page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

আই হ্যাড আ ব্ল্যাক ডগ, হিজ নেইম ওয়াজ ডিপ্রেশন

raka1


চোখ কচলে উঠে পড়ে নারমানা। আজকের দিনটা বিশেষ। আজকে ওর সাথে ঘুরতে যাবার কথা। ১১টা কখন বাজবে তর যেন সহ্যই হচ্ছে না। ১১টার মাঝে ঝটপট তৈরি হয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে।

মলের ঠিক নিচেই অপেক্ষা করছে নিলয়। ওকে দেখেই নারমানার মুখে হাসি ফুটে ওঠে। রাস্তায় এত জ্যামের কথা মুহূর্তে ভুলে হাত দিয়ে নিলয়ের চুল ঠিক করে দিতে দিতে “চুলটাও আঁচড়ে আসতে পারো না” বলে কপট বিরক্তি প্রকাশ করে।

নিলয় একটু করে হাসে। চল মুভি শুরু হবে। টিকেট করে রেখেছি। হাসিমুখে দুজন উপরে উঠে যায়।

মুভির ব্রেকে নিলয়ের ফোনে ভাইবারের মেসেজ বেজে ওঠে “কোথায় তুমি? মিস ইউ।”

ব্যাস। প্রচণ্ড লেগে যায় দুজনের। একটু আগের ভালো সময়ের কথা কারো চিন্তায় আর থাকে না। তিরস্কারে জর্জরিত করে নারমানা শেষে বলে “তুমি আমাকে আর কোনদিন ফোন দিবে না!”

নিলয় প্রাণপণে বোঝানোর চেষ্টা করে যে মেসেজ করেছে সে বন্ধু ছাড়া কিছুই নয়। নারমানার শেষ কথা শুনে চেহারায় কেমন উন্মাদনা ভর করে তার, “তাহলে বলছো আমাদের মাঝে আর কিছু নেই? আমার কিছু হলে তোমার কিছু আসে যাবে না?”

“না,” বলে ঝাঁজিয়ে ওঠে নারমানা।

“আমি কিন্তু বলছি আমি মরে যাবো, আমাকে যখন কোনদিন দেখতে চাও না তখন বেঁচে থেকে কী হবে?”

“মরার কথা আমাকে শুনাচ্ছো কেন? মরতে হলে মরো। শুনাতে হবে?” তাতিয়ে ওঠে নারমানা।

শেষ বারের মত নারমানার মুখের দিকে একবার গভীর ভাবে তাকিয়ে মলের রেলিং টপকে নিচে লাফ দেয় নিলয়।

২.
মুঠো করে ঘুমের ওষুধগুলো ধরে বসে আছে নিহাল। চোখ লাল। আজ কেমন বৃষ্টিভাব। পাগুলো গুটিয়ে কাছে নেয়, পাশে ফেলে রাখা ফোনটা তুলে একটা নাম্বার ডায়াল করেই মুছে ফেলে, কী হবে ফোন করে? নাটকীয়ভাবে বলবে “আমি মারা যাচ্ছি, বিদায়?”

কারো সাথেই আজকাল কথা বলতে ইচ্ছে করে না। আর এখন ফোন ধরে বলবে কথা? থাক। সে না থাকলে কাছের মানুষগুলো তো বুঝেই নিবে কেন এমন করলো সে। আচ্ছা মা কি কাঁদবে খুব? মনে হয়। যাদের কথাগুলো সহ্য করতে না পেরে আজকে… তাদের কি আসবে যাবে? না মনে হয়। আচ্ছা সুইসাইড হটলাইনে ফোন দিলে কেমন হয়? নাহ থাক, কাউন্সিলিং সেন্টারের গতানুগতিক কথার ধারা শোনার ইচ্ছে হচ্ছে না। বাসার মানুষ ফিরে আসবার আগেই যা করবার করতে হবে।

