page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

ঋতুপর্ণের সত্যান্বেষী

satyan-456

চলে যাওয়ার অল্প কয়েকদিন দিন আগে তাঁর শেষ চলচ্চিত্রের শুটিং শেষ হয়েছে বলে টুইটারে জানিয়েছিলেন। ঋতুপর্ণ ঘোষ তাঁর শেষ সিনেমাটি করছিলেন শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনপ্রিয় গোয়েন্দা চরিত্র ‘ব্যোমকেশ বকশি’কে নিয়ে। শরদিন্দুর চোরাবালি উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ছবির নাম দিয়েছিলেন ‘সত্যান্বেষী‘।

ছবির শ্যুটিং পরবর্তী কাজ বাকি ছিলো। সেই কাজগুলি অর্থাৎ ছবির সম্পাদনা, ডাবিং, শব্দ যোজনা, আবহ সংগীত, সবই করতে হয়েছে তাঁর সহযোগীদের মিলেমিশে৷ সেখানে ঋতুপর্ণ ছিলেন না সশরীরে ঠিকই, কিন্ত্ত যাঁরা এতদিন তার সঙ্গে করেছেন, তাঁদের কাছে ঋতুপর্ণের ভালো লাগা, মন্দ লাগার একটা ধারণা অবশ্যই হয়ে গিয়েছিলো৷ অনেক জল্পনা-কল্পনা শেষে ছবিটি শেষ হয় দেবব্রত দত্তের হাত দিয়ে। সঙ্গে ছিলেন সম্পাদক অর্ঘ্যকমল মিত্র, চিত্রগ্রাহক অভীক মুখোপাধ্যায়, সুরকার দেবজ্যোতি মিশ্র এবং প্রযোজক শ্রীকান্ত মোহতা।

ঋতুপর্ণর চমক ছিল হিন্দি ছবির পরিচালক সুজয় ঘোষকে এই ছবিতে গোয়েন্দা ব্যোমকেশ বকশি চরিত্রে কাস্ট করা।

সুজয় এর আগে কাহানি (২০১২) পরিচালনা করেছিলেন। এছাড়াও আছেন অর্পিতা চট্টোপাধ্যায়, ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত, অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়, শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ।

সত্যান্বেষী ছবিটি প্রযোজনা করেছে শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস। শরদিন্দুর চোরাবালি থেকে সত্যান্বেষীর গল্প অনেকটাই সরে এসেছে। এখানে তিনি গল্প বলেছেন তাঁর পরিচিত ঢঙে।

শরদিন্দুর চোরাবালির চরিত্রগুলো যথাক্রমে ত্রিদিব, হিমাংশু, হিমাংশুর কন্যা বেবি, দেওয়ানজি কালীগতি, অনাদি, অনাদির বিধবা মেয়ে রাধা ও হরিনাথ৷ বাঘের আওয়াজ, হরিনাথের অন্তর্ধানই গল্পের রহস্য ও ব্যোমকেশের চ্যালেন্জ।

সত্যান্বেষী ছবির চরিত্রগুলিকে ঋতুপর্ণ সাজিয়েছেন যথাক্রমে বলবন্তপুরের (যা উপন্যাসে চোরাবালি জমিদারী) মহারাজ অর্থাৎ হিমাংশুর বাবা (উপন্যাসে নেই), দেওয়ানজি চন্দ্রশেখর (উপন্যাসে চন্দ্রশেখর বলে কোনও চরিত্র নেই) কালীগতি এখানে বৈদ্য৷ আর তার বিধবা কন্যা লীলা ৷ জমিদার হিমাংশু রয়েছেন, রয়েছেন তার স্ত্রী অলকা ৷

উপন্যাসে অবশ্য স্ত্রীর উপস্থিতি অতি সামান্যই ৷ উপন্যাসে উপস্থিতি অতি সামান্য অনাদীর বিধবা মেয়ে রাধারও৷ তবে ঋতুপর্ণ গল্পটা শুরু করলেন দুই নারী চরিত্র থেকেই৷ বলা ভালো, ঋতুপর্ণ হরিনাথের ভ্যানিশ রহস্যটাকে বাঁধলেন অলকা ও লীলার আঁচলে৷ অপরিবর্তিত রইল বাঘের ডাক ও চোরাবালি৷

ট্রেইলার, সত্যান্বেষী

ব্যোমকেশকে এতদিন পড়ে এসেছি ব্যোমকেশের মত করেই৷ বুদ্ধিদীপ্ত গোয়েন্দা, কিন্তু যেন খুব কাছের মানুষ৷ আর লেখক অজিত, যার বয়ানেই এগিয়ে চলে গোটা ব্যোমকেশ সিরিজ৷চোরাবালিও এই নিয়মের বাইরে নয়৷ কিন্তু পড়াটা হঠাৎ করে বদলে দিলেন পরিচালক ঋতুপর্ণ৷ শরদিন্দুর চোরাবালিকে ঋতুপর্ণ ঘোষ বানিয়েছেন সত্যান্বেষী। শরদিন্দুর এই গল্পটাকেই তিনি কেন নির্বাচন করলেন, আবার নামটাও বদলে দিলেন, তারও যে যথোপযুক্ত কারণ ছিল, সেটা ছবিটা সম্পূর্ণ দেখলে বোঝা যায়।

