page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

আখাউড়া জংশনের আবিষ্কারক দুপুর

এরপর বড় হওয়ার আগ পর্যন্ত—আরো ভালোভাবে বললে ক্লাস সেভেনের বছর নাজির রোড ছাইড়া গাজী ক্রস রোডে বাসা ভাড়া নেওয়ার আগ পর্যন্ত—তারো ভালোভাবে বললে, সেই বছরই কোত্থেকে যেন নাজির রোডে আইসা বিল্ডিং বানাইয়া বাপ-মা সহ থাকতে শুরু করা রাদিয়ার প্রেমে পড়ার আগ পর্যন্ত কোনো না কোনোভাবে পরীরে আমি নিজের সঙ্গেই রাখতে পারছিলাম। জাস্ট রাইখা দেওয়া। কাজে লাগলে কাজে লাগানো, আর না লাগলে দীর্ঘদিন ভুইলা থাকায় থাইকা তবুও থাইকা বেড়ানোর একটা পর্যায় পর্যন্ত সে ছিল।

আর পিছনে, সুপারেন্টেন্ট হুজুরের দেওয়া তাবিজ তুমায় আচ্ছাদিত আমার যেই জীবন, সে জীবনের নব্বই পার্সেন্টই হইয়া ওঠে কল্পনানির্ভর। যেহেতু দৃশ্যমান জীবনের কাহিনিহীনতা ও নিরুত্তেজনায় আমি ছিলাম টায়ার্ড। স্কুল, বিরক্তিকর পড়াশোনা, বিকালের দিকে ক্রিকেট খেলার চেষ্টা—তাও আবার কোনোদিন টিমে চান্স পাওয়া আর কোনোদিন না-পাওয়ার যন্ত্রণা সবমিলে আবারো আমি সবকিছু ছাইড়া ছুইড়া লালমনিরহাট চইলা যাওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করি।

tanimlogo2

কিন্তু এরমধ্যে স্কুলে পিটিআই’র এক ট্রেনিং ম্যাডাম আইসা আমাদের ইংরেজি ক্লাস নেওয়া শুরু করে। ব্যাপার হইলো, প্রথম ক্লাসেই ম্যাডাম আমার মন জয় কইরা নেয়!

অসম্ভব ভালো লাইগা যায় ম্যাডামরে। ক্লাসের পুরাটা সময় আমি তার দিকে তাকাইয়া থাকার কাজে নিযুক্ত হই। ডায়াসে থাকলে তো বটেই, এছাড়া ক্লাসে পায়চারিরত ম্যাডামকে অবলম্বন কইরাও আমার তাকাইয়া থাকা অব্যাহত থাকে। এবং আমার ঘাড় যেসব অ্যাঙ্গেলে আগে ঠিকমতো বাঁকতে পারতো না, মুহুর্মুহু মটকা ফুটার মধ্যদিয়া ঘাড়ের সেইসব অ্যাঙ্গেলও ফ্রি হইতে শুরু করে। শুধু যখন, একদম আমার বেঞ্চের কাছে আইসা পড়তো ম্যাডাম—যখন তারে দেখতে হইলে আকাশের দিকে তাকানোর ভঙ্গি করা বাধ্যতামূলক—তখন তারে দেখতে পারতাম না। পরিবর্তে তার গন্ধ পাইতাম যদিও, কিন্তু সেই গন্ধের আলাদা কোনো তাৎপর্য—তখন পর্যন্ত অর্জিত বিদ্যায় অনুধাবনযোগ্য ছিল না।

সে যাই হোক—একদিন ম্যাডামরে স্বপ্ন দেখলাম আমি। দুপুরের পরে আমাদের একটা ঘুমের ক্লাস হইতো—ফেনীর আলীয়া মাদ্রাসা প্রাইমারি স্কুলে। ক্লাসটা ছিল এরকম; বেত হাতে কোনো একজন রাগী ম্যাডাম বা স্যার আইসা ঢুকতো, ঢুইকাই সবাইরে ঘুমাইয়া পড়তে বলতো। তখন আমরা সবাই বেঞ্চিতে বইসা টেবিলে মাথা রাইখা ঘুমাইয়া পড়তাম, চল্লিশ মিনিট ঘুমাইতে হইতো। স্যার ম্যাডামরা বেত হাতে ক্লাসরুম প্রদক্ষিণ করতো, যদি বুঝতো কেউ আসলে না ঘুমাইয়া ফিঁসফাঁস কইরা নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলতেছে—ধুমাইয়া পিটাইতো। কে যে পিটা খাইতেছে—জাইগা উইঠা ওই দৃশ্য দেখারও উপায় ছিল না, কেননা যেকোনো টাইপ অব জাগরণেই মাইর বরাদ্দ ছিল।