পরের দৃশ্য। হাসপাতালের উইঙে বসে আছে নিহালের বন্ধু তারান্নুম। ওর হাতে নিহালের ফোন। আতিপাতি করে খুঁজেও নিহালের ফোনের কোথাও পাওয়া গেল না নিহালের বাসার কারো নাম্বার। “মেয়েটা বেশি বুদ্ধিমতী!” — মনে মনে ভাবে তারান্নুম। ভেবেচিন্তে কাজ করেছে।

উপায় না পেয়ে নিহালের ফেইসবুকে একটা পোস্ট — নিহালের পরিচিত কেউ যেন তার বাসায় একটু জানায় যে নিহালের রাত কেটেছে হাসপাতালে। সেদিনই রিলিজের পর বাসায় নিয়ে আসে নিহালকে। নিহালের মা ফোন করে অঝোরে কাঁদে, কী করলে নিহাল ভালো থাকবে জানতে চায় বার বার… তারান্নুম ঘুরতে নিয়ে যায় নিহালকে, নিজের অফিস মাথায় তুলে বোকা মেয়েটাকে বুকে আগলে রাখে তারান্নুম।

আই হ্যাড আ ব্ল্যাক ডগ, হিজ নেইম ওয়াজ ডিপ্রেশন


উপরের ঘটনা সত্যি কি? হলেও হতে পারে। কোনো মৃত্যু ক্ষণিকের ক্ষোভের বশে, কোনোটা বা দীর্ঘ সময়ে চিন্তাভাবনা করে এক্সিকিউট করা।

কখন একজন সুস্থ মানুষ মৃত্যুর মত অসুস্থ বিষয় নিয়ে ভাবতে পারে?

ভালোবাসার মত একটা সুন্দর বিষয় থেকে ব্যাপারগুলো কীভাবে এত কলুষিত হয়ে যায়?

ভালোবাসার কাউকে কি এত কষ্ট দেয়া আসলেই সম্ভব? সম্ভব মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া? নাহ, এলোমেলো হয়ে যায় সব চিন্তা।

ফ্রেঞ্চ লেখক Nicolas Sebastien এর একটা কোটেশন দেই। তিনি মৃত্যুর আগে লিখে রেখে গেছেন, “And so I leave this world, where the heart must either break or turn to lead.” কথাটা বড় নির্দয় হলেও সত্য। আসলে, জীবনে কিছু মুহূর্ত আসে যখন বোঝা যায় না খুশি হওয়া উচিত নাকি দুঃখ পাওয়া উচিত?

আমাদের নিজের জীবনে কি শুধুই নিজের দাবি? আমাদের জীবনের উপর তো বাবা মা ভাই বোন ভালোবাসার মানুষ সবার দাবি আছে। কী হবে নিজেকে শেষ করে দিয়ে? বেঁচে থাকা যে অসহ্য সুন্দর! দেখার যে অনেক কিছু আছে। আছে অনেক কিছু করার। সেটা কি এই বিষণ্ণতার মারপ্যাঁচে ডুবে যাওয়া ছেলেমেয়েগুলো কোনদিন বুঝবে?

প্রেসিডেন্ট উইনস্টন চার্চিল এবং আব্রাহাম লিঙ্কণ প্রচণ্ড বিষণ্নতায় ভূগতেন। চার্চিলের সাথে তার বাবার সম্পর্ক বেশ খারাপ ছিলো। পরিবার থেকে বিছিন্নতা বিষণ্নতার একটি মেজর লক্ষণ। ৩৫ বছর বয়স থেকে তার বিষণ্নতা প্রকট আকার ধারণ করে। সুইসাইডাল চিন্তা শুরু করেন তিনি। নিজের বিষণ্নতা কাটিয়ে উঠবার জন্য শুরু করেন প্রচুর মদ্যপান। শেষ বয়সে এসে আলজাইমারসে ভোগা শুরু করেন। চার্চিল তার বিষণ্নতাকে কখনোই পুরো কাটিয়ে উঠতে পারেন নি। কিন্তু শিখে যান নিয়ন্ত্রণ করতে। নিজের কাজগুলো বিষণ্নতার মাঝেই গুছিয়ে করে নিতে অভ্যাস করে তোলেন ধীরে ধীরে।