ঋতুপর্ণ চারদিকের ঘটনা এমনভাবে সাজালেন, যেন শরদিন্দুর সময় উঠে এল আমাদের চারদিকে। ঢুকে গেলাম রাজবাড়ির অন্দরমহলে। রহস্যের গন্ধ যেখানে প্রতি ইটে আছে আবার সত্যজিত রায়ের অনুসরণে  ঋতুপর্ণর চরিত্রচয়ন। পরিচিত, অপরিচিত অভিনেতা-অভিনেত্রী, আশেপাশের নন-অ্যাক্টরদের কাছ থেকে অভিনয় আদায় করে নেওয়া। সুজয় পরিচালক, অনিন্দ্য গায়ক, কালীগতির ভূমিকায় শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায় অধ্যাপক। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের চোরাবালি পুরোপুরি আত্মস্থ যে করেছিলেন ঋতুপর্ণ, তা এই কাস্টিং-এ স্পষ্ট। অতিরিক্ত ঘটনার ঘনঘটার চাপ নেননি ঋতুপর্ণ। বরং আবহসঙ্গীতের প্রলেপে চোরাবালি-ও সত্যান্বেষীকে এক চরিত্র করে তুলেছেন। তা বোঝা যায় ক্লাইম্যাক্সে।

ব্যোমকেশ ও হিমাংশু

অজিতের ছুড়ে দেওয়া সিগারেট টিন যখন বালুকার গ্রাসে চলে যেতে দেখছি তখন দেখা যাচ্ছে ব্যোমকেশ-অজিত লাইব্রেরিতে। আবিষ্কার করছে বালুবন্ধপুর। অপভ্রংশে যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলবন্তপুর। সেখান থেকে চোরাবালি পর্যন্ত উপনীত হওয়ার সময়ে এক অতিরিক্ত রঞ্জিত, অতিনাটকীয় দৃশ্য দেখতে পাই।

“গায়ের রং ফরসা, বেশ সুশ্রী চেহারা- -মুখে চোখে একটা বুদ্ধির ছাপ আছে। কিন্তু বোধহয় সম্প্রতি কোনও কষ্টে পড়িয়াছে; কারণ বেশভূষার কোনও যত্ন নাই, চুলগুলি অবিন্যস্ত…” এমনই একটা চেহারার স্কেচ পাওয়া যায় শরদিন্দুর ‘সত্যান্বেষী’ গল্পে, যেখানে প্রথমবার অজিতের দেখা হচ্ছে অতুলের ছদ্মবেশধারী ব্যোমকেশের সঙ্গে। শীর্ণকায় শরীর, সদা সজাগ মস্তিষ্ক, সাধারণের চেয়েও বড় চোখ। একদম বাঙালির ব্যোমকেশ। যে ব্যোমকেশ কেন্দ্রে থাকে না। রহস্যের জালটাকে কেন্দ্রে রাখে। নিজে থাকে গল্পে মিশে, ইন্দ্রিয়কে রাখে জাগ্রত। সাসপেক্টদের অনুসন্ধান করে চোখ-কান-খোলা রেখে। ব্যোমকেশের আদবকায়দা কেমন যেন পার্শ্বচরিত্রের মত। সাসপেক্টরাই কেন্দ্রে। বেশি পরিস্ফূট, বেশি রঙিন, আর একই কারণে ব্যোমকেশ চলে যান তাঁদেরই পেছনে।

অপূর্ব লেগেছে অজিতকেও। এই অজিত কিন্তু একান্ত শরদিন্দুরই অজিত। জিজ্ঞাসু, ভ্রমণপিপাসু, সাহিত্যমনস্ক ও স্পষ্টবাদী। সুজয়-অনিন্দ্য এই কম্বিনেশন শরদিন্দুর লেখনীকে যথাযোগ্য সম্মান জানিয়েছে।

রানি অলকার চরিত্রে অর্পিতা চট্টোপাধ্যায়। এ ছবিতে অর্পিতা এককথায় অসাধারণ। মানসিক সঙ্কট, একাকিত্ব, স্বামীর প্রতি সন্দেহ, বন্ধুকে হারানোর যন্ত্রণা—সব মিলিয়ে তাঁর চরিত্রটাই বোধহয় ছিল সব চেয়ে কঠিন। এবং তিনি প্রতিটি দৃশ্যেই যেন দর্শকদের মুগ্ধ করতে করতে এগিয়েছেন।

