page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

আর্ট-কালচারের দিনগুলি

১.
আমাদের বাসার সবকিছুর হর্তাকর্তা হচ্ছে আমার মা। মেয়েরা কোন স্কুলে পড়বে, কোন রঙের স্কুল ব্যাগ কিনবে, কোন স্যারের কাছে ইংরেজি পড়বে এসব তো আছেই। বাসা ভাড়া দেয়া, বাজার করা…। পাশাপাশি আবার চাকরিও করতো আমার মা। সবকিছুতেই আমার বাবার কাজ ছিল কিছুই করতে না পারাটা। মাও অবশ্য বাবাকে কিছু করতে দিয়ে শান্তি পেত না। সবকিছু নিজের কন্ট্রোলে না থাকলে আমার মা শান্তি পায় না। আর যদি কোন কিছু নিয়ে মা একবারও ডিস্টার্বড হয় তো সব মেয়েরে একসাথে ধরে পিটানো শুরু করে।

আমি অবশ্য খুব বেশি মাইর খাই নাই। কারণ আমার আগের তিনজনকে মা এত বেশি কড়া শাসনের মধ্যে রাখছে যে, আমার বেলায় মা টায়ার্ড হয়ে গেছে। মাইরের ব্যাপারে আমার মায়ের আবার একটা ব্যাপার আছে। সেটা হচ্ছে মা ছাড়া আর কেউ তার মেয়েদের পিটাইতে পারবে না। মাঝে মাঝে আমার বাবাও যদি আমাদেরকে টুকটাক চড় থাপ্পড় দিতো তাতেও মা খেপে যেত। স্যার-মাস্টার কেউই আমাদের পিটাইতে পারতো না। এমনকি আমার বড় বোনরা যে মাঝে মাঝে আমাকে পিটায় সেইটাও মা’র পছন্দ হয় না।

২.
‘মাই ফার্স্ট ডে অ্যাট স্কুল’ এর কথা কিন্তু আমার একদমই মনে নাই। খালি আবছা আবছা মনে পড়ে আমি টেবিলে পা ঝুলাই বসে আছি। মা জুতা, মোজা পরায়ে দিচ্ছে, চুল আচড়ায়ে দিচ্ছে, মজার মজার টিফিন বক্সে ভরে দিচ্ছে… আমার প্রথম স্কুল হচ্ছে “প্রি-ক্যাডেট ট্যালেন্ট স্কুল।” আমার মা তার ব্রিলিয়ান্ট মেয়েকে নার্সারি পড়ানোর আগেই কেজিতে ভর্তি করে দেয়। তারপর জীবনের প্রথম স্কুলে, প্রথম ক্লাসে আমি মোটামুটি সব সাবজেক্টে ফেল করি। নট প্রোমোটেড হই। আমার মা প্রোমোশনের তোয়াক্কা না করেই আমাকে বাওয়া স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা দিতে পাঠায়।

বাওয়া স্কুল আমার মা’র খুব প্রিয় স্কুল। আমার আগে আমার তিন বোনই এই স্কুলে পরীক্ষা দিছে। কিন্তু কেউই শেষ পর্যন্ত টিকে নাই। মানে রিটেনে টিকলে অরালে বাদ পড়ছে। আবার রিটেন, অরালে টিকলে মেডিকাল টেস্টে বাদ পড়ছে। সর্বশেষ আমি বাওয়া স্কুলে পরীক্ষা দিতে গেলাম। আমাকে টিকতেই হবে এমন একটা অবস্থা ওই সময়।

রিটেনে টিকলাম। ভাইভা পরীক্ষা দিতে যাই। (ভাইভার কথা আমার কিছুই মনে নাই। মা- বোনের মুখে যা শুনছি তাই লিখালাম।) সেখানে আমাকে এক ম্যাডাম প্রশ্ন করে, তোমার প্রিয় নায়ক কে?

সালমান খান।

তোমার প্রিয় একটা গান গেয়ে শোনাও দেখি।

দিওয়ানা হে ইয়ে মান কিয়ুন পাগাল হে ধারকান…।

এইভাবেই হাত পা নেড়ে নেড়ে গান গেয়ে আমি বাওয়া স্কুলে টিকে যাই।

প্রতিদিন সকালে আমাকে অনেক কষ্ট করে ঘুম থেকে উঠতে হইত আর আমার বোন পারমিতাকে আরও বেশি কষ্ট করে ঘুম থেকে উঠে আমাকে স্কুলে দিয়ে আসতে হইত। হোম ওর্য়াক খাতা, ক্লাস ওর্য়াক খাতা, পেন্সিল বক্স, পানির বোতল আরো কত কিছু নিয়ে কত কষ্ট করে যে আমি স্কুল যাইতাম! তবুও আমার স্কুলে যেতে ভালো লাগত কারণ স্কুল শেষে পারমিতা তার মানিব্যাগ সহ আমাকে আনতে যেত আর আমি স্কুল গেট থেকে শুরু করে বাসা পর্যন্ত যা যা পাওয়া যেত সব কিনতাম। (example: স্কুল গেট থেকে ঝালমুড়ি, আচার, বাদাম। স্কুলের পাশের দোকান থেকে চিপস, আইসক্রিম। আর বাসার সামনের দোকান থেকে হ্যান্ড পপ, ফুট পপ। পারমিতা একদিন ইচ্ছা করে তার মানি ব্যাগটা ফেলে আসছিল। তখন আমি বাকিতে এসব খাওয়া দাওয়া নিয়ে বাসায় আসছিলাম।