ফেনী আলিয়া প্রাইমারি স্কুল। ছবি. শুভ নীল পিকলু ২০১৪

ফেনী আলিয়া প্রাইমারি স্কুল। ছবি. শুভ নীল পিকলু ২০১৪

স্বপ্নে দেখলাম আমি আর ম্যাডাম—দু’জনই আমরা নদীর পাড়ে অবস্থিত কোনো একটা প্যাকেটজাত খাদ্যের ফ্যাক্টরিতে কাজ করি। আমি হইলাম ম্যাডামের বস। তো ফ্যাক্টরিতে ম্যাডামের কী একটা কাজে ভুল হইছিল জন্য মালিকপক্ষ তারে ভাগাইয়া দিতে চাইছিল। কিন্তু আমি বাগড়া দিয়া ম্যাডামরে ফ্যাক্টরিতে, আগের পজিশনেই রাইখা দিছি। এ-কারণে ম্যাডাম আমার ওপর খুবই কৃতজ্ঞ, কিন্তু বিনিময়ে আমারে কী দিবে বুঝতেছে না।

ম্যাডাম ম্যাডাম কইয়া সশব্দে জাইগা উঠি আমি। চোখ কচলাইয়া দেখি বেত হাতে নিয়া রাইগা শক্ত হইয়া থাকা জাহেদা ম্যাডামরে। ইনি পার্মানেন্ট, খুব মাইরধর করেন।

কী?

না ম্যাডাম, মানে স্বপ্ন দেখছি।

কী দেখছিস?

[নীরবতা, মাথা নিচু]

মৃদু বেতের বাড়ি দিয়া আবারও জিগান: বলছিস না কেন!

ট্রেনিং ম্যাডামরে স্বপ্নে দেখছি ম্যাডাম!

অ্যা! কোন ট্রেনিং ম্যাডাম—ইংলিশ?

জ্বী ম্যাডাম।

ক্লাসের সবাই হাসতে হাসতে ঘুম থেইকা গড়াইয়া পড়লো। শুধু এক তূর্ণা জাহিদা ছাড়া, সে আগের মতোই ঘুমাইয়া থাকলো—কেননা সে ক্লাস ক্যাপটেন।

পরেরদিন ইংরেজি ম্যাডাম আইসা আমার সামনের টেবিলে বসলো। বললো, তুমি নাকি আমাকে স্বপ্ন দেখেছো?

জ্বী ম্যাডাম, আপনি আমার খুব প্রিয়।

হা হা হা, তাই? কেন প্রিয়, কী দেখেছো স্বপ্নে?

এদিকে, ম্যাডাম ও আমার যেকোনো কথায়—তূর্ণা জাহিদা ছাড়া বাকি সবাই হাইসা গড়াগড়ি খাইতেছিল বিধায়, আমি ‘এইখানে ডিটেইল কিছু বলা সম্ভব না’—জানাইয়া দিলাম তারে। হয়তো আমি ভাবছিলাম ডিটেইল শোনার জন্য ম্যাডাম আমারে আর কোথাও ডাইকা নিয়া যাবে! কিন্তু তার বদলে সবাইরে শান্ত হইতে বইলা ম্যাডাম ক্লাস নিতে শুরু করলে আমি বিমর্ষ হইয়া পড়ি। এবং আমার মনে হয়, এই যে আমি ম্যাডামরে স্বপ্নে দেখলাম, এত পছন্দ করি ম্যাডামরে—এগুলা কি জাস্ট হাস্যকর বিষয়? আমার ভালোবাসার কি কোনো দাম নাই!

জহির রায়হান মিলনায়তন। ছবি. লেখক, ২০০৮

জহির রায়হান মিলনায়তন। ছবি. লেখক, ২০০৮

জহির রায়হান মিলনায়তন। ছবি. লেখক, ২০০৯

জহির রায়হান মিলনায়তন। ছবি. লেখক, ২০০৯

লেইজার পিরিয়ডে কয়েকজন বন্ধুর সাথে স্কুল মাঠ পার হইয়া, মসজিদের পুকুর পার হইয়া জহির রায়হান মিলনায়তন (২০০৯-এ ভাইঙ্গা ফেলছে) চইলা গেলাম জয়নাল হাজারীরে দেখতে। সেখানে কোনো একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে আসছেন তিনি। আমরা জয়নাল হাজারীর ভক্ত ছিলাম, কার যেন শিখাইয়া দেওয়া নিয়মে অঞ্জন দত্তের ‘মাথার ভিতর ছিল এলভিস প্রিসলি’রে চেঞ্জ কইরা আমরা ‘মাথার ভিতর ছিল জয়নাল হাজারী / খাতার ভিতর তোমার নাম’ গাইতাম। অনুষ্ঠান শেষে জয়নাল হাজারী যখন বাইর হইয়া যাচ্ছেন, আমরা আগায় গিয়া তার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করলাম।