লীলার চরিত্রে আনন্দির অভিনয় মন ছুঁয়ে যাওয়ার মত, রাজা হিমাংশু চরিত্রে ইন্দ্রনীল বেশ মানানসই৷ সঞ্জয় নাগও বেশ ভালো নিজের জায়গায়৷ মনে দাগ কাটে অনির্বাণ ঘোষের অভিনয়ও। এ ছবিতে বৃদ্ধ কালীগতির চরিত্রে অধ্যাপক শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভাল লাগে। তিনি বুদ্ধিদীপ্ত, সাবলীল এবং অতি অনায়াস। বাংলা উচ্চারণে জড়তাহীন। কালীগতির চোখ ও শরীরী ভাষাতেও তিনি যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য। শিবাজী প্রথম ছবিতেই যে সাক্ষর রাখলেন তা মনোমুগ্ধকর।

শরদিন্দু-র চোরাবালি এগোয় সহজ-সরল ভঙ্গিতে৷ যেখানে একটাই উদ্দেশ্য৷ জমিদার হিমাংশুর একমাত্র কন্যার অঙ্কের মাষ্টার হরিনাথ হঠাৎ-ই গায়েব৷ সঙ্গে গায়েব জমিদারীর হিসেবে-নিকেশের খাতা৷ ঘটনাচক্র ও ব্যোমকেশের বুদ্ধিতে রহস্যের সমাধান৷ অন্তর্ধান রহস্যের একেবারে ইতি৷ শেষমেশ দোষীর শাস্তি৷ কিন্তু ঋতুপর্ণ এত সহজে চোরাবালিকে দেখালেন না৷ বরং চোরাবালি নামটিকে জমিদারীর কবল থেকে বার করে নিয়ে এসে ফেললেন অলকা ও হিমাংশুর দাম্পত্য জীবনে৷

যেখানে বন্ধু ব্যোমকেশকে হিমাংশু জানাতে বাধ্য হল তাঁর স্ত্রী অলকার যৌনতায় অনিচ্ছার কথা৷ জানাতে বাধ্য হল রাজবৈদ্য কালীগতির বিধবা মেয়ে লীলার সঙ্গে যৌনতায় লিপ্ত হওয়ার ঘটনা৷ সঙ্গে যুক্ত করলেন হরিনাথ লাইব্রেরিয়ানকে৷ যে লাইব্রেরিয়ান নিজের কাজের প্রতি খুব সৎ৷ যে হরিনাথ রানি অলকার একমাত্র বন্ধু৷ একাকীত্বের সঙ্গী৷ অন্যদিকে যে হরিনাথের সঙ্গে প্রেমে লিপ্ত বিধবা লীলা৷ যে হরিনাথ অন্তস্বত্তা লীলাকে গান্ধর্ব মতে বিয়েও করে ছবির শেষ পর্যায়ে৷ আর সেখান থেকেই সত্যান্বেষী শুধু গোয়েন্দা গল্প থাকে না ৷ জন্ম নেয় এক অন্য প্রেমের গল্পের যার চোরাবালিতে লুকিয়ে থাকে গোয়েন্দা ব্যোমকেশ৷

ছবির প্রথম দৃশ্যেই বৃদ্ধ কালীগতির আগমন৷ সঙ্গে বিধবা মেয়ে৷

লাইব্রেরি থেকে চুরি যায় দুটি মূল্যবান আর্য়ূবেদ চিকিৎসার বই৷ প্রশ্ন ওঠে তাহলে অলকার যৌন অনিচ্ছার জন্য দায়ী এই বৈদ্য? অলকাকে নিয়মিত ওষুধ দিতেন বৈদ্য৷ যদিও তা অলকার কথায় ঘুমের ওষুধ৷ এই প্রশ্নের উত্তরের কিছুটা অভাস মেলে ছবির শেষে ৷ নিজের বিধবা মেয়েকে অলকার জায়গায় প্রতিস্থাপন করার জন্যই কালীগতির এই সব চাল৷ লীলার প্রতি হরিনাথের প্রেম ও বিবাহ কালীগতির অঙ্ক বদলে দেয়৷ আর ফলাফল হরিনাথ নিখোঁজ৷ পরিচালক ঋতুপর্ণ জটটি খুলেছেন শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিয়ম মেনে৷ শুধুমাত্র নতুন সংযোজন হিমাংশুর পুত্রসন্তান কোলে লীলা৷ অনেক মুগ্ধতা সত্ত্বেও উল্লেখ না করে পারা যায় না, মৃগয়ার দৃশ্যে অজিত ও ব্যোমকেশের উইগ বদলে যাওয়া। অজ্ঞাত কারণে হাতের লেখার বদলে ছাপার অক্ষর ব্যবহার করা হয়েছে তাসের ওপর। যথেষ্ট অস্বস্তির জন্ম দেয় ঋতুপর্ণের ছবিতে এ ধরনের ভুল।

About Author

মুনতাকীম চৌধুরী
মুনতাকীম চৌধুরী