বাওয়া স্কুলের পাশাপাশি আমার মা’র আরো কতগুলি ইচ্ছা ছিল। তার মধ্যে দুইটা হচ্ছে, আমাকে শিশু একাডেমিতে ভর্তি করায়ে নাচ-গান শেখানো আর শিল্পকলা একাডেমিতে আর্ট শেখানো।

শিশু একাডেমিতে ভর্তি নেয় জানুয়ারি মাসে। ফরম আনতে গিয়ে মা বুঝলো যে শিশু একাডেমিতে টেকা অনেক টাফ। হাজারের মত ছেলেমেয়ে ভর্তি ফরম নেয়। তার উপর কোনো ভর্তি পরীক্ষা নাই। লটারি করে ছেলেমেয়েদের ভর্তি করানো হয়। লটারির দিন আমার মা সকাল সকাল একাডেমিতে চলে গেছে। লটারিতে ২৫০ জনের নাম ডাকা হবে। আমার নাম ৩ নাম্বারে ডাকা হইল। এরপর আমার মায়ের খুশি কে দেখে!

পারমিতা হিমের সঙ্গে আমি — লেখক

খুশি খুশি ভাব নিয়ে বাসায় এসেই মা চিন্তায় পড়ে গেছে। দুইদিনের মধ্যে ভর্তি হইতে হবে। আর শিশু একাডেমির নিয়ম ছিল পুরা এক বছরের টাকা একসাথে নেয়ার। এতগুলি টাকা ম্যানেজ করারও তো একটা ব্যাপার আছে। তাও কীভাবে কীভাবে যেন মা টাকা ম্যানেজ করে আমাকে ভর্তি করায়ে দিল।

শিশু একাডেমিতে ভর্তি হওয়ার পরের সপ্তাহে শিল্পকলার আর্ট ক্লাসের ভর্তি ফরম দেয়া শুরু হয়। আমার মা সেইখান থেকেও ফরম আনতে যায়। যাওয়ার পরে মাকে ওরা জিজ্ঞেস করে যে আপনার মেয়ে কোন ক্লাসে পড়ে? ক্লাস থ্রি শুনে তো ওরা কোনভাবেই ফরম দিবে না। কারণ ওইখানে ক্লাস সিক্সের নিচে ভর্তিই করায় না। আমার মা তাও ঝগড়াঝাটি করে ফরম নিয়ে আসছে। ওদেরকে বলছে, আমার মেয়ে না টিকলে আমার লস, আপনার কী? ঝাড়ি খাওয়ার পরে ওই লোক ফরম দিলো। এইখানে আবার লটারি সিস্টেম নাই। পরীক্ষা দিতে হবে।

নতুন কালার বক্স টক্স কিনে পরীক্ষা দিতে গেলাম। গিয়ে তো আমি পুরাই হা! ফার্স্ট, সেকেন্ড, থার্ড তিন ইয়ারের পরীক্ষাই একসাথে হচ্ছে। ধামড়া ধামড়া সব পোলাপাইন। ফার্স্ট ইয়ারের ছেলে মেয়েরাই আমার চেয়ে কমপক্ষে ৫-৬ বছরের বড়। একমাত্র পিচ্চি তার উপর সবসময় একটা গম্ভীর ভাব নিয়ে থাকতাম বলে সেখানকার সবাই আমাকে অনেক খাতির করা শুরু করে দিল। অনেক পরিশ্রম করে মোটামুটি সুন্দর একটা ছবি আঁকলাম।

আমার নতুন রঙের বক্স খুলে যেই রঙ করতে যাব সেই পাশের এক ভাইয়া বলে উঠছে “এই কী করতেছো? রঙ ইউজ করতে মানা করছে তো!”

আমি—“রঙ ছাড়া আমার এই গ্রামের দৃশ্য কেমনে হবে? এ তো স্যার-ট্যার শুনবো না। আমি রঙ করবই।”

ঐ ছেলে—“আরে স্যার বলে গেছে স্কেচ করতে।”

আমি—“স্কেচ কী?”