ফিরা আইসা স্কুলে ঢোকার সময় ট্রেনিং ম্যাডামরে দেখলাম অন্য একটা ক্লাসে ঢুকতেছে। এ দৃশ্যে আমার মনে হইলো, ‘মাথার ভিতর ছিল জয়নাল হাজারী / খাতার ভিতর তোমার নাম’। তারপর ভাবলাম, লালমনিরহাট চইলা যাই বরং—বড় হইয়া আসি। এ ব্যাপারটা বেশ তীব্রভাবেই হইতো। মনে হইতো, আমি কেন বড় না! অথচ বড়দের জন্য তৈরি হইয়া থাকা সবকিছুই তো আমিও বুঝতেছি, ফিল করতেছি। তবু এক অনাবশ্যক ‘নো এক্সেস’—কী তার প্রয়োজন?

ইত্যাকার বিষণ্নতা নিয়া পরদিন আমি মহানগর প্রভাতী (নাকি উর্মি ওড়না?) ট্রেনে উইঠা বসি। উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন—লালমনিরহাট। সেখানে একবার পৌঁছাইয়া গেলে ঠিকঠাক বড় হইয়া কখনো আবার ফিরতে পারবো—এই আমার বিশ্বাস। কিন্তু এ-যাত্রায় তথ্য বিভ্রাটের শিকার হই, এক হারামজাদার দেওয়া ভুল তথ্য অনুযায়ী আখাউড়া স্টেশনে নাইমা পড়ি আমি। পরে, স্টেশনের অন্যদের কাছে লালমনিরহাটের ট্রেনের খোঁজ করতে গিয়া বুঝতে পারি ইনফরমেশন ভুল ছিল। তারা জানায়, আখাউড়া—জংশন বটে, তবে তৃতীয় সেই লাইন লালমনিরহাটের দিকে না, বরং সিলেটের দিকে গেছে।

আখাউড়া জংশনের নামফলক। ছবি. লেখক, ২০০৯

আখাউড়া জংশনের নামফলক। ছবি. লেখক, ২০০৯

হতাশ হই, এবং ক্লান্ত লাগে আমার। রেললাইন ধইরা হাঁটতে শুরু করি একপর্যায়। হাঁইটা হাঁইটা আউটারের দিকে গেলে পরে সেদিকে অনেক ভাঙাচোরা ট্রেনের বগি, মালের বগি, খোলা চাকা ইত্যাদি দেখতে পাই। আর লক্ষ্য করি একটা মালগাড়ির ইঞ্জিন একবার এদিক থেইকা সেদিক এবং আরেকবার সেদিক থেইকা এদিক আসা যাওয়া করতেছে। যাওয়ার সময় একলা যায়, আসার সময় একটা কইরা বগি নিয়া আসে। ওইখানে দাঁড়াইয়া থাকা একজনরে জিগাইলাম ইঞ্জিনটা এরকম করতেছে কেন? একবার এদিক, আরেকবার সেদিক, কাহিনি কী? তিনি বললেন যে, শান্টিং দিতেছে। শান্টিং দেওয়াটা আবার কী জিনিস? আমি কৌতূহলী হই, ইঞ্জিনের সঙ্গে সঙ্গে আমিও এদিক-সেদিক শুরু করি।

কিছুক্ষণের মধ্যে ব্যাপারটা বুঝতে পারি। ইঞ্জিনটা মূলত, স্টেশনের বিভিন্ন লাইনে ছড়ায়া ছিটায়া থাকা বগিগুলারে নির্দিষ্ট লাইনে আইনা একটা র‍্যাক বানাইতেছে। মানে একটা পুরাপুরি ট্রেন বানাইতেছে। এটারেই তবে শান্টিং দেওয়া বলে!