ঠিক কতটা বিষণ্ণ হলে বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাই মরে যায়? যখন এমন হয় তার কাছের মানুষগুলো কি এই বিষণ্ণতা ধরতে পারে না? নাকি ধরতে পেরেও উপেক্ষা করে যায়? বিষণ্ণতা এক বড় ভয়ানক “অসুখ”।

মন মরে গেলে যে সবই মরে যায়। একটা সময় বিষণ্ণতাকে বড়লোকি অসুখের পর্যায়ে ধরা হত। কারণ যার অন্নবস্ত্রের চিন্তা নেই তারই বিষণ্ণতা হয়। কবি জীবনানন্দ সচ্ছল ছিলেন না কিন্তু তার কবিতা জুড়ে কেবলই বিষণ্ণতা। জাফর স্যার (মুহম্মদ জাফর ইকবাল) প্রজন্মের বিষণ্ণতা নিয়ে একবার একটা লিখা দিয়েছিলেন। লিখা পড়ে কেন যেন ভালো লাগে নাই। স্যারও ইনিয়ে বিনিয়ে বিষণ্নতাকে বড়লোকি অসুখের কাতারেই যেন ফেলার চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন।

বিষণ্নতা যে কোন বয়সে যে কোন কারণেই হতে পারে। প্রেমে হেরে গিয়েই কেবল এমনটা হবে অথবা যাদের অভাব নেই তাদেরই হবে এমন কথা নেই। পারিবারিক কারণ, ক্যারিয়ার, এমনকি কোন কারণ ছাড়াও বিষণ্ণতা হয়।

বিষণ্নতায় ভোগা লোকজন নিজের থেকে পালিয়ে বেড়ায়। একটা সময় পালিয়ে বেড়ানোটা আর এনাফ হয় না। সব সময়ের কষ্টগুলো এক হয়ে যায়। তখন ইতি টানে সবকিছু থেকে। কাছের মানুষগুলো তখন কিছুই করতে পারে না।

বাট দে কুড হ্যাভ সেইভড অ্যা লাইফ ইফ দে কেয়ারড অ্যা লিটল। আমাদের চারপাশে বাস করা মানুষগুলোকে একটুখানি স্বপ্ন, একটুখানি আশা ফিরিয়ে দেওয়া কি খুব কঠিন? “A lot of you cared, just not enough. Not enough to save a life.”

ডিপ্রেশনে হেল্প সিক করা উচিত। মেডিকেশন ক্যান হেল্প। কাউন্সিলিং নেয়া যেতে পারে। তাও না হলে কাছের বন্ধু পরিবারের সাথে শেয়ার করা যেতে পারে।

ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের ডিপ্রেশন নিয়ে একটা সচেতনতা মূলক ভিডিও লিঙ্ক নিচে:


আই হ্যাড আ ব্ল্যাক ডগ, হিজ নেইম ওয়াজ ডিপ্রেশন – ইউটিউব ভিডিও

 

About Author

তাসপিয়া রাকা
তাসপিয়া রাকা

জন্ম. ঢাকা, নভেম্বর ১৯৮৯। পরিবেশ প্রকৌশলী (এনভারমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং) ইউনিভার্সিটি অফ ব্রিটিশ কলাম্বিয়া (ইউ বি সি), ভ্যাঙ্কুভার, কানাডা ল্যাবরেটরি অ্যানালিস্ট, ম্যাক্সাম অ্যানালেটিকস, ক্যালগরি ফ্রি ল্যান্সার অনুবাদক/ কনসালট্যান্ট। লিংক: পার্সোনাল ব্লগ