশের রান্না আর মশলার গন্ধ পাওয়া যেত যেটা এখন জ্যামাইকা, জ্যাকসন হাইটস, এস্টোরিয়া, ব্রংঙ্কসে গেলেই ভাল ভাবে টের পাওয়া যায় ।

তখন আমাদের অনেকের বৈধ কাগজপত্র ছিল না। ভাল জব ছিল না। গাড়ি-বাড়ি ছিল না।

নিউ ইয়র্কে নরসিংদী জেলা সমিতির অভিষেক

নিউ ইয়র্কে নরসিংদী জেলা সমিতির অভিষেক

অনেক বাঙালী পত্রিকা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, উকিল, ডাক্তার, সমিতি কিছুই ছিল না। কিন্তু তবুও আমাদের কোন ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিস’ ছিল না। আমরা কোন সমিতি বানাতে চাইতাম না আলাদা আলাদা করে। একমাত্র বাংলাদেশ সোসাইটির ব্যানারে থেকে অনেক সুখী ছিলাম। কোন ভেদাভেদ, দলাদলি কিছুই ছিল না। ছিল কাজের পর অফুরন্ত আড্ডা, হৈ চৈ, খাওয়া-দাওয়া আর দল বেধে টাইমস স্কোয়ারে গিয়ে দশ-বিশ ডলারের বিনিময়ে চোরাই লাইনে দেশে কথা বলতে পারার আনন্দে বিভোর হওয়া।

 

অনেক বেশিদিন ভুলে থাকার সুযোগ হয় নাই যে আমরা সারাক্ষণ ধাক্কাধাক্কি আর হিংসা-বিদ্বেষের দেশ থেকে আসা বাংলাদেশী।

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে প্রথমে ওপি ওয়ান লটারি, পরবর্তীতে ডিভি লটারির মাধ্যমে খুব কম সময়ের ভিতর দেশ থেকে প্রচুর মানুষ আসতে শুরু করে সপরিবারে।

গরীব দেশের মানুষ উন্নত দেশে আসলে দেশের জন্য অনেক ভালো সেটা, কোনো সন্দেহ নাই। কিন্তু অল্প দিনের মধ্যেই এখানে দেশের মতই সব নোংরা কর্মকাণ্ড শুরু হয়ে গেল।

কোন মানুষ খারাপ হয়ে জন্মে না, কিন্তু সঙ্গদোষে খারাপ হয়। মানুষ কাজ করে পয়সা জমিয়ে দেশে পাঠাতে শুরু করে, এখানেও গাড়ি-বাড়ি, ব্যবসা কিনে। ছেলেমেয়েদের ভালভাবে মানুষ করে। সব কিছুই যখন খুব বেশি পরিশ্রম ছাড়াই হাতের মুঠোয় চলে আসে তখন মানুষের মনে বাসা বাঁধে যে কোনো একটা পদবীর, একটা আলাদা পরিচিতির।

কম্যুনিটি বড় হতে থাকে। মানুষ গড়ে তোলে আঞ্চলিক সমিতি।

নিউ ইয়র্কে মাদারীপুর সমিতি

নিউ ইয়র্কে মাদারীপুর সমিতি

একটা একটা করে হতে হতে এখন শুধু জেলা নয় , উপজিলা নয়, থানা নয়, গ্রাম-মহল্লা সমিতিও আছে একাধিক বিভক্তি সহ। আছে দেশের সকল রাজনৈতিক দলের মূল এবং বিদ্রোহী শাখা। এছাড়াও স্কুল, কলেজ ইউনিভার্সিটি, বিভিন্ন পেশা সমিতি, শিল্পীগোষ্ঠী।

এত সমিতি খোদ বাংলাদেশেও আছে কিনা আমার সন্দেহ আছে। এসব সমিতির নির্বাচন হয় হাজার নয়, লক্ষ ডলার খরচ করে। নির্বাচিত কমিটির কর্মকাণ্ডের ভিতর বছরে একবার পিকনিক করা, ইফতার পার্টি, ঈদ পূনর্মিলনী করার ভিতরেই মেয়াদ পার হয়ে যায়। মানুষ এখানে নিজের পরিচয় দেয় কে কোন সমিতির কোন পজিশনে আছে, তাই বলে।