Like shamprotik on Facebook

আবিষ্কারের আনন্দে আমি ওই এলাকাতেই অবস্থান নিলাম। দেখতে দেখতেই, আপাত দৃষ্টিতে অর্থহীনভাবে চলাচলকারী ইঞ্জিনটা একটার পর একটা বগি সংগ্রহ কইরা একটা সুসংগঠিত ট্রেন বানাইয়া ফেলে, তারপর ট্রেন নিয়া প্রথমে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে এবং পরবর্তীতে সেখান থেকে অন্যকোনো গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হইয়া যায়। ব্যাপারটা এরকম, যেন ট্রেনের মতো বড়সড় একটা কিছুর প্রাইভেসি সম্পর্কে আমি জাইনা ফেললাম। আর সে কারণে যথেষ্ট উত্তেজিতও আমি। কিন্তু অনেকক্ষণ ধইরা একই জায়গায় ঘুরঘুর করতে দেইখা ওই এলাকায় দাঁড়াইয়া থাকা একটা ব্রেকভ্যানের ভিতর থেইকা একজন লোক বাইর হইয়া আইসা আমারে ডাকলো।

গেলাম ওই লোকের কাছে। এবং রেলওয়ের লোক কর্তৃক আগে একবার বাসায় ফেরত যাওয়ার ঘটনা ঘটছিল বিধায়—নিজেরে এই এলাকারই কেউ—হিসেবে তার কাছে তুইলা ধরতে চাইলাম, আর সেটা সম্ভবও হইলো। বললাম, মামার বাড়িতে বেড়াইতে আসছি তো, ইস্টিশনে ঘুরতে বাইর হইছি।

কী দেখলা ঘুইরা?

ট্রেনের শান্টিং দেওয়া দেখলাম। এটা তো আগে কখনো দেখি নাই।

মালগাড়ির ব্রেকভ্যান। ছবি. লেখক, ২০০৯

মালগাড়ির ব্রেকভ্যান। ছবি. লেখক, ২০০৯

তারপর আমিই কৌতূহলী হইয়া জিগাইলাম, আচ্ছা এই যে ব্যাপারটা (ব্রেকভ্যান)—এটার কাজ কী? প্রতিটা মালগাড়ির পেছনে এটা থাকে কেন?

সে বুঝাইলো যে, এটা থাকে কারণ এটার থাকার দরকার আছে। এটায় একজন গার্ড থাকে। একেবারে সামনে তো থাকে ইঞ্জিন, তারপর অনেকগুলা মালের বগি, শেষেও একজন কারো থাকা দরকার না? যাতে মালগুলা চুরি না হয়? আরো ধরো যে, এই ব্রেক—ট্রেনের ব্রেক তো শুধু ইঞ্জিন থেইকা করলেই হয় না, ইম্ব্যালান্সড হইয়া যায়। একদম একেবারে সামনে থেকে যেমন, তেমনি একেবারে পিছন থেইকাও ব্রেক দিতে হয়।

আপনিও কি একজন ট্রেনের গার্ড?

হ্যাঁ।

তার সাথে অনেক কথা হইলো। ট্রেন সম্পর্কে যা যা আমার জানতে চাওয়ার ছিল—সবই তারে জিগাইলাম। সব ব্যাপারেই সদুত্তরও মিললো বলা যায়—কিন্তু সমস্যা হইয়া গেল পরে। সেটা হইলো, মানে এই গার্ড লোকটা—সে ছিল এমন একজন লোক, যে বাচ্চাদের অন্যায়ভাবে আদর করে। আমার সঙ্গেও তাই করলো। প্রথমে আমার হাত—তার হাতের মধ্যে নিয়া আঙুলে বিলি কাটতে লাগলো, তারপর আরো কাছাকাছি টাইনা নিয়া আমারে, বলা যায় জড়ায়ে ধরলো—চুমু খাইলো। ঘটনার আকস্মিকতায় আমি ঝাপটা দিয়া উঠতেই আরো শক্ত কইরা বেড়াইয়া ধরলো সে। আর সাবধান কইরা দিলো, কোনো প্রকার বেয়াদপি (!) করলে কোনো একটা চলন্ত ট্রেনের নিচে আমারে ফালাইয়া দেওয়া হবে।

বেয়াদপি করার অবস্থা ছিল না আমার। জীবনে প্রথমবারের মতো এ ধরনের কোনো পরিস্থিতিতে পইড়া ততক্ষণে প্রায় অসাড় হইয়া গেছি আমি। এরইমধ্যে ওই গার্ড—যে একটা লুঙ্গি আর সেন্ডো গেঞ্জি পরা অবস্থায় ব্রেকভ্যানের মধ্যে ছিল—পাশে বসাইয়া আমার হাত তার লুঙ্গির নিচে চালান কইরা দেয়। এবং এরচেয়ে বেশি কিছু যেন না করতে হয়, সেই ব্যাপারে সাবধান কইরা দিয়া ওই পর্যন্ত করতে থাকার ব্যাপারে আমারে বাধ্য করে।