ঐ ছেলে—“এই যে পেন্সিল দিয়ে এই রকম এই রকম।”

ঐ ছেলেটা আমাকে দেখায়ে দিল। আমি মহা আনন্দে স্কেচ করলাম। জীবনের প্রথম স্কেচ। সেই পরীক্ষাতে আমি ২০ তম হইছিলাম। যেহেতু ক্লাসের সর্বকনিষ্ঠ স্টুডেন্ট তাই স্যাররা আমাকে একদমই বিরক্ত করত না। আমার যা মন চাইত আমি ক্লাসে তাই আঁকতাম। উঁচু ক্লাসের ছেলেপেলেরা আমাকে মডেল বানায়ে আমার পোর্ট্রেট আঁকত।

ছবি আঁকার ক্লাসের একটা খুবই মজার ব্যাপার ছিলো। সেটা হচ্ছে প্রতি বছর এক মাস ওইখানে মাটির জিনিসপত্র বানানো শেখানো হইত। ওইটাতেই আমি সবচেয়ে বেশি মজা পেতাম আর জিনিসপত্র ভালো বানাতেও পারতাম। স্যাররাও পছন্দ করতো। আমাকে পাল বংশের কন্যা ডাকতো।

ওইদিকে শিশু একাডেমি গানের ক্লাসে মোটামুটি সবাই আমার সমবয়সী। ওইখানে প্রতি সপ্তাহে একটা করে গান শিখাতো। ক্লাসে সেই গান সবাইকে হারমোনিয়াম বাজায়ে শোনাতে হইত। আমি ক্লাসে প্রতিদিন হারমোনিয়াম বাজাতাম ঠিকই কিন্তু গান গাইতাম না। শুধু গানটা বাজায়ে দিয়ে চলে আসতাম। প্রথম প্রথম ম্যাডাম ভাবতো পরে পরে লজ্জা কেটে গেলে আমি গান গাওয়া শুরু করবো। কিন্তু কখনোই আমি গান গাই নাই।

৩.
দেখতে দেখতে গান আর ছবি আঁকার ফার্স্ট সেমিস্টার পরীক্ষা চলে আসলো। ছবি আঁকার ব্যাপারে আমি যেহেতু কখনই সিলেবাস ফলো করি নাই তাই পরীক্ষা দিতে আমার ভালোই কষ্ট হইছিল। পরীক্ষায় দুইটা ছবি আঁকতে বলা হইছিল। একটা গ্রাম্য মেলা আরেকটা সামনের মডেলের পোর্ট্রেট। সামনের মডেলের পোর্ট্রেট আঁকার ব্যাপারে আমার কোনো আগ্রহই ছিল না। আমি সুন্দর করে গ্রাম্য মেলা আঁকলাম।

আর গানের পরীক্ষায় স্টেজে উঠে হারমোনিয়াম বাজায়ে দিয়ে চলে আসছি। যা যা গান বলছে সব কয়টারই হারমোনিয়ামে সুর তুলে দিয়ে আসছি।

দুইটা পরীক্ষারই রেজাল্ট দিল। আমি দুইটাতেই ফেইল করছি। ছবি আঁকার পরীক্ষায় ৪০-এ পাইছি ১৮। ২০-এ পাশ ছিল। আর গানের পরীক্ষায় ৩০-এ ৫। ম্যাডাম অবশ্য বলছিল গান গাই নাই বলে আমি গানে ডাবল জিরো পাবো। আর ছবি আঁকার ব্যাপারে স্যার আমাকে কিছুই বলে নাই। বড় ভাইরা বলছে, “গ্রাম্য মেলা আঁকতে বলছে আর তুমি সেখানে এত্ত বিশাল আকাশ আঁকছো কেন? মেলার কিছুই তো নাই দৃশ্যে, খালি একটা নাগরদোলা আর দুই তিনটা বেলুনওয়ালা ছাড়া! আর এইটা কী পোর্ট্রেট আঁকছো? আঁকা দেখে মনে হচ্ছে ওই লোকরে না, উনার কঙ্কাল আঁকছো তুমি। মডেল যদি এইটা দেখে তাহলে তোমার খবরই আছে।”

গ্রাম্য মেলাতেই আমি ২০-এ ১৮ পাইছিলাম। আর পোর্ট্রেট স্যার আমাকে কিছুই দেয় নাই। জিরোও দেয় নাই। গ্রাম্য মেলাতে ১৮ দেয়ার ব্যাপারে স্যার আমাকে বলছিলো একমাত্র আকাশের জন্যই নাকি উনি আমাকে ১৮ নাম্বার দিছে। আকাশটা সুন্দর হইছিল বলে।

দুইটাতেই ফেইল তার উপর এসব আর্ট কালচার করতে গিয়ে আমার স্কুলের রেজাল্টও হইছে চরম খারাপ। (অবশ্য কখনো খুব একটা ভালোও হয় না।) সব মিলায়ে আমার মা খুবই দুঃখ পাইছে। এতগুলা ফেইলিয়ার, এরপরে তাই আমার আর আবার ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হওয়া হয়ে ওঠে নাই।

About Author

সুচিস্মিতা তিথি
সুচিস্মিতা তিথি

জন্ম. চট্টগ্রাম, জুন ১৯৯৮। চট্টগ্রামের বাওয়া স্কুলে ক্লাস সেভেন পর্যন্ত পড়াশুনা। চকরিয়া থেকে জেএসসি এবং ঢাকার আজিমপুর গভমেন্ট গার্লস স্কুল খেকে ২০১৪ সালে এসএসসি পাস। এখন ঢাকার মতিঝিলে আইডিয়াল কলেজে পড়ছেন।