শুধু সমিতি নয়, আছে অসংখ্য বাংলা পত্রিকা। উল্লেখযোগ্য কিছু পত্রিকা ছাড়া বেশিরভাগই এক ব্যক্তি সর্বস্ব। কিছু মানুষ আছে এরা দেশ থেকে কষ্ট করে এখানে এসেও পরিশ্রম করে জীবনের মোড় ঘোরাতে রাজি নয়। তারা বরং একটা পত্রিকা বের করে ইন্টারনেট থেকে দেশের খবর কাট অ্যান্ড পেস্ট করে, স্থানীয় ব্যবসায়ীদের বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে, আর বিভিন্ন সমিতির নির্বাচনের প্রচারের খবর ছাপিয়ে কোনো রকমে জীবন কাটায়। সাংবাদিক পরিচয়ের সূত্রে এরা কন্স্যুলেটের কিংবা দেশীয় বড় মাপের অনুষ্ঠানগুলিতে ফ্রি এক্সেস পায়। অন্যথায় বাঙালী পাড়ার রেস্টুরেন্ট এদের মূল আড্ডাস্থল।

সব চাইতে খারাপ লাগে কিছু টাউট শ্রেণীর মানুষ নিজ দেশের খেটে খাওয়া মানুষের সাথে প্রতারণা করে। এরা অন্য কোনো দেশের মানুষের সাথে এই প্রতারণা করার সাহস পায় না। সুদূর আমেরিকায় এসেও কিছু মানুষ সংকীর্ণতার কারণে এত বিশাল দেশের বিশাল মার্কেটে ঢোকার চেষ্টা না করে শুধু নিজের ছোট কম্যুনিটির উপর নির্ভর করে ।

২০০০ সালের পর থেকে বাড়িঘর কেনাবেচার ব্যবসায়ে আমাদের দেশের অনেক ভাল মানুষের পাশাপাশি কিছু টাউট শ্রেণীর মানুষও জড়িয়ে পড়ে। স্বচ্ছলতা আসার পর সব মানুষ নিজের একটা বাড়ি চায়। এই দেশের নিয়মকানুনে খুব সহজে সামান্য ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ব্যাংক লোন পেয়ে বাড়ি কেনা যেত। কিছু খারাপ রিয়েল এস্টেট এজেন্টের পাল্লায় পড়ে অনেক মানুষ সর্বস্বান্ত হয়েছে। নিজের দেশের খেটে খাওয়া সরল মানুষগুলির সাথে বেঈমানি করে দ্রুত বড়লোক হবার নেশায় ছিল এই বদ এজেন্টরা। কিন্তু তারা বেশিদিন টিকে থাকতে পারে নাই। এদের বেশির ভাগই এখন জেলের ঘানি টানছে।

নিউ ইয়র্কে ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি মৌলভীবাজার জেলা সমিতির দু'গ্রুপ

“নিউ ইয়র্কে মৌলভীবাজার জেলা সমিতি বিলুপ্ত ঘোষণা করে প্রবাসী মৌলভীবাজারবাসীদের ঐক্যবব্ধ করার লক্ষ্যে মৌলভীবাজার ডিষ্ট্রিক্ট সোসাইটি অব ইউএসএ ইনক গঠনের লক্ষ্যে সভা অনুষ্ঠিত হলেও ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি মৌলভীবাজার জেলা সমিতির দু’গ্রুপ।” খবর: কালের কণ্ঠ, ১৯ জানুয়ারি ২০১৫

এই একই খারাপ মানুষগুলি আরো জড়িয়ে পড়েছিল ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি, ইন্স্যুরেন্স জালিয়াতির মত বেআইনি কর্মকাণ্ডে। কিন্তু অন্যায় করে এই দেশে বেশিদিন টেকা যায় না। তার প্রমাণ হিসেবে ওই মানুষগুলি সব হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে আইনের মারপ্যাচে।

নিজের অবস্থান ভুলে কেউ যখন রাতারাতি আকাশ ছুঁতে চায়, স্বীয় যোগ্যতার চেয়ে বড় কিছু হবার স্বপ্ন দেখে, নিজেকে আন টাচেবল মনে করে, তখুনি ওদের পতন নেমে আসে । ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিস’ নিয়ে ভাবনায় থাকা মানুষেরা দেশের, সমাজের, দেশে থাকা আত্মীয়স্বজনের কোন কাজে লাগে না। বরং মাথাব্যথার কারণ হয়ে ওঠে সবার ।

About Author

মুরাদ হাই
মুরাদ হাই

জন্ম হাতিয়ায়। ১৯৬০ সালের ৯ অক্টোবর। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। পড়তেন মার্কেটিং বিভাগে। থাকতেন সূর্যসেন হলে। ১৯৮৯ সালে পাড়ি জমান নিউইয়র্কে। সে অবধি সেখানেই আছেন। দুই ছেলে রেশাদ ও রায়ান ছাত্র, স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা স্কুলের শিক্ষিকা।