আখাউড়া জংশন। ছবি. লেখক, ২০০৯

আখাউড়া জংশন। ছবি. লেখক, ২০০৯

একইরকম ঘটনা সত্তর দশকের কবি আবিদ আজাদের সাথেও হইছিল বইলা বহুদিন পরে তার আত্মজীবনীগ্রন্থ কবিতার স্বপ্ন পইড়া জানতে পারছিলাম। তারটা ঘটছিল কিশোরগঞ্জ স্টেশনে, ট্রেনের ড্রাইভার কর্তৃক।

ঘটনার পরে কিন্তু ওই গার্ড অনেক দুঃখ প্রকাশ করে, বলে এরকম করাটা তার ঠিক হয় নাই, সে ক্ষমাপ্রার্থী—আমি যেন কাউরে কিছু বইলা না দিই। স্টেশনের কাউকে, কিংবা আমার মামাদের কাউকেও যেন না বলি।

মামাদের মানে?

মামার বাড়িতে বেড়াইতে আসছো না?

আসলে, কী আমি বলছিলাম আগে—কিছুই প্রায় মনে ছিল না। উল্টা যা যা সত্যি, তাই তারে বইলা ফেলি তখন।

Like Tanim Kabir on Facebook

অপরাধবোধ থেইকাই হোক, বা নিজের নিরাপত্তার স্বার্থেই—গার্ড আমারে নিয়া স্টেশনে গেল। প্ল্যাটফর্মের একটা হোটেলে নিয়া দুপুরের খাবার খাওয়াইলো। আমি তারে—ফেনীতে, নিজের বাসায় ফিরা যাইতে চাই বললে—সে বললো, “কোনো সমস্যা নাই, ব্যবস্থা করতেছি।”

বিকালের দিকে সে আমারে ঢাকা বা সিলেট থেইকা ছাইড়া আসা কোনো একটা ট্রেনে তুইলা দেয়। বারবার হাতে ধইরা মাফ চায়, বলে, আমি মাফ না করলে আর কারোরই তারে মাফ করার ক্ষমতা নাই। এ কারণে, শুধু এ কারণেই নিশ্চিতভাবে তারে জাহান্নামে যাইতে হবে। কিন্তু ওই ব্যাপারে আমি তারে কিছুই বলতেছিলাম না। ট্রেন আসার আগের কিছুটা সময় ধরেও লোকটার এই আর্জি ছিল আমার প্রতি। আমি অন্যান্য বিষয়ে তার সঙ্গে টুকটাক হ্যা-না বললেও, এ ব্যাপারে টোটালি নিশ্চুপ ছিলাম।

কিন্তু ট্রেন যখন ছাইড়া দিলো ফাইনালি, আমার হাত ধইরা রাখা গার্ডের হাতটা যখন একটু একটু শিথিল হইতেছে। তখন সময় আমি তারে বললাম, আর কখনো কারো সাথে এরকম করবেন না। মাফ করে দিছি। স্লামালাইকুম।

[ctt tweet=”আখাউড়া জংশনের আবিষ্কারক দুপুর http://ctt.ec/hjacG+” coverup=”hjacG”]

About Author

তানিম কবির
তানিম কবির

জন্ম ফেনী জেলার পরশুরাম-বিলোনীয়া এলাকায়। কবিতা ও গল্প লেখেন। প্রকাশিত কবিতার বই তিনটি, ‘ওই অর্থে’ (শুদ্ধস্বর ২০১৪), ‘সকলই সকল’ (শুদ্ধস্বর ২০১৫) ও 'মাই আমব্রেলা' (আদর্শ ২০১৬) এবং একটি গল্পের বই 'ইয়োলো ক্যাব' (ঐতিহ্য ২০১৬)। সম্পাদনা করেন দৈনিক ভোরের পাতার সাপ্তাহিক সাহিত্য ম্যাগাজিন ‘চারুপাতা’। এর আগে অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলানিউজ ও প্রিয়.কমে সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। প্রকাশিতব্য বই, ‘ঘরপলায়নসমূহ’ (ফেব্রুয়ারি ২০১৭) ফেসবুক পেজ: Tanim Kabir (Writer)